রবিবারের পড়া: বর্ণময় ব্যক্তিত্ব সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে স্মরণ

0
Subrata Mukherjee
শ্রদ্ধার্ঘ্য। একডালিয়া এভারগ্রিন ক্লাবের চেয়ারম্যান সুব্রত মুখোপাধ্যায় বসতেন এই ঘরেই। ছবি: রাজীব বসু।

১৯৭১। রাজ্যে চার বছরে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন। ’৬৭, ’৬৯-এর পর ’৭১। আগের নির্বাচন দু’টোর ফলের ভিত্তিতে যে দু’টি সরকার গঠিত হয়েছে, তার অভিজ্ঞতা রাজ্যবাসীর কাছে খুব একটা সুখের হয়নি। এর মূল কারণ সরকারের স্থায়িত্ব। কোনো কোয়ালিশন সরকারই কয়েক মাসের বেশি টেকেনি। ফলে আবার নির্বাচনে যেতে হল রাজ্যকে।

১৯৬৬-এর খাদ্য আন্দোলনের রেশ ধরেই ’৬৭-এর নির্বাচনে একচেটিয়া কংগ্রেসি শাসনের পতন। কংগ্রেস থেকে ভেঙে আসা অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে সিপিএমের নেতৃত্বে বামপন্থী দলগুলি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করল। কিন্তু মাত্র ৯ মাস চলার পর খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের বিদ্রোহে সরকার ভেঙে যায়। জারি হয় রাষ্ট্রপতি শাসন।

আবার নির্বাচন ১৯৬৯-এ। এ বারেও গঠিত হল যুক্তফ্রন্ট সরকার। সিপিএম বৃহত্তম দল হওয়া সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী হলেন বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়। তেরো মাস চলল সেই সরকার। সিপিএম আর বাংলা কংগ্রেসের বিরোধে ভেঙে গেল সরকার। আবার রাষ্ট্রপতি শাসন।

পরের বছর আবার নির্বাচন। ১৯৭১-এর সেই নির্বাচনে ১১১টি আসন পেয়ে সিপিএম বৃহত্তম দল হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গড়ল বাংলা কংগ্রেস, সিপিআই-সহ কয়েকটি দল। ৫টি আসনে জয়ী বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হলেন।

এই নির্বাচনে জয়ের পর সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটল কংগ্রেসের লড়াকু ছাত্রনেতা ২৫ বছরের সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের। আগের দু’টি যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী জ্যোতি ভট্টাচার্যকে বালিগঞ্জ কেন্দ্রে পরাজিত করলেন তিনি। রাজ্য রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটল এক বর্ণময় ব্যক্তিত্বের।

’৭১-এর ভোটের ফলের ভিত্তিতে যে সরকার গঠিত হয়, তার মেয়াদ ছিল আগের দু’টি সরকারের তুলনায় আরও কম। এ বার সরকার টিকল মাত্র ৮৭ দিন। ফের ফিরে এল রাষ্ট্রপতি শাসন।      

১৯৭২। পাঁচ বছরে চতুর্থ বার নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে। বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে আবার জ্যোতি ভট্টাচার্যকে হারালেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়।

রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী। ছবি: অশোক বসু

পশ্চিমবঙ্গে সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ’৭২-এর নির্বাচনকে কলঙ্কজনক অধ্যায় বললে বোধহয় অত্যুক্তি হয় না। সেই প্রথম রাজ্যের জনগণ ‘রিগিং’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হয়।

সেই নির্বাচনে জিতে সরকার গড়ল কংগ্রেস। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হল। সেই সরকারে তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী হলেন ২৬ বছরের সুব্রত মুখোপাধ্যায়।

কলকাতায় চলচ্চিত্র বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে উত্তমকুমারের সঙ্গে এক আলাপচারিতায়। ছবি: অশোক বসু।

সত্তর দশকের এই সময়টাতেই উত্তাল হয়ে ওঠে দেশীয় রাজনীতি এবং রাজ্যের রাজনীতি। এক দিকে কংগ্রেস নেতা ইন্দিরা গান্ধী যখন দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করছেন, ঠিক সময়ে রাজ্যে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের পুলিশ নকশালদের মোকাবিলায় ব্যস্ত এবং সমালোচিত। এ সবেরই প্রতিফলন ঘটল ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে। রাজ্যে ক্ষমতায় বসল বামফ্রন্ট, যাদের শাসন চলল ৩৪ বছর।


কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের এক সভায় প্রিয়রঞ্জন দাশমুনশি, প্রণব মুখোপাধ্যায়, সোমেন মিত্র ও এবিএ গনি খান চৌধুরীর সঙ্গে।

১৯৭৭-এ বালিগঞ্জে হেরে গেলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা তরুণ কংগ্রেস নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায়। পরের নির্বাচন থেকে বালিগঞ্জ থেকে চলে গেলেন জোড়াবাগানে। ১৯৮২, ১৯৮৭ এবং ১৯৯১-এর নির্বাচনে জিতে বিধানসভায় জোড়াবাগানকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সুব্রতবাবু।

১৯৯৬-এর নির্বাচনে চলে এলেন চৌরঙ্গি কেন্দ্রে। সেখান থেকে জিতলেনও। ২০০১-এর নির্বাচনেও চৌরঙ্গি থেকে জিতলেন সুব্রতবাবু।

কালীঘাটে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে দলীয় অফিসে সাংবাদিক সম্মেলনে।

ইতিমধ্যে কংগ্রেস ছেড়ে সুব্রতবাবু ১৯৯৯-এ যোগ দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে। ২০০০ সালে কলকাতার মেয়র হলেন। ২০০৪ সালে কলকাতা উত্তর পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্র থেকে লড়ে পরাজিত হলেন সুব্রতবাবু।

২০০৫-এর পুরসভা ভোটের আগে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে সুব্রতবাবু যোগ দেন এনসিপি-তে। ২০০৬-এ চৌরঙ্গি কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী হিসাবে লড়াই, সেই বছরেই রাজ্যসভা আসনে লড়াই, ২০০৯-এ বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্র থেকে লড়াই – তিন বারেরই ফল এক, পরাজয়।

ধর্মতলায় দুঃস্থদের সাহায্যের জন্য অর্থসংগ্রহ অভিযানে বিরোধী নেত্রী সাংসদ মমতা বন্দ্যপাধ্যায়ের সঙ্গে।

সুব্রত মুখোপাধ্যায় ২০১০-এ ফিরে এলেন তৃণমূল কংগ্রেসে, এবং ২০১১-য় তাঁর যৌবনের বালিগঞ্জ কেন্দ্রে। সেই থেকে আমৃত্যু তিনি বালিগঞ্জেরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং রাজ্য সরকারের পঞ্চায়েতমন্ত্রী হিসাবে কাজ করেছেন।

মাঝে ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে দল সুব্রতবাবুকে বাঁকুড়া কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করেছিল। কিন্তু তিনি হেরে যান।

উল্টোরথের দিন ত্রিধারা সম্মিলনীর খুঁটিপুজোয় পাঁপড়ভাজা খাচ্ছেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়।

রাজনীতির বাইরে আরও একটা জগৎ ছিল সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের – অভিনয় জগৎ। ১৯৮৮ সাল। অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়ের প্রযোজনায় সুব্রত মুখোপাধ্যায় হিরোর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন টিভি সিরিয়াল ‘চৌধুরী ফার্মাসিউটিক্যালস’-এ। তবে ১৪ পর্বের পর এই সিরিয়াল বন্ধ হয়ে যায়। ওই টিভি সিরিয়ালে নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন মুনমুন সেন।   

মহাকারণে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর কাছে সরকারি কাজে তদানীন্তন কলকাতার মেয়র।

রাজনৈতিক রঙ নির্বিশেষে দিলখোলা, সদাহাস্য সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সকলেরই ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল মধুর। কখনোই কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতেন না। কারও সম্পর্কে কটূ কথা বলে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করার মতো মানুষ ছিলেন না সুব্রতবাবু। তাই কালীপুজো-দীপাবলির রাতে আঁধার নামিয়ে সুব্রত মুখোপাধ্যায় যখন চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন, তখন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রকৃত অর্থেই বেদনাদীর্ণ হয়েছিলেন।

ছবি: রাজীব বসু; অশোক বসুর তোলা ছবি দু’টি রাজীব বসুর সৌজন্যে পাওয়া।   

আরও পড়তে পারেন  

সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পর সোমবার স্থগিত থাকবে বিধানসভার অধিবেশন

চোখের জল আর গান স্যালুটে শেষ বিদায় সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে  

প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়, ‘আলোর দিনে অন্ধকার নেমে আসবে ভাবতেও পারিনি’, বললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়                      

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন