রবিবারের পড়া: প্রসঙ্গ মহালয়া

0

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

আর ঠিক তিন দিন পরেই কৃষ্ণা অমাবস্যা তিথি, মহালয়ার পুণ্য লগ্ন। বাঙালির শারদোৎসব হল বাঙালির সংস্কৃতির এক আন্তর্জাতিক রূপ। এই শারদোৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে মহালয়া। মহালয়া যে পক্ষের শেষ দিন সেটি হল পিতৃপক্ষ এবং পরের পনেরো দিনের নাম দেবীপক্ষ বা মাতৃপক্ষ। মহালয়া হল পিতৃপক্ষ এবং দেবীপক্ষের মহা সন্ধিক্ষণ। মহালয়ার অর্থ হল মহৎ আলোয় পিতৃপুরুষদের প্রতি ‘তর্পণ’ পূর্বক শ্রদ্ধা নিবেদন।

পিতৃপক্ষ কী

শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ এই পিতৃপক্ষের উল্লেখ করেছেন। মহাভারতে মহালয়ার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে। কুরুক্ষেত্রের মহারণে দাতা কর্ণের মৃত্যুর পরে তাঁর সূক্ষ শরীর (আত্মা) পৃথিবী ছেড়ে স্বর্গলাভ করে। সেখানে তাঁকে আবাহনের সময়ে খাদ্য উপহার দেওয়া হয়। সেই খাদ্যসামগ্রীতে ছিল সোনা, রুপো-সহ বিভিন্ন রত্নরাজি। কোনো খাদ্যবস্তু ছিল না।

কর্ণের আত্মা তা-ই দেখে অত্যন্ত অবাক হয়ে পরমাত্মাকে জিজ্ঞাসা করেন, এ সব কী? খাদ্যবস্তু কোথায়? তখন পরমাত্মা কর্ণকে বলেন, তিনি (কর্ণ) জীবৎকালে সারা জীবন শুধু এই সোনা, রুপো,রত্নরাজি দান করেছেন। কিন্তু পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে কখনও কোনো দিন তর্পণ করেননি, তাঁদের উদ্দেশে কখনও কোনো খাদ্যাদি তণ্ডুলাকারে  অঞ্জলি হিসাবে নিবেদন করেননি।

তা-ই শুনে কর্ণ প্রত্যুত্তরে পরমাত্মাকে জানান, আমি তো শরীর ত্যাগের আগের দিন রাত্রে জানতে পারলাম যে আমি কে? আমাকে আমার মা মহারানি কুন্তী জানালেন আমার পূর্বপুরুষদের পরিচয় এবং পরদিন কুরুক্ষেত্রের মহারণে আমার মৃত্যু হল। তা হলে আমার অপরাধ কোথায়?

তখন পরমাত্মা কর্ণের আত্মাকে আসন্ন পনেরো দিনের জন্য পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করার কাজ দিয়ে আবার মরজগতে পাঠিয়ে দেন। দাতা কর্ণ সেই পনেরো দিন তাঁর পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা-সহ শ্রাদ্ধাদি করে শেষে অমাবস্যার দিন তর্পণ করেন। সেই দিনটিই হল এই মহালয়ার দিন। তার পর তিনি এই ধরাধাম থেকে সূক্ষ্মতম শরীরে আবার মহাজগতে চলে যান।

আসলে মহালয়া হল পিতৃপক্ষের শেষে পিতৃপুরুষদের প্রতি তর্পণের মাধ্যমে তাঁদের  সম্মান, সৌজন্য এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের দিন। শুধুমাত্র নিজের বংশের নয়, অন্যদের প্রতিও এই দিনে তর্পণের দ্বারা শ্রদ্ধা, বিনম্রতা জানানো হয় তিলাঞ্জলি অর্পণ করে।  

“আমার পিতা এবং পিতৃপুরুষদের, আমার মাতা এবং মাতৃপুরুষদের, আর যাঁরা আমার আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু-অবন্ধু, যাঁরা আমার জন্ম-জন্মান্তরের পূর্বজ, তাঁদের সকলের প্রতি আমার বিনীত শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। সবাই শান্তি এবং মুক্তি লাভ করুক, এই প্রার্থনা করছি।”

ভারতবর্ষের সমস্ত প্রদেশে এই মহালয়া-তর্পণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় কোনো নদী বা জলাশয়ের ধারে ওইদিন সকালে। লোকবিশ্বাস, এই দিন পূর্বপুরুষদের আত্মা পিতৃলোক থেকে নেমে আসেন সূক্ষ্মতম শরীরে এই মর্ত্যলোকে। অবশ্য এই বিশ্বাস শুধু সনাতন ধর্মেই রয়েছে তা কিন্তু নয়, এই বিশ্বাস সব ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যেই আছে। ১৯০৪ সালে স্যার এম.এম. আন্ডারহিল লিখে গেছেন: “সূর্য এই সময়ে কন্যারাশিতে অবস্থান করে। আত্মারা অমর্ত্যলোক থেকে মর্ত্যলোকে নেমে এসে অবস্থান করেন।” আবার ১৯১৭ সালে ড. চার্লস্ হেনরি বাকের একটি লেখায় পাওয়া যায় – “সৌর বছরে যতগুলি অমাবস্যা আছে, তার মধ্যে আশ্বিনের এই কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যাটিই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

ইতিহাস বলছে, রোম সভ্যতায় ন’ দিন ধরে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা পালন করার অনুষ্ঠান সেই প্রাচীন যুগ থেকে (যিশুর জন্মেরও বহু আগে থেকে) চলে আসছে। রোমান ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টানরা প্রতি বছর ২ নভেম্বর (এই আশ্বিন-কার্তিক মাসের সময়কালেই) ‘All souls day’- তে তাদের পূর্বপুরুষদের সমাধিস্থলে গিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে। মুসলিম সম্প্রদায়ের (শিয়া এবং সুন্নি উভয়েই) মানুষেরা ‘শব-এ-বরাত’-এর দিন তাদের পূর্বপুরুষদের সমাধিস্থলে খাদ্যাদি, ফুল ইত্যাদি রেখে, মোমবাতি জ্বালিয়ে তাঁদের শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। মিশরীয়রা তাদের সভ্যতার সেই উন্মেষ পর্ব থেকেই তাদের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে নিবেদন করে শ্রদ্ধা। পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের রীতি সমস্ত দেশেই দেখা যায়, তাদের নিজস্বতায়।

শুধু এই বাংলাতেই নয়, আমাদের দেশের অন্যত্রও এই মহালয়ার দিনে তর্পণ করা রেওয়াজ আছে। সেই অনুষ্ঠানকে কোথাও বলা হয় ‘ষোলাশ্রাদ্ধ’, কোথাও বলা হয় ‘কানাগাত’, কোথাও ‘আপারিপক্ষম’, কোথাও আবার ‘মহালয়া পক্ষ’। শ্রীলঙ্কায় এই দিনের নাম ‘মেহালোয়ি মাথাই’।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পুরাতাত্বিক ড. উষা মেননের  কথায়, “পিতৃপক্ষ, তর্পণ এই রীতিগুলি বংশের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে। এই পক্ষে এবং এই মহালয়ার দিনটিতে কোনো বংশের বর্তমান প্রজন্ম স্মরণ করে তার বা তাদের না দেখা অতীত প্রজন্মের পূর্বপুরুষদের। বা যাদের সাথে এক সময়ে জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু আজ তাঁরা আর নেই, যেমন মা-বাবা, অগ্রজ-অগ্রজা, বা পরিবারের কোনো বয়স্ক-বয়স্কা ইত্যাদি। এই দিনের এই অনুষ্ঠান তাঁদের প্রতি বিনম্রতায় শ্রদ্ধা-সম্মান নিবেদনের এক পবিত্র দিন।”

এইখানেই আমাদের বাস্তব জীবনে মহালয়া দিনটির প্রাসঙ্গিকতা। কারণ যা কিছু অতীত, তার কাছে বর্তমান চিরদিন ঋণীই থেকে যায়, এটাই চিরন্তন সত্য। এটাই সময়ের শিলালিপির স্বাক্ষরিত অভিধান।

দেবীপক্ষ কী

পিতৃপক্ষের শেষ হলে আসে দেবীপক্ষ, যাকে মাতৃপক্ষও বলা হয়ে থাকে। কারণ এই দেবীপক্ষে দেবী মায়ের আবাহন ঘটে। দেবী দুর্গা মহাশক্তি মহামায়া শ্রী আদি আদ্যাশক্তির কেন্দ্রীভূত চিৎ-শক্তি। দেবী হলেন সত্ত্ব-রজো-তমো, এই ত্রি-গুণের অধিষ্ঠাত্রী এবং ত্রিগুণাত্মিকা। তিনি ত্রিগুণে বিরাজিতা আবার ত্রিগুণাতীতা। তাঁর বাহন সিংহ হল রজোগুণের প্রতীক, অসুর হল তমোগুণের প্রতীক।

জ্ঞানশক্তির প্রতীক হলেন দেবী মহাসরস্বতী। তাঁর বাহন হংস। হংস হল জ্ঞান-তাপস, জ্ঞানরূপ দুধের মধ্যে সংপৃক্ত অজ্ঞানরূপী জল ত্যাগ করে পরমার্থকে গ্রহণ করাই তার কাজ। দেবীর দক্ষিণে অর্থ-পরমার্থের প্রতীক হলেন মহালক্ষ্মী। তাঁর বাহন সদা জ্ঞানী, গম্ভীর, সুপ্তিকালের জাগ্রত সাক্ষী পেচক, মানে পেঁচা। বল-বীর্যের প্রতীক কার্তিক। ময়ুর তাঁর বাহন, সৌন্দর্যের প্রতীক। সিদ্ধিদাতা গণপতি হলেন জনগণেশের সিদ্ধিযোগের প্রতীক। তাঁর বাহন ইঁদুর, যে মাটির সঙ্গে একাত্মতায় বাস করে।

থাকে নবপত্রিকা – মানবসভ্যতার কৃষি ও শস্য – ফসল উৎপাদনের প্রতীক, নবশস্যের সমাহার – ধান, কচু, মানকচু, হলুদ, বেল, ডালিম, অশোক, জয়ন্তী (জয়ত্রী) এবং কলা। এই ন’টা গাছের পাতা দিয়ে তৈরি নারীমূর্তি তথা মাতৃরূপ। এই নবপত্রিকা হল নবদুর্গার পল্লবশিশু।

দেবী মহামায়ার নবরূপ হল এই নবদুর্গা – পার্বতী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুশ্মাণ্ড, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী। মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ থেকে মহানবমী তিথি পর্যন্ত দেবী আরাধিতা হন এই নবরূপে। তাই সারা ভারতবর্ষ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়নমার, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলিতে এই উপলক্ষ্যে এই নয় দিনকে বলা হয় নবরাত্রি বা নবরাত্র বা নওরাতি বা নওরাত্রি বা নওরোজ।

মহালয়ার দিন দেবী মায়ের চোখ আঁকা করা হয়। তার পর মহাষষ্ঠীতে হয় বোধন। মহাঅষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং মহানবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট – এই দুই সময়ের সম্মিলিত ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণে দেবীর সন্ধিপুজা হয়।

আসলে এই দেবী আরাধনার মাধ্যমে যুগে যুগে আমাদের সমাজে, সংসারে প্রতিটি নারীকে এক মান্যতায় প্রতিষ্ঠিত করার পবিত্র অনুভূতি রয়েছে। সেই বোধের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান থেকেই স্বামী বিবেকানন্দ শুরু করেছিলেন ‘কুমারীপূজা’, যে পূজা  সেই প্রাচীন কালে ঋষি-মুনিদের আশ্রমে অনুষ্ঠিত হত। আসলে নিত্যদিনের সংসারে-সমাজে প্রতিটি নারীর মধ্যেই তো দেবী দশপ্রহরণধারিনী মা দুর্গা বিরাজিতা – মা রূপে, ভগিনী রূপে, স্ত্রী রূপে, কন্যা রূপে, সহকারিনী রূপে, বিভিন্ন রূপে।

তার পর দশমীতে বিজয়ার করুণ আবেশে চলে যান দেবী মা। অপেক্ষায় থাকে মানুষ আর মানুষের ঘরসংসার আবার পরের বছরের জন্য।

আরও পড়তে পারেন

পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করার জন্য কর্ণও স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিলেন মর্ত্যে

‘মহালয়া’ মানেই দুর্গাপুজো, ‘মহালয়া’ মানেই তর্পণ, জেনে নিন আরও কিছু তথ্য

দেখে নিন এ বছরের মহালয়ার দিনক্ষণ

‘শুভ মহালয়া’ কি বলা যায়? নানা মুনির নানা মত

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন