আট বছরে পঞ্চম বার, মুম্বইকে ফের একবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন করে নায়ক রোহিত শর্মা

0

দিল্লি: ১৫৬-৭ (শ্রেয়স ৬৫ অপরাজিত, পন্থ ৫৬, বোল্ট ৩-৩০)

মুম্বই: ১৫৭-৫ (রোহিত ৬৮, ঈশান ৩৩ অপরাজিত, নোর্কিয়া ২-২৫)

খবরঅনলাইন ডেস্ক: জ্যোতি বসুর ব্যাপারে এক সময়ে বলা হত, ‘গ্রেটেস্ট প্রাইম মিনিস্টার ইন্ডিয়া নেভার হ্যাড।’ শেন ওয়ার্নকে বলা হয়, ‘গ্রেটেস্ট ক্যাপ্টেন অস্ট্রেলিয়া নেভার হ্যাড।’ ঠিক তেমনটা কি রোহিত শর্মার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে?

শেন ওয়ার্নের ভাগ্যের থেকে অবশ্য রোহিতের ভাগ্য ভালো। সহ-অধিনায়ক হওয়ার সুবাদে তিনি ভারতকে বেশ কয়েকটি টুর্নামেন্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ফলও পাওয়া গিয়েছে হাতেনাতে। কিন্তু পূর্ণ সময়ের অধিনায়ক হওয়ার সৌভাগ্য তাঁর কোনো দিনও হবে না। কারণ বয়স। বিরাট কোহলির থেকে অন্তত দু’ বছরের বড়ো তিনি।

অথচ রোহিতের রেকর্ড দেখুন। ২০১৩-তে মুম্বইয়ের অধিনায়কত্বের ব্যাটন হাতে পান রোহিত। সেই থেকে পরের আট বছরে পাঁচ বার দলকে চ্যাম্পিয়ন করলেন তিনি। এর মধ্যে পর পর দু’ বছর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নজির তৈরি করল মুম্বই।

নেতৃত্ব তো বটেই, ফাইনালে নিজের দলের ব্যাটিংকে যে ভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন তা এক কথায় অনবদ্য। তবে প্রথমে এক্কেবারে ম্যাচের শুরু থেকেই বলা যাক।

দুবাইয়ের পিচে প্রথমে ব্যাট করা দল বরাবই বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। ঠিক সেই কারণেই ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন দিল্লির অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটা দিল্লির কাছে বুমেরাং হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল যখন ম্যাচের প্রথম চার ওভারের মধ্যেই তিনটে উইকেট হারায় তারা।

ফাইনালের প্রথম ওভারের একদম প্রথম বল থেকেই নাটকের শুরু। দুরন্ত আউটসুইংয়ে মার্কাস স্টয়নিসকে ড্রেসিং রুমের পথ দেখান ট্রেন্ট বোল্ট। গত সপ্তাহে প্লে-অফের ম্যাচে চোট পেয়েছিলেন বোল্ট। এ দিন তাঁকে দেখে অবশ্য মনে হয়নি যে তাঁর আদৌ কোনো চোট রয়েছে। ঠিক দু’ ওভার পর ফের চমক দেন বোল্ট।

তৃতীয় ওভারেই অজিঙ্ক রাহানেকে ফিরিয়ে দেন বোল্ট। চলতি আইপিএলটা ঠিক মনের মতো গেল না রাহানের। প্রথমত তিনি বেশি সুযোগ পাননি। যা সুযোগ পেয়েছেন, তার মধ্যে একটা ম্যাচ ছাড়া সব ম্যাচেই ব্যর্থ হয়েছেন। এর পরের ওভারে শিখর ধাওয়ানকে ফেরান জয়ন্ত যাদব।

রাহুল চাহরের বদলে এ দিন জয়ন্তকে খেলিয়েছে মুম্বই। সেই সিদ্ধান্ত মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে প্রমাণিত হয়। তবে পঞ্চম ওভার থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে দিল্লি। সৌজন্যে অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার এবং ঋষভ পন্থ।

আইপিএলে রানের মধ্যে এক্কেবারেই ছিলেন না ঋষভ পন্থ। কিন্তু তাঁর ব্যাটই এ দিন জ্বলে উঠতে শুরু করে। মুম্বইয়ের বোলারদের দাপটে নড়ে যাওয়া দিল্লির ব্যাটিংকে থিতু করার দায়িত্ব দেন ঋষভ আর শ্রেয়স। প্রথম দিকে বেশি ঝুঁকি নেননি দু’ জনে। কিন্তু দশম ওভারে প্রথম বার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজের আসল ফর্মের ঝলক দেখান পন্থ।

দশম ওভারের শেষে দিল্লির স্কোর পৌঁছে যায় তিন উইকেটে ৭৬-এ। এর পর থেকে আরও বেশি আগ্রাসী হতে শুরু করেন দু’ জনে। এই টুর্নামেন্টে ভালো রান করলেও শেষ পাঁচটা ম্যাচে ফর্মে ছিলেন না শ্রেয়স। কিন্তু মোক্ষম সময়ে এসে ফের জ্বলে উঠতে শুরু করেছে তাঁর ব্যাটও।

শ্রেয়স আর পন্থের ব্যাটে ভর করেই ১৪তম ওভারের প্রথম বলে একশো পেরিয়ে যায় দিল্লি। তার পরের ওভারেই অর্ধশতরান করে ফেলেন পন্থ। টুর্নামেন্টে প্রথম বার ৫০-এর গণ্ডি পেরোন তিনি। বার বার ব্যর্থ হওয়ার পর অনেকটাই চাপে ছিলেন তিনি।

যদিও ওই ওভারেই আউট হয়ে যান পন্থ। পুল মারতে গিয়ে বাউন্ডারি লাইনে ধরে পড়েন তিনি। ১৫ ওভারে দিল্লির স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় চার উইকেটে ১১৮। এর পর আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে দিল্লি। ছয় নম্বরে নামা শিমরান হেটমেয়ার শুরু থেকেই আগ্রাসী ছিলেন। ১৭তম ওভারে নিজের পঞ্চাশ পেরিয়ে যান শ্রেয়স আইয়ার।

তবে এর পর থেকে মুম্বইয়ের বোলাররা চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। শেষের পাঁচ ওভারে যতটা আগ্রাসী হওয়া উচিত ছিল দিল্লির, সেটা সম্ভব হয়নি। আর সেই কারণে ১৫৬-তেই আটকে যায় দিল্লি। যদিও ফাইনালের পক্ষে এটা যথেষ্ট ভালো স্কোরই।

শুরু থেকেই আগ্রাসী হওয়ার পরিকল্পনা সম্ভবত করেছিল মুম্বই। আর সেই কারণে, রান তাড়া করতে নেমে প্রথম ওভারের তৃতীয় বলেই রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে ছক্কা হাঁকান রোহিত শর্মা। আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠেন কুইন্টন ডে কক। চাপমুক্ত হতে শুরু থেকেই ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে আস্থা রাখেন দু’ জনে। প্রথম তিন ওভারের মধ্যেই ৩৩ রান করে ফেলে মুম্বই।

পঞ্চম ওভারের প্রথম বলে আউট হন ডে কক। তবে ততক্ষণে স্কোরবোর্ডে ৪৫ উঠে গিয়েছে। তাঁকে ফেরান মার্কাস স্টয়নিস। যদিও তাতে বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি মুম্বইয়ের। ডে ককের ছেড়ে যাওয়া জায়গা থেকেই শুরু করেন সূর্যকুমার যাদব। প্রথম দুই বলেই একটি চার আর একটি ছক্কা হাঁকান তিনি। প্রথম ছয় ওভারে মুম্বইয়ের স্কোর চলে যায় ৬১।

পাওয়ারপ্লেতে এই পরিমাণ রান তোলার পর হিসেব অনেকটাই সহজ হয়ে আসে মুম্বইয়ের কাছে। সেই কারণে আর বাড়তি ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না মুম্বইয়ের। তারা নেয়নি। ১১তম ওভারে সূর্যকুমার যাদব যখন আউট হন, তখন স্কোরবোর্ডে উঠে গিয়েছে ৯০। তবুও মুম্বইকে টলানো যায়নি।

রোহিতের কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব আরও একটা কারণে ছিল। নিজের দুশোতম আইপিএল এ দিন খেলছেন তিনি। তা সেই ম্যাচটা এর থেকে ভালো আর কী ভাবেই বা স্মরণীয় হত তাঁর কাছে! দুরন্ত একটি অর্ধশতরান করে ফেলেন তিনি।

উলটো দিকে ততক্ষণে জমে গিয়েছেন ঈশান কিষাণ। বেশি কোনো ঝুঁকি না নিয়েই নিজেদের ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন তাঁরা। তবে ১৭তম ওভারে তাল কেটে যায়। ওই ওভারের প্রথম বলে এনরিকে নোর্কিয়ার বাউন্সার সামলাতে না পেরে ড্রেসিং রুমের পথ দেখেন রোহিত।

এর পরেও খানিক নাটক অপেক্ষা ছিল। কারণ কার্যত বিনা কারণেই আউট হয়ে যায় কায়রন পোলার্ড। আবার জয়ের জন্য যখন মাত্র এক রান দরকার, তখন ফিরে যান হার্দিক পাণ্ড্য। তবে ১৯তম ওভারে জয়ের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে যায় মুম্বই। আরও একবার দলকে চ্যাম্পিয়ন করে রোহিত।

শুধুমাত্র আইপিএলের পারফরম্যান্স যদি দেখা হয়, তা হলে কিন্তু বিরাট কোহলিকে বার বার মাত করেছেন রোহিত শর্মা। এখনও করে চলেছেন। আট বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে একটা দলকে পাঁচ বার চ্যাম্পিয়ন করা তো চাট্টিখানি কথা নয়।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করবে এ বার ভারতের সীমিত ওভারের ম্যাচগুলিতে অধিনায়কের দায়িত্ব রোহিতকে দেওয়া উচিত নয় কি?

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন