আবেগে ভাসছে দুই বাংলা, সোশ্যাল মিডিয়ার তিক্ততা ভুলে শুরু হোক নতুন পথচলা

0

শ্রয়ণ সেন

ঢাকানিবাসী বছর তিরিশের যুবক শাবির। বিদেশের যে শহরকে তিনি সব থেকে ভালোবাসেন, তা হল কলকাতা। বেশ কয়েক বার এই শহরে এসেছেন। ইডেনে খেলাও দেখেছেন। কিন্তু সেটা ছিল আইপিএলে কলকাতা নাইটরাইডার্সের ম্যাচ। তাঁর প্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খানের দলের হয়ে গলা ফাটানোর জন্য কলকাতায় এসেছেন তিনি।

কিন্তু মনের কোনায় সব সময়েই একটা আশা ছিল, কখনও যদি এই ইডেনে ভারত আর বাংলাদেশের ম্যাচ দেখা যায়! সেই স্বপ্ন অবশেষে সফল হতে চলেছে। তাঁর অন্যতম প্রিয় শহরে, তাঁর দুই প্রিয় ক্রিকেটদল মুখোমুখি হবে, এটা এখনও তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো।

শাবিরের কথায়, “কোনো দিনও ভাবতে পারিনি, দাদার শহরের এসে নিজের দেশের হয়ে গলা ফাটাব দাদার দলের বিরুদ্ধে।”

এই ‘দাদা’ আবেগটা আজও অটুট বাংলাদেশে। ১৯ বছর আগে এমনই এক নভেম্বরের সকালে ভারতীয় দলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে নেমেছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। প্রথম বার ভারতীয় টেস্ট দলের অধিনায়কত্বে বাঙালির ছেলে। আর তাঁর মুখোমুখি এগারো বাঙালির একটা দল, যারা প্রথম বার টেস্ট ক্রিকেটের স্বাদ নিচ্ছে।

সেই টেস্টের ফল কী হয়েছিল, সবারই জানা। নইমুর রহমনের বাংলাদেশকে ন’উইকেটে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল সৌরভের ভারত। কিন্তু ফলাফলে যেটা প্রকাশ পাবে না, তা হল প্রথম ইনিংসে কী দুর্দান্ত লড়াইটাই না করেছিল বাংলাদেশ। প্রথম বার টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নেমে প্রথম ইনিংসেই কি না চারশো! আমিনুল ইসলাম করে ফেললেন ১৪৫। ভারত লিড নিলেও তা ২৯ রানের বেশি ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংস ভরাডুবি হল বাংলাদেশের, ফলে ভারতের জিততে আর কোনো সমস্যাই হল না।

বাংলাদেশে অবশ্য ‘সৌরভ আবেগ’ তার আড়াই বছর আগে থেকেই। ১৯৯৮ সালে ঢাকাতেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপের ফাইনালে সেই যে দুর্ধর্ষ একটা শতরান করেছিলেন! সৌরভকে নিয়ে বাংলাদেশেও তখন মাতামাতি।

শাবিরের কথায়, “তখন ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ হলে, আমরা দু’টো জিনিস চাইতাম। এক, বাংলাদেশ জিতুক আর দুই, সৌরভ বড়ো রান করুক।”

আরও পড়ুন দিন-রাতের টেস্টকে ‘যুগান্তকারী’ আখ্যা দিয়েও একটি আশঙ্কার কথা বললেন কোহলি

সেই সৌরভই এখন ভারতীয় ক্রিকেট হর্তাকর্তাবিধাতা। ভারতীয় ক্রিকেটের মসনদে বসেছেন এক মাস হতে চলল। আরও কাকতালীয় ব্যাপার হল, যে লোকটার ঐকান্তিক চেষ্টায় বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট আলো দেখেছে, সেই জগমোহন ডালমিয়ার ছেলে অভিষেক এখন সিএবির সচিব, হয়তো কিছু দিনের মধ্যেই তিনি সভাপতি হয়ে যাবেন।

ইডেন টেস্ট শুধুমাত্র একটা ক্রিকেট খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এক সঙ্গে কাজ করছে একাধিক আবেগ। সৌরভ-ডালমিয়া আবেগ, দুই বাংলার মিলিত হওয়ার আবেগ, আর সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আবেগ।

শুক্রবার দুপুর ১২:৫৫। ইডেন হয়ে উঠবে রবীন্দ্রময়। প্রথমে ‘আমার সোনার বাংলা…’ আর তার পরেই ‘জনগণমন…।’

এই টেস্টকে ঘিরে কত কী আয়োজন করা হয়েছে ইডেনে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমন, তাঁর সঙ্গে থাকবেন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও। সেনাবাহিনীর প্যারাট্রুপাররা দুই দেশের অধিনায়কদের হাতে গোলাপি বল তুলে দেবেন।

২০০০ সালের ঐতিহাসিক সেই টেস্টে ভারত এবং বাংলাদেশের সব সদস্যকে সংবর্ধিত করা হবে। সৌরভের আমন্ত্রণেই যে তাঁরা ইডেনে আসছেন, সে কথা অনেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন। বিরতিতে থাকবে বিশেষ ‘টক-শো,’ ভারতীয় ক্রিকেটের ‘ফ্যাব ফাইভ’কে নিয়ে। আর সেই সঙ্গে রুনা লায়লার গান। সত্যি কথা বলতে, শুক্রবার যে ইডেনে যাবে না, সে অনেক কিছুই মিস করবে।

আর সেই সঙ্গে ক্রিকেট তো থাকবেই। যাকে কেন্দ্র করে এত কিছুর আয়োজন, সেই ব্যাপারটাকে কী ভাবে এড়ানো যায়। শুক্রবার ইতিহাসে ঢুকে পড়তে চলেছে ইডেন গার্ডেনস। ইতিহাসে ঢুকে পড়তে চলেছে ভারত আর বাংলাদেশ দুই দলই।

আর এটা যে একমাত্র সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্যই হয়েছে, তা একবাক্যে মেনে নিচ্ছে সবাই। ২০০০ সালে ভারতীয় দলের নেতৃত্ব হাতে পেয়ে দলটাকে আমুল বদলে দিয়েছিলেন তিনি। আর এখন বোর্ডের নেতৃত্ব হাতে পেয়ে তার পুরোনো মনোভাব পুরোপুরি পালটে দিয়েছেন।

তাই যে বোর্ড গত বছরেও বলেছিল তাঁরা কোনো ভাবেই দিন-রাতের টেস্টের পক্ষপাতী নয়, সেই বোর্ডের মাথায় সৌরভ বসতেই জানিয়ে দিলেন, টেস্ট ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করতে দিন-রাতের টেস্টের কোনো বিকল্প নেই।

দিন-রাতের টেস্টের চতুর্থ বছরে এসে এই প্রথম সেই টেস্টের স্বাদ নেবে দুই দল। এক দিকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেস অ্যাটাক সংবলিত ভারত, অন্য দিকে শাকিব-তামিমহীন বাংলাদেশ। এই টেস্ট তৃতীয় দিনের শেষ হয়ে যাবে কি না, সেই চর্চা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে ক্রিকেটমোদীদের মধ্যে।

শামি-উমেশদের সামলানো বাংলাদেশের পক্ষে ইনদওরের থেকেও বেশি কঠিন হবে কোনো সন্দেহই নেই। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে ভারতকেও। কারণ গোধূলিতে তাদের আবু জায়েদও বিরাটদের চাপে ফেলতে পারেন।

তবে এই টেস্টকে ঘিরে খেলার থেকেও ছাপিয়ে গিয়েছে দুই দেশ, বা বলা ভালো দুই বাংলার মেলবন্ধনের আবেগ। তাই তো শাবির যখন বলেন, কলকাতার মতো ভালোবাসা, তিনি নিজের দেশ ছাড়া আর অন্য কোথাও পান না, তখন মনে হয় সোশ্যাল মিডিয়ায় তিক্ত ঘটনাগুলি বিক্ষিপ্ত, মুষ্টিমেয় কয়েক জনের কাজ।

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়ানো স্বর্গের উদ্যানের শহরে তাই এখন একটাই প্রার্থনা, এ বার নতুন করে পথচলা শুরু হোক ভারত আর বাংলাদেশ ক্রিকেটের। গত কয়েক বছরের যাবতীয় তিক্ততা ভুলে আবার সেই পুরোনো দিনগুলোতে ফিরে যাই, যখন পাকিস্তানের বোলারের বল সৌরভ স্টেপ আউট করে মাঠের বাইরে পাঠাতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, বা আশরাফুলের শতরানে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর সময়ে বাঙালি আবেগে ভেসে গিয়েছিল এ পার বাংলাও।

(দিন-রাতের টেস্টের যাবতীয় খবরাখবর পড়তে ক্লিক করুন এখানে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.