সত্তরের দশকের স্মৃতি উস্কে ইডেনের পথে লয়েডের উত্তরসূরিরা

0
112

IMG_6453

শ্রয়ণ সেন ঋভু

ফিরল না পাঁচ বছর আগের সেই মায়াবী রাত। ২০১১-এর দোসরা এপ্রিলের রাতের উল্লসিত ওয়াংখেড়ে আজ নিস্তব্ধ, বিমর্ষ, বাকরুদ্ধ।

কাজে এল না বিরাটের মহাকাব্য, চলল না গেলের ব্যাটও। স্বল্পপরিচিত কোনও এক লেন্ডল সিমন্স, ওয়েস্ট ইন্ডিজের নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেন। দোসর হিসেবে পেলেন জনসন চার্লস আর আন্দ্রে রাসেলকে। সেই সঙ্গে যোগ হল দু’টো গুরুত্বপূর্ণ নো-বল। সব মিলে ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীকুলকে নিরাশায় ডুবিয়ে স্যামি বাহিনী উঠে পড়ল কলকাতার বিমানে। সত্তরের দশকে অপ্রতিরোধ্য ছিল ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই মুহূর্তে ক্রিকেটের সব চেয়ে ছোট ফরম্যাটে সেই একই রকম অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ক্যারিবিয়ানরা।

টসে জিতে ফিল্ডিং-এর সিদ্ধান্ত নেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি। আর তাতেই ম্যাচের পঞ্চাশ শতাংশ ম্যাচ জিতে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ধোনি এ দিন দলে দু’টি পরিবর্তন করেন। আহত যুবরাজের বদলে দলে আসেন মনীশ পাণ্ডে। আর ফর্মহীন শিখর ধাওয়ানের বদলে ওপেনিং-এ রোহিত শর্মার সঙ্গী হন অজিঙ্ক রাহানে। দুই ওপেনার সতর্ক ভাবে শুরু করেছিলেন ভারতীয় ইনিংস। প্রথম দু’ ওভারে মাত্র ৬ রান ওঠে। কিন্তু তৃতীয় ওভারে মারমুখী হন রোহিত। ব্রাথওয়েটের বলে ছক্কা হাঁকান। প্রথম চার ওভারে চার জন বোলারকে অ্যাটাকে এনে স্যামি দূরদর্শিতার পরিচয় দিলেও রোহিতের মেজাজের সামনে কেউই রেহাই পাননি। পাওয়ার-প্লের ছ’ ওভারে ভারত তোলে বিনা উইকেটে ৫৫, যা এই বিশ্বকাপে তাঁদের সর্বোচ্চ। অষ্টম ওভারের প্রথম বলে বদ্রির স্পিনের শিকার হন রোহিত। ৩১ বলে ৪৩ করে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তিনি। এর পর ব্যাট হাতে নামেন কোহলি। ভাগ্য আজ সদয় ছিল কোহলির ওপর। পর পর দু’ বলে তিন বার রান আউটের হাত থেকে বাঁচেন বিরাট। তার পর যেন অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের সেই বিরাট ফিরে আসেন, এবং আরও মারমুখী, চরিত্রবিরোধী মেজাজ নিয়ে। খুব সন্তর্পণে ভারতীয় ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন কোহলি আর রাহানে। ১৩তম ওভারে তিন অঙ্কে পৌঁছয় ভারত। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোলাররা একটু চাপে রেখেছিলেন ব্যাটসম্যানদের। ১৫ ওভার পর্যন্ত সাড়ে আটের বেশি ওঠেনি রান রেট। ১৫.৩ ওভারে আউট হন রাহানে। তাঁর সংগ্রহ ৩৫ বলে ৪০। ফর্মে না থাকা রায়না আর নবাগত পাণ্ডেকে পিছনে রেখে ব্যাটিং অর্ডারে নিজেকে প্রোমোট করেন ধোনি। তিনি আসার পর গতি পায় ভারতের ইনিংস। গিয়ার পাল্টান বিরাট। ১৭তম ওভারে অর্ধশত রান পূরণ করেন তিনি। ৩৩ বলে আসে তাঁর ৫০। ৫০-এর পর আরও মারমুখী হয়ে যান। উনিশতম ওভারে একটি ছক্কা আর দু’টো চারের সাহায্যে ১৮ রান করেন। ভারতের ইনিংস শেষ হয় ১৯২/২-এ। ৪৭ বলে ৮৯-এ অপরাজিত থাকেন বিরাট। শেষ পাঁচ ওভারে ভারতের রান ওঠে ৬৫। বিরাটের ওই সময় সংগ্রহ ২০ বলে ৪৯।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসের শুরুতেই ধাক্কা দেন জসপ্রীত বুমরাহ। দ্বিতীয় ওভারেই বোল্ড হয়ে যান গেল। বুমরাহর সেলিব্রেশন দেখে মনে হবে যেন বিশ্বকাপ ওখানেই জিতে নিয়েছেন। পরের ওভারেই নেহরার বলে ফেরেন আর এক বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান মার্লন স্যামুয়েলস। দু’জন বড় প্লেয়ারকে হারিয়েও মুষড়ে না পড়ে পাল্টা লড়াই শুরু করেন জনসন চার্লস আর লেন্ডল সিমন্স। ভাগ্য ভালো ছিল সিমন্সের। অশ্বিনের বলে বুমরাহর হাতে ধরা পড়লেও, রিপ্লেতে দেখা যায় নো বল করেছেন অশ্বিন। দুর্দান্ত ভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যান চার্লস। তাঁর আর সিমন্সের পার্টনারশিপেই ম্যাচ থেকে রাশ আলগা হতে শুরু করে ভারতের। ৩০ বলে অর্ধশত রান করেন চার্লস। তাঁর আর সিমন্সের পার্টনারশিপের সামনে যখন সব বোলাররা ব্যর্থ, মোক্ষম চাল চাললেন ধোনি। ১৪তম ওভারে বোলিং-এ নিয়ে এলেন কোহলিকে। এবং সাফল্য। বিরাট যেন কোনও ভুল করতেই পারেন না! অনিয়মিত বোলারকে ছক্কা লাগাতে গিয়ে মিড-উইকেটে রোহিতের হাতে ধরা পড়েন চার্লস। ওই ওভারে মাত্র চার রান দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রানের গতিতে কিছুটা রাশ টানেন বিরাট। ৩৫ বলে অর্ধশত রান পূরণ করেন সিমন্সও। কিন্তু বিপদ তো কাটলই না উল্টে আরও বেড়ে গেল ভারতের। বিধ্বংসী মেজাজ নিয়ে ব্যাট করতে নামেন আন্দ্রে রাসেল। পরের ওভারে আবার জীবন পান সিমন্স। রাসেল আর সিমন্সের জুটিটাই পাকাপাকি ভাবে ভারতের আশা শেষ করে দেয়। দু’জনের তাণ্ডবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর জয়ের ব্যবধান ক্রমে ক্রমে কমে আসে। শেষ তিন ওভারে দরকার ছিল ৩২ রান, হাতে সাত উইকেট। দু’ওভার বাকি থাকতেই পেসারদের কোটা শেষ হয়ে যাওয়ায় উনিশতম ওভারে রবীন্দ্র জাদেজার কাছে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না ধোনির। শেষ ওভারে মাত্র আট রান দরকার, হাতে সাত উইকেট। এই অবস্থায় আবার কোহলির শরণাপন্ন হলেও কাজের কাজ হয়নি। দু’বল বাকি থাকতেই ছক্কা হাঁকিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয় নিশ্চিত করেন রাসেল। ২০ বল খেলে ৪৩-এ অপরাজিত থাকেন তিনি। ৫১ বলে অপরাজিত ৮২ করে ম্যাচের সেরা নির্বাচিত হন সিমন্স। ম্যাচ শেষে ধোনি টসে হেরে যাওয়াকেই হারের মূল কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তবে মোক্ষম সময় ভারতের বোলারদের গুরুত্বপূর্ণ দু’টো নো বলই যে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় সেটা মেনে নেন ধোনি।

উল্লেখ্য, মহিলা টি-২০ বিশ্বকাপেও ফাইনালে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এ দিন দ্বিতীয় সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে সাত রানে হারায় তারা। রবিবার যখন চার বছর আগের রাত ফিরিয়ে আনতে ইডেনে নামবেন গেল-স্যামুয়েলস-স্যামিরা, তাঁর ঘণ্টা পাঁচেক আগে তাঁদের মহিলা দল ঝাঁপাবে প্রথম বারের জন্য বিশ্বকাপের ট্রফিটা দখল করতে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here