রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান / শেষ পর্ব

0

তপন মল্লিক চৌধুরী

পূর্ব প্রকাশিতের পর

ভারতীয় মার্গসংগীত থেকে কীর্তনাঙ্গের গান, এমনকি বাংলা লঘু বা চটুল গান বঙ্কিমের উপন্যাসে পরিপূর্ণ ভাবেই আছে। তবে সব গান যে তাঁরই রচনা এমনটা কিন্তু নয়। অনেক গানে আবার অন্য গানের সরাসরি প্রভাব লক্ষ করা যায়, কোনো কোনো গানের সংগ্রাহক আবার বঙ্কিম নিজে। নিজের লেখা গানে বঙ্কিম তো কেবল রচয়িতা নন, রাগ-তাল-এর যথাযথ উল্লেখ বলে দেয় সংগীত সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা কতখানি গভীর। ‘মৃণালিনী’, ‘বিষবৃক্ষ’র মতো সংখ্যায় বেশি না হলেও গান রয়েছে ‘ইন্দিরা’তেও। ‘একা কাঁখে কুম্ভ করি, কলসীতে জল ভরি,/জলের ভিতরে শ্যামরায়’ – এই প্রাচীন গীত ইন্দিরার মনে পড়ে নৌকা চড়ে গঙ্গা দিয়ে কলকাতা যাওয়ার সময়।

পাঠকমাত্রেরই সাহিত্যসম্রাটের সংগীত প্রসঙ্গে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের দশম পরিচ্ছেদে ‘বন্দেমাতরম’ গানটির কথা মনে আসে, যে গান ভারতের জাতীয়তার মহামন্ত্র। গানটি বঙ্কিম ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস লেখার অন্তত ছ-সাত বছর আগে লিখেছিলেন সঞ্জীবচন্দ্র সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়। ফুটনোটে আছে মল্লার রাগ ও কাওয়ালি তালে গানটি গীত। শোনা যায় বঙ্কিমের সংগীতগুরু যদুভট্ট গানটিতে প্রথম সুরারোপ করেছিলেন, কিন্তু কোন রাগ বা তালে তা জানা যায় না। বন্দেমাতরম ছাড়াও ‘আনন্দমঠ’-এ আরও গান আছে, দ্বিতীয় খণ্ড দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বাগীশ্বরী রাগিণীতে আড়া তালে শান্তিকে গাইতে দেখি, ‘দড় বড়ি ঘোড়া চড়ি কোথা তুমি যাও রে… পায়ে ধরি প্রাণনাথ আমা ছেড়ে যেও না’। তৃতীয় খণ্ডের তৃতীয় পরিচ্ছেদে শান্তি ও তাঁর স্বামীর যুগলকন্ঠে পাই, ‘এ যৌবন-জলতরঙ্গ রোধিবে কে?/হরে মুরারে! হরে মুরারে!’ এ ছাড়াও ব্রহ্মচারী সত্যানন্দ ও শান্তির গলায় বঙ্কিম রেখেছেন জয়দেব গোস্বামী বিরচিত পদ – ‘ধীরসমীরে তটিনীতীরে বসতি বনে বরনারী…’। তৃতীয় খণ্ডের সপ্তম পরিচ্ছেদে শান্তি গায় গোস্বামী কবির দশাবতার স্ত্রোত্র, ‘প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসি বেদম…’।

উপন্যাস ছাড়াও বঙ্কিমের গান পাওয়া যায় ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এ। কমলাকান্ত প্রসন্নকে শুনিয়েছিলেন, ‘এসো এসো বঁধু এসো, আধ আচারে বসো…’। ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে ধনকুবের জগতশেঠ ভাইদের জলসাঘরের ঐশ্বর্যমণ্ডিত সংগীতসভায় মনিয়াবাঈকে ‘সনদি খিয়াল’ গাইতে দেখা যায়, ‘শিখো হো ছল ভালা’। অনুমান মেটিয়াব্রুজে ওয়াজেদ আলি শাহর সভাগায়ক সনদপিয়া রচিত ঠুমরি হল সনদি খিয়াল। ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের চতুর্থ খণ্ড প্রথম পরিচ্ছদে মোগল সেনার বেশে মানিকলালের গলায় বঙ্কিম রাখেন উত্তর-মধ্য ভারতের লোকভাষার একটি গান, ‘শরম ভরমসে পিয়ারী,/সোমরত বংশীধারী,/ঝুরত লোচনসে বারি…’। এ রকম উদাহরণ আরও রয়েছে বঙ্কিমের উপন্যাসে এবং লেখায়। বঙ্কিমের এই সংগীতপ্রীতি এবং সংগীত বিষয়ে গভীর ধারণা কোথা থেকে কী ভাবে হয়েছিল?

আমরা জানি বঙ্কিমের সময় হল বাংলায় রাগসংগীত চর্চার সুবর্ণ যুগ। এক দিকে মেটিয়াব্রুজে লখনউয়ের সিংহাসনচ্যুত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহর সংগীত দরবার, যার স্পষ্ট প্রভাব বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ঊপন্যাসে বর্ণিত নবাব কতলু খাঁর নাচগানবিলাসিতার মধ্যে অনেকখানি ধরা পড়ে, অন্য দিকে পাথুরিয়াঘাটার রাজা যতীন্দ্রমোহন ও সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের গানবাজনার আসর, কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি-সহ কয়েকটি বনেদি বাড়ির সংগীতচর্চা ও বৈঠকি আড্ডা কলকাতার সেই সময়কার সংগীতচর্চাকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। প্রসঙ্গত বঙ্কিম ছিলেন সৌরীন্দ্রমোহনের খুবই ঘনিষ্ঠ। তাঁদের বাগানবাড়ি মরকতকুঞ্জে ১৮৭৬ সালের ৩১ জানুয়ারি সরস্বতী পুজোর দিন অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বার্ষিক কলেজ রি-ইউনিয়নে সৌরীন্দ্রমোহনের গান শুনতে উপস্থিত ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমের কাঁঠালপাড়ার বাড়িতেও গৃহদেবতা রাধাবল্লভের নানা পার্বণ উপলক্ষ্যেও যাত্রা, পালাগান, কথকতা ইত্যাদি লেগেই থাকত। শৈশবাবস্থা থেকেই বঙ্কিম ওই সাংগীতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠায় তাঁর কান গানের জন্য যে তৈরি হয়ে উঠেছিল তা বলাই যায়। পরবর্তীকালে একটু বেশি বয়সে তিনি রীতিমতো নাড়া বেঁধে তাঁর থেকে দু’বছরের ছোটো সেই সময়ের প্রখ্যাত ধ্রুপদশিল্পী যদুভট্টের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান / পর্ব ১

শোনা যায়, শৈশবকাল থেকেই বঙ্কিম মুখে মুখে গান রচনা এবং তাতে সুর সংযোগ করতেন। বঙ্কিম অনুজ পূর্ণচন্দ্রের একটি লেখা থেকে জানা যায়, যখন বঙ্কিমের ১৩-১৪ বছর বয়স সেই সময় দাদা ও ভাইদের সঙ্গে নৌকায় ভাসান দেখতে বঙ্কিম ফরাসডাঙা যাচ্ছিলেন। ভাগীরথীর  পূব পাড়ের শ্মশানে তখন শবদাহ হচ্ছিল। শ্মশানে এক মহিলা কাঁদতে কাঁদতে জলন্ত চিতায় ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তাকে ধরে রেখেছিল তার বাড়ির লোক। এই ঘটনায় বঙ্কিমের চোখ জলে ভরে যায়। কিশোর বঙ্কিম নৌকায় বসেই একটি গান লিখে সুর সংযোগ করেছিলেন। মল্লার রাগিণীতে তৈরি সেই গান বহু কাল প্রচলিত থাকার পর লুপ্ত হয়ে যায়। গানটির কথা… ‘হারালে পর পায় কি ফিরে মণি – কি ফণিনী, কি রমণী?’

বঙ্কিমের ভাইয়ের ছেলে তথা বঙ্কিমজীবনীকার শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্কিম-জীবনী’তে লিখেছেন, ‘মৃণালিনী’ লেখার সময় বঙ্কিম ইতিহাস ও বিজ্ঞান পড়তে যেমন শুরু করেছিলেন, তেমনই তাঁর মধ্যে গান শেখার ঝোঁকও দেখা যায়। কাঁঠালপাড়ারই একজন বঙ্গবিশ্রুত গায়ক যদুভট্টকে পঞ্চাশ টাকা বেতন দিয়ে তিরিশ-উত্তীর্ণ বঙ্কিম গান শেখা শুরু করেন। বঙ্কিমের ‘মৃণালিনী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৯-এর ১৯ নভেম্বর, তার আগে ব্যক্তিগত কাজে তিনি ছ’মাসের ছুটি নিয়েছিলেন ১৮৬৮-র ৪ জুন থেকে। এর পর ১৮৬৮-র শেষাশেষি তিনি ‘মৃণালিনী’ লিখতে শুরু করেন, শচীশচন্দ্রের জীবনী অনুযায়ী এই সময়েই তিনি যদুভট্টের কাছে সংগীত শিক্ষা শুরু করেছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে বলাই যায় বঙ্কিমের সংগীতচর্চা খুব নিয়মিত হয়নি। কারণ ১৮৬৯-এর ১৫ ডিসেম্বর তিনি বহরমপুরে কাজে যোগদান করেন। ১৮৭২-এ ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা প্রকাশের পর থেকেই বঙ্কিম সপ্তাহান্তে কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে ফিরতেন। তাঁর বাড়িতেই বসত ‘বঙ্গদর্শন’-এর বিখ্যাত মজলিশ, সেখানে উপস্থিত থাকতেন যদুভট্টও। (শেষ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.