রবিবারের পড়া: নির্ধনের ধন হইবে, নির্ঘরের ঘর

0

দীপঙ্কর ঘোষ

স‍্যাটিরিক সেন। পিতৃদত্ত নাম সত‍্যরিকাক্ষ সেন। পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে একটি বিখ‍্যাত গেঞ্জি কারখানার মালিকানা পেয়েছেন। স্ফীতোদর। বজ্রকন্ঠী। শ্বেতশুভ্র  শ্মশ্রুশোভিত। সদ‍্য যখন যৌবন নিকুঞ্জের পাখি কাকা বলে ডেকেছিল তখন কৈশোরের উপান্তে বিয়ে করে ফেলেন। পরে নিরতিশয় মনস্তাপে ও সমাজসেবার অনুপ্রেরণায় বৌকে পিত্রালয়ে ছেড়ে আসেন। ব্যাস, খেল খতম পয়সা হজম। এ বার নিরন্তর সমাজসেবা, নো পিছুটান। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অগাধ সম্পত্তি – একটি প্রাসাদোপম গৃহ এবং অনন্ত অবকাশ – এই এখন সম্বল।

স‍্যাটিরিকবাবু নিঃসন্তান। বাবু প্রত‍্যহ প্রদোষকালে কতিপয় স্থানীয় প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ-বয়োবৃদ্ধ সমভিব্যাহারে বিভিন্ন আলোচনায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। উক্ত আলোচনাসভাটি ‘মুক্তিপ্রসার ধরণি’ নামে সবিশেষ পরিচিত। সময়ের বিশেষ আহ্বানে অদ্যকার বিশ্লেষণের বিষয়বস্তু ‘ক‍্যা’ বা সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট। এবং যে হেতু এই মহতী সভার ব‍্যয়ভার স‍্যাটিরিকবাবুই স্বস্কন্ধে বহন করেন এবং খাদ‍্যদ্রব‍্যাদি স‍্যাটিরিকবাবুর পাচক ও সর্বক্ষণের সঙ্গী গোলগাল কুঁতকুঁতে চোখ গোপাল‌ই সরবরাহ করে, তাই উদ্বোধনী বক্তা সদাসর্বদাই স‍্যাটিরিকবাবু। 

এই আড্ডার বাকি সকলের নামাবলি নিম্নস্বরূপ।

প্রথম চপলকান্তি কান্তি। সিড়িঙ্গে তিরিক্ষি ভাঙা গাল কুচকুচে কলপমাখা চুল। পরম ভক্ত। একটু ইয়ের দোষ আছে।

দু’ নম্বরে কপোত মুহুরি। এক সময়ে ল‍্যান্ড রিফর্ম বিভাগে ভারী পদে চেয়ার সামলাতেন। ইনি মধ‍্যম বর্ণ, মধ‍্যম আকৃতি, ঝুপো গোঁফ আছে। সদাসর্বদা গলায় গোরুর গলকম্বলের মতো একটা মাফলার জড়িয়ে রাখেন।

তৃতীয় ব‍্যক্তি পঞ্চানন মণ্ডল, ওরফে পাঁচু মোড়ল। খোঁচা খোঁচা ঝাঁটামার্কা চুল, গোঁফ পেকে গিয়েছে, তাই নির্গুম্ফ। চাঁদের মতোন মিষ্ট হাসি। অবসরে গানবাজনা করে থাকেন।

চতুর্থত, আন্তরিক মজুমদার। ইনি লিবারেল, বাংলায় যাকে এক কথায় বলে সুবিধাবাদী। তীক্ষ্ণ চোখ ভোঁতা নাক এবং ভূষুন্ডি কাকের মতোন একমাথা কুচকুচে কালো চুল।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: সখী ভালোবাসা কারে কয়?

নিজের বেনসন হেজেস সিগারেটের প‍্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে মুখে লাগিয়ে স‍্যাটিরিকবাবু আরম্ভ করেন (হেব্বি দেখতে লাগছিল কিন্তু – একমুখ শ্বেতশুভ্র দাড়ি-গোঁফ,পাকা ব‍্যাকব্রাশ করা চুল, চকচকে পাঞ্জাবি, আলিগড়ী পাজামা আর চিত্রবিচিত্র হাতকাটা জ‍্যাকেটে)।

“বন্ধুগণ আজ সন্ধ্যায় আমরা স্বাধীনতার পরে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করব এবং একই সঙ্গে ‘ক‍্যা’ আজ ভারতের পক্ষে কতটা প্রয়োজনীয় এবং উপকারী সেটা বোঝাতে চেষ্টা করব।”

চপলবাবু অঙ্গুলিচালনায় নিজের কলপিত কুঞ্চিত কেশদাম সুবিন্যস্ত করে বললেন, “সাধু সাধু, বিধর্মীশূন্য হোক আমাদের পুণ‍্যভূমি – সনাতন ধর্মের পীঠস্থান সুজলা সুফলা মাতৃভূমি…।” বলা বোধ করি বাহুল্য হবে না যে চপলবাবু একজন প্রবল হিন্দু।

স‍্যাটিরিকবাবু ঈষৎ ভ্রূ কুঞ্চন করে পূর্বসুত্রের লাঙ্গুল ধরতে উদ‍্যত হলেন – “আহা, সম্প্রচারে বিঘ্ন ঘটাচ্চো ক‍্যানো হে?”

শ্রী কপোত মুহুরি চপলবাবুকে মৃদু ভর্ৎসনা করলেন। স‍্যাটিরিকবাবু পুনঃপ্রচারোদ‍্যত – “এই অভাগা ভারতে যে কত কত মানুষ গৃহহীন, তাদের কথা কেউই চিন্তা করে না। ক’ দিন আগে এই রাস্তায় একটা পাগলিকে দেখতুম – নোংরা, চান না করা চেহারা, কোটরে বসা চোখ – একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে ঘুরত। ক’ দিন পর দেখি পাগলিটার সেই বাচ্চাটা মরে গেচে আর তাকেই কোলে নিয়ে ঘুরচে – তার এক বচ্ছর পর দেখি আবার একটা সদ‍্যোজাত বাচ্চা নিয়ে ঘুরচে…। এই মানুষের নাগরিক অধিকার কে রক্ষা করে বলো দেখি? কীই-বা এদের নাগরিক অধিকার আচে? খাদ‍্য নেই বস্ত্র নেই শিক্ষা নেই…।” 

সংগীতশিল্পী এবং পঞ্চায়েত কর্মাদির বিষয়ে বিশেষ দক্ষ শ্রী পাঁচু মোড়ল বলেন  “ইসস মেয়ে মানে কি কেবলই কৃষ্ণগহ্বর? মানুষের রুচি নেই, বোধ নেই?” মোড়লমশাইয়ের আশ্চর্য হ‌ওয়ার ক্ষমতাও বিলুপ্ত। উনি কিঞ্চিৎ খাবি খান।

স‍্যাটিরিকবাবু নাক খুঁটে পরম যত্নে আঙুলদু’টি টেবিল-ঢাকনার উপরিদেশে মুছে নিয়ে বক্তব্য দীর্ঘায়িত করতে থাকেন – “এই হাজার হাজার মানুষ যে পথেঘাটে ফুটপাতে ইস্টিশনে থাকে – আমরা এদের নিয়ে ভাবিই না। এদের আদমশুমারিতে ধরা হয়তো হয় হয়তো নয়…।”

পাঁচু মোড়ল বলেন, “বহু ক্ষেত্রেই হয় না, কে যাবে মশয় ওই সব আস্তাকুঁড়েতে? তা ছাড়া এদের ঠিকানারও তো ঠিকঠিকানা নেই – আজ গয়েশপুরে তো কাল হেতমপুরে, তার পরের দিন বর্ধমানের ভাতারে… বুইলেন কিসু? এরা কেউ নয় কিস‍্যু নয় জাস্ট ফালতু।”

স‍্যাটিরিকবাবু কিঞ্চিৎ ভেবে বলেন, “তা হলে এদের নাগরিক অধিকার আদায় করার উপায় কী?”

চপলকান্তিবাবু ধুয়ো ধরেন, “অবাঞ্ছিত বিধর্মীদের বের করে দিলেই এদের জন্যে কিছু ব‍্যবস্থা করা সম্ভব।”

“কিন্তু চপলবাবু সব বিধর্মীকে তো অন্য কোথাও পাঠানো যাবে না…যারা যুগ যুগ ধরে এ দেশে আছে… তাদের কোথায় পাঠানো হবে? তাদের তো অন্য দেশে কিছুই নেই… সে তো ভারী মুশকিলের কথা…” – পাঁচু গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: সমাজের যে কোনো আঘাতে কেঁপে উঠতেন কবি বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

স‍্যাটিরিকবাবু পরম মমতায় হুঁ হুঁ করে হাসেন – “না হে না। ওই জন‍্যেই উনিশশো একাত্তর সালটাকে ভিত্তিবর্ষ ধরা হয়েচে। এ বার বুঝলেন মশয়রা?”

ইতিমধ্যে গোলগাল গোপাল একটা ট্রেতে করে ধূমায়িত কফি আর গরমাগরম ফিশফ্রাই নিয়ে এল। কফিতে চুমুক দিয়ে ডান হাতে ফিশফ্রাই ধরে স‍্যাটিরিকবাবু চালাতে থাকেন – “উত্তরপ্রদেশে… কেবলমাত্র উত্তরপ্রদেশেই তিন কোটি আটাত্তর লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি নেই…। হ‍্যাঁ, এটা দু’ হাজার এগারো সনের আদমশুমারিতে জানা যায়। উত্তরপ্রদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় কুড়ি কোটি চল্লিশ লক্ষ মানে প্রায়…উঁ উঁ উঁ…উনিশ শতাংশ লোকের ঘরবাড়ি নেই। আর মহারাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যা এগারো কোটি চল্লিশ লক্ষ তার এগারো দশমিক নয় শতাংশের মানে এক কোটি ছত্রিশ লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি কিস‍্যু নেই, নাগরিক অধিকার – স্বাস্থ্য – শিক্ষা – আব্রু – কিস‍্যু নেই – বুঝলেন?”

কচরমচর কচরমচর। শব্দটি ফিশফ্রাই চিবোনোর। এই মহতী বক্তৃতা দিতে দিতে ওঁর গলা শুকিয়ে গিয়েছে, তাই কফিতে দ্বিতীয় চুমুক।

“অবশ‍্যি কাশ্মীরের মাত্র এক দশমিক শূন্য এক শতাংশ লোকে গৃহহীন; এটাই সব চাইতে কম। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সাত দশমিক পাঁচ ছয় শতাংশ মানে আটষট্টি লক্ষ লোকের ঘরবাড়ি নেই…” – স‍্যাটিরিক সেন একটু থেমে ফিশফ্রাইয়ের স্বাদ গ্রহণ করেন।

“গোটা ভারতে এই নিরক্ষর অসহায় খাদ‍্যহীন বস্ত্রহীন মানে মানুষ হিসেবে বাঁচার মিনিমাম কোনো উপকরণহীন মানুষের সংখ্যা নয় নয় করে ন’ কোটি তিরিশ লক্ষ পঁচাত্তর হাজার আটশো আটচল্লিশ…উঁ উঁ উঁ উঁ…ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাত দশমিক দুই শতাংশ… এত বড়ো বড়ো সংখ্যা তো? টুকটাক ছোটোখাটো ভুল থাকলে ক্ষমা করবেন। তবে মোটামুটি সংখ্যাটা বেশি হতে পারে কিন্তু কম নয়…।”

“কিন্তু ক‍্যা? এখানে ক‍্যা ক‌ই?” – আন্তরিকবাবু আন্তরিক ভাবে প্রশ্ন করেন ।

স‍্যাটিরিক সেন একটা উচ্চ মার্গের হাসি দিয়ে বলেন, “এখানেই তো ক‍্যা আর এনআরসির খেলা। ধরুন গিয়ে… আসামে আদমশুমারিতে দশ লক্ষ আটাত্তর হাজার চারশো দশ জন গৃহহীন মানুষ পাওয়া গেচে কিন্তু এনআরসিতে এর বহু গুণ বেশি মানুষ বাদ গেচে। সুতরাং এই প্রায় দশ কোটি লোক ডিটেনশন ক‍্যাম্পে থাকবে – খাবার পাবে ঘর পাবে, স…ব পাবে। এ ছাড়াও প্রায় দশ কোটি লোক একাত্তরের আগের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারবে না – হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ – মোট কুড়ি কোটি লোক কমে যাবে। তা হলে বিদেশ থেকে আসা টাকার থেকে পনেরো বিশ লক্ষ টাকা করে বাকিরা সবাই পেয়ে যাবে…ব্যাস সব সমস্যার সমাধান…হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ।”

পাঁচুবাবু বলেন, “একবার আমি একটা কুকুর পুষেছিলাম। ঘরে আটকে দিলেই সেটা কেঁদে চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করত…মানে… মানুষ কি এ ভাবে থাকা পছন্দ করবে? এই কুড়ি কোটি লোক কি ক‍্যাম্পে থাকতে চাইবে…মানে সেটা কি ঠিক হবে?” 

চপলবাবু সন্দেহ প্রকাশ করেন – “আরে আপনি তো মহা ইতর লোক মশয়? কুকুরের সঙ্গে মানুষের তুলনা করছেন?”

কপোত মুহুরি চটে চট্টগ্রাম হয়ে ওঠেন। 

হঠাৎ আন্তরিকবাবু হু হু করে কেঁদে উঠলেন – “আমার তো একাত্তরের আগের কোনো কাগজপত্র নেই… মাগো আমার কী হবে?” 

স‍্যাটিরিকবাবু আন্তরিকবাবুর মাথায় হাত বুলিয়ে সস্নেহে বলেন, “আহা আহা, কানতে নেই কানতে নেই। এত দিন তো সর্বহারার জন্যে বুক চাপড়ে কেঁদেছিলেন। এ বার সর্বহারাদের সঙ্গে থেকে তাদের বেদনার সঙ্গী হয়ে যান।”

------------------------------------------------
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.