সানি চক্রবর্তী:

প্রত্যাশার ঢেউয়ে চড়ে প্রত্যাবর্তনটা হয়েছিল। নায়কোচিত না হলেও নাটকীয় তো বটেই। আর প্রস্থানটা হল ব্যর্থতার বোঝা ফের একবার কাঁধে নিয়ে। গত বারে কর্তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি বাজে পর্যায়ে যাওয়ার পরে ছেড়েছিলেন। এ বারে সমর্থকদের বিক্ষোভ, হতাশার বহিঃপ্রকাশ ও চূড়ান্ত অশালীন আচরণে কোনো রকম বিতর্কের মধ্যে না জড়াতে চেয়ে নিজে থেকে সরে দাঁড়ালেন। ইস্টবেঙ্গলে তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসেও আই লিগে ভারতসেরা হওয়ার ‘অধরা মাধুরীর’ তেঁতো বড়ি হজম করে সরে গেলেন ট্রেভর জেমস মরগ্যান। আই লিগের শেষ দু’টি ম্যাচ ও ফেড কাপের জন্য স্টপ গ্যাপ কোচের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে দৌড়ে এগিয়ে আর্মান্দো কোলাসো। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, তুষার রক্ষিত ও ভাস্কর গাঙ্গুলির তিন সদস্যের পরামর্শদাতা কমিটি আপাতত ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারদের মানসিকভাবে চাঙ্গা করার কাজটা করবেন। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে, মঙ্গলবার রাতেই শহরে চলে আসতে পারেন আই লিগের সব থেকে সফল ও লাল-হলুদের প্রাক্তন কোচ আর্মান্দো কোলাসো।

কিছু দিন আগে পর্যন্ত যদিও গোটা ঘটনা পরম্পরা ছিল অন্য। চলতি আই লিগের শুরুতে ৯ ম্যাচের শেষে ২১ পয়েন্ট নিয়ে লিগশীর্ষে ছিল ইস্টবেঙ্গল। সেই দলই শেষ ৭ ম্যাচে পেয়েছে মাত্র ৬ পয়েন্ট। টানা চার ম্যাচ হেরে অতি সূক্ষ্ম সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আর নিজেকে পেশাদার মোড়কে ঢেকে না রেখে ই-মেল মারফত পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলেন ব্রিটিশ কোচ। রবিবার ডিএসকে ম্যাচে হারের পরে কার্যত ফাঁকা গ্যালারি ও পুলিশি নিরাপত্তায় কোনো বড়োসড়ো বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু রাতে একদল লাল-হলুদ সমর্থক হতাশার জেরে পৌঁছে গিয়েছিলেন মরগ্যানের ঠিকানায়। ফের একপ্রস্থ ‘গো ব্যক মরগ্যান’ স্লোগানের পরেই সোমবার পদত্যাগ।

সূত্রের খবর, ডার্বিতে পর্যুদস্ত হওয়ার পর থেকেই কর্তাদের থেকে সরে যাওয়ার বার্তাটা পরিষ্কার পেয়ে গিয়েছিলেন মরগ্যান। কিন্তু তা-ও শেষ তিনটে ম্যাচে চেষ্টাটা করতে চেয়েছিলেন, ফুটবলারদের জঘন্য পারফরম্যান্সের পরে তার আর কোনো জায়গা যদিও বাকি না থাকায় আগেভাগেই সরে গেলেন মরগ্যান। এমনিতেই তাঁর দায়িত্বে পুনর্বহাল হওয়ার আগে থেকে সরাসরি বিরোধের রাস্তা তৈরি করেছিলেন ক্লাবসচিব কল্যাণ মজুমদার। পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গলের এ বারের পদস্খলন শুরুর পর থেকেই মরগ্যান ও তাঁর দল-নির্বাচন ঘিরে ঝাঁঝালো একের পর এক বোমা ফাটিয়ে গেছেন তিনি। দল গড়ার ক্ষেত্রে মরগ্যান ও ফুটবল সচিব সন্তোষ ভট্টাচার্য পুরো দায়িত্ব মরশুমের শুরু থেকে সামলেছেন। এমনটাই একটি গোষ্ঠী দাবি করে এসেছে, মরগ্যান যদিও শেষ দিকে এসে দলগঠন নিয়ে কিছু কর্তার নাক গলানোর কথা বলেছেন। আখেরে কার দায়িত্বে এই ব্যর্থতা তা হয়তো জানা যাবে না, কিন্তু আই লিগে আরও একটা বছর হতাশ হয়ে মরগ্যানের উপরে আর আস্থা রাখতে পারছিলেন না সমর্থকরাও।

সময়ের পরিহাস হয়তো একেই বলে। টানা ব্যর্থতার পরে ‘পারলে মরগ্যানই পারবেন’ এই মন্ত্রে ভর করে ব্রিটিশ কোচকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরেছিলেন লাল-হলুদ সমর্থকরা। কিন্তু মরগ্যানের টানা ডিফেন্সিভ স্ট্র্যাটেজিতে একের পর এক হারে ফের এক বার লিগ খুইয়ে চরম হতাশ তাঁরা। আপাতত, কর্তারা ফের কোচ করে আনতে চলেছেন আর্মান্দো কোলাসোকে। তাঁর নিয়োগ ঘিরে সমর্থকরা কতটা খুশি হবেন, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। আগের বার তাঁর আমলেই ইস্টবেঙ্গল ড্রেসিংরুমে বাংলা-গোয়া-পাঞ্জাবি লবিতে ফুটবলাররা ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন। গোয়ার কোচ যোগ্যতা না থাকলেও সেখানকার ছেলেদের বেশি সুযোগ দেন, এ রকম অভিযোগ করেছিলেন বাঙালি ফুটবলাররা। তা ছাড়া কোলাসোর আগমনে ফের এক বার ক্লাবতাঁবুতে সিনিয়র শিবিরে দখল দৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা আলভিটো ডি কুনহার। সিনিয়র দলে তাঁর ছড়ি ঘোরানোর রেওয়াজও ফের সমর্থকরা কতটা ভালো ভাবে নেন, সেটাও দেখার। সব মিলিয়ে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের ক্লাবতাঁবুতে ফের বিক্ষোভের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অন্য একটি সূত্র যদিও বলছে অ্যাশলি ওয়েস্টউডের কথা। বেঙ্গালুরুকে দু’বার আইলিগ জেতানো ওয়েস্টউড হার্ড টাস্ক মাস্টার। কিন্তু তাঁর ব্যবহার বরাবরই রূঢ় ধরনের। লাল-হলুদ কর্তাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মোটেই ভালো নয়। সে ক্ষেত্রে আদৌ সব রকম মনকষাকষি সরিয়ে রেখে ওয়েস্টউডকে ফেড কাপের আগে উড়িয়ে আনা হবে নাকি কোলাসোর উপরেই ভরসা রাখবে লাল-হলুদ শিবির, উত্তরটা দেবে সময়।

আবার কয়েকটি সূত্র থেকে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে সন্তোষজয়ী বাংলার কোচ মৃদুল বন্দোপাধ্যায়, সুভাষ ভৌমিকের মতো বাঙালি কোচেদের নামও। গোটা ব্যপারটায় যে অবশ্যই বড়োসড়ো প্রভাব ফেলবে সমর্থকদের মতামত, তা নিয়ে যদিও কোনো দ্বিমত নেই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here