নিউজিল্যান্ড: ২৩৯-৮ (টেলর ৭৪, উইলিয়ামসন ৬৭, ভুবনেশ্বর ৩-৪৩)

ভারত: ২২১ (জাদেজা ৭৭, ধোনি ৫০, হেনরি ৩-৩৭)

ম্যাঞ্চেস্টার: ২৬ বছর আগে যে ম্যাঞ্চেস্টার থেকেই উদয় হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটের, সেই ম্যাঞ্চেস্টারই এ বার হতাশায় ডুবিয়ে দিল ভারতকে। যে ম্যাঞ্চেস্টার ভারতের কাছে সব সময় গর্বের, সেই মাঠই গোটা ভারতকে হতাশায় ডুবিয়ে দিল। লর্ডসে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন বিরাটবাহিনীর কাছে অধরাই থেকে গেল।

অথচ এটা হওয়ারই কথা ছিল না। ২৮ ঘণ্টা আগে যে ম্যাচ শুরু হয়েছিল, যার প্রথমার্ধে পুরোপুরি দাপট ছিল ভারতের। কাজে এল না রবীন্দ্র জাদেজার মহাকাব্যিক এক ইনিংসও।

আরও পড়ুন ম্যাঞ্চেস্টারে মহারণ লাইভ: হেরে গেল ভারত, বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ড

মঙ্গলবারের ঘটনায় প্রথমে ফিরে যাওয়া যাক। মেঘলা আবহাওয়ায় প্রথমে বল করার সুযোগ যে ভারতের কাছে আখেরে লাভেরই হবে, সেটা একটা আন্দাজ করাই গিয়েছিল। যতই পিচে পেসারদের জন্য বাড়তি কোনো সুবিধা না থাকুক, শুরুর দশ ওভার ভারতের পেসাররা জোরদার দাপট দেখিয়ে গেলেন। পেসারদের দাপট এতটাই বেশি ছিল যে এই বিশ্বকাপের প্রথম দশ ওভারের সর্বনিম্ন স্কোরটি উঠল এই ম্যাচেই। কিন্তু প্রথম দশ ওভারের সেই স্কোরকেও ভারত ছুঁতে পারবে না, সেটা কি ছাই আন্দাজ করা গিয়েছিল।

বিশ্বকাপে ওল্ড ট্র্যাফর্ডের এই মাঠে য’টা ম্যাচ এখনও পর্যন্ত হয়েছে, তার কোনোটাই সেমিফাইনালের পিচ নয়। যে পিচে সেমিফাইনাল তা একেবারে আনকোরা। এক্কেবারে নতুন পিচ দুই দলকেই ঘোল খাইয়ে দিয়েছে বলা যায়। পিচ রিপোর্টে বলা হয়েছিল, এই পিচে যথেষ্ট রান আছে, স্কোর তিনশো পেরিয়ে যেতে পারে, এমনও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আদতে দেখা গেল ইনিংস যত গড়িয়েছে পিচ ততই স্লো হয়ে এসেছে। সেখানে রবীন্দ্র জাদেজা আবার বল ঘুরিয়েছেন, সমস্যায় ফেলেছেন কিউয়ি ব্যাটসম্যানদের।

প্রথম দশ ওভারে অত কম রান ওঠার জের কিছুতেই কাটাতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। উইকেট সে ভাবে না পড়লেও, রানের গতি কিছুতেই বাড়ছিল না। অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন তো রোজকার মতোই, একটা দিক ধরে রেখে ঠান্ডা মাথায় নিজের ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অন্য দিকে মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবেই বেশি পরিচিত রস টেলর ভয়ংকর ভাবে আটকে গিয়েছিলেন। এর ফলে ৪০ ওভার যখন নিউজিল্যান্ড পেরোচ্ছে তখন তাদের স্কোর মাত্র ১৫৫।

তবে এখান থেকেই কিছুটা রানের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করে কিউয়িরা। সেই গতি বাড়ানোয় নেতৃত্ব দেন কলিন ডে গ্র্যান্ডহোম। একটু পরে হাত খোলেন টেলরও। ফলে ৪০ থেকে ৪৬ ওভার পর্যন্ত প্রায় ৬০-এর কাছাকাছি রান তুলে ফেলে নিউজিল্যান্ড।

একদিনের ম্যাচের দ্বিতীয় দিন। এই কথাটি খুব একটা শোনা যায় না। কিন্তু ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার কল্যাণে এই বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে সেটাই হল। নিউজিল্যান্ডের এ দিন টার্গেট ছিল, যত কম সময়ে যত বেশি রান তোলা যায়। তা বিপক্ষে যখন ভুবনেশ্বর কুমার এবং জশপ্রীত বুমরাহর মতো বোলার রয়েছেন, রানের গতি বাড়ানো যে খুব কষ্টকর, তা তো বলাই বাহুল্য। তবুও কিউয়ি ব্যাটসম্যানরা চেষ্টার কোনো খামতি রাখেননি। ২৫০ রান না উঠলেও, যেটা উঠেছে সেটাও বেশ চ্যালেঞ্জিং স্কোরই ছিল।

স্কোরটা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল, সেটা ভারতের ব্যাটিং ইনিংসের প্রথম পাঁচ ওভারেই বোঝা গেল। ট্রেন্ট বোল্ট আর ম্যাট হেনরির গতি এবং সুইং সামলাতে না পেরে দ্রুত ফিরলেন রোহিত, কোহলি এবং রাহুল। তিন জনেরই স্কোর ১। এর পর যখন দশম ওভারের শেষ বলে কার্তিক আউট হলেন, তখনই মোটামুটি আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটভক্তরা।

সত্যিই আশা ছেড়ে দেওয়ারই ছিল। কারণ ঋষভ পন্থ এবং হার্দিক পাণ্ড্য সেট হতে শুরু করলেও কোনো উদ্যম দেখা যায়নি। পন্থ যখন উদ্যম দেখিয়ে ছয় মারার চেষ্টা করলেন তখন বাউন্ডারি লাইনের ধারেই তালুবন্দি হয়ে গেলেন। একশো পেরোনোর আগে ফিরলেন হার্দিক পাণ্ড্যও।

তখন ভারতের একমাত্র আশা এবং ভরসা ছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। কিন্তু যাকে হিসেবের মধ্যেই রাখা হয়নি, তাঁর ব্যাটই জ্বলে উঠল হঠাৎ করে। তিনি রবীন্দ্র জাদেজা। সঞ্জয় মঞ্জেরেকরের সঙ্গে তাঁর কী রকম ঝামেলা চলছে, তা তো আমরা সবাই জানি। মহাগুরুত্বপুর্ণ এই ম্যাচেই সম্ভবত সঞ্জয়কে জবাব দেওয়ার মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জেদেজা।

জাদেজাকে কেউ হিসেবের মধ্যেই রাখেননি। আর সেই সুযোগেই ম্যাচের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিলেন তিনি। সম্পূর্ণ ক্রিকেটীয় শট খেলেও কী ভাবে মারকাটারি খেলা যায়, সেটাই দেখিয়ে দিলেন জাদেজা। অর্ধশতরান করে কমেন্ট্রি বক্সের দিকে তাঁর উত্তপ্ত ভঙ্গি বুঝিয়ে দিল, কী মন নিয়ে তিনি এই ইনিংসটা খেলছিলেন।

জাদেজা যখন মারছিলেন, তখন উলটো দিক থেকে তাঁকে স্ট্রাইক দিয়ে যাচ্ছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। কিন্তু কোথাও যেন, আবার ধোনির ক্রিজে আটকে যাওয়ার ব্যাপারটি সামনে চলে এসেছিল। শুরুর দিকে তিনি যদি আর একটু চালিয়ে খেলতেন তা হলে ম্যাচের ফল অন্য রকম হতেই পারত। একটা সময়ে কার্যত বাধ্য হয়েই ওড়াতে গেলেন জাদেজা এবং উইলিয়ামসনের তালুবন্দি হলেন। তখন শেষ ভরসা ছিলেন ধোনিই।

ধোনির জীবনে এটিই সম্ভবত সব থেকে খারাপ অর্ধশতরান। অর্ধশতরান করেও কোনো রকম উচ্ছ্বাস না দেখিয়ে ব্যর্থতার মুখ দেখিয়ে ফিরে যেতে হল তাঁকে। আর তখনই সরকারি ভাবে যবনিকা পড়ে গেল ম্যাচে।

২০১৫-এর বিশ্বকাপের মতোই সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিল ভারত। আবার ফাইনালে উঠে গেল নিউজিল্যান্ড। আবার চার বছরের অপেক্ষা শুরু ভারতের। হয়তো ভারতের মাটিতেই আবার ট্রফি তুলবে তারা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here