কলকাতা: নজিরবিহীন বার্ষিক সাধারণ সভা দেখল শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব। যেখানে মঞ্চ সাজানোর মাঝেই মঞ্চে উঠে সাধারণ সভার সভাপতির পদ দখল করতে চলে গেলেন ক্লাবের পদত্যাগী সভাপতি টুটু বসু। মঞ্চে উঠে ক্লাবের দুই সদস্যকে সজোরে ঘুঁষি মেরে আহত করলেন পদত্যাগী সহ সচিব সৃঞ্জয় বসু। পদত্যাগপত্র কর্মসমিতিতে গৃহীত হওয়ার পরও অর্থসচিবের চেয়ারে বসলেন দেবাশিস দত্ত। প্রবল চাপে কেঁদে ফেললেন সচিব অঞ্জন মিত্র। চারটে থেকে যে বৈঠক শুরু হওয়ার কথা, তা শুরু হল পৌনে ছটায়।

শেষ অবধি অবশ্য নিজেদের পরিকল্পনা মতো যা যা পাস করানোর ছিল, সব পাস করিয়ে নিল অঞ্জন মিত্র নেতৃত্বাধীন শাসক গোষ্ঠী। তার মধ্যে রয়েছে ক্লাবের কোম্পানিকে প্রাইভেট লিমিটেড থেকে পাবলিক লিমিটেড করিয়ে নেওয়া এবং ক্লাবে যুব সচিব ও ক্রীড়া সচিব পদ তৈরি। সভার শেষে অঞ্জনবাবু জানিয়ে দিলেন, সাধারণ সভায় পাস হয়ে গেলেও কোম্পানিকে প্রাইভেট থেকে পাবলিক লিমিটেড করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগবে, ততদিন সদস্য-সমর্থকদের ধৈর্য ধরতে হবে। পাশাপাশি জানালেন, ক্লাবকে যারা স্পনসর করবে, তাঁরা স্বাভাবিক ভাবেই অংশীদারিত্ব চাইবে। তার জন্য তাঁদের সঙ্গে দরাদরিও হবে। বাজারে খবর, এ বছরই ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলতে পারে, সেক্ষেত্রে সবুজমেরুন কী করবে- এই প্রশ্নও করা হয় বাগান সচিবকে। তাতে তিনি বলেন, “ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেললে মোহনবাগান আইএসএল খেলবে। মোহনবাগান আইএসএল খেললে ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলবে”। অঞ্জনবাবুর এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অসমর্থিত সূত্রের খবর, চলতি মরশুমে দুই প্রধানের মূল স্পনসর নিয়ে আসছে তাঁর ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি।

তবে, এদিনের সাধারণ সভায় দুই গোষ্ঠীর তিক্ততা যে পর্যায়ে পৌঁছল, তাতে মনে করা হচ্ছে এবার আইনি পরামর্শ নিয়ে টুটু এবং সৃঞ্জয়ের পদত্যাগপত্র কর্মসমিতিতে গ্রহণ করে নেবেন অঞ্জন মিত্র।

ক্লাবের শাসক গোষ্ঠী এদিন টুটু বসুকে সভার সভাপতি করতে চায়নি। সেটা বুঝে আগেভাগেই মঞ্চে উঠে যান টুটু। তখন মঞ্চে থাকা ফুটবল সচিব বাবুন ব্যানার্জি জানতে চান, তিনি কেন উঠে এলেন। টুটু বলেন, তিনিই ক্লাবের সভাপতি। সে সময় বাবুনের এক সঙ্গী বলেন, “আপনাকে আমরা সভাপতি বলে মানি না”। এই কথা শুনে মঞ্চে উঠে টুটুর ছেলে এবং ক্লাবের পদত্যাগী সহ সচিব সৃঞ্জয় ওই ব্যক্তিকে ঘুঁষি মারেন। ওই ব্যক্তি মঞ্চ থেকে পড়ে যান। তাতেই পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। সৃঞ্জয়ের দলবল এবং সাংসদ প্রসূন ব্যানার্জি অঞ্জন মিত্রকে বলেন ক্লাবের সভাপতি হিসেবে টুটুবাবুকে সভা পরিচালনার দায়িত্ব দিতে। প্রথমে অঞ্জন তাতে রাজি হননি, তিনি সভা স্থগিত করে দিতে বলেন। তাতে টুটু শিবির রাজি হয়নি। তারপর তিনি বলেন, তাঁকে এবং টুটুকে বাইরে রেখে সভা চালাতে। তাতেও টুটু গোষ্ঠী রাজি হয়নি। তখন অঞ্জনবাবু বলেন, প্রবীণ সদস্য হিসেবে তিনি টুটুকে সভার সভাপতি করতে রাজি। তাতেও কাজ হয়নি। ব্যাপক চাপে অঞ্জনবাবু কেঁদে ফেলেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাঁকে সামলাতে তাঁর মেয়ে সোহিনী মঞ্চে ওঠেন, তিনি কর্ম সমিতির সদস্যও। সঙ্গে ওঠেন জামাই কল্যাণ চৌবে। কল্যাণকে মঞ্চে দেখে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে যান সৃঞ্জয়। তাঁকে মঞ্চ থেকে নামতে বলেন। কল্যাণ তাঁর সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন। তখন সৃঞ্জয় কল্যাণকে ঘুঁষি মেরে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেন। মাথায় আঘাত পান কল্যাণ। এরপর টুটুকে সভাপতি করে সভা শুরু হয়।

সভা শেষে টুটুবাবুর দাবি, তিনিই এখন ক্লাবের সভাপতি। পাশাপাশি সৃঞ্জয় দাবি করেন, তিনি সহ সচিব। দেবাশিস দত্ত বলেন, ক্লাবের তিন সদস্যের কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন পর্যন্ত তিনি অর্থসচিব পদে কাজ চালাবেন। এদিনের গুন্ডামি প্রসঙ্গে টুটু বসু বলেন, বিধানসভা-লোকসভাতে যে ভাবে বিরোধিতা হয় তাঁরা সেভাবেই বিরোধিতা করেছেন।

অঞ্জন মিত্র অবশ্য টুটুবাবুর কথা মানতে নারাজ। তাঁর কথায় টুটুবাবু কেবল এদিনের সভায় সভাপতিত্ব করেছেন, ক্লাবে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মসমিতি ঠিক করবে।

এদিনের সভার কার্যসূচিতে নির্বাচনের বিষয় ছিল না। তা নিয়ে কোনো কথাই হয়নি। যদিও মঞ্চ থেকে টুটুবাবু একসময় অপ্রাসঙ্গিক ভাবে বলেন, তাঁরা নির্বাচনের জন্য আদালত থেকে রিসিভার বসাবেন।

বস্তুত, এদিনের সাধারণ সভার পরে ক্লাবের প্রশাসনিক রাশ অঞ্জনগোষ্ঠীর হাতেই রইল। টুটু-সৃঞ্জয়-দেবাশিস যা বলছেন, সেগুলো স্রেফ তাঁদের দাবি, এটুকুই বলা যায়। তবে এদিন যা হল, তার রেশ এখনও চলবে। আইনি পরামর্শ নেবে দু’পক্ষই। সেক্ষেত্রে কী হবে, তা সময়ই বলবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here