বাঘ সংরক্ষণের বার্তা দিতে দেশ ঘুরে এ বার বিদেশে পাড়ি বাঙালি দম্পতির

0

শ্রয়ণ সেন

এ বছর জুলাইয়ের কথা। দীর্ঘক্ষণ মোটরবাইক চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটি গাছের তলায় বাইকটিকে পার্ক করে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রীও। কিন্তু সেটা যে রথীনবাবু আর গীতাঞ্জলিদেবীর কাছে কতটা বিপদ বয়ে আনছে ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তাঁরা।

রথীনবাবু যখন গাছের তলায় দাঁড়িয়েছিলেন, সেই সময় ওই গাছের তলায় সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল এক কিশোর। রথীনবাবু তার কাছে যেতেই সে দৌড়ে কাছের একটি বাড়িতে ঢুকে যায়। কিছুক্ষণ পরেই গ্রামের পুরুষ-মহিলারা ঘিরে ধরেন তাঁদের। তৈরি হয় গণপিটুনির পরিস্থিতি।

কিন্তু সে যাত্রায় কোনো ভাবে বেঁচে গেলেও, ব্যাপারটা নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন তাঁরা। বরং তাঁদের বিশ্বাস, যে বার্তা ছড়িয়ে দিতে তাঁরা বেরিয়েছেন, তাতে সমস্ত প্রতিকূলতা তাঁদের অতিক্রম করতেই হবে।

বিশ্ববাসীকে বাঘ সংরক্ষণের বার্তা দিতে এক অভিনব অভিযানে বেরিয়েছেন কলকাতার বাঙালি দম্পতি রথীন্দ্রনাথ দাস ও গীতাঞ্জলি দাস। ফেসবুকে রথীনবাবু, ‘ওয়াইল্ড রথীন’ হিসেবে বেশি পরিচিত।

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে সস্ত্রীক রথীনবাবু বেরিয়েছিলেন দেশ সফরে। পৌঁছে গিয়েছিলেন দেশের তৎকালীন ২৯টা রাজ্য ও পাঁচটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। সেই অভিযানই এ বার দেশের গণ্ডির বাইরে। আগামী মাসের শেষ দিকে, বনভূমি ও বন্যপ্রাণী, বিশেষত বাঘ সংরক্ষণের বার্তা নিয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন তিনি আর গীতাঞ্জলিদেবী। 

কিছুটা প্রচারের আড়ালে থেকে অনন্য কাজ করে চলেছেন এই দম্পতি। সংবিধানের ৪-এ বিভাগের ৫১-এ (জি) অনুচ্ছেদটি রথীনবাবু মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দেশের বনাঞ্চল, হ্রদ এবং বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করা তাঁর অন্যতম কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

নিজের নেশাকেই তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ করে এমনই একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত রথীনবাবু। পশুশিকার বিরোধী এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে একাধিক কাজকর্মে তিনি নিজে হাত লাগিয়েছেন। কখনও কখনও দুঃসাহসিক কিছু অভিযানেও গিয়েছেন।

আরও পড়ুন বাঘের গহ্বরে বিকল সাফারির বাস, পর্যটকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিজেকে নিয়োজিত করার পাশাপাশি তিনি একজন অত্যন্ত সফল বাইকারও। এই বাইক নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, উদ্দেশ্য একটাই, বাঘ তথা সামগ্রিক ভাবে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে বার্তা দেওয়া।

এই অভিযান তিনি শুরু করেছিলেন ২০১৬ সালে। সে বছর ৩ অক্টোবর নিজের প্রাণের বাইক নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন, ফিরেছিলেন পরের বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি। এই সফরে তাঁর মূল বার্তা ছিল, ‘জঙ্গল বাঁচাও, বন্যপ্রাণ বাঁচাও।’ এই সফরে দেশের ২৯টি রাজ্য আর পাঁচটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মোট ২৭,১৩৮ কিমি সফর করেন তিনি। নিজের বার্তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পৌঁছে যান ২২টি স্কুলে।  

এর পর ‘গণ্ডার বাঁচাও’-এর বার্তা নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ আর অসমে মোট ২৮২২ কিমি সফর করেন তিনি। এই সফরে ১৬৭টা স্কুলে বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত সচেতনতা শিবির করেন তিনি।

এর পর তৃতীয় সফর। “কেন বন্যপ্রাণ রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য?”, দেশবাসীকে সেই পাঠ দিতেই বেরিয়ে পড়েন দু’ জন। ভারতের দশটি রাজ্যে প্রায় ৬০০০ কিমি সফর করে তাঁরা পৌঁছে যান ২৩২টি স্কুলে। 

প্রথম তিনটে সফরের সফলতার পর এ বার আরও বড়ো পরিকল্পনা করেন দু’ জনে। ‘জার্নি ফর টাইগার’ নামের এই সফরের মূল বার্তা ছিল, “প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য বন্যপ্রাণ বাঁচাও!”

দেশ আর বিদেশ মিলিয়ে এই সফরকে মোট তিনটে ভাগে ভাগ করেন রথীন-গীতাঞ্জলি। তাঁর প্রথম ভাগের জন্য এ বছর ১৫ ফেব্রুয়ারিতে বেরিয়ে পড়েন দু’জনে। প্রথম লক্ষ্য ভারতের ২৯টা রাজ্য এবং পাঁচটা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সফর।

কলকাতা থেকে শুরু হয়ে প্রথমে সুন্দরবন হয়ে রথীনবাবুরা চলে যান আলিপুরদুয়ারের বক্সা। সেখান থেকে উত্তরপূর্ব ভারতের ব্যাঘ্রপ্রকল্পগুলি ঘুরে, দেশের বাকি অংশে সফর করেন। এই সফরে দেশের সব ক’টি ব্যঘ্র প্রকল্পে যাওয়াই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। তার আশেপাশের গ্রামগুলিতে বাঘ সংরক্ষণের বার্তা দিয়েছেন এই দম্পতি। তাঁদের এই অভিযানে পূর্ণ সহায়তা করেছে বিভিন্ন রাজ্যের বন্যপ্রাণ দফতরও।

১০ নভেম্বর পর্যন্ত অভিযানে ছিলেন দু’জনে। মোট ২৬৯ দিনের এই অভিযানে ৩৬৪৯২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন তাঁরা। এই সফরে দেশের ৫০টি ব্যাঘ্রপ্রকল্প, ১০০-এরও বেশি অভয়ারণ্য সফর করেন তাঁরা। সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে ৩০০০টি গ্রাম আর ৬৪৩টি স্কুলে যান তাঁরা। আর এই সফর চলাকালীনই উন্মত্ত জনতার রোষের মুখেও পড়তে হয় তাঁদের।

মধ্যপ্রদেশের সাতপুরা টাইগার রিজার্ভের কাছে উন্মত্ত জনতার মুখোমুখি হয়েছিলেন দু’জনে। ওই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রথীনবাবু বলেন, “‘আমরা কিডনি চোর, এমন ধারণা হয়েছিল ওঁদের। কিছুতেই ওদের বোঝাতে পারছিলাম না আমাদের উদ্দেশ্যটা। এমনকি আমার সঙ্গে যে একজন মহিলা রয়েছেন, সেটাও ওঁরা বিশ্বাস করছিলেন না।”

শেষে গ্রামেরই এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন রথীনবাবু। তিনি বলেন, “ওই ব্যক্তিকে দেখে মনে হল উনি শিক্ষিত। বুঝলাম, ওঁকে যদি বোঝাতে পারি, তা হলে এ যাত্রায় বেঁচে যাব।”

শেষে ওই ব্যক্তির তৎপরতায় রণে ভঙ্গ দেয় উন্মত্ত ওই জনতা। ছাড়া পেয়ে যান রথীনবাবুরা।

এই ঘটনার পরেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে ভয় লাগে না?

এই বিপদেও হাল ছাড়েননি দু’জনে। বলছেন, ‘‘যে-শপথ নিয়ে বেরিয়েছি, তা শেষ করেই ফিরব।” সেই অভিযানের প্রথম অংশটি শেষ হয়েছে গত নভেম্বরেই। কিন্তু এ বার লক্ষ্য আরও বড়ো।

অভিযানের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অংশ শুরু হচ্ছে জানুয়ারির শেষে। এ বার তাঁদের লক্ষ্য, বাঘ রয়েছে, এশিয়ার এমন ১২টি দেশে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

আরও পড়ুন রাজস্থানের জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের তাড়া বাঘের, দেখুন রোমহর্ষক ভিডিও

মোট দুটি অংশে এই অভিযানকে ভাগ করেছেন তাঁরা। দ্বিতীয় অংশে মূলত আসিয়ানভুক্ত দেশ, অর্থাৎ মায়ানমার, তাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কাম্বোডিয়া এবং লাওসে যাবেন তাঁরা। তৃতীয় তথা শেষ অংশে তাঁরা অভিযান করবেন, বাংলাদেশ, চিন, রাশিয়া, নেপাল এবং ভুটানে। প্রত্যেকটা দেশের রাজধানী ছুঁয়ে আরও গভীরে প্রবেশ করার ইচ্ছে রথীন-গীতাঞ্জলির।

তাঁদের এই অভিযানগুলির পরিকল্পনা এবং দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে হংকং-এর এশিয়ান ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার্স ক্লাব, সাউথ এশিয়ার ফোরাম ফর এনভায়রনমেন্ট (সেফ) আর ‘এক্সপ্লোরিং নেচার’ নামক তিনটি সংস্থা।

এই অভিযান শেষ করে ফিরে আসার পর বাঘ সংরক্ষণ নিয়ে একটি বই লেখারও পরিকল্পনা রয়েছে রথীনবাবুর। তবে তার আগে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য, উল্লিখিত দেশগুলিতে নিজের বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

এই সফরে বেরোনোর আগে দেশবাসী তথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে একটা বিশেষ বার্তা দিতে চান রথীনবাবু। তিনি বলেন, “আমাদের জীবনের মূল উৎস হল জঙ্গল। কারণ জঙ্গল আছে বলেই জল, অক্সিজেন-সহ বাঁচার মূল রসদ আমরা পাচ্ছি। আর এই জঙ্গলকে বাঁচিয়ে রাখছে বন্যপ্রাণ, বিশেষত বাঘেরা। তাই বাঘ বাঁচানোর দায়িত্ব কোনো সরকারের একটা বা দু’টো দফতরের নয়, এই দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। ওরা বাঁচলে, আমরাও বাঁচব।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.