‘মহান অনিশ্চয়তা’র সবুজ গালিচাকে ভালোবেসেই প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন

0
711
শ্রেয়সী তালুকদার

ক্রিকেট দুনিয়া এখন ঝলমল করছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির রঙে। এর মধ্যেই সকল অসুবিধা, অসহযোগিতার চোখরাঙানি অগ্রাহ্য করে এই রাজ্যে হয়ে গেল আরও একটি প্রতিবন্ধী ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। গত ৩০ ও ৩১ মে বিবেকানন্দ পার্কে বাংলা, ঝাড়খণ্ড এবং বিহারকে নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ চ্যালেঞ্জার্স কাপের আয়োজন করে ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল। কাপ জিতে নেয় পশ্চিমবঙ্গ, ম্যান অফ দ্য সিরিজ ভিকি সিং, সেরা বোলার গোবিন্দ মন্ডল, সেরা ব্যাটসম্যান শুভ্র জোয়ারদার, সেরা ফিল্ডার বিনয় তিরকি।

বছরখানেক আগে গড়ে ওঠা ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহিদ কায়সরের স্বপ্নের ফল এই সংস্থা। নাহিদ গত ১২ বছর ধরে লড়াই করছেন নিজের প্রতিবন্ধকতার সাথে। ক্রিকেট খেলতে গিয়েই রেড রোডে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে্ন ২০০৫ সালে। তবু ক্রিকেটটা ছাড়তে পারেননি। ছাড়তে পারেননি কারণ, ‘ক্রিকেটটা ভালবাসি যে!’ প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে তাই এভাবেই ক্রিকেটের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তিনি। সরকারের থেকে কোনোরকম উল্লেখযোগ্য সাহায্য এই এক বছরে সংস্থাটি পায়নি। পুরোটাই চলে স্পনসরদের টাকায়। তাতে অবশ্য যে খুব ভালোভাবে চলে যায় তা নয়। অ্যাসোসিয়েশন-এর পক্ষ থেকে তিন-চারটে কিট কেনা সম্ভব হয়েছে কোনোরকমে। টুর্নামেন্টের সময়েও সেই কিটগুলোই ভাগ করে ব্যবহার করেন ক্রিকেটাররা। নাহিদ আক্ষেপ করছিলেন কীভাবে পয়সার অভাবে অনেক খেলোয়ারকেই ছেড়ে দিতে হয়, ‘অনেকেই কোটায় চাকরি পেয়ে খেলা বন্ধ করে দেন। নিয়মিত কিছু ভাতা পেলেও হয়ত এতটা খারাপ অবস্থা হত না।’

অথচ এই টিমের বর্তমান অধিনায়ক শুভ্র জোয়ারদার বাংলা ক্রিকেটমহলে খুব অপরিচিত নাম নয়। ২০০৮ সালে বাংলার অন্যতম উঠতি ক্রিকেটার ছিলেন শুভ্র জোয়ারদার। সেই সিজনে ৫৩৫ রান ও ২২টি উইকেট নিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন বাংলার অনূর্ধ্ব ২২ দলে। এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর ‘ইন্ডিয়া’ খেলার স্বপ্নে সাময়িকভাবে ছেদ পড়ে। অবশ্য চিকিৎসার পরে এই শুভ্র জোয়ারদারই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে হয়ে ওঠেন বিশ্বের প্রথম ‘ব্লেড ক্রিকেটার’। এই শুভ্র জোয়ারদার ও গোবিন্দ মন্ডল ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল এর পাশাপাশি এখন ডিসেবেল্ড স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দলের নিয়মিত সদস্য।

শুভ্র জোয়ারদার

দেশে যে কয়েকটি সংস্থা প্রতিবন্ধী ক্রিকেট নিয়ে কাজ করে তাদের মধ্যে ডিসেবেল্ড স্পোর্টিং সোসাইটি অন্যতম। এই সংস্থা ছাড়াও প্রতিবন্ধী ক্রিকেটারদের নিয়ে ভারতে কাজ করছে আরও বেশ কিছু সংস্থা। যার মধ্যে অন্যতম দুটি হল, ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া এবং অল ইন্ডিয়া ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ফর ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড। এদের সকলেরই মূল সমস্যা স্পনসর। তার মধ্যেও যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এরা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইংল্যান্ডে ক্রিকেট বোর্ডগুলি ইতিমধ্যেই নিজেদের দেশের প্রতিবন্ধী ক্রিকেটকে মান্যতা দিয়েছে। বাংলাদেশ তো আইপিএল এর ফরম্যাটে প্রতিবন্ধী ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চালু করার কথাও ভাবছে। আইসিসি ২০১৯ সালে ডিসেবেল্ড ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের কথা ভাবতে শুরু করেছে। কিন্তু সেখানেও অন্তরায় ভারত; কারণ ভারতে এতগুলো সংস্থা থাকলেও তারা কোন একটি মূল সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নয়। সংস্থাগুলি যে যুক্ত হতে চায়না, তা অবশ্য একেবারেই নয়। বরং তাদের মূল লক্ষ্যই হল বিসিসিআই-এর মান্যতা অর্জন করা।

নাহিদ বলছিলেন বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ক্রিকেট টুর্নামেন্টে শেখ হাসিনার উপস্থিতির কথা। অথচ লোধা কমিটির সুপারিশের পরেও এদেশে কাজ বিশেষ এগোয়নি। হয়ত এসব থেকেই লড়াই এর রসদ পান নাহিদ ও তাঁর মত আরও অনেকে। চ্যালেঞ্জ জেতার তাগিদটা বেড়ে যায়। যে ‘কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ (CoA) নিয়ে দেশের ক্রিকেট উথালপাতাল, কে জানে হয়ত তারাই বদলে দেবে এদেশের প্রতিবন্ধী ক্রিকেটের চিত্রটা! হয়ত আরও ক’দিন দেরি হবে, কিন্তু আশা ও চেষ্টা দুটোর কোনোটাতেই দাঁড়ি টানবেন না নাহিদ। ক্রিকেটটা ভালোবাসেন যে!

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here