papya_mitraপাপিয়া মিত্র

বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে। কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপের ফলাফল ঘোষণা হল। শম্পা গুহর প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বাসিন্দা। ভারতের পতাকা আরও উঁচুতে উঠে গেল। শুরু হল জাতীয় সঙ্গীত। শম্পা শুনছেন গাইছেন, কাঁদছেন। এ-ও মনে হয়েছিল একদিন এঁদের শাসনে আমাদের দেশ পরাধীন ছিল। আজ তারাই আমাদের জাতীয় পতাকার নীচে মাথা নত করে আছে। এই অভিজ্ঞতা কোনও দিন ভোলার নয়।

বাবা চাইতেন, নিজের মতো করে বড় হোক। তাই সাইকেল চড়া, ক্রিকেট খেলা, ফু্টবল খেলার পাশাপাশি পাড়ায় শাসনটাসন বেশ চলত। কিশোরীবেলা কাটিয়ে কর্মজীবনেও এহেন উদাহরণ দু’একটা আছে বই-কি। এখানেই থেমে থাকা নয়। নিজের জীবনপঞ্জিও আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়েছে পাওয়ার লিফটিং-এর সাফল্যে। সাফল্য যাঁর ঝুলিতে তাঁর নাম শম্পা গুহ।  

বর্তমানে শম্পা গুহ কলকাতা পুলিশে কর্মরত, বসেন লালবাজারে। নিবাস হুগলির উত্তরপাড়ায়। উজবেকিস্তানের তাসখন্দে ২০১৬-এর ১২ অক্টোবর থেকে বসছে এশিয়ান পাওয়ার লিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপের আসর। ভারত থেকে মোট ১৮ জন পুরুষ-মহিলার মধ্যে এ রাজ্য থেকে শম্পা একাই প্রতিযোগী। তবে এই প্রতিযোগিতায় নামা এই প্রথম নয়। ইতিমধ্যে ঝুলি ভরেছে সোনার পদকে, নানা সম্মানে। পাওয়ার লিফটিং-এ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ২০১৪) সোনা, এশিয়ান পাওয়ার লিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় ৫টি সোনা, কমনওয়েলথ পাওয়ার লিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় ৩টি সোনা, ১৬ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন, ভারতে ২ বার স্ট্রং উওম্যান, জাতীয় গেমসের ওয়েট লিফটিং-এ দু’বার রৌপ্য পদক। রাজ্য সরকারের সেবাপদক (রুপো) অর্জন করে লিমকা রেকর্ডস বুকে নামটি তুলে ফেলেছেন।

পড়াশোনা উত্তরপাড়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও উত্তরপাড়া রাজা প্যারীমোহন কলেজ থেকে। কলাবিদ্যায় স্নাতক। পরে বাণীপুর থেকে পিজিপিটি-তে উত্তীর্ণ। চিন, মঙ্গোলিয়া, উজবেকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড,  নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রেট ব্রিটেন, জাপানের মাটি থেকে সোনা, রুপো ও ব্রোঞ্জ আনা কন্যারত্নটির খেলার জীবন শুরু কীভাবে হয়েছিল? শম্পা বললেন, “উত্তরপাড়া ইউসিসি-র মাঠে খেলতে যেতাম। সেখান থেকে সুব্রতা দেবনাথের কাছে শট পাটের জন্য যাই। তখন আমাকে  ম্যাড্যাম ওয়েট ট্রেনিং করার জন্য বালি ফিজিক্যাল কালচারে পাঠান। সেখানকার কোচ অশোক সেনগুপ্ত  আমার কাজ দেখে ওয়েট লিফটিং-এ থাকতে বলেন। সময়টা ১৯৯৫-৯৬। সেই পথ চলা শুরু।”  shampa1

নিজের রেকর্ড এত ভালো। সেই ভালোর ধারা ধরে রাখার জন্য কিছু করহেন না? কলকাতা বালক সঙ্ঘে প্র্যাকটিস করেন শম্পা। জানালেন, এ খেলাতে সম্পন্ন ঘরের ছেলেমেয়েরা আসে না। খেলাটিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কিছু ছেলেমেয়েকে তিনি শেখান। সেখান থেকে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে ৯ জনকে পাঠিয়েছিলেন। সকলেই পদক নিয়ে এসেছে। এখানে অনেক দুঃস্থ খেলোয়াড় আছে। বজবজ, হালিশহর, হাওড়ার অনেক ভেতর থেকে তারা আসে। নানা ভাবে তাদের পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের জন্য যতটা পারেন পাশে থাকার চেষ্টা করেন। এখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাঁরা পাওয়ার লিফটিং-এ যান তাঁদের প্রশিক্ষণ দেন।  

বাবা তুহিন গুহ ও মা রেবা গুহকে নিয়ে  অবিবাহিত শম্পার সংসার। ছোটবোন বিবাহিত। শম্পার ভালো লাগে গান শুনতে আর গাড়ি চালাতে। ন্যাশনাল গেমস-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে কলকাতা পুলিশে চাকরি পান ১৯৯৭-এ। তবে সবটাই চলছে নিজের অদম্য ইচ্ছে আর বিভাগীয় পদাধিকারীদের উৎসাহের জন্য।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here