রবিবারের পড়া: দেশে দেশে যত বিচিত্র ভোট

0

তপন মল্লিক চৌধুরী

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কিছু কিছু দেশে এমন বিচিত্র পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হয় যা রীতিমতো অবাক করে। যেমন আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। গাম্বিয়ায় ভোট দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতি পুরোপুরি আলাদা। সেখানে ইভিএম নেই, ব্যালট আছে। কিন্তু ব্যালট হিসেবে কাগজের বদলে ব্যবহৃত হয় পাথর। অর্থাৎ সিল মারার কোনো ব্যাপার নেই। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ব্যালটবাক্স বা ইভিএম-এর বদলে থাকে কয়েকটা করে ড্রাম। নির্বাচনে যোগ দেওয়া প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য বরাদ্দ করা হয় নির্দিষ্ট রঙের ড্রাম। তার পরে সেই ড্রামে সেঁটে দেওয়া হয় প্রার্থীর ছবি। ভোটাররা বুঝতে পারে ভোটটা সে কাকে দিচ্ছে। ভোটারের কাজ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে একটা পাথর তুলে তার পছন্দের প্রার্থীর ছবিওলা ড্রামে ফেলে দেওয়া। একটার বেশি পাথর বা ভোট যাতে না দিতে না পারে তার জন্যও আছে ব্যবস্থা। ড্রামের ভিতর একটা ঘণ্টা এমন ভাবে থাকে যে প্রত্যেকটা পাথর ভিতরে পড়ার সময় একবার করে বেজে ওঠে। বাইরে থাকা পোলিং এজেন্টরা বেল বাজার শব্দ একটার বেশি হল কিনা সে দিকে খেয়াল রাখে।

Loading videos...

ভোট শেষে গণনা। এক একটি ড্রাম থেকে পাথর ঢালা হয় ২০০ বা ৫০০ ঘরের এক একটি কাঠের ফ্রেমে। সেইগুলি যোগ করে হিসাব করা হয় কোন কেন্দ্রে কতগুলো ভোট পেল এক একজন প্রার্থী। গাম্বিয়ার মানুষের নিরক্ষরতার কারণে ভোটের জন্য এ রকম বিচিত্র পদ্ধতি। প্রথম যখন গাম্বিয়ায় ভোটের ব্যবস্থা চালু হয় তখন মনে করা হয়েছিল প্রচলিত ব্যালট পেপার, প্রতীক, সিলের ভোটব্যবস্থা চালু করতে গেলে অধিকাংশ মানুষ বুঝবে না যে সে কাকে কী ভাবে ভোট দিচ্ছে। তবে দেশে শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভাবে ভোট নেওয়ার প্রয়োজনও ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে গাম্বিয়া সরকারও চাইছে আস্তে আস্তে অন্যান্য দেশের মতোই ভোটগ্রহণ পদ্ধতি চালু করতে।

কিছু আশ্চর্য ঘটনা

এ বার সব থেকে আশ্চর্যের নির্বাচিত প্রার্থীর কথা। ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরের সিটি কাউন্সিলে ১৯৫৮ সালে নির্বাচিত হয়েছিল একটা গণ্ডার। কী ভাবে ঘটল এমন অকল্পনীয় ঘটনা? সেই সময় শহর সাও পাওলোর নাগরিকরা রাজনীতির মানুষদের দুর্নীতিতে এতটাই বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল যে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় কাকারেকো নামের একটা গণ্ডারকে। নির্বাচন কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক ভাবেই ভোট-প্রার্থী হিসাবে একটি গণ্ডারের মনোনয়ন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। পরে অবশ্য মানুষের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়। কিন্তু তার থেকেও আশ্চর্যের ঘটনা হল যখন ভোটের ফলাফল বের হল তখন দেখা গেল কাকারেকো পেয়েছে এক লক্ষেরও বেশি ভোট। শুধু তা-ই নয়, এত ভোট অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর ভাগ্যে জোটেনি। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই ভোটগুলি নষ্ট হয়েছে, কারণ ব্রাজিলের আইন অনুসারে কাউন্সিলের সদস্য হতে হলে অবশ্যই কোনো একটা দল থেকে মনোনয়ন পেতে হয়।

এ বার আরেকটি আশ্চর্য ঘটনার কথা। এটা আগের চেয়েও অদ্ভুত মনে হতে পারে। ১৯৬৭ সালে ইকুয়েডোরের পিকোয়াজা নামের একটা শহরে মেয়র নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল পালভাপাইস নামের একটি ফুড পাউডার। নির্বাচনের বাজারে পাউডারের বিজ্ঞাপন করতে ওই ফুড পাউডার কোম্পানি বেশ কিছু চটকদার লাইন বের করেছিল, যার মধ্যে একটা ছিল: Vote for any candidate, but if you want well-being and hygiene, vote for Pulvapies। কিন্তু ভোটের ফলাফল যখন প্রকাশিত হল দেখা গেল বিজ্ঞাপনের ওই লাইনটাকে শহরের মানুষ এত বেশি করে নিয়েছে যে রাইট-ইন ভোটে জিতে শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছে পালভাপাইস! যদিও সেই দায়িত্ব সেই কোম্পানি আদৌ নিয়েছিল কি না সেই তথ্য আজ আর জানার উপায় নেই।

উত্তর কোরিয়ায় ভোট?

কিম জং উনের দেশ উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দল একটি ব্যালট নির্ধারণ করে। সেই ব্যালটে থাকে একটি মাত্র নাম। সেখানে বিকল্প প্রার্থী বাছাইয়ে কোনো সুযোগ রাখা হয় না। কিন্তু সেই দেশেও নির্বাচন হয়। কিম জং উনের একচ্ছত্র আধিপত্য যেখানে ধার্য সেখানে আবার ভোট কী ভাবে সম্ভব?

হ্যাঁ,  সম্ভব। তবে পদ্ধতিটি ভিন্ন। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মতো কখনোই নয়। উত্তর কোরিয়ার এই নির্বাচনকে ভোট ভোট খেলা বলা যেতে পারে। প্রতি পাঁচ বছরে সেখানে একটি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। ২০১৫ সালে সেখানে ভোটে যোগ দেয় ৯৯.৭ শতাংশ ভোটার। কিন্তু হাস্যকর হলেও এটা ঘটনা যে, ভোটারদের পছন্দসই প্রার্থী বেছে নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ভোটাররা শুধু সেই ব্যালটের নির্দিষ্ট ঘরে প্রার্থীর নামের পাশে স্বাক্ষর করে।

পাশে আলাদা একটি বাক্স রাখা ছিল। সেখানে ভোটাররা সরকারের বিপক্ষে অর্থাৎ শাসক প্রত্যাখ্যানের মত দিতে পেরেছিল। কিন্তু সেটি গ্রহণ করা হয়নি। অন্য দিকে যে বাক্সে রাষ্ট্রপ্রধানের নাম লেখা ব্যালট ফেলা হয়েছিল সেটিই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এতে নির্বাচিত প্রার্থী শতভাগ ভোট পেয়েছেন বলে প্রচার করা হয়। এর অর্থ হল কেউই এখানে শাসককে প্রত্যাখ্যান করেনি। খেলা হলেও এমন ভোট প্রতি পাঁচ বছর অন্তর হয়েছিল।

ভোটের দিন, ভোটের বয়স এবং আরও তথ্য

রবিবার দিনটি সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় ভোট দেওয়ার জন্য আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ এই দিনটিকেই উপযুক্ত মনে করে। কানাডার নাগরিকরা সোমবার, ব্রিটেন বৃহস্পতিবার এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড শনিবার বেছে নিয়েছে। আমেরিকায় মঙ্গলবার ভোট হওয়ার নিয়মটি আইন দ্বারা সিদ্ধ ছিল না কখনও। অথচ উনিশ শতক থেকে তারা মঙ্গলবারই ভোট দিয়ে আসছে।

অস্ট্রেলিয়ার আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের প্রতিটি নাগরিককে ভোটের জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। আর এই আইন সবার জন্য বাধ্যতামূলক। শুধু তা-ই নয়, ভোটারদের ফেডারেল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাটাও বাধ্যতামূলক। যদি কোনো কারণে কোনো ভোটার উপস্থিত থাকতে না পারে তবে তাকে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হয়। সেই জরিমানা হতে পারে ১৫ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত।

প্রাপ্তবয়স্করাই সাধারণত দেশের ভোটার হয়ে থাকেন। কিন্তু ব্রাজিল চলে উলটো পথে। সেখানে ১৯৮৮ সাল থেকে কিশোররাও ভোটদানের অধিকার অর্জন করেছে। তাদের বিবেচনায়, দেশের জনগণের বেশির ভাগ যখন জাতীয় নির্বাচনে নিজের মতামত প্রদানের সুযোগ পায় তখন সে দেশে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। আর এই কারণেই ব্রাজিল নিজের দেশের ১৬ বছর বয়সের ছেলেমেয়েদের ভোটাধিকার দিয়েছে। শুধু ব্রাজিল নয়,  নিকারাগুয়া ও আর্জেন্তিনাও একই নিয়ম।

আরও পড়ুন: পয়লা বৈশাখ এমন এক আনন্দ-উৎসব যার কোনো সংজ্ঞা নেই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.