শ্রয়ণ সেন:

আর মাত্র একটা দিন, তার পরই ঢাকে কাঠি পড়ে যাবে আইপিএলের দশম সংস্করণের। তবে প্রথম ম্যাচে ভারত-অস্ট্রেলিয়া দ্বৈরথের আশা করা হলেও, বিরাট কোহলি চোট পেয়ে যাওয়ায় আপাতত তা হচ্ছে না। কিন্তু প্রথম ম্যাচে গত বারের চ্যাম্পিয়নরা জিতবে, না কি রানার্স বেঙ্গালুরু হায়দরাবাদকে হারিয়ে বদলা নেবে, সেটা দেখার জন্য নজর থাকবে ক্রিকেটভক্তদের।

ধুমধাড়াক্কা কুড়ি ওভারের ম্যাচে আগাম আভাস দেওয়া যায় না কোন দল ভালো খেলতে পারে, কোন দল খারাপ। মাত্র একটা উইকেট বা একটা দশ-বারো রানের ওভারই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।  তবুও শক্তি-দুর্বলতার নিরিখে কোন দল এ বার কেমন খেলতে পারে সেটা বিশ্লেষণ করা যাক।

কলকাতা নাইটরাইডার্স

কলকাতার মানুষের কাছে আশা-ভরসার দল এই নাইটরাইডার্স। নিঃসন্দেহে এই প্রতিযোগিতার সব থেকে ব্যাল্যান্স্‌ড দল। ওপেনিং জুটির জন্য গত তিন বছরে বেশ নাম করেছে কেকেআর। অধিনায়ক গৌতম গম্ভীর এবং রবিন উথাপ্পা, ভারতের অন্যতম দুই সেরা ওপেনার। কিন্তু কখনও যদি ওপেনিং জুটি ব্যর্থ হয় তা হলে খেলা ধরার জন্য মিডল অর্ডারে রয়েছেন ড্যারেন ব্রাভো এবং মনীষ পাণ্ডের মতো ব্যাটসম্যান। দলে আছেন শাকিব আল হাসানের মতো নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার যিনি একাধারে দ্রুত রান যেমন করবেন, আবার প্রয়োজনমতো হাত ঘুরিয়ে উইকেটও তুলে নেবেন। তবে কেকেআরকে এ বছর ভোগাতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেলের না থাকা। সেই সঙ্গে প্রথম কয়েকটি ম্যাচ খেলতে পারবেন না উমেশ যাদবও। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টি ২০ সিরিজে আশাপ্রদ বল করতে পারেননি সুনীল নারিন। চারটি ম্যাচে মাত্র তিনটে উইকেট পেয়েছেন তিনি। তবুও এই সব বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে এ বার শাহরুখের দল ‘করব লড়ব জিতব’ করে কি না সেটাই দেখার।

সানরাইজার্স হায়দরাবাদ

একটা দলে যত ভালো ব্যাটসম্যান থাকুক না কেন, যত ক্ষণ না বোলিং বিভাগ ভালো হবে, তত ক্ষণ কোনো ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়। আর তাই গত বারের চ্যাম্পিয়ন এ বারেও ট্রফি জেতার অন্যতম দাবিদার। তার প্রধান কারণ এই দলের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ। বাংলাদেশের মুস্তাফিজুর রহমনের সঙ্গে পেস বিভাগে রয়েছেন আশিস নেহরা এবং ভুবনেশ্বর কুমার। স্পিন বিভাগ শক্তিশালী করে দলে যোগ দিয়েছেন সাড়া ফেলে দেওয়া আফগান স্পিনার রশিদ খান। ব্যাটিং-এও পিছিয়ে নেই এই দল। ডেভিড ওয়ার্নারের সঙ্গে শিখর ধাওয়ান ইনিংসের শুরুতেই ঝড় তুলতে পারেন। রয়েছেন তুখোড় ফর্মে থাকা যুবরাজ সিংহ। সেই সঙ্গে আছেন বেন কাটিং-এর মতো মারকুটে অলরাউন্ডার, যিনি গত বার একার হাতেই দলকে চ্যাম্পিয়ন করে তুলেছিলেন।

রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু

ব্যাটিং শক্তিশালী হলেই যে বড়ো টুর্নামেন্টে সফল হওয়া যায় না, তার মস্ত বড়ো প্রমাণ এই দলটি। ক্রিস গেল, বিরাট কোহলি এবং এবি ডেভিলিয়ার্সকে নিয়ে তৈরি হওয়া এই লাইন-আপ নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সেরা ব্যাটিং। কিন্তু বোলিং আক্রমণ কখনওই আহামরি ছিল না। বোলিং বিভাগকে শক্তিশালী করার জন্য এ বার নিলামে চড়া দাম দিয়ে আরসিবি কিনেছে পেসার টাইমাল মিল্‌সকে। তবে এই মুহূর্তে আরসিবির সব থেকে চিন্তার ব্যাপার চোটগ্রস্ত খেলোয়াড়দের তালিকা। কাঁধের চোটের জন্য ইতিমধ্যেই দু’সপ্তাহের জন্য মাঠের বাইরে বিরাট কোহলি। গোটা আইপিএলেই থাকবেন না, ভারতীয় দলে ক্রমে অপরিহার্য হয়ে ওঠা কেএল রাহুল। অন্য দিকে প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন না ডেভিলিয়ার্সও। এর মধ্যে যদি শেন ওয়াটসনের নেতৃত্বে প্রথম কয়েকটি ম্যাচ বেঙ্গালুরু জিতে যায়, তা হলে অনেকটাই চাপমুক্ত হয়ে যাবে তারা।

গুজরাত লায়ন্স

গত বছর প্রথম বার আইপিএলের মঞ্চে নেমেই সাড়া জাগিয়েছিল সুরেশ রায়নার নেতৃত্বাধীন এই দল। লিগ স্টেজে তারা দ্বিতীয় স্থানে ছিল। এ বার অবশ্য তাদের আইপিএল যাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নির্ভরযোগ্য দুই ক্রিকেটারের চোট। এক জন রবীন্দ্র জাদেজা, অন্য জন ডোয়েন ব্রাভো। সপ্তাহ দুয়েক পর চোট সারিয়ে জাদেজা ফিরলেও, ব্রাভোর ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে ব্রেন্ডন ম্যাকালাম, ডোয়েন স্মিথ, রায়না, অ্যারন ফিঞ্চ এবং দীনেশ কার্তিককে নিয়ে ব্যাটিং লাইনআপ, এই প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা ব্যাটিং বিভাগ বলা যায়।

রাইজিং পুনে সুপারজায়ান্টস

টুর্নামেন্ট শুরু মাস দেড়েক আগেই একদফা বিতর্ক হয়ে গিয়েছে এই দলে, যখন মালিকপক্ষের আকস্মিক সিদ্ধান্তে ধোনিকে সরিয়ে দলের অধিনায়ক হন স্টিভেন স্মিথ। সেই বিতর্ক কাটিয়ে উঠেই নতুন ধাক্কা। চোটের জন্য গোটা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গিয়েছেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন। তবে গত বার মাত্র পাঁচটি ম্যাচ জিতে সাত নম্বরে শেষ করা পুনের কাছে এ বারের তুরুপের তাস হতে চলেছেন বেন স্টোক্স। আইপিএলের ইতিহাসে সব থেকে দামি বিদেশি স্টোক্স। বাঙালি ক্রিকেটভক্তদেরও নজর থাকবে পুনের ওপরে। কারণ অশোক দিন্দা এবং মনোজ তিওয়ারি। গত বছর সব ম্যাচ না খেললেও যখনই সুযোগ পেয়েছেন, নজর কেড়েছেন দিন্দা। একটা খেলায় তো ম্যাচ সেরার পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। অন্য দিকে সদ্য সমাপ্ত ঘরোয়া মরশুমে ভালো ফর্মে ছিলেন মনোজ। সেই ফর্মের বিচারে প্রথম একাদশে তাঁর সুযোগ পাওয়াই উচিত।

কিংস ইলেভেন পঞ্জাব

এই দলের সব থেকে বড়ো গণ্ডগোলের ব্যাপার হল অধিনায়ক নির্বাচন। গত বছর তারা অধিনায়ক করেছিল ডেভিড মিলারকে। ঘরোয়া ক্রিকেটে কোথাও অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা না থাকায় দলকে অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব দিতে পারেননি মিলার। এ বারও ঠিক একই পথে হেঁটেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের টি ২০ বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি বা ইংল্যান্ড অধিনায়ক ওইন মর্গ্যান দলে থাকলেও, তাদের সরিয়ে নেতা বাছা হয়েছে কোথাওই অধিনায়কত্বের এতটুকু অভিজ্ঞতা না থাকা গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে। এখন দেখার তাঁর নেতৃত্বে কেমন খেলে প্রীতি জিন্টার এই দল। তবে পুনের পাশাপাশি বাঙালিদের নজর এই দলেও থাকবে, সৌজন্য ঋদ্ধিমান সাহা। গত এক বছরে পুরো জগতটাই পালটে গিয়েছে ঋদ্ধির। ব্যাটিং-এ অনেক উন্নতি করেছেন তিনি।

মুম্বই ইন্ডিয়ান্স

এই দলের সব থেকে বড়ো দুর্বলতা প্রতিযোগিতার শুরুতে এরা কয়েকটি ম্যাচ হেরে যায়। কিন্তু মোক্ষম সময় ভালো খেলা শুরু করে। হরভজন, জসপ্রীত বুমরাহ এবং মালিঙ্গাকে নিয়ে বোলিং বিভাগে অন্যতম সেরা দল মুম্বই। সেই বিভাগের ধার বাড়াতে এ বার যোগ হয়েছেন মিচেল জনসন। ব্যাটিং-এ অধিনায়ক রোহিত শর্মার অন্যতম প্রধান ভরসা অম্বতি রায়ড়ু এবং কিরন পোলার্ড।

দিল্লি ডেয়ারডেভিল্‌স

টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ধাক্কা খেয়েছে দিল্লি। কারণ দলের দুই প্রধান ব্যাটসম্যান জেপি দুমিনি এবং কুইন্টন ডিককের চোটের জন্য বসে যাওয়া। তবে তাদের অভাব মেটানোর জন্য তৈরি রয়েছেন বিস্ফোরক কয়েক জন অলরাউন্ডার, করি অ্যান্ডারসন, আঞ্জেলো ম্যাথিউজ এবং কার্লোস ব্রাথোয়েট। বোলিং বিভাগে অধিনায়ক জাহির খানের সঙ্গে থাকবেন অস্ট্রেলিয়ার প্যাট কামিন্স এবং কাগিসো রাবাদা। সব মিলিয়ে এই বছর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অন্যতম দাবিদার দিল্লি।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here