রবিবারের পড়া: ইয়াসের তাণ্ডবে মানবতা বিপন্ন সুন্দরবনে, বিকল্প পথের সন্ধান

0
ছবি: সুব্রত গোস্বামী।

মৃত্যুঞ্জয় সরদার

২০০৯-এর ২৫ মে থেকে ২০২১-এর ২৬ মে। ঠিক ১২টা বছর, একটা যুগ। ঘূর্ণিঝড় আয়লার যুগান্তরে আঘাত হানল ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। আরেক বার আয়লার স্মৃতি মনে করাল উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার সুন্দরবন লাগোয়া বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের। কোটালের ওপর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে মুহুর্মুহু ভাঙল বাঁধ। ফের লোনা জলে প্লাবিত কৃষিজমি। এক বছর আগেই অবশ্য উম্পুন দেখেছে সুন্দরবন।

Loading videos...

প্রশ্ন হল, ১২ বছরে হলটা কী? প্রতি বছর নিয়ম করে নদীবাঁধ মেরামত বাবদ একটা বাজেট ধরা থাকে সরকারের, তা সেচ দফতর ও পঞ্চায়েতের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়। গ্রামের লোকেরও কিছু রোজগার হয়, বহু জায়গায় একশো দিনের কাজের সঙ্গে এটাও এখন জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নদী ও প্রকৃতি তো কারও কথা শুনে চলে না। যে বিপুল ম্যানগ্রোভ অরণ্য এই দ্বীপগুলির পাশে ছিল, জলের কাছ পর্যন্ত, অধিকাংশ জায়গায় তা আর নেই। আর ভাঙনের হারও সব জায়গায় সমান নয় যে, কোনো রকমে তাপ্পি মেরে চলবে৷ বহু জায়গায় নদীবাঁধ সাংঘাতিক ভঙ্গুর অবস্থায় বছরের পর বছর থাকে আর তার পাশেই চরম অনিশ্চিত জীবনযাপন সুন্দরবনের মানুষের। প্রতি বর্ষায় বাঁধে মাটি ফেলা হয়। কোনো রকমে চলে যায়, যতক্ষণ না একটা আয়লা, উম্পুন বা ইয়াস আসে।

গোসাবা থেকে পাখিরালা যাওয়ার রাস্তাটা এখন পাকা। ঝকঝকে ম্যাজিক গাড়ির কুড়ি মিনিট লাগে। নানা রঙের ছোটোবড়ো লজের ইতিউতি। সেঁধিয়ে যাও। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বিকেলের পড়ন্ত সূর্যটাকে বগলদাবা করে এ-দিক সে-দিক বিক্ষিপ্ত হাঁটাহাঁটি। ছোটোবড়ো দোকানে বাচ্চাদের খেলনা, সফট টয়ের অবতারে স্বয়ং দক্ষিণরায় চেয়ে আছেন ড্যাবড্যাব করে। চায়ের পাতা ফুটতে দিয়ে আটপৌরে করে শাড়ি পরা দোকানি সন্ধে দেন। ঠিক উলটো দিকেই ছিল বেশ বড়ো চাষের জমি, আয়লা ও উম্পুন ঝড়ের নুন এখনও বেরোয়নি মাটি থেকে। অগত্যা দোকান-ব্যবসা। সারা বছরই ট্যুরিস্টের আনাগোনা তো এই বাদাবনে! কিন্তু দোকানটা এ বছর আস্ত থাকবে তো, একেবারে বাঁধের ওপর!

ভাঙা বাঁধেই বাস।

কিন্তু এ তো আকছার ঘটে, বছরের পর বছর। এ আর নতুন কী, আগেও তো হয়েছে! আচ্ছা কত আগে?

শহর বেড়ে উঠেছে তার শাখাপ্রশাখা নিয়ে। গ্রামের মানুষ বাঁধ বেঁধেছে নদীতে, মাটি, ইট আর নারকেল পাতা জোগাড় করে। চরঘেরি, কুমিরমারী, ত্রিপলিঘেরি, দয়াপুর – বিভিন্ন গ্রামে মাটির বাড়িতে ইট-সিমেন্টের প্রলেপ। রাজ্যের ওপর দিয়েও পরিবর্তনের হাওয়া বয়, লাল চলে গিয়ে সবুজ আসে, কিন্তু বাঁধের অবস্থা সেই একই থেকে যায়। আর থেকে যায় সেই বিশাল গভীর ছায়াপথটা – নদীর ঠিক ওপরে।

এক বছরের মধ্যেই ইয়াস

নোনা ক্ষত বুকে চেপে মানুষ উম্পুনের জল ছাঁচে। রাস্তা এখন অনেকটাই পাকা, ঘরে ঘরে সিএফএল আলোর ছোঁয়া, ধান বোনে মানুষ। বনরক্ষকরাও বন্ধু – জঙ্গল ঘিরে বসেছে নাইলনের জাল, বাঘ বেরোয় কালেভদ্রে। নানা রকম বিকল্প রোজগারের হাতছানি গোটা বাদাবনে – মুরগি পালন করো, মাছ চাষ করো – সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রেখেছে মানুষ। এ বার তা হলে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই? মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর সময় পেল না। এক বছরের মধ্যেই ইয়াস আছড়ে পড়ল, জলমগ্ন হয়ে গেল গোটা সুন্দরবন।

প্রত্যেক বছরই সাইক্লোনে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলবর্তী এলাকা। মেরামত হতে না হতেই প্রতি বার ভাঙে বাঁধ। জনবসতি এলাকা প্লাবিত হয়ে বিপদে পড়ে মানুষ, আবার প্লাবিত হয় জঙ্গলও। বন্যপ্রাণীদের আতঙ্কিত হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা গিয়েছিল আয়লার সময়। ইয়াসের দিনও জল বাড়তেই ভেসে এল একের পর এক হরিণ।

বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হওয়ার দরুন সুন্দরবনে ভারী শিল্প হওয়া সম্ভব নয়। ও দিকে প্রতি বছর বাঁধ ভেঙে নদীর নোনাজল ঢুকে চাষাবাদের অবস্থাও তথৈবচ। এমতাবস্থায় সুন্দরবন থেকে উম্পুন-পরবর্তী অবস্থায় বিপুল পরিযায়ী শ্রমিকদের ঢল নামতে পারে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই এমন কিছু করা দরকার যা এই বিপুল মাইগ্রেশনকে, মানুষের এই অবর্ণনীয় কষ্টকে আটকাতে পারে। এমন কিছু জরুরি পরামর্শ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিয়েছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে।

ক্রমশ নদীর গ্রাসে।

ভারতের সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভের ক্ষয়

সুন্দরবনের ১০০০০ বর্গকিমির বেশির ভাগটাই (৬০ শতাংশ) বাংলাদেশে। কিন্তু সেখানকার জনসংখ্যা মাত্র ২০ লক্ষ, আর ভারতের ৪০% ভাগ সুন্দরবনে জনসংখ্যা ৪৫ লক্ষ। বাংলাদেশের সুন্দরবনের একটা বড়ো সমস্যা হল ট্রপিকাল সাইক্লোনের মুহুর্মুহু আক্রমণ। তার মধ্যে সিডর ২০০৭ সালে যে ধ্বংসলীলা চালায়, তেমনটা আয়লা, উম্পুন, বুলবুল, ফণী, ইয়াসে পশ্চিমবঙ্গ দেখেনি। বাংলাদেশের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের জৈববৈচিত্র্য অনেক বেশি, সেটার কারণ ক্রমাগত মিষ্টি জলের প্রবাহ, যেটা ভারতের পূর্ব সুন্দরবন, যেখানে আছে প্রজেক্ট টাইগার, সেখানে অনেক কম। প্রকৃতপক্ষে ভারতের সুন্দরবনের সপ্তমুখী পর থেকে মাতলা, বিদ্যাধরী, ঠাকুরান, হরিণভাঙা নদীগুলো পুরোপুরি সমুদ্রের জলে পুষ্ট ও এদের উপরিভাগের মিষ্টি জলের প্রবাহ মনুষ্যকৃত কারণে লুপ্ত হয়েছে বহু দিন। বহু দিন ধরে এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং উপগ্রহচিত্র ও অন্যান্য পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভারতীয় সুন্দরবনের একটা বড়ো অংশ জুড়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ভীষণ ক্ষয় হচ্ছে, তার গঠন ও বৃদ্ধি হৃাস পাচ্ছে, তার সবুজের পরিমাণ কমে যাচ্ছে ও গাছগুলো দুর্বল হয়ে গিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলছে।

গত পঞ্চাশ বছরে সুন্দরবনে যত বড়ো বড়ো ঝড় হয়েছে তার বেশির ভাগটাই গেছে বাংলাদেশে। তবে তার মধ্যে সিডর আর আয়লা ছিল ভয়াবহ। এর থেকে আরও ভয়াবহ ছিল উম্পুন। এ বার ভয়ংকর রূপ নিল ইয়াস। সিডর মূলত বাংলাদেশের উপকূল ভাগ আর কক্সবাজার অঞ্চলের ভয়ানক ক্ষতি করে। কিন্তু আয়লা ছিল বহু বছরের মধ্যে এমন একটা ঝড় যা ভারতের সুন্দরবনকে মাত্রাহীন বিপর্যয়ে ফেলে। নদীতে জোয়ার থাকায় আয়লায় ভারতীয় সুন্দরবনের ৭৭৮ কিমি নদী বাঁধ ভেঙে যায়। হু হু করে জোয়ারের জল ঢুকে সব চাষের জমি ও মিষ্টি জলের পুকুর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এর পর ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ের ফলে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় সুন্দরবনে জলোচ্ছ্বাস বেড়ে গিয়ে কৃষিযোগ্য জমি নষ্ট হয়, মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম সংকট। ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ শেষ হতে না হতে দাবি ওঠে, এই ভাবে চলবে না, নদীবাঁধের পাকাপাকি একটা বন্দোবস্ত করতে হবে।

আয়লা-পরবর্তী বাঁধ প্রকল্প

সেই বন্দোবস্ত অবশ্য সেই বিধান রায়ের আমল থেকেই হচ্ছে। হল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন, পথও বাতলেছিলেন কিছু, কিন্তু খরচের বহরে সরকার পিছু হটে। আয়লার পরে কেন্দ্রীয় সরকার টাস্কফোর্স গঠন করে। তাতে কেন্দ্রের বড়ো বড়ো আমলা ছিলেন। তাঁদের মদতে ও পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন বিষয়ক ও সেচ দফতরের কর্তাদের বুদ্ধিতে ৫০৩২ কোটি টাকার প্রকল্প গঠিত হয়। পরিকল্পনা করা হয় গ্রামের দিকের অধিক জমি অধিগ্রহণ করে শক্ত মাটির ভিতের উপর বেছানো হবে বিশেষ ধরনের পলিপ্রপিলিন শিট আর তার উপর ব্রিক সিমেন্ট পিচিং করে তৈরি করা হবে উঁচু বাঁধ।

সুন্দরবন বিষয়ক সমস্ত বিশেষজ্ঞ প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠেন। তাঁদের সকলেরই বক্তব্য ছিল, সুন্দরবনের মতো সদাই গতিশীল মোহনায় এ রকম ইটের বাঁধ বেশি দিন স্থায়ী হবে না, আর সুন্দরবনের মতো জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলে পলিপ্রপিলিন শিট দিয়ে বাঁধ বানানো চরম ভুল ও অন্যায় কাজ। বরং স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্যপূর্ণ ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের প্রাচীর ও বাঁশের চাটাই দিয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ বানানো সম্ভব। কিন্তু সে সব কথা কেউ কানে তোলেনি। বেশ কিছু নামকরা কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে কাজের বরাত দেওয়া হয়, যারা কোনো দিন সুন্দরবনের মতো অঞ্চলে কেন, কোথাওই কোনো নদীবাঁধ তৈরি করেনি। তারা সুন্দরবনে মাটি কাটার যন্ত্র নিয়ে নেমে পড়ল বাঁধ বানাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চরম ব্যর্থতার মুখে পড়ে এই প্রকল্প। প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় জমি। গ্রামের মানুষ কোনো মতেই চাকরি বা বাজারমূল্যে যথেষ্ট মোটা টাকা ছাড়া বাঁধের জন্য জমি দিতে রাজি নয়। সরকার বহু জায়গায় জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে দেখে জমির সঠিক কোনো মালিক নেই। এই সব নানা বিবাদে সিকি ভাগ কাজও এগোয় না।

ফের অস্থায়ী মেরামতি।

তত দিনে রাজ্যে বাম আমল বদলে তৃণমূল। জমিজটে কাজ আটকে যায়, চলে আসে ২০১৪। ইউপিএ-২ আমলের প্রকল্প, তায় আবার অগ্রগতি খুবই খারাপ। মোটামুটি মৃত্যুঘণ্টা বেজে যায় আয়লা-পরবর্তী বাঁধ প্রকল্পের। যদিও উম্পুনের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সুন্দরবন বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, তাঁরা নাকি এখনও এই টাকা পাওয়ার আসা রাখেন।

ইয়াসের তাণ্ডবে প্রবল জলোচ্ছ্বাস

ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে উঠল প্রবল জলোচ্ছ্বাস। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুন্দরবনের জনবসতি এলাকা জলের তলায় তলিয়ে গেল। নেতা, মন্ত্রী ও রাজ্যের কর্মকর্তাদের উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন এলাকাবাসী। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের জন্য আগে থেকেই সরানো হয়েছিল নিচু এলাকার বাসিন্দাদের। তাতে প্রাণহানি এড়ানো গেলেও বাঁধ ভেঙে জল ঢোকায় অনেকের ফেরার জায়গা রইল না। অনেকের ফসল গেল লোনা জলের তলায়। যে জমিতে আবার কবে চাষ করা যাবে জানেন না চাষিরাও। অনেক জায়গায় বুক দিয়ে বাঁধ আগলাতে দেখা গেল যুবকদের।

নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীকেও এই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শোনা গেল। ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের নদীবাঁধের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে তা স্বীকার করে নিলেন তিনি। সেচ দফতরের সচিবকে বললেন, আপনার দফতরের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সব থেকে বেশি। কী করে স্থায়ী ভাবে বাঁধ মেরামত করা যায় তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। প্রতি বছর বাঁধ ভাঙবে আর সরকার টাকা দেবে, এটা হতে পারে না।

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায়।

নদীবাঁধের ইতিহাস

ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরাই। ভরা জোয়ার আর কোটালের জলের দ্বীপগুলোতে দিনে দু’ বার ঢুকে পড়া রুখতে ম্যানগ্রোভ জঙ্গল সাফ করে, যাবতীয় বন্যপ্রাণীদের বিতাড়ন করে তীর বরাবর বাঁধ তৈরি করা হয়। এটার কারণ যেখানে মানুষ বসত গড়েছিলেন সেই জায়গাগুলো কোনো দিনই মাটি ফেলে এত উঁচু করা হয়নি বা যায়নি যাতে জোয়ারের জল ঢোকা আটকানো যায়। আর নদীর নোনাজল ঢুকলে চাষাবাদ তো দূরের কথা, মিলবে না খাওয়ার জল, জীবন কাটানোই মুশকিল হবে। তাই সুন্দরবনের ১০২টো দ্বীপের মধ্যে যে ৫৪টা দ্বীপে মানুষ বাস করতে শুরু করল, সেগুলোয় এ ভাবেই মাটির দেওয়াল বা বাঁধ দেওয়া হল।  মানুষের বসতি ও জীবনযাপনের বন্দোবস্ত করতে গিয়ে প্রায় পুরো ম্যানগ্রোভের জঙ্গল সাফ করে দেওয়া হল। ফলে স্বাভাবিক জোয়ারভাটায় পলি আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তাই পার্শ্ববর্তী জঙ্গল এলাকার তুলনায় মনুষ্য-বসতি দ্বীপগুলো হয়ে গেল আরও নিচু।

স্বাভাবিক জোয়ারভাটা বাধা পাওয়ায় নদীখাতেও নানান বদল এল – কোথাও তা পাশের দিকে চওড়া হয়, কোথাও হয় সরু। কিন্তু গঙ্গা দিয়ে বয়ে আসা বছরে ২০০ লক্ষ টন পলি হুগলি-মাতলা মোহনা অঞ্চলে এই ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আঁকাবাকা পথে নদীখাতের নানা অংশে জমতে থাকে, আর তার উলটো দিকেই জলের তোড়ে বাঁধের মাটি তলা থেকে সরে গিয়ে ভাঙতে থাকে পাড়।

এমন করেই গড়ে উঠেছে ৩৫০০ কিমি জুড়ে এক নদীবাঁধ যা সুন্দরবনের মানুষের জীবন, জীবিকা, রাজনীতি আর অর্থনীতির এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে সুন্দরবনের নানা অঞ্চলে নোনা ও মিষ্টি জলের মাছের চাষ একটা বড়ো রোজগারের পথ। নোনাজলে মাছচাষ বসিরহাট, ন্যাজাট, ভাঙড়, হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জে বেশি হয়, কিছুটা হয় কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা ও নামখানায়। এটা মূলত ভেনামি চিংড়ির (আগে ছিল বাগদা) চাষ, সঙ্গে অন্যান্য নোনাজলের মাছ, যেমন পারশে, ভাঙন, ভেটকি যা নদীর জলের সঙ্গে চলে আসে ভেড়িতে। জায়গায় জায়গায় মিষ্টি জলের রুই, কাতলা, পাবদা, গলদা চিংড়ির চাষও হয়। আয়লার মতো উম্পুনেও নদীর নোনাজল ঢুকে যাওয়ায় মিষ্টি জলের মাছ মারা গেছে। নোনাজলের মাছ জলে ভেসে গেছে। এই সব ভেড়ি বা পুকুরের পাড় খুব নিচু হওয়ায় এবং পাড়ের চার দিকে জাল না থাকায় বা ঝড়ে উড়ে গিয়ে মাছ ভেসে যাওয়া স্বাভাবিক। মাছ ভেসে যাওয়া বা পুকুরে বাইরের জল ঢোকা আটকাতে গেলে পাড় খুব উঁচু করতে হয়, আর তার ধারে জালের বেড়া দিতে হয়, যাতে তা জোরালো ঝড়ে না ছিঁড়তে পারে, তাই হালকা করে বেঁধে ভারী বাঁশের ওজন দিয়ে রাখতে হয়। পুকুরগুলো এই ভাবে তৈরি করালে এই বিপর্যয় হত না।

সুন্দরবনের লড়াকু নারী, যেন বঙ্গজননী।

বিকল্প অর্থনৈতিক পথের সন্ধানে  

এখন প্রশ্ন হল, আপাতত কী করা যাবে। প্রথমে আসা যাক নোনাজলের মাছ চাষে। ভেনামি চিংড়ি একটি বৈদেশিক প্রজাতি এবং এর চাষের সঙ্গে দূষণ, ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের পরিবেশগত সমস্যা জড়িয়ে রয়েছে। এ ছাড়াও এখানে চলে অর্থনৈতিক শোষণ। অবস্থা এমন হয়েছে যে আন্তর্জাতিক পরিবেশ নজরদারি সংস্থা গ্রিনপিস একে লাল তালিকাভুক্ত করে দেশে দেশে সুপারমার্কেটে প্রচার চালায়। বাগদা চাষও একই রকম ক্ষতিকারক। এই চাষের জন্যই আরও ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হয়েছে। ভারতের নানা রাজ্যের সরকার এই চাষ বন্ধ করতে বহু দিন ধরে চেষ্টা করছে। কিন্তু নীতিপঙ্গুতার জন্য কিছু হচ্ছে না।

এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার একটা ভালো পথ হল, ভাসমান খাঁচায় নোনা কাঁকড়া চাষে উৎসাহ দেওয়া। কাঁকড়া চাষ অনেক প্রাকৃতিক ও সহজ এবং এতে ক্ষতি কম। ম্যানগ্রোভ রেখেও করা যায়। শুধু বনে-জঙ্গলে ছোটো খোসা কাঁকড়া ধরার জন্য মৎস্যজীবীদের ইজারা দেওয়া দরকার। বনের অধিকার আইন ব্যবহার করে বাঘ সেনসাসের সময় যেমন সুরক্ষার বন্দোবস্ত করা হয়, তেমন ভাবে রোটেশনে এলাকা ভাগ করে করে বনের নানা ব্লকের খাঁড়িতে এই ব্যবস্থা করা যায়। এই খোসা কাঁকড়া ২০-২৫ দিনে ভারী ও মোটা হয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খুব ভালো দামে বিক্রি হয়। দেশেও বেশ চাহিদা। পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মীদের উচিত বন দফতরের উপর এই বিষয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা। এটা না হলে বেআইনি কাঁকড়া ধরা চলবে ও বন দফতরের অসহযোগিতায় এরা চরম নির্যাতিত হতেই থাকবে। এই তো সে দিন ঝিলা ৪ নম্বর জঙ্গল লাগোয়া নদীর খাড়িতে বাঘের আক্রমণে প্রাণ গেল চরঘেরির ভগবতী মণ্ডলের। আইনি ব্যবস্থা ও সুরক্ষা বাড়লে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারানো কমবে। আর যদি কখনও এমন দুর্ঘটনা ঘটে, লোকে জীবনবিমার টাকাটা পাবে।

নোনাজলে সি উইড বা নোনা শ্যাওলার চাষ খুব লাভজনক হতে পারে। নতুন করে নোনাজল ঢোকানোর দরকার নেই। ম্যানগ্রোভের নিউম্যাটোফোরের গায়ে হয়ে থাকা বেশ কিছু শ্যাওলা যেমন এন্টারোমরফা, উলভা প্রভৃতি নোনা পুকুরে দিব্যি চাষ করা যায়। এই শ্যাওলার বিপুল খাদ্যগুণ, উত্তম পশুখাদ্যও বটে এবং নানা ধরনের শিল্প যেমন কনফেকশনারি, বায়োটেকনলজি শিল্পে এর প্রচুর চাহিদা। সুন্দরবনে এমন চাষ করে সফল ভাবে দেখানো হয়েছে। এখন দরকার বৃহৎ উদ্যোগের।

সুন্দরবনের আপাতত অল্প লবণাক্ত হয়ে যাওয়া পুকুরগুলোয় ট্যাংরা, গুলশে, তেলাপিয়া এ সব মাছ করা যাবে। এ সব মাছের চাষ তিন থেকে ছয় মাসে শেষ হয় ও লাভজনকও। মিষ্টিজলের মাছ চাষ করতে গেলে পুকুরের নোনাজল ও তলার নোনা কাদামাটি পাম্প ও স্লাজ পাম্প দিয়ে বার করে, পুকুরে ক্ষারত্ব ও অম্লত্বের প্রকারভেদে জিপসাম বা চুন দিয়ে ট্রিট করে বর্ষার জল ভরতে হবে। পুকুর শুকিয়ে নিলে আরও ভালো হয়। সব ক্ষেত্রেই পুকুরের পাড় উঁচু করতে হবে ও এ বিষয়ে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে নিলে ভালো হয়।

ছবি: সুব্রত গোস্বামী

আরও পড়ুন: এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দক্ষিণবঙ্গ

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন