রবিবারের পড়া: এক ভিন্ন আঙ্গিকে রবীন্দ্র-স্মরণ শিল্পী নমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের

0

পাপিয়া মিত্র

‘মোর নাম এই বলে খ‍্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক, আর কিছু নয় – এই হোক শেষ পরিচয়’। আমজনতার মাঝে কবিই থাকতে চেয়েছেন তিনি আজীবন, মন্দির-মসজিদ-গির্জায় আবদ্ধ দেবতা হিসেবে নয়। তাই সন্ধানী মানুষের মনে থেকে গিয়েছেন নিজের সৃষ্টির মাঝে নিভৃতপ্রাণের দেবতা হয়ে।

Loading videos...

চার দিকের আবহাওয়ায় এখন অতিমারির ঘন কুয়াশার চাদর। দিনের পরে দিন যায় এক আতঙ্কে ভর করে। তবুও এর মাঝে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোর মতোই পালিত হয়ে চলেছে কবির ১৬০তম জন্মোৎসব।

নমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সম্প্রতি ‘জয় যাত্রা’, ‘রম‍্যবীণা’ ও ‘পুনশ্চ’-র আমন্ত্রণে ফেসবুক লাইভে এসেছিলেন সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক নমিতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, একটু অন্য আঙ্গিকে। যেমন, ‘জয় যাত্রা’ ফেসবুক পেজ থেকে জয়ী বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের অনুরোধে নমিতা তাঁর ‘মুক্তধারা’ শিল্পীগোষ্ঠীর তিন শিল্পীকে নিয়ে পরিবেশন করেন ‘গীতাঞ্জলি’ ও তার ইংরেজি অনুবাদ ‘সং অফারিংস্’-এর কিছু গান। ‘একটি নমস্কারে প্রভু’ শীর্ষক নিবেদনে তিনি বলেছেন নিভৃত প্রাণের দেবতার কথা। মংপুতে বসে মৈত্রেয়ীদেবীকে কবি বলেছিলেন, তিনি কোনো দেবতা সৃষ্টি করে প্রার্থনা করেন না। নিজের কাছে নিজের যে মূর্তি, সেই মূর্তির জন্য চেষ্টা করেন। সুতরাং ‘গীতাঞ্জলি’র গানগুলি ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে কবির এক নিভৃত আত্মকথন।

১৫৭টি গান নিয়ে ‘গীতাঞ্জলি’র প্রথম প্রকাশ ১৩৫৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে। ইন্ডিয়ান পাবলিশিং হাউজ থেকে প্রকাশ করেন সতীশচন্দ্র মিত্র। পাশাপাশি বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’ থেকে ৫৩টি গান ও ‘নৈবেদ্য’, ‘উৎসর্গ’, ‘খেয়া’, ‘অচলায়তন’, ‘গীতিমাল্য’-সহ আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ থেকে ৫০টি কবিতা বেছে নিয়ে সেগুলিকে দু’ মলাটে ধরে রাখেন ‘সঙ অফারিংস’ তথা ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’তে। নমিতার ব‍্যাখ‍্যায় যে কবিতাগুলিতে কবি জীবনদেবতার আরাধনা করে চলেছেন পরবর্তীতে সেগুলিকেই ব‍্যক্তিগত জীবনে বন্ধু করে তুলেছেন। তাই কবির কথায় ‘দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়েরে দেবতা’। তাই প্রভু আর ঈশ্বরের মুখোমুখি হয়ে জানতে চেয়েছেন কী ভাবে করুণার ধারা বয়ে চলেছে। তাঁর কবিতা গান সবই এক মহাশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ।

শাশ্বতী বিশ্বাস।

‘জয় যাত্রা’য় নমিতার পরিবেশনে ছিল ‘তাই তোমার আনন্দ আমার পর’, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’ ও ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’ গান তিনটি। পরে শাশ্বতী বিশ্বাস পরিবেশন করেন ‘জগত জুড়ে উদার সুরে’, ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’ ও ‘ওই আসন তলে’। উমা চট্টোপাধ‍্যায় শোনান ‘তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে’, ‘যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু’ ও ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ এবং লোপামুদ্রা  মুখোপাধ‍্যায়ের নিবেদনে ছিল ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা’, ‘এই যে তোমার প্রেম ওগো’ ও ‘একটি নমস্কারে প্রভু’।

রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন মানে কয়েকটি গান গাইলাম এমনটি মনে করেন না শিল্পী নমিতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়। তাঁর সৃষ্টির প্রেক্ষিত তুলে এনে তিনি তাঁর উত্তরসূরিদের তা বুঝিয়ে দিতে চান। কোন সময়ে রবীন্দ্রসংগীত কোথায় কী ভাবে পরিবেশিত হয়েছে তার অনুসন্ধান করেন। যেমন ‘রম‍্যবীণা’র ফেসবুক লাইভে ‘চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীতের ব‍্যবহার’-এর বিষয়টি সামনে এনে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর জন্মদিনে স্মরণ করেছেন নমিতা। ঋত্বিক ঘটক, সত‍্যজিৎ রায়, তপন সিনহা, অপর্ণা সেন, হীরেন নাগ, বিমল রায়, তরুণ মজুমদার, পিনাকী মুখোপাধ‍্যায়, হৃষীকেশ মুখোপাধ‍্যায় প্রমুখ পরিচালক সুপরিকল্পিত ভাবে রবীন্দ্রসংগীত ব‍্যবহার করে তাকে এক অন‍্য মাত্রা দিয়েছেন চলচ্চিত্রজগতে। আসলে রুচিশীল সমাজে রবীন্দ্রসংগীতের এক বিশেষ জায়গা আছে।

‘বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা’ ছবিতে ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ এবং ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে’ রবীন্দ্রসংগীত দু’টি পরিবেশটিকে মহিমান্বিত করেছে। ‘রম‍্যবীণা’ আয়োজিত রবীন্দ্রজয়ন্তীতে নমিতা অনুষ্ঠানের সূচনা করেন ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ গানটি দিয়ে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় ‘এ পরবাসে’ গানটি সুকৌশলে ব‍্যবহৃত হয়েছে এবং তা সম্ভব হয়েছে পরিচালক সত‍্যজিৎ রায়ের কুশলতায়। ‘আগন্তুক’ ছবি থেকে শিল্পী নিবেদন করেন ‘বাজিল কাহার বীণা’ গানটি। পরিচালক অপর্ণা সেন ‘পারমিতার একদিন’ ছবিতে ‘হৃদয় আমার প্রকাশ হল’ ও ‘বিপুল তরঙ্গ রে’ গান দু’টি রেখেছিলেন। শিল্পীর কণ্ঠে শোনা গেল দ্বিতীয় গানটি।

উমা চট্টোপাধ্যায়।

সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি শিল্পী নমিতা নানা তথ‍্যে সমৃদ্ধ করে চলেছিলেন দর্শকবন্ধুদের। চলচ্চিত্রে কখনও কখনও কাহিনির ভাব ও সময় অনুযায়ী সংগীত ব‍্যবহার করা হয়। সময়কালকে ধরতে ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান’, পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘স্ত্রীর পত্র’-এ ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’, ‘সুভাষচন্দ্র’ ছবিতে ‘তোমার আসন শূন‍্য আজি’-সহ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত গান সম্পর্কে বহু তথ‍্য শুনিয়েছেন শিল্পী। আবার কাহিনির ভাব ঠিক রেখে গান দিয়ে বিষয়বস্তুকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে ‘তিনকন্যা’ ছবির ‘বাজে করুণ সুর’ গানটি। তরুণ মজুমদারের বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অলংকার হিসেবেও ব‍্যবহৃত হয়েছে রবীন্দ্রসংগীত। যেমন, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’, ‘পথভোলা’ ইত্যাদি। একাধিক ছবিতে ব‍্যবহৃত ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’ গানটি গীত হয়েছে। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে গানটি সময়োপযোগীও বটে। শিল্পী যে কবির আশ্রমকন‍্যা সুচিত্রা মিত্রের ছাত্রী তা তাঁর পরিবেশনায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

লোপামুদ্রা মুখোপাধ্যায়।

আরও বিভিন্ন ধারায় রবীন্দ্রসংগীত ব‍্যবহার হয়েছে চলচ্চিত্রে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় ‘অবসর’ সিনেমায় ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’-র কথা। ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি’-র সুরে হিন্দি ‘অভিমান’ ছবিতে শুনতে পাই ‘তেরে মেরে মিলন কি ইয়ে রয়না’ গানটি। সর্বোপরি উল্লেখ‍্য, আমাদের জাতীয়সংগীত ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’-র প্রসঙ্গ। এই গান নানা ভাষায় নানা ছবিতে পরিবেশিত হয়েছে। ১৯৪৩-এ ‘উদয়ের পথে’ ছবিতে পরিবেশিত হয় এই গান। ‘চারুলতা’ ও ‘আলো’ ছবি থেকে ‘আমি চিনি গো চিনি’ ও ‘আমরা নতুন যৌবনেরই দূত’ পর পর নিবেদন করেন নমিতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়।

এর পর পাই ‘পুনশ্চ’র আমন্ত্রণ। আয়োজক দর্পনারায়ণ চট্টোপাধ‍্যায়ের ঐকান্তিক চেষ্টা বিরত থাকেনি অতিমারির আবহেও। ফেসবুক লাইভ করে চলেছেন গুণীজনদের নিয়ে শিল্পী দর্পনারায়ণ। এখানে শিল্পী নমিতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় গানের ডালি সাজিয়েছেন নাটকের গান নিয়ে। শুরু করেন এক মনোগ্রাহী উক্তি দিয়ে – “তোমার পায়ের পাতা, সবখানেতে পাতা” – কবি দীনেশ দাস কবিগুরু সম্পর্কে কথাগুলি বলেছেন। জলে স্থলে অন্তরীক্ষে যেখানেই যাবে তাঁকে পাবে মনে মনে। তাঁর সৃষ্টি নিয়ে আমাদের পথ চলা। খুব সুন্দর ভাবে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন কবি। একবার তিনি রেলগাড়ি করে বোলপুর থেকে কলকাতায় ফেরার পথে দেখলেন একটি বহমান নদীকে। সেই চলার গতি দেখে কবি লিখলেন ‘ওগো নদী, আপন বেগে পাগল-পারা’ এবং ব‍্যবহার করলেন ‘ফাল্গুনী’ নাটকে। শিল্পী নমিতা শুরু করেন ‘বাঁশরী’ নাটক থেকে ‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়’ গানটি দিয়ে এবং পরে একে একে শোনান ‘ওগো নদী, আপন বেগে’, ‘অচলায়তন’ থেকে ‘কঠিন লোহা কঠিন ঘুমে ছিল অচেতন’, ‘ভগ্নহৃদয়’ থেকে ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’, ‘শ্রাবণগাথা’ থেকে ‘হৃদয় মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু’ ও শিলাইদহে রচিত ‘তাসের দেশ’ থেকে ‘ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে’ গানগুলি।

এরই মাঝে শিল্পী শুনিয়েছেন সেই কাহিনি, কী ভাবে শুরু হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন পালন করা। ভাগনি সরলাদেবী ১৮৮৭ সালের ৭ মে প্রথম জন্মদিন পালন করেন পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে। শোরগোলে প্রায় সকলের ঘুম ভাঙে। তখন কবির বয়স ২৬। কবির ৭৫ বছর বয়সে শান্তিনিকেতনে নববর্ষের দিন জন্মদিন উৎসব পালন করা হয়। সেই রীতিই চালু হয়ে গিয়েছিল বরাবরের জন্য।

‘আপনারে তুমি করিবে গোপন কী করি/হৃদয় তোমার আঁখির পাতায় থেকে থেকে পড়ে ঠিকরি’। কবির দীপ্তি এমনই।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন