বাটলারকে আউট করছেন অশ্বিন।
শ্রয়ণ সেন

মঙ্গলবার সকালে খবরের কাগজের খেলার পাতা খুলতেই একটাই খবর, ‘জস বাটলারকে মাঁকড়ীয় পদ্ধতিতে আউট করেছেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন।’ ‘অখেলোয়াড়সুলভ’ আচরণ দেখানোর জন্য সবাই প্রায় অশ্বিনকে খলনায়ক ঠাহর করছেন। রাতারাতি ভিলেন হয়ে যাওয়া অশ্বিন যদিও নির্বিকার। তিনি নির্বিকার থাকা ছাড়া কী-ই বা করবেন। একটা কথা প্রথমেই বলে দিই, অশ্বিন যা করেছেন, সেটা সম্পূর্ণ ক্রিকেটীয় নিয়ম মেনে করেছেন আর এটা দোষের কিছুই নয়।

এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করার আগে প্রথমে আমরা জেনে নিই মাঁকড়ীয় আউট কাকে বলে।

আরও পড়ুন প্ল্যান করে করিনি, নিয়মের মধ্যেই ছিল, বাটলারকে মানকাডিং প্রসঙ্গে অশ্বিন

বোলার বল করার আগে নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যানকে রান আউট করাই হল মাঁকড়ীয় আউট। ১৯৪৭ সালে সিডনি টেস্টে বিল ব্রাউনকে এ ভাবেই আউট করেছিলেন বিনু মাঁকড়। যদিও ওই সিরিজের ঠিক আগে একটি প্রস্তুতি ম্যাচেও একই ভাবেই ব্রাউনকে আউট করেছিলেন মাঁকড়। তার পর থেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে এই ধরনের রান আউট মাঁকড়ীয় আউট নামে পরিচিত।

বিনু মাঁকড়

সোমবারের ঘটনার পর সারা বিশ্বে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। ক্রিকেট বিশ্ব মোটামুটি দু’ভাগ। এক দল অশ্বিনকে সমর্থনই করছেন, অন্য দল তাঁর বিরোধিতায় সরব। তবে আকস্মিক ভাবে অশ্বিনের সমর্থক কিন্তু বেশ কম। তবুও যাঁরা প্রকাশ্যে অশ্বিনকে সমর্থন করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডিন জোন্স, কুমার সঙ্গকারা, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের মতো কিংবদন্তি।

ডিন জোন্স টুইট করে জানান, ‘‘অশ্বিনকে অপরাধী চিহ্নিত করবেন না। ও নিয়মের মধ্যে দাঁড়িয়েই আউট করেছে বাটলারকে। তা হলে অন্যায় কোথায়।’’ সঙ্গকারা বলেছেন, “এখন ব্যাটসম্যানকে সতর্ক করার কোনো দায় বোলারের নেই। ব্যাটসম্যান এগিয়ে থাকবে, অন্যায় ভাবে সুবিধা নেবে, বোলার সেই সুবিধা ব্যাটসম্যানকে নিতে দেবে কেন?” গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ বলেছেন, “ব্যাটসম্যানরা যে দু’গজ এগিয়ে থাকার সুবিধা পায়, এটাও তো ক্রিকেটের স্বার্থবিরোধী।”

উল্লেখ্য, এই ধরনের আউটের মধ্যে কোনো অখেলোয়াড়সুলভ আচরণ দেখেননি স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যান। ১৯৪৭-এর সিরিজের মাঁকড়ীয় আউটের পর অস্ট্রেলিয়া মিডিয়ার কাছে ভিলেন হয়ে যান মাঁকড়। কিন্তু সেই সময়ের অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক ব্র্যাডম্যান এই ধরনের আউটের পক্ষেই কথা বলেছেন।

ডন ব্র্যাডম্যান।

আত্মজীবনী ‘ফেয়ারওয়েল টু ক্রিকেট’-এ এই ব্যাপারে পরিষ্কার ভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন ব্র্যাডম্যান। এর ফলে নন-স্ট্রাইকার ব্যাটসম্যানরা আরও সৎ হয়েছে বলেও অভিমত তাঁর। সেখানে তিনি লিখেছেন, “ক্রিকেটের নিয়মে পরিষ্কার করেই লেখা রয়েছে যে যতক্ষণ না বোলার বলটা হাত থেকে ছাড়ছেন, ততক্ষণ নন-স্ট্রাইকার ব্যাটসম্যান ক্রিজ ছেড়ে বেরোতে পারবে না। ক্রিজ ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়া মানে নন-স্ট্রাইকার ব্যাটসম্যান একটা বাড়তি সুবিধা পেয়ে যায়। সুতরাং এই ধরনের আউট খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করার কোনো মানেই হয় না।”

এখন অনেকেই বলতে পারেন, এক বার অন্তত বাটলারকে সতর্ক করা উচিত ছিল অশ্বিনের। কিন্তু সঙ্গকারা তো পরিষ্কার বলেই দিলেন ব্যাটসম্যানকে সতর্ক করার কোনো দায় বোলারের নেই। বরং বাটলারের নিজেই আগে থেকে সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কারণ ২০১৪ সালে তাঁর সঙ্গে ঠিক এই ধরনের একটি ঘটনাই ঘটেছিল।

শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে বার বার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন নন-স্ট্রাইকার বাটলার। প্রথম বার তাঁকে সতর্ক করেছিলেন বোলার সচিত্র সেনানায়ক। কিন্তু তার পরেও বাটলার যখন একই কাণ্ড ঘটালেন, তাঁকে মাঁকড়ীয় ঢঙে আউট করে দেন সেনানায়ক। এই নিয়েও ব্রিটিশ মিডিয়ায় কম কথা হয়নি। সেনানায়ক তখন খলনায়ক, অশ্বিনের মতোই। তাঁর বিরুদ্ধে অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের অভিযোগ।

এ ভাবেই বাটলারকে আউট করেছিলেন সেনানায়ক।

সত্যি কথা বলতে কী, অখেলোয়াড়সুলভ আচরণ ঠিক কাকে বলা যেতে পারে? এগারো বছর আগের একটা ঘটনা কথা মনে করা যেতে পারে। ২০০৮-এর জানুয়ারি। ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেই মহাবিতর্কিত সিডনি টেস্ট। আম্পায়ারদের একাধিক ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছে ভারত। কিন্তু সব থেকে আলোড়ন সৃষ্টি করল দ্বিতীয় ইনিংসে সৌরভের আউটকে কেন্দ্র করে।

ব্রেট লি-র বলে স্লিপে খোঁচা দেন ৫০-এ পেরিয়ে ব্যাট করতে থাকা সৌরভ। ক্যাচটি মাইকেল ক্লার্কের তালুবন্দি হওয়ার আগেই মাটিতে লেগে যায়। আম্পায়ার বুঝতে না পেরে ফিল্ডিং দলের অধিনায়ক রিকি পন্টিং-এর সাহায্য চান। পন্টিং আঙুল তুলে বুঝিয়ে দেন, ক্যাচটি বৈধ। এটা দেখেই সৌরভকে প্যাভিলিয়নে ফেরার নির্দেশ দেন আম্পায়ার। যদিও টিভি রিপ্লেতে বার বার দেখা যায় বলটা মাটিতে লেগেছে। এটাই হল অখেলোয়াড়সুলভ মনোভাব। যখন আইনবিরুদ্ধ কিছু কাজ করা হচ্ছে সেটাই অখেলোয়াড়সুলভ। ক্রিকেটের আইন মেনে যদি কিছু করা হয়, তা কেন অখেলোয়াড়সুলভ হতে যাবে!

আমার মতে তাই, অশ্বিন যা করেছেন একদম ঠিক করেছেন। এটা কোনো প্রীতি ম্যাচ নয়, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ। এখানে ম্যাচ জেতাই আসল, ‘ফেয়ার প্লে’-তে পয়েন্ট বাড়ানো নয়।

ক্রিকেটের একটা নামকরা ওয়েবসাইটে এই ঘটনা নিয়েই একটা ভোট চলছে। অসংখ্য মানুষ সেখানে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে আপাতত মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষ অশ্বিনকে সমর্থন করছেন, ৭৫ শতাংশ বিরোধিতা। একটা জিনিস দেখার ইচ্ছে রইল। বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারত খেলছে। টানটান পরিস্থিতিতে ম্যাচ। যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অধিনায়ক কোহলির নির্দেশে বিপক্ষের সেট ব্যাটসম্যানকে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মাঁকড়ীয় আউট করলেন না বোলার। আর খেলার ফল গেল ভারতের বিপক্ষে। এই ৭৫ শতাংশ মানুষ তখন বিরাট কোহলির প্রশংসা করবেন তো?

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here