ইডেনের অভিশাপ থেকে লর্ডসে শাপমুক্তি, বৃত্ত সম্পূর্ণ বেন স্টোক্সের

0
২০১৬-এর ইডেন থেকে ২০১৯-এর লর্ডস। ভিলেন থেকে সুপারহিরো।

নিজস্ব প্রতিনিধি

৩ এপ্রিল ২০১৬: টি২০ বিশ্বকাপের শেষ ওভার। জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের দরকার ১৯। বল হাতে বেন স্টোক্স। তামাম বিশ্ব বুঝে গিয়েছে বিশ্বকাপের ট্রফি উঠবে ইংল্যান্ডের হাতেই। কিন্তু কোথায় কী! স্টোক্সের প্রথম দু’টো বলেই ছক্কা মেরে ম্যাচের মোড় পুরো ঘুরিয়ে দিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কার্লস ব্র্যাথওয়েট। স্টোক্সের মুখচোখে ভেঙে পড়ার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু তখন বাকি চার বলে ৭ করতে হত ক্যারিবিয়ানদের। তৃতীয় বলে আবার ছয়। চতুর্থ বলেও ছয় মেরে ম্যাচ শেষ করে ফেললেন ব্র্যাথওয়েট। পিচে দাঁড়িয়ে সে দিন চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কী-ই বা করার ছিল স্টোক্সের। গোটা দেশের কাছে ভিলেন হয়ে গিয়েছেন তিনি।

১৪ জুলাই ২০১৯: মাঝখানে অনেক ঝড়ঝাপটা গিয়েছে স্টোক্সের জীবনে। কিন্তু আবার মোক্ষম সময়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের দেশকে উদ্ধার করার জন্য দাঁড়িয়ে তিনি। তবে এ বার বল নয়, ব্যাট হাতে। দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে হলে দরকার ১৫। ১৪ রান করলেও চলবে, কারণ তখন ম্যাচ যাবে সুপার ওভারে। বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ট্রেন্ট বোল্ট। প্রথম দু’বলেই বোল্টের নিখুঁত ইয়র্কার। রান এল না স্টোক্সের ব্যাট থেকে। বিশ্বজয়ের স্বপ্ন তখন দেখতে শুরু করে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড। কিন্তু তৃতীয় বলেই ব্যাট চালালেন স্টোক্স। বল গিয়ে পড়ল গ্যালারিতে। কথায় বলে, ভাগ্য সাহসীদের সঙ্গ দেয়। আর তাই চতুর্থ বলেই ভাগ্যের সহায়তা পেয়ে গেলেন স্টোক্স। ওভার-থ্রোয়ের খাতিরে আরও একটা ছয় রান। ব্যাস ইংল্যান্ডের পকেটে এসে গেল ম্যাচ। তার পর ম্যাচের টাই এবং সুপার ওভারের নাটকের পর ইংল্যান্ড বিশ্বজয় করল। কিন্তু এটা কথা প্রমাণিত, স্টোক্স না থাকলে মর্গ্যানের বদলে ট্রফি উঠত উইলিয়ামসনের হাতে। সাড়ে তিন বছর আগের ভিলেন স্টোক্স এখন ফাইনালের ম্যাচের সেরার পুরস্কার জিতে সুপার হিরো।

এই বিশ্বকাপটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্টোক্সের কাছে। কারণ নিজের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্য এটাই সেরা মঞ্চ ছিল তাঁর কাছে। ২০১৬-এর কথা তো ছেড়েই দিলাম। ২০১৭-এর সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী এক বছর তাঁর জীবনে কী গিয়েছে অনেকেই জানেন না। মারামারিতে জড়িয়ে পড়া, গ্রেফতার, কোর্টকাছারি, দল থেকে সাসপেন্ড, সব দুর্ভোগই এসেছে তাঁর জীবনে। আর তাই যখন ফাইনালে ওভার-থ্রো নিয়ে স্টোক্স যখন বলেন, “আমি উইলিয়ামসনের কাছে সব সময় ক্ষমা চাইব,” তখন তাঁর বদলে যাওয়া মানসিকতারই পরিচয় পাওয়া যায়।

২০১৭-এর ২৫ সেপ্টেম্বর দিনটা আজও অভিশপ্ত স্টোক্সের কাছে। একটি পানশালায় ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দু’জন যুবককে বেদম মারছেন স্টোক্স। তিনি মত্ত ছিলেন কোনো সন্দেহ নেই। এর পরেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তার পর এক বছর মামলা-মোকদ্দমা চলতে থাকে। দল থেকে বাদ পড়া। শেষে গত বছর ১৮ আগস্ট সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি পান স্টোক্স। এক সমকামী দম্পতির বয়ানের জন্যই স্টোক্সের মুক্তি হয়, আর সেই সঙ্গে জানা যায় তাঁর মানবিক মুখটাও।

আরও পড়ুন এ বার উইলিয়ামসন, বিশ্বকাপের এই রেকর্ডটি শুধু কিউইদেরই দখলে!

ওই দম্পতির বয়ান অনুযায়ী, ২০১৭-এর ২৫ সেপ্টেম্বর ওই পানশালায় তাঁরাও গিয়েছিলেন। তখন তাঁদের সমকামী বলে বার বার উত্যক্ত করে যাচ্ছিলেন দুই যুবক। এই ঘটনার প্রতিবাদ করেন স্টোক্স। এবং পানশালার বাইরে বেরিয়ে তাঁদের বেদম মারতে থাকেন। আদালতে দেওয়া বয়ানে ওই দম্পতি বলেছিলেন, “নিজের কেরিয়ার বিপন্ন হতে পারে জেনেও উনি আমাদের বাঁচাতে যে ভাবে এগিয়ে এসেছিলেন, তার জন্য আমরা ওঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।”

আজ গোটা ইংল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড ক্রিকেটের সব ভক্তই এই অলরাউন্ডারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। কারণ তিনি না থাকলে যে আরও এক ব্যর্থতার কাহিনিই লেখা থাকত ইংল্যান্ডের জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here