ফের ব্যাঘ্রগর্জন! কুড়ি বছর পর আবার টউনটন শাসন করল বাঙালি

ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৩২১-৮ (হোপ ৯৬, লিউইস ৭০, মুস্তাফিজুক ৩-৫৯)

বাংলাদেশ: ৩২২-৩ (শাকিব ১২২ অপরাজিত, লিটন ৯৪ অপরাজিত, রাসেল ১-৪২)

টউনটন: “তিন নম্বরে আমাকে ব্যাট করতে দেওয়া হোক।” বিশ্বকাপ শুরুর আগে টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে না কি এই আবদারই করেছিলেন শাকিব আল হাসান। টিম ম্যানেজমেন্ট সেই কথা রাখে এবং তার পর কী হচ্ছে তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। পর পর দুটো শতরান, এই বিশ্বকাপে আপাতত সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী। সেই সঙ্গে উইকেট তো আছেই। এটা শাকিবের বিশ্বকাপ হলে কিন্তু আর কোনো অবাকই থাকবে না।

একা শাকিবে তো এমনিতেই রক্ষে ছিল না, কিন্তু দোসর হয়ে এলেন লিটন কুমার দাস। এই দুয়ের বেধড়ক পেটানির পর বিশ্বকাপে আরও এক বড়ো জয় ছিনিয়ে নিল টাইগাররা। বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এটিই তাদের সব থেকে বড়ো জয়।

ম্যাচের শুরুতেই যদি ক্রিস গেলের মতো এক পাওয়ার হিটারকে প্যাভিলিয়নে পাঠানো যায়, তা হলে একটা দলের ঠিক কী রকম অনুভূতি হতে পারে? বাংলাদেশেরও সে রকম হয়েছিল। বোলার এবং ফিল্ডারদের মধ্যে উৎসাহ দেখে মনে হচ্ছিল বিশ্বকাপটাই সম্ভবত জিতে গিয়েছে তারা। কিন্তু হায়, তখনও তারা কি আন্দাজ করেছিল যে একটা গেলকে ফেরানো গেলেও, জ্বলে উঠবেন আরও দু’জন।

গত মাস ছয়েকে বাংলাদেশের কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে ভাবে নাস্তানাবুদ হয়েছে, আর কোনো বিপক্ষের কাছে হয়নি। গত বছর আগস্ট থেকে এ বছর মে পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে খেলা তিনটে একদিনের টুর্নামেন্টেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে শুধুমাত্র একটা সিরিজ হয়েছিল বাংলাদেশে। ফলে এই ম্যাচের আগে পাল্লা কার ভারী ছিল সেটা সহজেই অনুমেয়। তাই অন্য রকম বার্তা দেওয়ার তাগিদ ছিল হোপ এবং লিউইসের মধ্যে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভবিষ্যতের উজ্জ্বল তারকা হতে চলেছেন হোপ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এ দিন চার রানের জন্য শতরান ফসকালেও তাতে তাঁর প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহই উঠছে না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, একজনের পারফরম্যান্স বড়ো প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগেই কেকেআরের হয়ে এ ভাবে জ্বলে ওঠা আন্দ্রে রাসেল, এ ভাবে ফর্ম হারালেন কী করে?

যে সংখ্যাটা রাসেলের সঙ্গে কোনো ভাবেই খাপ খায় না, সেটাই তিনি করেছেন, ০। এ রকম ভাবে চলতে থাকলে দলে তাঁর জায়গা নিয়েও প্রশ্ন চিহ্ন উঠে যেতে পারে। তবে একটা সময়ে মনে হচ্ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর সাড়ে তিনশো পেরিয়ে যেতে পারে, সেটা যে মাত্র ৩২১-এ থামল তার বাংলাদেশের বোলারদের কৃতিত্ব অবশ্যই প্রাপ্য।

শাকিব তো না হয় প্রথম উইকেট পড়ার পর নেমেছিলেন, কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রাটি বাংলাদেশ যে ভাবে তাড়া শুরু করেছিল, তাতে কোনো ভাবেই মনে হয়নি তারা ভয় পেয়ে রয়েছে। তামিম ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে জোরদার জবাব দেওয়া শুরু করেন সৌম্য সরকার। কিন্তু আজ কৃতিত্ব মূলত প্রাপ্য দু’জনের। তার মধ্যে একজনকে নিয়ে তো একটু বলাই হল। অন্যজন লিটন দাস।

মুশফিকুর রহিম আউট হয়ে যাওয়ার পর কিছুটা চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। কারণ রান রেট ভালো থাকলেও তখনও দরকার দুশোর কাছাকাছি রান। ক্রিজে এলেন লিটন কুমার দাস। গত এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে দুরন্ত শতরান করার ফলে লিটন এখন অনেক পরিচিত ক্রিকেটার। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামলে একটু স্নায়ুর চাপ তো থাকবেই। কিন্তু তাঁকে দেখে বোঝাই যায়নি, কোনো চাপ রয়েছে তাঁর। অবশ্য এর জন্য শাকিবেরও যথেষ্ট কৃতিত্ব।

জুটিতে লুটলেন শাকিব আর লিটন আর ধীরে ধীরে ক্যারিবিয়ানদের ম্যাচ থেকে বের করে দিলেন। এরই মধ্যে একটা সময় এল যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিধ্বংসী পেসার শ্যানন গেব্রিয়ালকে যে ভাবে পর পর তিন বলে তিনটে ছয় মারলেন লিটন, সেটা বুঝিয়ে দিল বাংলাদেশ ক্রিকেট খুব নিরাপদ হাতেই রয়েছে।

বাঙালির কাছে সুখস্মৃতির মাঠ এই টউনটন। কুড়ি বছর আগে এই মাঠেই শাসন করেছিলেন এক বাঙালি, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। কুড়ি বছর পর আবার সেই বাঙালিদেরই শাসন। দেশটা আলাদা হতে পারে, জাতটা তো একই!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.