দুবাই: এ বারের টি২০ বিশ্বকাপ আক্ষরিক অর্থেই অনেক ক্রিকেট ভক্ত এবং বিশেষজ্ঞকে চমকে দিয়েছে। সব থেকে চমকপ্রদ ব্যাপার হয়েছে ভারতের ছিটকে যাওয়া। যে দলটাকে নিয়ে খুব আশা এবং ভরসা ছিল, তারাই গ্রুপ পর্যায় থেকেই ছিটকে গেল।

একই ব্যাপার ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ঘিরেও। গত বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল এ বার মাত্র একটা ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল। এক সময় টি২০ ক্রিকেটের সর্বশক্তিমান দল এমন পারফর্ম করবে, সেটা কার্যত আন্দাজই করা যায়নি।

ঠিক একই ভাবে সবাইকে চমকে দিয়েছে পাকিস্তান। দলটা নিজেদের গ্রুপ পর্যায়ে পাঁচটার মধ্যে পাঁচটা ম্যাচই জিতে যাবে, সেটা অনেকেই ভাবতে পারেননি। যে চারটে দল সেমিফাইনালে গেল, তাদের মধ্যে পাকিস্তান ছাড়া একমাত্র ইংল্যান্ডের টি২০ বিশ্বকাপ জেতার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড একবারও এই টুর্নামেন্ট জেতেনি। তবে এই দুই দলেরই এ বার বিশ্বকাপ জেতার যাবতীয় রসদ মজুত রয়েছে। এই চারটে দলের শক্তি (Strength), দুর্বলতা (Weakness), সুযোগ (Opportunities) এবং ঝুঁকির (Threats) দিকে নজর দেওয়া হল। এই চারটে বিষয়টি একসঙ্গে বলে স্বট (SWOT) পর্যালোচনা।

শক্তি

১) ইংল্যান্ড– দলের ১১ জনই জানেন, তাদের প্রত্যেকের ঠিক কী দায়িত্ব। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাদের ব্যাটসম্যানরা প্রথম থেকেই আগ্রাসী ব্যাটিং করেন। টপ অর্ডার ধসে গেলে মিডিল অর্ডার খেলা ধরে নেয়। বোলিংও শক্তিশালী। এ ছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল তাদের বোলারদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দুরন্ত ব্যাটসম্যান, যা গোটা দলকে একটা বাড়তি সুবিধা দিয়ে দেয়।

২) অস্ট্রেলিয়া– সাউথ আফ্রিকা এবং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যাটিং ভরাডুবি হলেও টুর্নামেন্ট যত গড়িয়েছে, তত জ্বলে উঠেছেন ব্যাটসম্যানরা। ফর্মে ফিরেছেন অ্যারন ফিঞ্চ এবং ডেভিড ওয়ার্নার। বোলিংও শক্তিশালী। স্টার্ক-হেজেলউড-কামিন্সের পেসত্রয়ীকে যোগ্য সহায়তা করছেন লেগ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা।

৩) পাকিস্তান– ভারতকে হারিয়েছে তারা। তাই এই বিশ্বকাপে এক অন্য পাকিস্তানকে দেখা যাচ্ছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। তাদের খেলার ধরনেই বোঝা গিয়েছে তাদের এ বারের লক্ষ্য বড়ো কিছু করার। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী এই দলটা। এটাই তাদের বড়ো শক্তি।

৪) নিউজিল্যান্ড– ব্যাটসম্যান, বোলারদের পাশাপাশি এই দলটার সব থেকে বড়ো শক্তি হল তাদের বেশ কয়েকজন নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার, যারা ব্যাটিং এবং বোলিং দুটোতেই সমান ভাবে দক্ষ। কেন উইলিয়ামসনের মতো ঠান্ডা মাথার একজন অধিনায়ক থাকা নিউজিল্যান্ডের কাছে বাড়তি সুবিধার।

দুর্বলতা

১) ইংল্যান্ড– দলটির সব থেকে বড়ো দুর্বলতা যেটা দেখা দিতে পারে, সেটা সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে গত শনিবার ঘটেছে। জেসন রয়ের চোট পেয়ে যাওয়া। গোটা টুর্নামেন্টে এখনও পর্যন্ত একবারই চাপে পড়েছে ইংল্যান্ডের মিডিল অর্ডার, সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। আর সে ঠিক সেই মিডিল অর্ডার দলটাকে উদ্ধার করতে পারেনি। ফলে সেমিফাইনালে এটা তাদের বড়ো দুর্বলতার জায়গা হতে পারে।

২) অস্ট্রেলিয়া– টি২০ ফরম্যাটে অস্ট্রেলিয়ার পারফরম্যান্সে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। অস্ট্রেলিয়া বরাবরই টি২০ ক্রিকেটের থেকে টেস্ট ক্রিকেটকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এটাই তাদের দুর্বলতা।

৩) পাকিস্তান– এখনও পর্যন্ত সে ভাবে কোনো দুর্বলতা পাকিস্তানের নেই। তবে মিডিল অর্ডারে ফকর জমান এবং মহম্মদ হাফিজের ফর্ম অধিনায়ক বাবর আজমের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলতে পারে। তবে রবিবার স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে শোয়েব মালিকের ঝোড়ো ইনিংস অনেক সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে।

৪) নিউজিল্যান্ড– শেষে দিকে পাওয়ার হিটারের অভাব রয়েছে এই দলে।

সুযোগ

১) ইংল্যান্ড– কোনো বিতর্ক ছাড়াই এটা বলে দেওয়া যায় যে ইংল্যান্ড এই মুহূর্তে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সেরা দল। ২০১৯-এর পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপ তাদের দখলে তো রয়েছেই। এর পাশাপাশি ২০১৬ সালের টি২০ বিশ্বকাপেরও রানার্স তারা। ২০১০-এর পর নিজেদের ঝুলিতে আরও একটা টি২০ বিশ্বকাপের ট্রফি পুরে দেওয়ার এটাই তাদের সেরা সুযোগ।

২) অস্ট্রেলিয়া– টি২০ বিশ্বকাপ তারা এর আগে কখনও জেতেনি। গত কয়েক বছরে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তাদের ফর্মও খুব একটা ভালো নয়। সে কারণে এটাই তাদের কাছে বড়ো সুযোগ টুর্নামেন্টটা জিতে সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোর।

৩) পাকিস্তান– টি২০ ফরম্যাটে পাকিস্তান বরাবরই ভালো খেলে। ১২ বছর পর ফের সুযোগ এসেছে এই টুর্নামেন্টের ট্রফিটা তোলার। পাকিস্তানে বড়ো ক্রিকেটীয় দেশ খেলতে যায় না, এটাই তাদের ক্রিকেটদের বাড়তি অনুপ্ররণা দিতে পারে বিশ্বকাপ জেতার জন্য। সব মিলিয়ে তাদের কাছে বড়ো সুযোগ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার।

৪) নিউজিল্যান্ড– দুরন্ত সময় চলছে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের। অল্পের জন্য বিশ্বকাপ ট্রফিটা হাতছাড়া হলেও টেস্টের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কেন উইলিয়ামসনের এই দলতাই। এর ওপরে যদি টি২০ বিশ্বকাপের ট্রফি জুটে যায়, সেটা হবে সোনায় সোহাগা।

ঝুঁকি

১) ইংল্যান্ড– অধিনায়ক ওইন মর্গ্যানের ফর্ম নিয়ে চিন্তা রয়েছে। এই বিশ্বকাপে তাঁকে খুব বেশি পারফর্ম করতে হয়নি। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে, আইপিএলে কেকেআরের হয়ে যতবার ব্যাট হাতে তিনি নেমেছেন ব্যর্থ হয়েছেন। এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তায় থাকবে ব্রিটিশরা।

২) অস্ট্রেলিয়া– টপ অর্ডার যদি তাড়াতাড়ি ড্রেসিং রুমে ফিরে যায় তা হলে বিপদ বাড়ে অস্ট্রেলিয়ার। স্টিভ স্মিথকে সময় দিতে হয় ৩ নম্বরে নেমে ইনিংসকে গড়ার জন্য। সে কারণে ওপেনাঢ়দের ভূমিকা এই দলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩) পাকিস্তান– এখনও পর্যন্ত সে ভাবে পরীক্ষায় পড়তে হয়নি পাকিস্তানকে। নিউজিল্যান্ড এবং আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে মিডিল অর্ডার ব্যর্থ হলেও মারকুটে ব্যাটসম্যান আসিফ আলি তাদের উদ্ধার করে দিয়েছেন। কিন্তু সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টপ অর্ডার ব্যর্থ হলে মিডিল অর্ডার কী করবে, সেটা নিয়ে চিন্তা রয়েছে।

৪) নিউজিল্যান্ড– পেসের বিরুদ্ধে খুব ভালো ব্যাট করলেও স্পিনারদের বিরুদ্ধে দুর্বলতা রয়েছে নিউজিল্যান্ডের। আমিরশাহির পিচে এটাই তাদের সব থেকে বড়ো ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

চার সেমিফাইনালিস্টই যথেষ্ট শক্তিশালী দল। তবুও সব কিছু বিচার করে ধারণা করা হচ্ছে যে সামনের রবিবার টি২০ বিশ্বকাপের ফাইনাল ইংল্যান্ড এবং পাকিস্তানের মধ্যে হতে পারে। সেখানে ইংল্যান্ডের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, যেহেতু দুই দলের মধ্যে ২১টি ম্যাচের মধ্যে ১৪টাই জিতেছে তারা।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন