সৌরভদের ক্ষেত্রে নেওয়া নীতিটা যদি আপনি নিজের ক্ষেত্রেও নিতেন…

0

শ্রয়ণ সেন:

প্রিয় মহেন্দ্র সিং ধোনি

১২ বছর আগে জানুয়ারি মাসের একটা দুপুরের কথা মনে পড়ে আপনার? অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজের পর একদিনের দলের নির্বাচন। দল নির্বাচনের আগের দিন থেকেই কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং রাহুল দ্রাবিড়কে সম্ভবত আপনি একদিনের দলে রাখবেন না। তবুও এমনটা হতে পারে কোনো আন্দাজই করতে পারিনি।

দল নির্বাচনের দিন অবাক করা ঘটনাটি দেখে স্তম্ভিত। আগের বছর একদিনের ম্যাচে ভারতীয়দের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানসংগ্রহকারী সৌরভকে দলে রাখার কোনো প্রয়োজনই মনে করলেন না আপনি। সেই সঙ্গে কোপ পড়ল রাহুল দ্রাবিড়ের ওপরেও। সৌরভ-দ্রাবিড়কে দলে না রাখার বেশ কিছু যুক্তি দিলেন আপনি।

যুক্তি নম্বর ১) দলে তাজা রক্ত চাই।

যুক্তি নম্বর ২) ব্যাটিংয়ে রান করার থেকেও বেশি দরকার ফিল্ডিংয়ে রান আটকানো।

আপনার সিদ্ধান্তের সমালোচনা হল বিস্তর। কিন্তু আপনি আপনার সিদ্ধান্তে অনড়। বুঝিয়ে দিলেন ব্যক্তিগত অভিসন্ধি থেকে আপনি কাউকে বাদ দেননি। আর তাই সৌরভের বড়ো ভক্ত হয়েও আমি আপনার সেই সিদ্ধান্তকে সে দিন সমর্থনই করেছিলাম। আমিও ভেবেছিলাম, টেস্ট ক্রিকেট যেমন চলছে চলুক, কিন্তু একদিনের ক্রিকেটে তরুণদের খেলানো উচিত।

আর সত্যি কথা বলতে কী, আপনি ফলও দিয়েছেন। ২০০৭-এর টি২০ বিশ্বকাপ আপনি তরুণদের ভরসায় জিতেছিলেন। তার পর ২০১১ বিশ্বকাপ হোক বা ২০১৩-এর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, সেই তথাকথিত কমবয়সিরাই আপনাকে ট্রফি এনে দিল।

কিন্তু ২০০৮-এ আপনি বোধহয় একটা জিনিস ভুলে গিয়েছিলেন, যে আপনিও একদিন ‘বুড়ো’ হবেন এবং দলে আপনার জায়গা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করবে।

আপনি আবেগ প্রকাশ করেন না, তাই গত এক বছর রানের মধ্যে বিশেষ না থাকা সত্ত্বেও আপনার ভেতরে ভেতরে কী চলেছে আমরা বুঝতে পারিনি। কিন্তু আপনার অবসরের দাবি যে বিভিন্ন মহলে জোরালো ভাবে উঠে গিয়েছিল, সেটা কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয়নি।

১২ বছর আগের আর ১২ বছরের পরের ‘আপনার’ মধ্যে কতটা পরিবর্তন হয়েছে সেটা বোধহয় আপনি নিজেও ভুলে গিয়েছিলেন। কারণ ২০০৮-এ যে সৌরভ আর রাহুলকে আপনি একদিনের দল থেকে বাদ দিয়েছিলেন, তাঁদের তখন বয়স ছিল ৩৫। আর আজ আপনি ৩৮।

শুধু তা-ই নয়, ২০০৭-এ সৌরভ ছিলেন ভারতীয়দের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানসংগ্রহকারী। করেছিলেন ১২৪০ রান। সর্বোচ্চ রান যিনি করেছিলেন, তিনিও একজন ‘বুড়ো।’ সচিন তেন্ডুলকর।

ঠিক এই জায়গায় আপনি নিজের পারফরম্যান্সের কথাটি ভাবুন। গত দু’বছরে আপনার মোট রান ৮৭৫। হ্যাঁ, অনেকেই যুক্তি দেবেন যে আপনি অনেক পরে নামেন, তাই আপনার পক্ষে এত রান করা সম্ভব নয়।

রান হয়তো সত্যিই করা সম্ভব নয়, কিন্তু স্ট্রাইক রেট তো দেড়শোর কাছাকাছি রাখা সম্ভব! আপনি নিজে সম্ভবত ব্যাপারটি মেনে নেবেন, যে শুরুর বছর আটেক যে ‘ফিনিশার’ আপনি ছিলেন, শেষের দিকে তার ধারেকাছেও পৌঁছোতে পারেননি। আপনি মেনে নেবেন যে মাঝেমধ্যে ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিং ছাড়া বেশির ভাগ সময়েই ধীরগতির ইনিংস খেলছেন।

আরও পড়ুন #thankyoudhoni: চুক্তি থেকে বাদ পড়তেই আচমকা টুইটারে ট্রেন্ড করছে এই হ্যাশট্যাগ

আপনার আর সৌরভের মধ্যে একটা তফাৎ কী ছিল জানেন? সৌরভ তাঁর কেরিয়ারের শেষ দিকে তাঁর জুনিয়র অধিনায়ককে পাশে পাননি। তাই ৩৫ বছরে একদিনের দল থেকে বাদ পড়েছিলেন এবং ৩৬ বছরে পড়তেই ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে হয়েছিল তাঁকে।

অথচ সৌরভের ওই সময়ে যা ফর্ম ছিল, আরও দেড়-দু’বছর খেলতে পারতেন তিনি। কিন্তু তখন দরকার ছিল, আপনার একটা স্নেহের পরশ। একবার যদি সৌরভের পিঠে হাত দিয়ে বলতেন, “দাদি, আপ ফিকর মত করো। ম্যায় হুঁ আপকে সাথ,” তা হলেই সৌরভের কেরিয়ার এত তাড়াতাড়ি শেষ হত না।

dhoni

এ বার আপনার কথা ভাবুন। যে স্নেহের পরশ আপনি সৌরভের পিঠে দেননি, সেটাই কিন্তু বিরাট কোহলি আপনার পিঠে বারবার দিয়ে গিয়েছেন। যখনই আপনাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠছে সামনে থেকে সেই সমালোচনা উড়িয়ে দিচ্ছেন কোহলি, যাতে আপনার গায়ে সেই ঝড়ের হাওয়া একটুও না লাগে।

বিশ্বকাপের পর আপনি যে অন্তর্ধানে চলে গেলেন, তখনও কিন্তু বিরাট আপনার হয়েই গলা ফাটিয়েছেন। চুপ করিয়ে দিয়েছেন সব সমালোচনাকে। কিন্তু এ ভাবে আর কত দিন চলতে পারে?

নিউজিল্যান্ডের সেই ম্যাচের পর আপনি দু’ মাসের জন্য ক্রিকেট থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন সেনায়। সেটা মেনে নেওয়া যায়। কেউ কয়েক দিনের জন্য বিশ্রাম নিতেই পারে। কিন্তু তার পর কী হল?

আপনি না ফিরলেন ভারতীয় দলে, না ঘোষণা করলেন অবসর। এক বারেরও জন্য আপনি আপনার ভক্তদের কথাও ভাবলেন না, যাঁরা অপেক্ষা করে বসে রয়েছেন আপনার ফিরে আসার জন্য।

আরও পড়ুন ধোনির ক্রিকেট কেরিয়ারে ইতি পড়ে গেল?

কোথাও কোথাও কি অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি কাজ করছিল আপনার ভেতরে? মানে সচিনের পর আপনিও ভারতীয় ক্রিকেটে অপরিহার্য এটা কি ভেবে নিয়েছিলেন? আপনি যা সিদ্ধান্ত নেবেন, বিসিসিআই আপনার মতোই চলবে? এটা যদি ভেবে থাকেন, তা হলে সেটা যে মস্ত বড়ো ভুল ছিল সেটা বিসিসিআই-ই আপনাকে বুঝিয়ে দিল।

তবুও ভারতীয় ক্রিকেটে আপনার যা অবদান তা অনস্বীকার্য। একবিংশ শতকের শুরুতে যে দলটা তৈরি করা শুরু করেছিলেন সৌরভ, সেই ব্যাপারটাকে আপনিই পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছেন। একাধিক আইসিসি টুর্নামেন্টে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। সৌরভের ট্রফি ভাগ্যটি অত্যন্ত খারাপ ছিল, কিন্তু আপনি খুব ভাগ্যবান।

আপনার ক্রিকেটের ভক্ত আমি। আমি এখনও মনে করি, হয়তো আপনাকে ভারতীয় জার্সিতে আবার দেখা যাবে। কিন্তু সৌরভের বিসিসিআইয়ের মনোভাব তো তেমন ঠেকছে না। তবুও আমি চাই, আপনার একটা গ্র্যান্ড ফেয়ারওয়েল প্রাপ্য।

শেষে একটা কথাই বলতে হয়, সৌরভদের ক্ষেত্রে যে নীতি নিয়েছিলেন, সেটা যদি আপনি নিজের ক্ষেত্রেও নিতেন…

ধন্যবাদ ধোনি। ভালো থাকবেন।

ইতি

------------------------------------------------
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.