এশিয়া-সেরা হব আমরাই, আত্মবিশ্বাসী ভারত

0

খবর অনলাইন ডেস্ক : গত বছর অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টি-২০-তে হার এখন অতীত, অতীত অস্ট্রেলিয়ায় এক দিনের সিরিজে হারও। এই টিম ইন্ডিয়া এখন সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া দল। যে অস্ট্রেলিয়ার কাছে একদিনের সিরিজে পর্যুদস্ত হয়েছিল ধোনিবাহিনী, তাদেরই টি-২০ সিরিজে ৩-০ ফলে উড়িয়ে ভারতের টি-২০ বিজয়রথের যাত্রা শুরু। আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপের আগে এখন লক্ষ্য, বাংলাদেশকে হারিয়ে ৬ বছর পর এশিয়ার সেরা হওয়া।
১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া এশিয়া কাপ, ২০১৬ সালে তার ১৩ তম সংস্করণে পদার্পণ করল। এ বারের ফরম্যাটও আলাদা। আগের টুর্নামেন্টগুলি পঞ্চাশ ওভারে খেলা হলেও, এ বার টি-২০ ফরম্যাটে হচ্ছে। ২০১৫ সালে এশীয় ক্রিকেট কাউন্সিল এই সিদ্ধান্ত নেয় যে এর পর থেকে এশিয়া কাপ টুর্নামেন্টগুলি হবে রোটেশন পদ্ধতিতে। অর্থাৎ এক বার টি-২০ হলে পরের বার ৫০ ওভারের। এ বার অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যায়ও আগের বারের থেকে আরও অনেক বেশি। প্রাথমিক রাউন্ডে হংকং, আফগানিস্তান আর ওমানকে হারিয়ে টুর্নামেন্টের মূল পর্বে কোয়ালিফাই করে সবাইকে চমকে দেয় সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। ২৪ ফেব্রুয়ারি ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ দিয়ে শুরু হয় পাঁচ দলের এশিয়া কাপ টি-২০, ২০১৬।
প্রথম থেকেই এ বার দাপট দেখানো শুরু ধোনিবাহিনীর। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের চার ফলা পেস আক্রমণের সামনে সাময়িক বিপদে পড়লেও ঝাপটা সামলে দেন রোহিত শর্মা আর হার্দিক পাণ্ড্য। রোহিতের ৮৩ আর হার্দিকের ঝোড়ো ৩১-এর সৌজন্যে ২০ ওভারে ১৬৬ রান খাড়া করে ভারত। জবাবে বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুতেই ধাক্কা দেন অভিজ্ঞ আশিস নেহরা। নির্দিষ্ট ২০ ওভারে সাত উইকেট হারিয়ে মাত্র ১২১ রান তোলে বাংলাদেশ। ২৭ তারিখ পরের ম্যাচে ভারত মুখোমুখি হয় পাকিস্তানের। সদ্য শেষ হওয়া পাকিস্তান সুপার লিগের সৌজন্যে এই ধারণা হয়েছিল যে পাকিস্তান এ বার এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়নের দাবিদার। কিন্তু আশিস নেহরা- জসপ্রিত বুমরাহ-হার্দিক পাণ্ড্যর পেস আর যুবরাজ সিংহ-রবীন্দ্র জাদেজার স্পিনের সামনে মাত্রে ৮৩ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। ভারতের জয়ও কিন্তু সহজলভ্য হয়নি। স্বল্প রানের পুঁজি নিয়েও ভারতের ইনিংসের শুরুতেই ধ্বস নামান নির্বাসন থেকে ফিরে আসা পাকিস্তানের পেসার মহম্মদ আমির। তাঁর বিষাক্ত সুইং-এর সামনে উইকেট দিয়ে দেন শিখর ধাওয়ান, রোহিত শর্মা আর সুরেশ রায়না। তিন উইকেটে ৮ রান, এই অবস্থায় হাল ধরেন যুবরাজ আর বিরাট কোহলি। ৪৯ রানে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হলেও, পরিস্থিতির বিচারে কোহলির এই ইনিংস সর্বকালের সেরা টি-২০ ইনিংসের মধ্যে অবলীলায় জায়গা করে নেবে। সেই ম্যাচে ৩২ বল খেলে মাত্র ১৪ রান করলেও যুবরাজের লড়াকু মনোভাবের তারিফ করতেই হয়। পয়লা মার্চ শ্রীলঙ্কাকে পাঁচ উইকেটে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা পাকা করে টিম ইন্ডিয়া। তিনটে চার আর তিনটে ছয় মেরে মাত্র ১৮ বলে ৩৫ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে নিজের পুরনো ফর্মে ফিরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যুবরাজের। পরের ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে নয় উইকেটে অবলীলায় হারিয়ে এশিয়া কাপের রাউণ্ড রবিন পর্যায় অপরাজিত থেকে শেষ করে ভারতীয় দল।
এ বার ফাইনাল। সামনে বাংলাদেশ। খাতায় কলমে ভারত বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে। বিগত কয়েকটা টুর্নামেন্টে ভারতের পারফর্ম্যান্সেই বোঝা যাচ্ছে সম্ভাব্য এশিয়া কাপের চ্যাম্পিয়নের মুকুট ভারতের মাথাতেই উঠবে। টিমে এখন অভিজ্ঞতা আর যুবশক্তির অদ্ভুত মিশেল। এক দিকে যেমন অলরাউন্ডার হার্দিক পাণ্ড্য আর জসপ্রীত বুমরাহর তরুণ রক্ত, অন্য দিকে লম্বা রেসের ঘোড়া নেহরা আর যুবরাজের ভারতীয় দলে সফল কামব্যাক। নেহরা যখন অপেনিং ওভারেই তাঁর বিষাক্ত সুইংয়ে বিপক্ষকে চাপে ফেলছেন, তেমনি পাণ্ড্য বিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে বাউন্সার দিতে এতটুকু পিছপা হচ্ছেন না। বুমরাহ, তাঁর অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশনেই ভেল্কি দেখাচ্ছেন। রোহিত শর্মা এখন অনেক পরিণত। তাঁর ট্যালেন্টের সুবিচার তিনি করছেন না, এই অভিযোগ এখন পুরনো। এখন যে কোনও পরিস্থিতিতেই তিনি রান করার ক্ষমতা রাখেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নড়বড়ে লাগলেও শ্রীলঙ্কা ম্যাচ থেকেই কথা বলতে শুরু করেছে যুবরাজের ব্যাট। আর তাঁর ব্যাট এক বার চলতে শুরু করলে কী হতে পারে স্টুয়ার্ট ব্রড সব থেকে ভালো জানে। তিন নম্বরে রেয়েছেন বিরাট কোহলি। যিনি কখনও ব্যর্থ হতেই পারেন না! টি-২০ ক্রিকেট যে শুধুই হুড়ুমতাল ক্রিকেট নয়, এই খেলাতেও যে শিল্প আছে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ বিরাট। পাকিস্তান ম্যাচে আমিরের সাথে লড়াইটা যে দক্ষতার সাথে সামলেছিলেন, তার পর বিরাটকে যদি সর্ব কালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটারের শিরোপা এখনই দিয়ে দেওয়া হয়, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আর রয়েছেন ‘ক্যাপ্টেন কুল’ মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। যে কোনও পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে তার জুড়ি মেলা ভার। তাঁর অধিনায়কত্ব এখন আগের থেকে অনেক বেশি চমকপ্রদ। ভারতীয় টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রীর মতে, এই টিমের মাইন্ডসেট এখন আগের থেকে অনেক আলাদা। তাঁর মতে যে কোনও পরিস্থিতিতে, যে কোনও সারফেসে এই টিম অম্লাবদনে খেলে দেবে। তাঁর প্রমাণ ২০১৫ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত অপরাজেয় থাকা, তার পর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কাতেই টেস্ট সিরিজ জয়। রোহিত শর্মা মনে করেন এই টিম এখন ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলছে। তাই সব মিলিয়ে ধারে ভারে ভারত অনেক এগিয়ে বাংলাদেশের থেকে।
কিন্তু বাংলাদেশও চমক দিতে তৈরি। টি-২০ এমন একটি ফরম্যাট, যেখানে যখন তখন যা খুশি হতে পারে। একটা কোনও ভালো ইনিংস বা একটা দুর্দান্ত বোলিং পারফর্ম্যান্সই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট সাম্প্রতিক কালের সেরা ক্রিকেটীয় দ্বৈরথগুলির একটা হয়ে উঠেছে। এর শুরু গত বছর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ থেকেই। ওই ম্যাচে আম্পায়ারের কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হতে হয় বাংলাদেশকে। তাঁদের দাবি, এই সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের পক্ষে গেলে সেমিফাইনালে ভারত নয়, বাংলাদেশই উঠত। এই ম্যাচে হারার মধুর প্রতিশোধ নেয় বাংলাদেশ, জুলাইয়ে তাদের দেশের মাঠে ভারতকে এক দিনের সিরিজে হারিয়ে। এশিয়া কাপে পারফর্ম্যান্স দেখে এই মুহূর্তে পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কাকে আর সেরা ক্রিকেটীয় দল হিসেবে গণ্য করা যায় না। অতএব ভারত-বাংলাদেশই এখন এশিয়ার দু’টি সবচেয়ে শক্তিশালী দল। ভারতীয় দলের কাছে ঢাকা যেমন অনেক আনন্দের তেমনি বেদনারও। ১৯৯৮-তে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ জিতেছিল ভারত, ২০১১-তে এখানেই বাংলাদেশকে হারিয়ে বিশ্বকাপের জয়গাঁথা লেখা শুরু, ২০১২-তে এই শহরেই সচিন তেন্ডুলকরের শততম আন্তর্জাতিক শতরান। আবার শেষ বার টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে হার যেমন আছে তেমনি আছে গত বছর এখানেই বাংলাদেশের কাছে এক দিনের সিরিজ হার। এ বার অবশ্য ভারতবাসীর আশা রবিবার ৬ই মার্চের রাতে আনন্দ অপেক্ষা করবে দেশের জন্য। প্রতিবেশী বাংলাদেশের সাথে যতই ভারতের সৌহার্দের সম্পর্ক থাকুক, তাদের হারিয়েই এশিয়া-সেরার শিরোপা ষষ্ঠ বারের জন্য ভারতের মাথায় উঠবে, এই স্বপ্নেই এখন বিভোর আসুদ্রহিমাচল।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন