হিমাদ্রিশেখর সরকার

 

দল ম্যাচ জয় অমীমাংসিত হার গোল ব্যবধান পয়েন্ট
আইজল এফসি ১৪ ৩০
ইস্ট বেঙ্গল ১৪ ১৪ ২৭
মোহন বাগান ১৩ ১৩ ২৬

রবিবার(৯ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত ২০১৬-১৭-এর আই লিগের পরিস্থিতি এটাই। প্রথম উত্তরপূর্ব ভারতীয় ক্লাব হিসেবে আই লিগ জিতে অনন্য কীর্তি স্থাপন করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে আইজল এফ সি-র। যদিও সামনের রাস্তাটা তাদের খুব একটা মসৃণ নয়। এখনও খেলা বাকি বেঙ্গালুরু, মোহনবাগান এবং চার্চিল ব্রাদার্সের মতো দলের সাথে। তুলনায় ইস্টবেঙ্গলের আগামী খেলাগুলো আংশিক সহজ দলের বিরুদ্ধে। কিন্তু একটাই দল যারা এই লিগ জয়ের সম্ভাবনা থেকে ইস্টবেঙ্গলকে এই মুহূর্তে মুছে দিতে পারে সেটা হল মোহনবাগান। সঙ্গে লিগ তালিকার শীর্ষে থাকা আইজল এফসি-র ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলারও সুযোগ রয়েছে তাদের। ফলে বুঝতেই পারছেন আজকের  ডার্বিটা আর পাঁচটা ডার্বির থেকে কেন সম্পূর্ণ আলাদা?

আরও পড়ুন: ময়দান পেরিয়ে: দুনিয়া জুড়ে ডার্বির রংমশাল

 

তবে ডার্বি মানেই সেটা বাকি সব ম্যাচের থেকে আলাদা। ডার্বি কী এবং কেন তার খানিক ইঙ্গিত আগের ডার্বি সংক্রান্ত লেখায় দিয়েছি। আজ তাই একটু অন্যরকম গল্প বলতে চাই এই ডার্বি ঘিরে। আচ্ছা বলুন তো, এই কলকাতা ডার্বি হঠাৎ এল কেন? কিভাবে সূচনা হল বাঙ্গালির বড় ম্যাচের? আমি জানি, আপনি জানেন সেই ইতিহাস। তাও আরেকবার নাহয় একটু ঝাড়পোঁছ করে নেওয়া যাক সেই সোনালি স্মৃতিকে।   

আসলে এই ডার্বি বা বাঙ্গালির বড়োম্যাচের সূচনা হয়েছিল ইস্টবেঙ্গলের জন্ম থেকে। সেযুগে বাংলার ফুটবলে বঙ্গীয় শক্তি বলতে যে নামগুলোকে প্রথম সারিতে বিবেচনা করা হত সেগুলো হল মোহনবাগান এবং  জোড়াবাগান। দেশ তখন ব্রিটিশদের অধীনে। সময়টা ১৯২০। কোচবিহার কাপে জোড়াবাগান ও মোহনবাগান মুখোমুখি হলে জোড়াবাগান তাদের রক্ষণভাগের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় শৈলেশ বোসকে বাদ দিয়েই দল নামায়। এই বাদ দেবার কোনও ঠিক যুক্তি জোড়াবাগানের কোচ বা কর্মকর্তারা দিতে না পারলে জোড়াবাগানের ভাইস প্রেসিডেন্ট সুরেশচন্দ্র চৌধুরী এক গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস পান। এবং মোহনবাগানের প্রচ্ছন্ন মদতেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন। তাই তার প্রতিবাদে জোড়াবাগান ক্লাব ত্যাগ করে রাজা মন্মথনাথ চৌধুরী, রমেশচন্দ্র সেন ও অরবিন্দ ঘোষের সাথে ১ অগস্ট, ১৯২০ সালে এক নতুন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। নাম হয় ইস্টবেঙ্গল।

এরপর ইস্টবেঙ্গল শুধুই খেলার মাঠের প্রতিবাদের ছবি নয়, হয়ে উঠেছিল তৎকালীন সময়ের সব প্রতিবাদের ভাষা। একটু পিছিয়ে গেলে দেখতে পাওয়া যায় লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ। শেষ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও বর্তমানের বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ কোলকাতায় আসতে শুরু করেন। কেউ চাকরিসূত্রে, কেউ শিক্ষা, কেউ বা তৎকালীন রাজনৈতিক টানাপোড়েনে আসেন এই শহরে। এদিকে নাবালিকা তিলোত্তমার সীমা তখন খুবই ছোটো। আজকের কলকাতার নিরিখে হয়তো ৪০ শতাংশ। ফলে ছড়িয়ে পরতে লাগলো কলকাতা।

পরবর্তীকালে স্বাধীনতার সময়ে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিজেদের সব হারিয়ে আসা মানুষগুলো আস্তে আস্তে বসতি গড়ে তোলে কলকাতা সংলগ্ন এলাকায়। আজকের ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, বেহালা, বাগুইআটি কিংবা বারাসত, বেলেঘাটা, বরাহনগর বা সোদপুরের মত জায়গায়। ইস্টবেঙ্গল হয়ে ওঠে তাঁদের ক্লাব। তাঁদের অবহেলা, বঞ্চনার প্রতিবাদ। তাঁদের অস্তিত্বের ছবি। একটু মনে করার চেষ্টা করলে বুঝতে পারবেন কেন আজকের দিনেও ইস্টবেঙ্গল ফ্যানবেস এই জায়গাগুলোতেই খুব জোরালো।

যাই হোক, অনেক বাজে বকে ফেললাম হয়ত। ফেরা যাক ডার্বির কথায়। এত ক্ষণে বুঝতেই পাড়ছেন ইলিশ- চিংড়ির এই লড়াইয়ের ঝাঁঝটা ঠিক কোথায়। যদিও ফুটবল গবেষক অভিক দত্ত দাবি করেছেন এখনও অবধি ৩৫০-এরও বেশি ডার্বি হয়েছে, কিন্তু তার কোনও ঠিক তথ্য পাওয়া যায়না। লিখিত দলিল দস্তাবেজের হিসেব অনু্যায়ী ডার্বির সংখ্যা ৩১০। যার মধ্যে ইস্টবেঙ্গলের জয় ১১৮ টি, মোহনবাগান জিতেছে ৮৭ টি। ১০৫ টি খেলা অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়েছে।

প্রথম ডার্বি কবে খেলা হয়েছিল? নথিবদ্ধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২৮ মে, ১৯২৫ সালে অধুনা মোহনবাগান মাঠে প্রথম ডার্বি হয়। নেপাল চক্রবর্তীর গোলে ইস্টবেঙ্গল ১-০ ব্যবধানে এই ম্যাচ জেতে। যদিও কারও কারও মতে ১৯২১ সালের ৮ আগস্ট কলকাতার পুলিশ মাঠে বাঙাল ঘটির প্রথম লড়াই হয়। খেলার ফল ছিল ০-০। ফিরতি ম্যাচে মোহনবাগান ৩-০ ব্যবধানে জেতে। কিন্তু এই তথ্যের প্রমাণ নিয়ে সংশয় আছে।

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ডার্বির কিছু পরিসংখ্যান।

  • ডার্বির সর্বোচ্চ গোলদাতা: ভারতীয় – বাইচুং ভুটিয়া ১৯ (ইস্টবেঙ্গল ১৩, মোহনবাগান ৬)

       বিদেশি – জোসে রামিরেস ব্যারেটো ১৭

  • সর্বোচ্চ ব্যবধানে জয় – ইস্টবেঙ্গল ৫-০ (আইএফএ শিল্ড ফাইনাল, ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫)
  • হ্যাটট্রিক – নথিবদ্ধ পরিসংখ্যান ২টি। বাইচুং ভুটিয়া (ইস্টবেঙ্গল) ও এডে চিডি (মোহনবাগান)। এছাড়াও অমিয় দেব ও অসিত গাঙ্গুলির দুটি হ্যাটট্রিকের কথা জানা যায়। কিন্তু সেই তথ্যপ্রমাণের সংশয় থেকেই যায়।
  • এক ম্যাচে সব থেকে বেশি গোল – ৮টি। মোহনবাগান ৫(চিডি ৪, মনিশ মাথানি)-৩ ইস্টবেঙ্গল(ইউসুফ ইয়াকুবু ২, নির্মল ছেত্রী)।
  • দ্রুততম গোল – মহম্মদ আকবর (১৭ সেকেন্ড, ১৯৭৬)

 ডার্বি নিয়ে যতটাই লেখা যাক না কেন, ততটাই বাকি থেকে যায়। কারণ এ তো শুধু ‘খেলা নয়, সংগ্রাম’। আর এই সংগ্রামের পিছনে লুকিয়ে থাকে হাজার হাজার না বলা কাহিনি। কোনোটা সেই সদ্য পুত্রহারা বাবার কাহিনি, যিনি কিনা শ্মশান থেকে সোজা খেলার মাঠে গিয়ে হাজির হন দলের জয় দেখে মৃত পুত্রের শোক লাঘব করতে। কোনোটা আবার নিজের বিয়ের দিনে বাকি সব আচার আচরণের তোয়াক্কা না করে দলকে জেতাতে ছুটে যাওয়ার কাহিনি। কোনোটা সামান্য এক ভাতের হোটেল মালিকের গল্প যিনি কিনা দলের খেলা থাকলে নিজের যৎসামান্য ব্যবসা তথা আয়ের ঝাঁপি ফেলে ছুটে যান শিলিগুড়ি কিংবা কটকে। কেউ আবার সামান্য লজেন্স বিক্রি করে সংসারের কঠিন লড়াই লড়ে চলেন, ক্লাবের খেলা মাঠে উপভোগ করতে পারার আনন্দে।


বাঙ্গালির এই আবেগ তাই শুধু আজকের নয়, একদিনের নয়। এই আবেগ প্রায় শতাব্দী প্রাচীন। ইলিশ-চিংড়ি বলুন বা ঘটি-বাঙাল কোলকাতা ডার্বির এই আমেজ, এই ইতিহাস শুধু ভারত নয়, এশিয়ার মধ্যেও সর্ববৃহৎ। তাই ১৯৯৭-এর সেই বিখ্যাত ডায়মন্ড ম্যাচে যুবভারতীতে উপচে পড়েছিল ১লক্ষ ৩০হাজারেরও বেশি সমর্থক। আজকের দিনে খেলার ধরনধারন পালটেছে, যুবভারতীর সাজ পালটেছে, পালটেছে দল গঠন এবং চালানোর পদ্ধতিও। কিন্তু যেই জিনিসটা এখনও সেই একই জায়গায় আটকে আছে সেটা হল ডার্বিকে ঘিরে বাঙালির চিরাচরিত আবেগটা। তার সাথে যখন যুক্ত হয় লিগ জয়ের হাতছানি, তখন পুরো ব্যাপারটাই হয়ে ওঠে ভাষাতীত। আর সেই স্বাদ আস্বাদনের আশায় তাই গোটা বাংলা, ভারত তথা বিশ্বের ঘটি বাঙ্গালের চোখ আটকে থাকবে আজ শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ সায়ন্তনী অধিকারী, সৌমিক দাশগুপ্ত, ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ।     

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here