sourav ganguly
শ্রয়ণ সেন

বছর দুয়েক আগেকার কথা। টি২০ বিশ্বকাপে ইডেনে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের পরের দিন সিএবি প্রেসিডেন্ট না কি সমস্ত মাঠকর্মীদের ছুটি দিয়ে দিয়েছিলেন, অথচ নিজে কোনো ছুটি না নিয়ে ব্যস্ত দাদাগিরির শুটিং-এ। কলকাতার এক বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক এ কথা বলেছিলেন রিয়ালিটি শো দাদাগিরিতে।

এই হলেন সৌরভ। অবসরের পর কেটে গিয়েছে দশটা বছর। তাতেও যেন ব্যস্ততার কোনো কমতি নেই তাঁর, বরং এখন অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে। এক দিকে সিএবির দায়িত্ব, তো অন্য দিকে ধারাভাষ্যের কাজ। এরই মধ্যে মাঝে মাঝে এসে যায় দাদাগিরির কাজও। সবই তিনি সামলান অসামান্য দক্ষতায়।

ব্যক্তি সৌরভের জন্মদিন আজ ৮ জুলাই। কিন্তু ক্রিকেটার সৌরভের জন্মদিন কবে জানেন? আজ থেকে বাইশ বছর আগে ২০ জুনের সেই দিনটা। আজ থেকে বাইশ বছর আগে লর্ডসের সবুজ ঘাসে বাঙালি পেয়েছিল তার সেরা ক্রিকেট আইকনকে।

sourav ganguly
অনেক সুখস্মৃতির সাক্ষী লর্ডসে সৌরভ

৯২-তে অপমানজনক ওয়ানডে অভিষেকের পর চার বছরের ‘নির্বাসন’। চার বছর পর সুযোগ যখন পেলেন, দু’হাতে লুফে নিলেন। ১৯৯৬-এর ২০ জুন প্রথম বার সাদা জামা পরে মাঠে পদার্পণ সৌরভের। তবে ব্যাটসম্যান সৌরভের আগেই বোলার সৌরভের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সৌরভের লর্ডস অভিষেক নিয়ে চর্চা হলেই অ্যালান মুলালি, ডমিনিক কর্কদের পিটিয়ে শতরানের কথাই আগে উঠে আসে, কিন্তু বোলার সৌরভের ব্যাপারে কেউ কোনো আলোচনাও করেন না। অথচ লর্ডস টেস্টে প্রথম দিন, ইংল্যান্ড যখন প্রথম ব্যাট করছে, নাসির হুসেন আর গ্রাহাম হিকের উইকেট নিয়ে বিপক্ষ শিবিরে প্রাথমিক ধাক্কা কিন্তু তাঁর বলই দিয়েছিল। তার পর কী হয়েছিল তা আমাদের সকলেরই জানা।

বাইশ বছর আগে সেই দিনটা যদি না আসত তা হলে কী হত?

এর জবাবটা দেওয়া বোধ হয় খুব একটা শক্ত নয়। ভারত পেত না দেশের সেরা অধিনায়ককে, সিএবি পেত না তার দক্ষ সভাপতিকে, বিসিসিআই পেত না তার যোগ্য পরামর্শদাতাকে, বিশ্ব পেত না অকুতোভয় এক সেনাপতিকে আর বাঙালি পেত না তার প্রিয় দাদাকে।

sourav ganguly
ধারাভাষ্যকার দাদা।

হ্যাঁ, এটা হয়তো ঠিক যে তথ্যের ভিত্তিতে দেশের সেরা অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি, কিন্তু অধিনায়কের মাপকাঠি কখনোই তথ্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। কোন পরিস্থিতিতে তিনি দলের হাল ধরেছেন, সহ-খেলোয়াড়দের কাছে কেমন সম্মান পাচ্ছেন আর সর্বোপরি দলের পারফরনেমস, সব মিলিয়ে অধিনায়ককে বিচার করা উচিত। প্রথম দু’টো কন্ডিশনে ধোনি কিন্তু খুব একটা নম্বর পাবেন না। অন্য দিকে সহবাগ, হরভজন, যুবরাজরা আজও সৌরভ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বেশ গদগদ হয়ে যান। শুধু কী তাই, কোনো এক টিভি-শোতে স্পিন তারকা রবিচন্দ্রন অশ্বিন বলেছেন, তাঁর কাছে সেরা অধিনায়ক সৌরভই, ধোনি নন। অশ্বিন, যাঁর সৌরভের অধিনায়কত্বে খেলার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই, তিনি যখন এই কথা বলেন তখন বোঝা যায় যে সহ-খেলোয়াড়দের কাছে কেমন সম্মান পেতেন সৌরভ। সৌরভের থেকে ধোনির টেস্ট জয়ের সংখ্যা বেশি কিন্তু বিদেশে টেস্ট জয়কে অভ্যেসে পরিণত করে ফেলা কিন্তু সৌরভই করিয়েছেন।

স্টিভ ওয়াকে টসে দাঁড় করিয়ে রেখে ওখানেই অস্ট্রেলীয়দের মনোবল ভেঙে দেওয়ার সাহস একমাত্র সৌরভই দেখাতে পেরেছেন। মুম্বইয়ে ফ্লিন্টফের জামা খুলে ওড়ানোর বদলা সুদে-আসলে তুলেছেন লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পালটা জামা উড়িয়ে। হরভজনের বিরুদ্ধে চাকিং-এর অভিযোগ ওঠার সময়ে গোটা টিমকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন আইসিসির বিরুদ্ধে। বিশ্ব ক্রিকেটে সৌরভের মতো বর্ণময় চরিত্র কিন্তু খব কমই এসেছে।

sourav
প্রাক্তন ও বর্তমান

ক্রিকেট ছাড়ার পরেও আরও ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছে সৌরভের। এক দিকে ধারাভাষ্যের কাজ সামলানো, অন্য দিকে বাংলার ক্রিকেটের হাল ধরা। মাঝে মাঝে বিসিসিআই থেকেও তাঁর ডাক পড়ে, কখনও সচিন-লক্ষ্মণদের নিয়ে কোচ বাছতে বা কখনও বা টেকনিক্যাল কমিটিতে পরামর্শদাতা হিসেবে। সৌরভের উদ্যোগেই বছর দুয়েক আগে নতুন দিগন্ত খুলে যায় ভারতীয় ক্রিকেটের। ভারতীয় ক্রিকেটের উন্নতির স্বার্থে প্লেয়ারদের নিয়মিত ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলতে দেওয়া দরকার — সৌরভের এই প্রস্তাব সমর্থন কুড়োয় টেকনিক্যাল কমিটিতে। তাঁর এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে এখন ইংল্যান্ডে কাউন্টির দরজা খুলে গিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটারদের জন্য।

ভারতীয় ক্রিকেটে সব থেকে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত কিন্তু সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভেরই নেওয়া। পিঙ্ক বলে দিন-রাতের টেস্ট ম্যাচই যে এখন টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ, সেটা তিনি মনে করিয়েছেন। বিসিসিআই এখনও আন্তর্জাতিক টেস্ট দিনরাতের খেলায় রাজি না হলেও সৌরভের প্রস্তাব মেনে ঘরোয়া টুর্নামেন্ট দলীপ ট্রফির ম্যাচগুলো দিন রাতেরই হয়। সৌরভের উদ্যোগেই প্রথম বার দেশে পিঙ্ক বলের ম্যাচ আয়োজন করা হয় ইডেন গার্ডেন্সে। ঘরোয়া ম্যাচ হলেও, ২০১৬-এর সিএবি সুপার লিগের ফাইনাল ম্যাচটি সারা দেশে চর্চার বিষয় হয়ে যায়।

sourav ganguly
প্রাক্তন মালিকের সঙ্গে কথোপকথনে বর্তমান সিএবি সভাপতি

শুধু কি দিন-রাতের ম্যাচ। বাংলা ক্রিকেটের উন্নতির স্বার্থে লক্ষ্মণ-মুরলি-ওয়াকারদের নিয়ে এসে প্রশিক্ষণ দেওয়ানো, আইপিএলের স্টাইলে বেঙ্গল প্রিমিয়ার লিগ চালু করার চিন্তা-ভাবনা সবই তিনি নিচ্ছেন একার প্রচেষ্টায়। বৃষ্টিতে ইডেনে যেন আগের মতো আর ম্যাচ পণ্ড না হয়ে যায় তার জন্য ইংল্যান্ড থেকে অত্যাধুনিক গ্রাউণ্ড কভার আনিয়েছেন। ফলও হাতেনাতে পাওয়া গিয়েছে। আগে ক্রিকেট প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাকে নিজের এসি কিউবিকল ছেড়ে মাঠে নেমে আসতে খুব একটা দেখা যায়নি, যেটা দেখা যাচ্ছে সৌরভের সভাপতিত্বকালে। বৃষ্টি হলে যেমন নিজে পিচ কভারের তদারকি করছেন, পিচের চরিত্র যাচাইয়ের জন্য নিজে পিচ দেখছেন, তেমনই আইপিএলের সময়ে দর্শকদের মাঝে বসে খেলা দেখছেন।

তবে সৌরভের নিন্দুকেরও অভাব নেই। নিজের খেলোয়াড় জীবনের মতো প্রশাসনেও কিছু লোক ওঁত পেতে বসে থাকেন কাজে বাগড়া দেওয়ার জন্য। এঁদের জন্যই সৌরভ চেয়েও স্পনসর আনতে পারেননি ইডেনের জন্য, অথচ স্পনসর আনলে আর্থিক দিক থেকে লাভ হত বাংলা ক্রিকেটেরই।

তবে তিনি সৌরভ, আমাদের দাদা। ওয়ার্ন-মুরলিদের স্টেপ আউট করেছেন অবলীলায়। প্রশাসক হিসেবেও তেমনই ক্রমাগত ছক্কা হাঁকিয়ে চলেছেন। গোলাপেরও কাঁটা থাকে কিন্তু তাতে গোলাপের সুগন্ধ এতটুকুও কমে না। দাদা তেমনি নিন্দুকদের কাঁটাগুলোকে ছেঁটে ফেলে সৌরভ ছড়িয়ে চলেছেন স্বর্গের উদ্যানে।

শুভ জন্মদিন দাদা। বাংলা এবং ভারতীয় ক্রিকেটকে আরও গর্বিত করুন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here