hungry world
ক্ষুধার্ত পৃথিবী। ছবি সৌজন্যে বরগেন ম্যাগাজিন।
শংকর ঘটক

পারমাণবিক অস্ত্রের ভবিষ্যৎ

হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে যে বোমা দু’টো ফেলা হয়েছিল সেগুলোর শক্তি ছিল যথাক্রমে ১৫ কিলোটন  আর ২১ কিলোটন। আজকের বোমাগুলোর তুলনায় নেহাতই ‘লিটিল বয়’। তাতেই বোমা ফেলার পরে আক্রমণস্থলের বাইরে তার প্রভাব পড়েছিল। আর আজ? শুধু রাশিয়া আর আমেরিকার কাছে যত পারমাণবিক অস্ত্র আছে সেগুলির মিলিত শক্তি ৬৬০০ মেগাটন (৬৬০০০০০ কিলোটন)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত বড়ো জায়গায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ২০১৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘জার্নাল অব আর্থ’স ফিউচার’-এ  তাঁরা একটি চিত্র দিলেন। তাঁরা বলছেন, বিশ্বযুদ্ধ নয়, ছোটোখাটো একটি আঞ্চলিক সংঘর্ষে দুর্বল ক্ষমতার ১০০টি পারমাণবিক বোমা (আছে ছোটো বড়ো মিলিয়ে ১৪৫০০টি) ব্যবহৃত হলে ৫,০০০,০০০,০০০ কিলোগ্রাম ভুসোকালি পৃথিবীর স্ট্রাটোস্ফিয়ারে (পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার বা ৩৩০০০ ফুট ওপরে) উঠে সূর্যালোক প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে দেবে। ঘন অন্ধকার নেমে আসবে সেই অঞ্চলে। এর ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যাবে। এই অবস্থা জারি থাকবে ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সাময়িক ভাবে ওজোন স্তরকেও নষ্ট করে ফেলবে। এর ফলে  অতিবেগুনী রশ্মির পৃথিবীপৃষ্ঠে আছড়ে পড়া ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। স্থলভূমি আর জলভূমির ইকোসিস্টেম তথা বাস্তুতন্তে ভেঙে পড়ে বিশ্ব পরমাণু দুর্ভিক্ষ (গ্লোবাল নিউক্লিয়ার ফেমিন) সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, “৮০-এর দশকে আমাদের ধারণা ছিল পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। এখন আমরা জানি, বিশ্বযুদ্ধের প্রয়োজন নেই, সামান্য একটি আঞ্চলিক পারমাণবিক যুদ্ধও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরে অবস্থিত অঞ্চলের বিপদ ডেকে আনবে।

এই তথ্য এখন সকলেরই জানা। কোনো উন্মাদ একনায়ক অথবা সন্ত্রাসবাদীদের ক্ষেত্রে অন্য রকমটা হলেও হতে পারে – যে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সাইবার দুনিয়ার অভাবনীয় অগ্রগতি সেই সম্ভাবনাকে তরান্বিত  করছে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অস্ত্রময়/ প্রথম পর্ব

একটা প্রশ্ন তবু থেকেই যায়। যা ব্যবহারের অযোগ্য সেটা নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন?

একটু অন্য প্রসঙ্গে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি গান উদ্ধৃত করতে লোভ হচ্ছে –  “কঠিন লোহা কঠিন ঘুমে ছিল অচেতন, ও তার ঘুম ভাঙাইনু রে।/ লক্ষ যুগের অন্ধকারে ছিল সঙ্গোপন, ওগো তায় জাগাইনু রে।… অচল ছিল, সচল হয়ে ছুটেছে ওই জগৎ-জয়ে…”

লক্ষ যুগের অন্ধকারে সঙ্গোপনে থাকা তেজস্ক্রিয় পদার্থের ঘুমটা ভাঙিয়েই বিপদ। ঊনবিংশ-বিংশ শতকের সন্ধিকালে একগুচ্ছ বিজ্ঞানী ঘুম ভাঙালেন তেজস্ক্রিয় পদার্থের। প্রথম দেখালেন পরমাণুকেন্দ্রে জমাটবাঁধা শক্তি। সেই সুপ্ত শক্তিকে মুক্ত করা হল। সেই মুক্ত শক্তিকে ফের সুপ্ত করা, আবার ঘুম পাড়ানো, অত সহজ নয় আর। যেটুকু করা যাচ্ছে সেটাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পারমাণবিক অস্ত্র প্রকৃত অর্থে ব্যবহারের অযোগ্য। কারণটা খুবই স্পষ্ট। যে মারবে সে-ও মরবে, নিজের ছোড়া অস্ত্রেই। মাঝখান থেকে গলার কাঁটা হয়েছে তৈরি অস্ত্রসম্ভার। এই সব অকাজের বস্তুগুলোর নিরাপত্তা আর আনুষঙ্গিক খরচ প্রতি সেকেন্ডের হিসেবে হয়। ইতিমধ্যেই দুই প্রধান, রাশিয়া আর অ্যামেরিকা, তাদের নিজের নিজের মজুদ ভাণ্ডার দশ ভাগের এক ভাগ করে ফেলেছে। দ্রুত কমানো সম্ভব নয় খরচের কারণে।

আর শান্তির জন্য পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার? ১৯৭০ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সুইডেনের পদার্থবিদ হানেস আল্‌ফফেন খানিকটা বিদ্রূপের সুরেই বলেছিলেন, “অ্যাটমস ফর পিস অ্যান্ড অ্যাটমস ফর ওঅর আর সিয়ামিজ টুইন্‌স (শান্তির জন্য পরমাণু আর যুদ্ধের জন্য পরমাণু যেন অবিচ্ছেদ্য জোড়)। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য পৃথক একটি নিবন্ধের প্রয়োজন।

অতএব, এই কথাটি বলাই যায় যে আমরা জেনে অথবা না জেনে বাঘের পিঠে চেপেছি। নামার কৌশল আমাদের জানা নেই।

geography-of-hunger
জিওগ্রাফি অব হাঙ্গার, খোসুয়ে দে কাস্ত্রো।

একটি অপ্রাসঙ্গিক উপসংহার: ক্ষুধার ভূগোল

হ্যাঁ, এই নামেই একটি বই লিখেছিলেন জোসিউ ডি কাস্ট্রো। ১৯৫২ সালে ‘জিওগ্রাফি অব হাঙ্গার’ শিরোনামে বইটি প্রকাশিত হল বোস্টনের লিটল, ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৩৭। প্রখ্যাত অধ্যাপক মার্শাল ক্রেন এই বইটি সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই বিষয়ে কথা বলতে পারেন এমন হাতে গোনা যে ক’ জন  বিশেষজ্ঞ এই বিশ্বে আছেন জোসিউ ডি কাস্ট্রো তাঁদের অন্যতম।”

রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংগঠনের (ইউএন এফএও) প্রধান খোসুয়ে দে কাস্ত্রো বিস্তারিত হিসেব কষে দেখালেন যে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই দীর্ঘকাল স্থায়ী অনাহারে জীবনযাপন করেন। বলেছিলেন ১৯৫২ সালে। তার মাত্র কয়েক বছর আগেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসান হয়েছে। দুনিয়া জুড়ে অব্যবস্থা। দুনিয়া জুড়ে হাহাকার, অনাহার, অপুষ্টি। পরবর্তী ষাট-সত্তর বছরে কৃষিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক উন্নতি ঘটেছে। স্বাচ্ছন্দ্য বেড়েছে, চাকচিক্য বেড়েছে। কিন্তু অনাহার ক্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা? সেটাও দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। বিশ্ব সংস্থার হিসেব বলছে ২০১৬ থেকে ২০১৭-এর মধ্যে এই বৃদ্ধি ১১ শতাংশ। ১৯৫২ সালে জোসিউ ডি কাস্ট্রো বলেছিলেন, অনাহার ব্যাপারটাই মনুষ্যসৃষ্ট। ম্যালথাসের তত্ত্ব নস্যাৎ করে এই কথা বলেছিলেন তিনি। তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ৩০০ কোটি। অর্থাৎ খেতে না পাওয়া মানুষের সংখ্যা তখন ছিল ২০০ কোটি। তখন ছিল রণক্লান্ত অরাজকতা-পূর্ণ বিশ্ব। আধুনিক সম্ভ্রান্ত বিশ্বের ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষ অভুক্ত।

রাষ্ট্রপুঞ্জ বলছে, বিশ্ব জিডিপির মাত্র ০.৩% অর্থাৎ বছরে ২৬৭০০ কোটি টাকা খরচ করলেই বিশ্বকে অনাহারমুক্ত করা যায়। পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত খরচের এটা একটা ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র।

বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে এই কাজ কি সম্ভব হবে কোনো দিন?

পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে বর্তমানে যে যুদ্ধ, দাঙ্গা, লড়াই হচ্ছে, এক একটা দেশকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর বিপুল ব্যয়ভার বর্তমান হিসেবে ধরা হয়নি। হয়তো সেটুকু দিয়েই বিশ্বের অনাহার দূর করা যায়। (শেষ)

তথ্যসূত্র:

  1. Frederick Soddy, ‘Technology Assessment’ of Atomic Energy, 1900-1915,” Science, Technology, & Human Values, Vol. 14 No. 2 (Spring, 1989), pp. 163-194: 170)
  2. “Atomic Audit:The Cost and Consequences of U.S. Nuclear Weapons Since 1940”-By Stephen Schwartz
  3. https://www.brookings.edu/the-hidden-costs-of-our-nuclear-arsenal-overview-of-project-findings/
  4. The Telegraph UK 11.10.2017

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here