নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: সকালেই খবরটা চলে এসেছিল। সোনা থেকে আর এক কদম দূরে স্বপ্না। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে সন্ধে পর্যন্ত প্রতীক্ষায় বসে ছিল গোটা পাড়া। স্বপ্নার স্বপ্ন বাস্তব হবে তো? এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল সকলের মনে। শুধু পাতকাটা-ঘোষপাড়া কেন, শুধু জলপাইগুড়িই বা কেন, আদতে গোটা বাংলাই অপেক্ষা করেছিল সারা দিন সোনার খবরটা শোনার জন্য। বুধবার সকালে হেপ্টাথেলনের ষষ্ঠ গেম জ্যাভেলিন থ্রো-এ প্রথম হয়ে পয়েন্টের হিসেবে স্বপ্না যখন অনেকটাই এগিয়ে গেল তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে, তখন যেন মন খুলে সবাই ভাবতে শুরু করল স্বপ্নার সোনা পাওয়াটা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। অবশেষে সন্ধ্যায় শেষ কদমটা যখন পেরিয়ে গেল সে, তখন উল্লাসে ফেটে পড়ল পাতকাটা-ঘোষপাড়া। উল্লাসে ফেটে পড়ল গোটা বাংলা। কুড়ি বছর পর এশিয়াড থেকে ফের সোনা আনল বাংলার মেয়ে। এর আগে ১৯৯৮-এর ব্যাংকক এশিয়ান গেমসে ৮০০ মিটার ও ১৫০০ মিটার দৌড়ে সোনা এনেছিল জ্যোতির্ময়ী সিকদার।

আরও পড়ুন এশিয়ান গেমস ২০১৮ একাদশ দিন: হেপ্টাথেলনে সোনা বাংলার স্বপ্নার, ট্রিপল জাম্পে অরপিন্দর

সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম স্বপ্নাদের পাড়াতে। পাতকাটা-ঘোষপাড়া প্রাথমিক স্কুলের পিছনে যেখানে রাস্তাটা বাঁক নিয়েছে, সেখানেই বসেছিলেন রোহিনী বর্মণ, শুক্লা বর্মণ, যুহিতা সেন, ভারী বর্মণ এবং আরও অনেকেই। সকলেরই প্রতীক্ষা সোনার খবরের। সকলেই তো স্বপ্নার চূড়ান্ত ফল জানার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে আছেন। কিন্তু আমার গন্তব্য তো স্বপ্নাদের বাড়ি। জিজ্ঞাসা করতে সবাই সমস্বরে দেখিয়ে দিলেন। আমিও সরু এক চিলতে গলিপথটা ধরলাম। স্বপ্নার বাড়ি কোনটা জিজ্ঞাসা করার দরকার হয়নি। ওঁরাই দেখিয়ে দিলেন।

swapna in pole vault
পোল ভল্টে স্বপ্না। নিজস্ব চিত্র।

সর্পিল রাস্তাটার একেবারে শেষ মাথায় স্বপ্নাদের টিনের বাড়ি। কিন্তু বিস্মিত আমি। সারা বাড়ি যে খাঁ খাঁ করছে। কেউ কোথাও নেই। এমন দিনে বাড়ির লোকেরা কোথায় গেলেন। শেষ পর্যন্ত একটা খোলা দরজার মধ্যে দিয়ে দেখা গেল একটা টিভি ঘিরে বসে আছেন সবাই – পাড়া থেকে আরম্ভ করে স্বপ্নার বাড়ির ভেতর, সর্বত্র একই দৃশ্য। দেখলাম টিভিতে দেখানো হচ্ছে এশিয়ান গেমসের প্রতিযোগিতা। আর সেই টিভি ঘিরেই বসে আছেন স্বপ্নার বাড়ির লোকজন এবং প্রতিবেশীরা। সকলেরই দৃষ্টি নিবদ্ধ টিভির পর্দায়। কখন স্বপ্নার শেষ ইভেন্ট দেখায় তারই জন্য সকলের অধীর অপেক্ষা।

তখন টিভিতে অন্য ইভেন্ট। তবু জায়গা ছাড়ছেন না কেউ। সেখানে কে নেই! পাড়ার বয়স্ক মানুষ জয়ন্ত সেন, সুপর্ণা সেন, স্বপ্নার জেঠিমা লক্ষ্মী বর্মণ, দুই বউদি মাম্পি এবং অনিতা, রয়েছে অনেক শিশু। স্বপ্নার বাবা-মাও রয়েছেন সেখানে।

টিনের বেড়া দেওয়া বাড়ি স্বপ্নাদের। বরাবর অভাবের সংসারর। বাবা পঞ্চানন বর্মণ এক সময় ঠেলা চালাতেন। মা বাসনা দেবী ছিলেন চা-বাগানের অস্থায়ী শ্রমিক। কোনো রকমে সংসার চলত। ইতিমধ্যে পঞ্চাননবাবু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে গোটা সংসারের দায়িত্ব পড়ে বাসনা দেবীর ওপর। ও দিকে স্বপ্না একটু একটু করে স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলেছে। তার স্বপ্নপূরণে মা যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন। রায়কতপাড়া স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশনের (আরএসএ) মাঠে স্বপ্নার অ্যাথলেটিক অনুশীলন চলছে। বাসনা দেবী রোজ বিকেলে সাইকেলে করে মেয়েকে পৌঁছে দিচ্ছেন সেখানে। কিন্তু দারিদ্র তো স্বপ্নাদের সংসারের পিছু ছাড়ে না। স্বপ্নার দুই দাদা – বড় দাদা পবিত্র রাজমিস্ত্রির কাজ করেন আর ছোটোভাই দিনমজুর। এ দিকে সেই আরএসএ-র মাঠ থেকে স্বপ্না এল সাই-এ। তার পর আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি।

swapna in shotput
শটপাটে স্বপ্না। নিজস্ব চিত্র।

এশিয়াডে গেলেও স্বপ্না কিন্তু বাড়ির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। রোজ ফোন করে। নিজের একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়ার খবর দেয়। বাড়ির সকলের খবর নেয়। মা বাসনা বর্মণ বললেন, “মেয়েটা দাঁতের ব্যথা নিয়েই খেলতে নেমেছে। এটাই খারাপ লাগছে। ব্যথা নিয়েই লড়াই করছে। আশা করি সফল ও হবেই।”

পাঁচ জনের কাছে স্বপ্নার পরিবার কৃতজ্ঞ। তাঁরা হলেন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক বিশ্বজিৎ কর, কালিয়াগঞ্জ স্কুলের শিক্ষক বিশ্বজিৎ মজুমদার, আরএসএ ক্লাবের কোচ সুকান্ত সিং, আরএসএ ক্লাবের কর্মকর্তা প্রয়াত সমীর দাস এবং সাইয়ের কলকাতার কোচ সুভাষ সরকার।

আরও পড়ুন নিষিদ্ধপল্লিতে গিয়ে ধরা পড়লেন এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া চার খেলোয়াড়, তার পর কী হল?

স্বপ্নার প্রথম কোচ সুকান্ত সিং বলেন, “যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে তখন ও আমাদের আরএসএ ক্লাবে আসে। তখন থেকেই বোঝা গিয়েছিল যে ও বড়ো অ্যাথলেট হবে। ও খুব নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলন করত।”

সকলের সঙ্গে আলাপ করতে করতে সন্ধে হয়ে এল। স্বপ্নার সফল হওয়ার দিকে সকলে তাকিয়ে। স্বপ্না সোনা জিতলেই পাড়ায় বাজি ফাটিয়ে উৎসব পালন করা হবে।

শেষ পর্যন্ত স্বপ্নার ইভেন্ট শুরু হল। এবং সোনার পদক হাতে উঠল স্বপ্নার। টিভিতে সেই দৃশ্য দেখে সবাই আনন্দে মেতে উঠল। পাড়ায় শুরু হয়ে গেল আতসবাজি পোড়ানোর উৎসব। মায়ের চোখের জল তখন বাঁধ মানে না। মানবে কেন, এ যে আনন্দাশ্রু। বুক চাপড়ে হাউ হাউ করে কাঁদছেন। আনন্দের কান্না এ রকম হয়, স্বপ্নার মাকে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। তার পর সেই আনন্দাশ্রু নিয়েই ছুটে গেলেন মন্দিরে, লুটিয়ে পড়লেন মা কালীর পায়ে।

ছবি ও ভিডিও সৌজন্যে ফেসবুক 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন