রবিবারের পড়া ২ : জঙ্গলমহলের ‘বাঘুৎ’-কে ঘিরে হাজারো লোক-বিশ্বাস

0
401
jangalmahal, west bengal
অময় দেব রায়

আড়েবহরে ১২ থেকে ১৬ ইঞ্চি। গোল চোখ, খাড়া কান, গায়ে ডোরাকাটা দাগ। দাঁত বের করে সারিবদ্ধ ভাবে পর পর কয়েকটি বাঘ। দেখলেই আপনার লোম খাড়া হতে বাধ্য। ভাগ্যিস ওরা জলজ্যান্ত নয়! মাটির মূর্তি। পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বিহার, এমনকি ওড়িশার সর্বাধিক পূজিত বনদেবতা ‘বাঘুৎ’-এর মূর্তি।

পুরোনো শাল কিংবা মহুল গাছের বড়াম থানে বাঘুৎ-এর অবস্থান। শুধুমাত্র জঙ্গলমহল জুড়েই কমপক্ষে পাঁচশো থান। কোথাও খড়ের চালা করা, কোথাও ইঁট সিমেন্টের বেদি। বেদিগুলো মাটির ছোটো ছোটো হাতি-ঘোড়া দিয়ে সাজানো। কোথাও আবার পাথরের ওপরে বাঘের দাঁত, চোখ, মুখ আঁকা। লোধা, শবর, সাঁওতাল, ভূমিজ, বাউরি, মহালী — সবার দেবতা বাঘুৎ। পুজোয় ব্রাহ্মণদের কোনো ঠাঁই নেই। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিজস্ব পুরোহিত বা লায়া আছে। চৈত্র সংক্রান্তি, ঝাঁপন সংক্রান্তি (শ্রাবণের শেষ দিন), কিংবা ডাক সংক্রান্তি (আশ্বিনের শেষ দিন) – এমন বিশেষ বিশেষ দিনে বছরে ছ’ বার বাঘুৎ-এর পুজো হয়। তবে মানুষিক থাকলে সপ্তাহের যে কোনো মঙ্গল বা শনিবার পুজো সারা যেতে পারে। বলি ছাড়া পুজো অসম্ভব। পাঁঠা কিংবা পায়রার রক্ত চাই ই চাই। সঙ্গে ঘি, দুধ, ফলমূল তো আছেই। অনেক সময় তাতেও সন্তুষ্ট হন না বাঘুৎ। আদিবাসীদের বিশ্বাস, বাঘের দেবতা ভয়ানক রাগী এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ। তিনি অসন্তুষ্ট হলে আর রক্ষে নেই। মাঝেমধ্যেই লায়ারা নিজের হাঁটু কেটে সেই রক্ত দিয়ে বাঘুৎ-এর পুজো সারেন।

ঝাড়গ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায় নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা চালাচ্ছেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। সুব্রতবাবু শোনাচ্ছিলেন তেমনই এক লায়ার গল্প। লোধা সম্প্রদায়ের লায়া বাবুলাল ভক্তার হাঁটু কেটে রক্ত দিতে গিয়ে পায়ে ভয়ানক ক্ষত হয়েছিল। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। বাইরে থেকে রক্ত দেওয়ায় প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেই রাতেই হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসে বাবুলাল। কারণ বাইরে থেকে রক্ত দিলে বাবুলালের শরীর দূষিত হয়ে যাবে। আর সে বড়াম থানে পুজো দিতে পারবে না। তাই পালিয়ে আসেন তিনি। সুব্রতবাবুর কথায়, ‘বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর’।

বাঁকুড়ার ছেঁদাপাথর অঞ্চলে বিখ্যাত ফুলঝোরা। কত লোক যে ঝরনার জল পান করতে আসে! আর ঝরনার পাশেই মাটির বিশালাকার বাঘুৎ। বাঁকুড়ার এই বাঘুৎপুজোয় রক্তের প্রয়োজন হয় না। তিনি ভক্তদের কাছে শুধুই সম্মানপ্রার্থী। এক খণ্ড পাথর ছুড়ে দিলেই তিনি খুশি। ভক্তদের দেওয়া পাথর জমে জমে এখন তা ছোটোখাটো পাহাড়ে পরিণত হয়েছে।

বাঘুৎ সম্পর্কে নানা সমাজে হাজারো লোক-বিশ্বাস। বাঁকুড়ার আর একটি গ্রাম কমলপুর। কমলপুরে পশুপালক সম্প্রদায় রাজোড়। রাজোড়দের পারিবারিক দেবতা বাঘুৎ। প্রত্যেক বাড়িতেই আছে সিজ মনসার গাছ। তার তলায় বাঘুৎ পুজো পান হাতি ঘোড়া প্রতীকে। নির্ভেজাল দুধই বাঘুৎ-এর নৈবেদ্য।

মেদিনীপুরের ওঁড়গোন্দা, চাঁদবিলা, দবড়া অঞ্চলের আরেক পশুপালক সম্প্রদায়ের নাম বাগল। বাগলদের ঘরে ঘরে বাঘুৎ-এর মূর্তি। বাগোল সম্প্রদায়ে বাঘুৎ নিয়ে একটি মজার লোকগাথা আছে। গোটা দিন গরু চরিয়ে কৃষ্ণ ক্লান্ত। তাঁর মনে হল, গরুর দেখভালের জন্য ‘বাগালে’র প্রয়োজন। ঘামে ভেজা শরীর থেকে এক টুকরো ‘মলা’ বা ‘ময়লা’ বের করলেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণের শরীরের ময়লা থেকে তৈরি হল ‘বাগাল’। বাগাল গরু চরাতে প্রস্তুত, কিন্ত সে বাঘের আক্রমণ প্রতিরোধ করবে কী করে! কৃষ্ণের কাছে সে ‘সাতদামড়া বল’ (মাতালদের) চাইল। কৃষ্ণ বললেন, “কাল সকাল সকাল আয়”। বাঘ আড়াল থেকে সে কথা শুনে ছলনা করে পৌঁছে বাগলের আগেই পৌঁছে গেল। কৃষ্ণ বাঘকে বাগাল ভেবে সাতদামড়া বর দিলেন। খানিক বাদে সে সব জানতে পেরে বাগাল কান্না জুড়ে দিল। কৃষ্ণ বললেন, “তুই বাঘুৎ-এর পুজো কর, তবে আর কোনো ভয় থাকবে না।” সেই থেকেই নাকি বাগাল সম্প্রদায়ে শুরু হল বাঘুৎ-এর পুজা।

অন্তজ মানুষের কথাকার নলীনি বেরার ‘শবর চরিত’ উপন্যাসে একাধিক বার এসেছে বাঘুৎ প্রসঙ্গ। জঙ্গলমহল অঞ্চলের প্রান্তিক শ্রেণির প্রধান জীবিকা শিকার। এক সময় ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে হামেশাই বাঘ বেরোত। তাঁর মতে, বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতেই বাঘুৎ-এর উৎপত্তি।

আজও বাঘুৎ-এ তাদের প্রবল বিশ্বাস। এই যেমন বেলপাহাড়ির অচিন কোটাল – “একবার জাকালে বনে গেচি। গাছে উঠি মৌ পাড়েছি। ওমনি দেখি দাঁতগিজডাটা (বাঘ) তলে হাজির। মৌমাছিগুলো কানে ভঁ ভঁ করতেছে। নীচে দাঁতগিজডাটা হাঁ করে তাকিয়ে। ওমনি আমার মনে পড়ি গেল। আমি ‘বাবা বাঘুৎ’ এর নাম নিলাম। সে সুড়সুড় করি পালালো।”

জঙ্গলমহলের এমনই হাজারো বিশ্বাস, গালগল্প আর লোকগাথাই মানুষগুলিকে বাঘের হাত থেকে বাঁচার রসদ জুগিয়ে যায়।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here