papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

এখন চার ধারে শুধু ঝরা পাতার গান, মরা পাতার গান। আমার বসন্ত পলাশে-শিমুলে। আমার বসন্ত মঞ্চে-ময়দানে। গেরুয়া বাউলের একতারায়, পিরিতি গানের চড়া শিরায়। আমার বসন্ত ডাক দিয়ে যায় আয়রে মাতাল আয়। লালমাটির পথ ছেড়ে বিনয়-শক্তি-সুনীলের কলকাতায়। ট্রামলাইনে পড়ে থাকা একটা ঠোঙা শালপাতায়।

ঢ্যাঙা গাছটার মাথায় পূর্ণিমার চাঁদ ছুঁতে চায় আমার বসন্ত। এখন মুকুলশেষে শিশুআম গাছের শাখায়, পাতার আবডালে। কচি মুকুলের চাদরে ঢেকেছে আঁশফল গাছ। কবির রঙ্গ দেখা বঙ্গে এখন শুধু ফেলে যাওয়া শ্বাস – চলে যায় মরি হায় আমার বসন্ত। ঝরা পাতা মরা পাতার সঙ্গে সঙ্গে চলেছে আমার বসন্তও। রেল লাইনের ধারে, এঁদো পুকুরের পাড়ে, আতাগাছের নীচে, এমনকি খেয়াঘাটের বাঁশের সেতুতেও শুকনো পাতার আসন বিছানো বসন্ত। ল্যাংটা খোকার দৌড় আর গাঁয়ের পথে আদুল গায়ের রমণীর শরীরে ঢেউ তুলেছিল যে বসন্ত, সগৌরবে ফিরে যাচ্ছে নিজের ডেরায়। ঋণী করে রাখছে হা-হুতাশ করা মানস-মানসীকে। রেলগাড়ির একছুট বলে দিচ্ছে সময় আর নেই। ধূ ধূ প্রান্তর, চুঁইয়ে পড়া গলানো সোনা কচি মুকুল সুবাসিত করছে। আমার বসন্ত ঠাঁই নিয়েছে জামরুল গাছের মগডালে কাকের বাসায়। বসন্তদূত অমৃত ফল দিয়ে গিয়েছে নিমগাছের ছোট্টো ঘেরাটোপে।

Loading videos...
summer is coming
মুকুল থেকে পূর্ণাঙ্গ ফল – মনে করিয়ে দেয় বসন্ত বিদায়ের সময় হয়ে এল।

ফাগুনের আগুনে পুড়েছে মন, পুড়েছে দেহ। পূর্ণিমার মাদকতা বুঝিয়ে দিয়েছে বসন্ত কী প্রবল ঔদ্ধত্যে হাজির হয়েছিল তোমার আমার দ্বারে। তৃতীয়ার কাস্তে আস্তে আস্তে সোনার থালা হয়ে গৃহস্থের ঠাকুরঘরে ঢুকে পড়েছিল। বেজে উঠেছিল কাঁসর-ঘণ্টা-শাঁখ। আকাশবাতাস রঙিন হয়েছিল ফাগফাগুয়ার গন্ধে। আমার বসন্ত একাকী গোপালের হোমের আগুনে। ছুটন্ত সময়ে, কাঠ গোঁজা জ্বলন্ত উনুনে চায়ের দোকানে, উঁকিমারা বুড়োর গালে আমার বসন্ত দাঁড়িয়ে দেহপটে নয়, তনুমনে। শক্তি দীপ্তি শান্তি তৃপ্তি নিয়ে যে বসন্ত অতিথি হয়েছিল দিন পক্ষ মাস, পুণ্যপথ বেয়ে চলে যাওয়ার সময় কী কথা কব কানে কানে? আমার এগিয়ে যাওয়ার সরু চলার পথে বেজে চলেছে তারই তান। সেই তো ঝরা পাতা মরা পাতার গান।

লালপাহাড়ির দ্যাশ আর বাপের ঘর, আমার শ্বউরঘর না বেটার ঘর, বসন্তের বাস তো বরাবরই ছিল। মরদের টানে সিলুখা মাহাতো যে বার ফুলডুংরির বনে লাইচতে গিয়াছিলও, সে বার মহুয়ার নেশায় বড় মাত্তাল হয়েছিলও। বাপরে বসন্তের হুল্লোড় বটেক। কথাগুলো বসন্তবাতাস কানে কানে গেয়ে গেল। আহা বড়ো মিষ্টি ভাষা, বড়ো সুরেলা টান। বাহা পরবের ধামসার ছন্দ মনে চেপে বসে। বিহুর সুরে কংসা শিলাই দামোদরের জলে ঢেউ ওঠে। কবিগান পাতা উলটে কাচমন্দিরে আসন নিয়েছে। বসন্ত পরব চলছে। গাঁথা মালা লেখা কবিতা প্রাঙ্গণে শিরিষপাতা, সব উড়ে যাচ্ছে দখিনা বাতাসে।

santali dance
ধামসা মাদলের ছন্দে নাচের প্রস্তুতি।

আমার বসন্ত চলে যাওয়ার ছন্দ তোলে ঝাড়গ্রাম ঘাটশিলা তারাপীঠ প্রান্তিকের পথে। একাকী পথের একলা শাখার ডালে ডালে। ফুল ফোটানো পালা শেষ করে ফুল জাগানোর ডালা রেখে যাচ্ছে আমারই সদর দ্বারে। বাগানময় ঝরা পাতার শয্যা। গাছের বিদায়ী পাতায় গৃহস্থের উঠোন বারান্দা অস্থির। পুবের জানলায় তেরছা রোদে আমার বসন্ত উষ্ণ হয়। আমার বসন্ত দক্ষিণের খিড়কিতে দাঁড়ায় প্রবল প্রতাপে। উত্তাপের জ্বরে কাহিল শরীর ভিক্ষা চায় রুপোলি আলোর স্নিগ্ধতা। পলাশের আগুনে নিভন্ত আমার পশ্চিম আকাশ। উত্তরের দেওয়ালে ঠোক্কর খায় নতুন সংসারের বিবাদ-মিতালি। আমার চার পাশে বসন্তের গীতিনাট্য চলতে থাকে। দু’ চোখ দেখে, দু’ কান শোনে। একার উপলব্ধি, অজস্র স্মৃতি ভিড় করে। আবেশে বুঁদ হয়ে ওঠা আমার বসন্তের কাছে। তুমি কিছু দিয়ে যাও মোর প্রাণে গোপনে।

ভোর আসে। ভোর এল আজ বাগান ঘিরে আমের বনে, ঘাটশিলার রাজার বাগানে। কেয়ারটেকার সন্তোষ সিং উঠে পড়েছে ভোর থাকতেই। শিশুআম শৈশব পেল না। রাতমাঝে অকাল বৈশাখীর দাপটে ওরা লুটোপুটি খাছে ধুলোকাদায়। বসন্তভর বৃষ্টি দেয়নি বাতাস। আজ বৃষ্টিধোয়া ভোর কড়া নাড়ে মনের দ্বারে। আবার আসব শুয়ে থাকব রাধাচূড়াকে সঙ্গে নিয়ে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে। লজ্জার মাথা খেয়ে, এক বুক সাহস নিয়ে আদরে ভরিয়ে দেব এই বলে রাখলাম। বলে গেল আমার বসন্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.