ইতিহাসে বিশ্বকাপ: পথ দেখিয়েছিলেন মহিলারা

0
1975 world cup
প্রথম বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে ক্লাইভ লয়েড।
শ্রয়ণ সেন

ইদানীংকালে মহিলাদের ক্রিকেট মোটামুটি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। সাধারণ ভাবে পুরুষদের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার কাছে অনেকটাই ফিকে ছিল মহিলাদের ক্রিকেট। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বকাপের পথ দেখিয়েছিলেন মহিলারাই। ১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে আয়োজিত হয়েছিল প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ, বা বলা ভালো পুরুষদের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ। তার বছর দুয়েক আগেই, অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে মহিলাদের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়।

১৯৭৩ সালের ২৮ জুলাই। ইংল্যান্ড মহিলা দলের হাতে প্রথম বিশ্বকাপের ট্রফি তুলে দেন ব্রিটেনের তৎকালীন যুবরানি অ্যানে। তার তিন দিন আগে, অর্থাৎ ২৫ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নেয় ক্রিকেট নিয়ামক সংস্থা আইসিসি। ঠিক দু’বছর পরেই একই দেশে পুরুষদের প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঠিক হয়, প্রত্যেক ম্যাচ হবে ১২০ ওভারের। অর্থাৎ একটা ইনিংসে ৬০ ওভার ব্যাট বা বল করার সুযোগ পাবে একটা দল। তখন টেস্ট ক্রিকেটের রমরমা। খুব বিক্ষিপ্ত ভাবে একদিনের ক্রিকেট খেলা শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের কাছে সে ভাবে গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই আবহে আইসিসির এই সিদ্ধান্ত এক কথায় যুগান্তকারী।

প্রথম মহিলা বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে ইংল্যান্ডের মহিলারা।

কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজন করা এত দরকারি হয়ে পড়েছিল কেন?

আইসিসির কর্তারা দেখলেন, টেস্ট ক্রিকেটের জনপ্রিয়তায় যেন কিছুটা ভাটা পড়ছে। আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে। ১৯৭৪ সালে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন দেখা যায় ইংল্যান্ডের ১৭টা কাউন্টি ক্রিকেট দল চরম আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কিছু একটা দরকার ছিল। ক্ষতির মোকাবিলা করার জন্য দরকারি ছিল স্পনসরেরও।

এই চিন্তাভাবনা যখন করা হচ্ছে, তখন একদিনের ক্রিকেট সদ্য আলো দেখেছে। আর সেটা হয়েছিল আকস্মিক ভাবে। সালটা ১৯৭১। মেলবোর্নে অ্যাসেজের টেস্ট চলছে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে। প্রথম তিন দিন বৃষ্টিতে ভেস্তে যাওয়ার পর সংগঠকরা হঠাৎ করে একদিনের একটি ম্যাচের আয়োজন করে বসলেন দু’দলের মধ্যে। প্রত্যেক ইনিংসে ৪০টা আট বলের ওভার নিয়ে আয়োজিত হল বিশ্বের প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ম্যাচে ইংল্যান্ডকে পাঁচ উইকেটে হারায় অস্ট্রেলিয়া।

আরও পড়ুন ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ক্রিকেটাররা

৪৬ হাজার দর্শকের সামনে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচটি সফল ভাবে আয়োজন করতে পেরে বাহবা কুড়োয় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। এর পরের বছর আসে প্রথম একদিনের ম্যাচের সিরিজ। এই দুই প্রতিপক্ষের মধ্যেই আয়োজিত হয় তিন ম্যাচের একটি সিরিজ। ২-১-এ সেই সিরিজ জিতে নেয় ইংল্যান্ড। তবে প্রথম একদিনের ম্যাচ এবং প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের মাঝখানের চার বছরে মাত্র ১৭টা একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল। এর থেকেই বোঝা যায়, একদিনের ক্রিকেটের গ্রহণযোগ্যতা তখনও আসেনি।

১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের প্রথম একদিনের ম্যাচ

আর সব থেকে বড়ো কথা, ১৯৭২ সালের ওই একদিনের সিরিজের ব্যাপারে তীব্র বিরোধিতা করেন খোদ অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাই। অস্ট্রেলিয়া দলের তৎকালীন অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল এই টুর্নামেন্টে অধিনায়কত্ব করতে রাজি হননি প্রথমে। সাফ বলে দেন, “আমি এই ম্যাচে অধিনায়কত্ব করতে রাজি নই। এই ম্যাচগুলিকে বেশি গুরুত্বও দিতে রাজি নই।” তবে শেষমেশ তিনিই অধিনায়কত্ব করেন অস্ট্রেলিয়ার।     

কিন্তু তবুও এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের ব্যাপারে এগিয়ে যায় আইসিসি। আর সৌভাগ্যবশত টুর্নামেন্টের ‘স্পনসর’ হিসাবে এগিয়ে আসে ‘প্রুডেনশিয়াল।’ কিন্তু বিক্ষিপ্ত কয়েকটি একদিনের ম্যাচ থেকে কী ভাবে বড়ো বহুদেশীয় একটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা সম্ভব? উল্লেখযোগ্য ভাবে বিশ্বকাপের চিন্তাভাবনা যখন চলছে তখন অনেকেই ইতিহাসের সরণি বেয়ে ফিরে গেলেন ছ’দশক আগের একটি টুর্নামেন্টে। ১৯১২ সালে ত্রিদেশীয় টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজিত হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে। ওই টুর্নামেন্ট ইংল্যান্ড জিতলেও ইংল্যান্ডের আবহাওয়া মাঝেমধ্যেই থাবা বসায় ম্যাচগুলির মধ্যে।   

কিন্তু টেস্টের আবহে এই ভাবে একদিনের বহুদেশীয় টুর্নামেন্টে কী ভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে সেই নিয়ে সন্দেহ ছিল। ক্রিকেটের এই নতুন সংস্করণকে মেনে নিতে চাননি প্রাচীনপন্থীরা। কিন্তু তবুও দমেনি আইসিসি। এগিয়ে যায় এই টুর্নামেন্টটি নিয়ে।

বিশ্বকাপ শুরুর দিনেও আসন্ন টুর্নামেন্টকে বেশি গুরুত্বই দিতে চায়নি মিডিয়া। ৭ জুন ইংল্যান্ড বনাম ভারত ম্যাচ দিয়ে ঢাকে কাঠি পড়ে বিশ্বকাপের। ওই দিন সকালেও স্থানীয় সংবাদপত্র ‘ডেলি টেলিগ্রাফ’-এ বিশ্বকাপের প্রিভিউ লিখতে দিয়ে ক্রীড়া সাংবাদিক মাইকেল মেলফোর্ড লেখেন, “যে দলই জিতুক, আমি মনে করি ক্রিকেট হারতে চলেছে।”

ক্রিকেটের নবতম সংযোজনকে সুনীল গাওস্করই কি মেনে নিয়েছিলেন? প্রথম ম্যাচেই তাঁর খেলা ১৭৪ বলে ৩৬ রানের ইনিংসটা আজও কিংবদন্তি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ডেনিস অ্যামিসের শতরানে ভর করে ইংল্যান্ড করে ৩৩৪। জবাবে নিজেদের ৬০ ওভারে মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে ১৩২ রানের বেশি করতে পারেনি ভারত। গাওস্করের ওই ইনিংসের জন্যই যে ভারত বেশি দূর এগোতে পারেনি তা তো বলাই বাহুল্য। ম্যাচের পরে প্রকাশ্যেই তিনি বলে দিয়েছিলেন, ক্রিকেটের নবতম সংস্করণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই ইচ্ছা করেই শ্লথ গতিতে খেলেন ‘লিটল মাস্টার।’

গাওস্করের সেই ‘প্রতিবাদী’ ইনিংস!

কিন্তু প্রাথমিক যে লক্ষ্য নিয়ে এই টুর্নামেন্টের আয়োজন, সেটা একদমই সফল বলা চলে। বেশির ভাগ ম্যাচেই দর্শকাসন ভরতি। বেশ কিছু ম্যাচ যথেষ্ট জমাটি হয়। এর মধ্যে গ্রুপ লিগে নজর কাড়ে পাকিস্তান বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের ম্যাচটি। সেই ম্যাচে শেষ উইকেটে অ্যান্ডি রবার্ট্‌সকে সঙ্গে নিয়ে ডেরেক মারের অসাধারণ ইনিংস, জুটিতে ওঠা ৬৪ রানের সুবাদে পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয় ক্যারিবিয়ারনরা।

আরও পড়ুন আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে বিরক্তি, ব্যাট ছুঁড়ে ক্রিজের বাইরে গিয়ে ব্যাট ধরলেন পোলার্ড, ভিডিও

যাই হোক টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার এক পক্ষকাল পরে লর্ডসে ঐতিহাসিক ফাইনালে মুখোমুখি হল অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তত দিনে বিশাল আর্থিক লাভের মুখ দেখেছে আয়োজক দেশ এবং আইসিসি। টুর্নামেন্টের সায়াহ্নে দরকার ছিল একটি উত্তেজক ম্যাচের। সে রকম একটা ম্যাচই উপহার দিল দুই দল।

ক্লাইভ লয়েডের সেই অসাধারণ শতরানের ইনিংসটা আজও প্রবীণরা ভুলতে পারেন না। ৮২ বলে করা তাঁর শতরানই এই ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভাগ্য গড়ে দিয়েছিল। প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে নজর কেড়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার গ্যারি গ্লিমর। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৬০ ওভারে তোলে ২৯১। লক্ষ্যমাত্রাটি তাড়া করতে নেমে ১৭ রান দূরেই থেমে যায় অস্ট্রেলিয়া। লয়েডের হাতে উঠল প্রথম বিশ্বকাপের ট্রফি। ওই সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে দাপটের সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করে চলেছে, তাতে এই ফলাফলই যুক্তিযুক্ত ছিল।

প্রথম বিশ্বকাপের পর পেরিয়ে গিয়েছে ৪৪টা বছর। আবার এক বিশ্বকাপের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা। জায়গাও একই। সেই ইংল্যান্ড। কিন্তু প্রেক্ষাপট যেন কিছুটা ভিন্ন।

টি-২০ ক্রিকেটের সামনে পড়ে একদিনের ক্রিকেট জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে বলে অভিমত অনেকের। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই টুর্নামেন্টই হয়তো বুঝিয়ে দেবে একদিনের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কী!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here