অরুণাভ গুপ্ত

একদম প্রথম ইউরো কাপ ১৯৬০ ফাইনাল পর্বের খেলায় ঢুঁ মারা যাক। ৬ জুলাই ১৯৬০, এক দিনে দু’টো সেমিফাইনাল। প্রথম সেমি প্যারিসে, মুখোমুখি ফ্রান্স ও যুগোস্লাভিয়া। সন্ধেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম চেক, স্থান মার্সেইল।

প্রথম ইউরো কাপের ফাইনাল পর্ব, প্রথম গোল

[মুখোমুখি ফ্রান্স ও যুগোস্লাভিয়া]

প্ৰথম খেলা শুরু হওয়ার ১১ মিনিটের মাথায় পার্টিজেন বেলগ্রেড স্ট্রাইকার মিলান গালিক যুগোস্লাভিয়ার পক্ষে গোল করেন। পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে থেকে চকিতে কামান দাগা যে গোল শট নিলেন, তা বাতাসে বাঁক নিয়ে বল গোলপোস্টের কোনা দিয়ে ঢুকে জালে আছড়ে পড়ল। ফ্রান্স গোলরক্ষক জর্জ ল্যামিয়া বল ধরা দূরের কথা, জায়গায় দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলেন। প্রথম ইউরো কাপের ফাইনাল পর্ব, প্রথম ইউরো গোল এবং গোল করে গালিক তালিকায় প্রথম গোলদাতার স্থান দখল করে নজির গড়লেন। রেকর্ড তো হল এবং যা ভাঙা কারোর সাধ্য নয়। তখন ঘুণাক্ষরে টের পাওয়া যায়নি আরও অনেক চমক খেলায় অপেক্ষা করে রয়েছে।

খেলা চলছে জোর কদমে, কেউ কাউকে এক ছটাক জমি ছাড়তে নারাজ, বিশেষ করে ফ্রান্স মরিয়া প্রথম ইউরো ঘরে তুলতে হবে। গোল করার লক্ষ্যে যখন দু’টো টিম মুখিয়ে থাকে তখন গোল কিন্তু আসবেই, শুধু সময়ের অপেক্ষা। যা দেখা গেল ফ্রান্সের ক্ষেত্রে। শুরুতে দুম করে গোল হজম করে দমে থাকার বদলে পাল্টা মার দিয়ে যুগোস্লাভিয়া শিবিরে মেসেজ পাঠাল ফ্রান্স আক্রমণের সামনে রুখে দাঁড়ানো অত সহজ নয় বন্ধু। ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াল ৩-১, তার পর দুই অর্ধ মিলেঝুলে স্কোর বোর্ড শো করল ৪-২, অর্থাৎ যুগোস্লাভিয়া অস্বাভাবিক চাপের মুখে থাকলেও গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে কসুর করেনি। তাতে অবশ্য ফ্রান্স খুব একটা থমকে যায়নি এবং শতকরা নব্বই ভাগ নিশ্চিত ছিল ফাইনাল তারা খেলতে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রবাদ বাক্য অকাট্য- ম্যান প্রপোজেস গড ডিসপোজেস। ভাগ্যদেবীর করুণা যুগোস্লাভিয়ার পাল্লা ভারী করল। ম্যাচ প্রায় শেষ হব-হব করছে, এমন সময় মিরাকল ঘটল। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে সমস্ত হিসেব-নিকেশ লন্ডভন্ড। স্কোর ৪-৩ করলেন টমিস্লাভনেজ, ফ্রান্স ব্যাপার-স্যাপার সুবিধার না দেখে তড়িঘড়ি রক্ষণ ভালো আঁটোসাঁটো করার রাস্তায় হাঁটে। যুগোস্লাভিয়া তখন আক্রমণে ঝড় তুলেছে, সেই ঝাঁঝের সামনে ফ্রান্স খড়কুটোর মতন ভেসে গেল। দু’মিনিট সময়ের ব্যবধানে ড্রাজন জারকোভিচ যুগোস্লাভের জন্য পর পর দু’খানা গোল করে ফাইনালের রাস্তা পাকা করে ফেললেন। স্কোর ৫-৪, অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় ফ্রান্স ছিটেফোঁটা বাকি সময় আর ধোপে টেকেনি। ফ্রান্স এই যে কুলে এসে তরী ডোবাল তার খেসারত চলল ১৯৮৪ সাল অবধি। ফের নিজের মাটিতে ওই সালেই ফ্রান্সের শাপমোচন হল এবং ইউরো কাপ ঘরে উঠল।

আগে বলেছি, ম্য়াচে চমক আছে এবং যা মোটেই খুচখাচ নয়, একেবারে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ইউরোপিয়ান রেকর্ড।

সেমির স্কোর ৫-৪ অর্থাৎ, মোট ৯টা গোল, যা ইউরো-তে প্রথম এবং সেমি-তেও প্রথম। ঘটবি তো ঘট প্রথম আসরে ৯টা গোল এবং রেকর্ড হয়ে এখনও পর্যন্ত অক্ষত। দেখুন, ইউরো ৬০ বছরে পৌঁছানোর পথে প্রতিযোগিতার আসরে ইতিমধ্যে ২৮৬ ম্যাচ সম্পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ১৯৬০ ফাইনালে পর্বের সেমি-তে হওয়া ৯টা গোলের রেকর্ড এখনও পর্যন্ত কোনো দেশ স্পর্শ করা বা টপকে যাওয়ার কৃতিত্ব দেখাতে পারেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের কবজায় প্রথম ইউরো

[ইউরো ১৯৬০: লেভ ইয়াসিনের হাত ধরে সোভিয়েতদের গৌরব অর্জন]

দ্য ইউরোপিয়ান চ্য়াম্পিয়নশিপ বা দ্য ইউরোপিয়ান নেশনস কাপ প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনার মূল হোতা ছিলেন হেনরি ডিলনে। ঘটনা হল ডিলনে ছিলেন আবার ফ্রেঞ্চ ফুটবল ফেডারেশন ও উয়েফার সাধারণ সম্পাদক। সঙ্গে অবশ্য দোসর ছিলেন জুলে রিমে। করিতকর্মা চরিত্র হলেও ভাবলাম আর হয়ে গেল, এমন কিন্তু হয়নি। তিন দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে এই পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দিতে। ১৯৫৫ ডিলনে মারা গেলেন এবং তার পাঁচ বছর পর দুই কীর্তিমান পুত্র পিয়েরি এবং এল ইকুইপি বাবার অসমাপ্ত ইচ্ছা পূরণ করে ইতিহাস তৈরি করলেন।

১৯৬০ ইউরো ফাইনালে মুখোমুখি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়া। চেককে সেমিতে পরাস্ত করার সুবাদে সোভিয়েতের ফাইনালে অভিষেক। ফাইনালেও কিন্তু শুরু এক কায়দায় করেছিল যুগোস্লাভ।

এ ক্ষেত্রে গালিক প্রথমার্ধে গোল দিয়ে দেশকে এগিয়ে দিয়েছিলেন, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১০টি গোল করার ফলে বিশ্বরেকর্ ছোঁয়ার অসামান্য কৃতিত্ব অর্জন করেন। তবে ফুটবল জগতের দিকপাল ফুটবলারদের অভিমত হল, গোল করে রেকর্ড ছোঁয়া বা ইউরো-তে প্রথম গোল করা নি:সন্দেহে যে কোনো ফুটবলারের কাছে দুর্লভ সম্পদ ও অমূ্ল্য স্মৃতি বিশেষ, কিন্তু তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি দামি লেভ ইয়াসিনকে গোল দেওয়া। প্রতিপক্ষে যে কোনো ফুটবলারের কাছে এটাই একমাত্র স্বপ্ন। সোভিয়েত গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিন বিপক্ষ টিমের চোখে ত্রাস বিশেষ। বিশ্বের তাবড় ফুটবলাররা একবাক্যে স্বীকার করেন, লেভ ইয়াসিন লেজেন্ড।

যুগোস্লাভিয়া তার টাটকা প্রমাণ পেয়েছে নিজের ফাইনাল ম্যাচে। ওই একটি গোলের পর মাথা খুঁড়েও গোলপোস্টে দাঁড়ানো লেভ ইয়াসিনকে পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি যুগোস্লাভদের। লড়লেও ফলাফল ছিল ২-১, সোভিয়েত অনুকূলে। এই স্কোরেই প্রথম ইউরো ১৯৬০ সোভিয়েত ইউনিয়নের কবজায় চলে গেল। নিজের সেই রেকর্ড দ্বিতীয় বার ছুঁতে পারেনি সোভিয়েত ইউনিয়ন। এমনকী রাশিয়াও একটি বারের জন্য ইউরো চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করতে এখনও অ-সফল!

ইউরো কাপ সম্পর্কিত খবর অনলাইনের অন্যান্য প্রতিবেদন পড়ুন এখানে ক্লিক করে: EURO

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন