সিরিজ জিতে নিল অস্ট্রেলিয়া!

অস্ট্রেলিয়া: ২৭২-৯ (খোয়াজা ১০০, হ্যান্ডস্‌কম্ব ৫২, ভুবনেশ্বর ৩-৪৮)

ভারত: ২৩৭ (রোহিত ৫৬, ভুবনেশ্বর ৪৬ জাম্পা ৩-৪৬)

দিল্লি: এক দিনের ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কাণ্ড কখনও ঘটায়নি অস্ট্রেলিয়া। আর অস্ট্রেলিয়াই বা কেন, ক্রিকেটের ইতিহাসে এই ধরনের রেকর্ডের নজির মাত্র দু’টো রয়েছে। এ বার অস্ট্রেলিয়াও সেটা করে দেখাল। আর করে দেখাল এমন একটা সময়ে, যখন তাদের ক্রিকেট ঐতিহ্য এক্কেবারে মাটিতে এসে মিশে গিয়েছে।

সেই বিরল রেকর্ডটির ব্যাপারে একটু খোলসা করে বলা যাক। পাঁচ ম্যাচের এক দিনের সিরিজে কোনো দল প্রথম দু’টো ম্যাচ হেরেও পরের তিনটে ম্যাচ জিতে সিরিজ জিতে নিচ্ছে, এমন নজির মাত্র দুটো ছিল এতদিন। ২০০৫-এ জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে এমনটি করেছিল বাংলাদেশ এবং ২০০৩-এ এই কাজটা করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এ বার সেই রেকর্ডে ভাগ বসাল অস্ট্রেলিয়া।

ক্রিকেট জগতে এই বছর এখনও পর্যন্ত তিন নম্বর অঘটনটিও ঘটাল অ্যারন ফিঞ্চের দল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট সিরিজ জিতেছে শ্রীলঙ্কা। তিন নম্বর কাণ্ডটি ঘটিয়ে ফেলল ব্যাগি গ্রিন টুপিধারীরা। গত বছর অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের খুব দুঃসময় গিয়েছে। সেই কঠিন সময় আরও কঠিন হয়ে যায় স্টিভ স্মিথ এবং ডেভিড ওয়ার্নারের ওপরে নিষেধাজ্ঞার পর। হারা বই জয়ের মুখ কার্যত দেখেইনি তারা। তাই নিজেদের মাঠে ভারতের কাছে এক দিনের সিরিজ খুইয়ে অস্ট্রেলিয়া যখন ভারতে পা রাখল, কেউই তাদের ওপর বাজি ধরেনি। বিরাটবাহিনীও ভেবে নিল, এই দলকে হারানো আর এমন কী!

আরও পড়ুন ঋষভ পন্থ জংলি ঘোড়া, ওকে বশে আনতে হবে: প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক

কিন্তু সেটাই যে কাল হল। দলটার নাম যে অস্ট্রেলিয়া। কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা যদি কোনো দলের থেকে শিখতে হয়, সেটা এই হলুদ জার্সিদের থেকেই। ইঙ্গিতটা ছিল টি২০ সিরিজ থেকেই। ভারতকে দু’টো ম্যাচে হারিয়ে দেওয়ার পরেও সতর্ক হয়নি বিরাটবাহিনী। তার ফল পাওয়া গেল এক দিনের সিরিজে।

প্রথম দু’টো ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর তৃতীয় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ালেন উসমান খোয়াজারা। সেই জয়কেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি কেউ। কিন্তু রবি-সন্ধ্যায় সাড়ে তিনশোর ওপরে রান তাড়া করে অস্ট্রেলিয়া জেতার পরেই যাবতীয় টেনশনের সূচনা। তখন থেকে বোঝা যাচ্ছিল, এই দলকে হালকা ভাবে নেওয়া কোনো ভাবেই উচিত হয়নি ভারতের। কিন্তু সম্বিত যখন ফিরল, তখন বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছে। সিরিজে সমতা ফিরিয়ে বাড়তি চেগে গিয়েছে অজিরা। তার ফল পাওয়া গেল পঞ্চম ম্যাচে।

আগের ম্যাচগুলির মতো এ দিনও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং-এর তারকা পাকিস্তানজাত উসমান খোয়াজা। এই খোয়াজার মধ্যেই ভবিষ্যতের এক বড়ো তারকা হওয়ার রসদ দেখতে পেয়েছেন রিকি পন্টিং। পন্টিং-এর ধারণা কতটা সঠিক, সেটা খোয়াজা প্রমাণ করে দিচ্ছেন। হায়দরাবাদ ম্যাচ থেকেই শুরু করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় ম্যাচ ছাড়া সব ক’টায় পেরিয়েছেন ৫০-এর গণ্ডি। আর শেষ তিনটে ম্যাচে তো আরও সাংঘাতিক। এই ম্যাচটি নিয়ে শেষ তিন ম্যাচে খোয়াজার রানগুলি হল যথাক্রমে ১০৪, ৯১ এবং ১০০।

উসমান খোয়াজার শতরান।

উসমান খোয়াজাই এই ম্যাচে, বা বলা যেতে পারে এই সিরিজে দুই দলের মধ্যে প্রধান ফারাক হয়ে তৈরি করে দিয়ে গেলেন। খোয়াজা এ দিন টিকে গেলে অস্ট্রেলিয়া সাড়ে তিনশো যে পেরোতই তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তাঁর আউট এবং শেষ দিকে ভারতের চাপা বোলিং ২৭২-এর বেশি স্কোর নিয়ে যেতে দিল না। কিন্তু সেটাও যে ভারতের কাছে খুব বেশি হয়ে গেল, সেটা তো দেখাই যাচ্ছে।

আগের ম্যাচে শতরান করে ফর্মে ফিরলেও এ দিন আবার ব্যর্থ শিখর ধাওয়ান। আর গত কয়েকটি ম্যাচে ভারতের ব্যাটিং-এর যা হাল, তাতে কোহলি আর রোহিত ছাড়া ভারতের ভরসা বলতে কেবল কেদার যাদব। ধোনি থাকলে অবশ্য আলাদা কথা ছিল। তাই বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে বিরাটের আউটের পরেই ভারতের ভবিষ্যৎ মোটামুটি ভাবে খাতায় লেখা শুরুই হয়ে গিয়েছিল।

দিল্লির ম্যাচের পর ভারত আবার ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলতে নামবে ৫ জুন। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পন্টনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ এক্কেবারে বিশ্বকাপ। তা বিশ্বকাপে নামার আগের ম্যাচেও ভারতের ব্যাটিং লাইন আপ ঠিক হল না। সুবর্ণ সুযোগ ছিল ঋষভ পন্থের কাছে। কিন্তু তিনি কাজে লাগাতে ব্যর্থ। ধরে খেলে ভারতকে জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে দিলে আজ সকলের কাছে বন্দিত হতেন তিনি। কিন্তু হল উলটো। একটি চার আর একটি ছয় মেরেই দম ফুরিয়ে গেল। আগের ম্যাচেই দেখা গিয়েছে তাঁর উইকেট কিপিং-এর ছিরি। অর্থাৎ, বিশ্বকাপের পর ধোনি অবসর নিয়ে নিলে ভারতের উইকেটের পেছন আদৌ নিরাপদ থাকবে কি না, সেই প্রশ্নও থেকেই যাচ্ছে।

আরও পড়ুন মিলিটারি টুপি পরার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, জানিয়ে দিল আইসিসি

এ রকম একাধিক প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই সিরিজ শেষ করতে হল ভারতকে। এক সময়ে ২-০-এ এগিয়ে যাওয়া ভারত সিরিজ হারল ২-৩-এ। অবশ্য কোথাও খুঁটিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে এই সিরিজের ফল অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ০-৫-ও হতে পারত। বিশ্বকাপের কাছে এটা যে বিরাটবাহিনীর কাছে কত বড়ো ধাক্কা সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। আর অন্য দিকে অস্ট্রেলিয়া এখন টগবগ করে ফুটছে। কিছু দিনের মধ্যেই এই দলে যে যোগ দেবেন স্মিথ আর ওয়ার্নার।

বিশ্বকাপের সেরা বাজি কে, এই নিয়ে চর্চা হলেই মূলত দু’টো দলের নাম বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারত এবং ইংল্যান্ড। বিশেষজ্ঞদের সব হিসেবনিকেশ পালটে দিয়ে এ বার আলোচনার মধ্যে যদি বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা ঢুকে পড়ে, তা হলে অবাক হওয়ার আর কিছু থাকবে না।

শেষে একটা কথা বলা যেতেই পারে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ঘুরে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ফলে বিশ্বকাপ জমে উঠল বলে!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here