রবিবারের পড়া ২ / চিত্রকর বব ডিলান

0
153
bob's portrait drawn by Fabrizio casetta
ফাব্রিজিও কাসেত্তার আঁকা বব ডিলানের প্রতিকৃতি।
তপন মল্লিক চৌধুরী

প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিক মহাকবি হোমার তাঁর স্তোত্রাবলি ইলিয়াড ও অডিসিতে গীতিকাব্যরসের মাদকতা সৃষ্টি করেছিলেন। তারও পরে ৬৩০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে জন্মানো লেসবস দ্বীপের গ্রিক কবি স্যাফো রচনা করেছিলেন গীতিরসের গভীর মাদকতায় মণ্ডিত কাব্যসমূহ। তিনি নেচে নেচে পরিবেশন করতেন তাঁর কবিতা আর তা সংগীতের অপার অমেয় সুধা নিয়ে আবির্ভূত হত মানুষের কানে কানে। অনেক শতাব্দীকাল পর আরেক দ্বীপবাসিনী কবি তাঁর প্রতিবাদমুখর কাব্যবাণীকে পলকা সুরের ছোঁয়া দিয়ে আপামর সংগীতপ্রেমীর অন্তঃস্থল স্পর্শ করলেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে, দুর্দশার বিরুদ্ধে, নীতিহীনতার বিরুদ্ধে কর্কশ সমালোচনায়, তির্যক ব্যঞ্জনায়, জনপ্রিয় ধারার বিপরীত পিঠ থেকে প্রান্তিক মানুষের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে।  হোমার যেমন দেবদেবীদের বিশাল ও নির্দয় ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে ইলিয়াড গেয়েছেন পরম মায়া ও মানবিকতা দিয়ে, সেই একই গীতিকাব্যের ছায়া আবার যেন আমরা শুনতে পেলাম ‘The line it is drawn/The curse it is cast/The slow one now/Will later be fast/As the present now/Will later be past/The order is/ Rapidly fadin/And the first one now/ Will later be fast/ For the times they are a-changin’–এর মতো অগুনতি পংক্তিমালায়, মিনেসোটা কফিশপ থেকে নিউইয়র্কের যুদ্ধবিরোধী কনসার্ট-এ, ‘Bringing It All Back Home’,  ‘Highway 61 Revisited’, ‘Blonde On Blonde’, ‘Blood on the Tracks’ , ‘Oh Mercy’ , ‘Time Out Of Mind’ , ‘Love and Theft’, ‘Modern Times’ থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি অ্যালবামের সবকটি গানে।

bob dylanওয়েলসের জনপ্রিয় লেখক ও কবি ডিলান থমাসের ‘Under Milk Wood’, ‘A Child’s Christmas in Wales’ প্রভৃতি বিখ্যাত কবিতা দ্বারা প্রভাবিত ও মুগ্ধ হয়ে রবার্ট আল্যান জিমারম্যান নাম বদল করে বব ডিলান হয়েছেন, ওডেত্তা হোমসের লোকসঙ্গীতে মোহাচ্ছন্ন হয়ে ইলেকট্রিক গিটার, অ্যামপ্লিফ্যায়ার বদলে ফেলে অ্যাকুয়িস্টিক গিটার নিয়ে গাইতে শুরু করেছেন, গানের দাবি মতো রক-ব্লুজ-ফোক-কান্ট্রি-জ্যাজ থেকে শুরু করে ইংলিশ, স্কটিশ, আইরিশ লোকসঙ্গীত; ইচ্ছেমতো পালটেছেন নিজের গানের আঙ্গিক। কিন্তু এত কিছু রদবদলের মধ্যেও তাঁর কাব্যময় গীতিকবিতা কখনও যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী দর্শন-রাজনীতি থেকে সরে যায়নি।

অথচ বব ডিলান শুধুমাত্র গান নিয়েই পড়ে থাকলেন না। গান লেখা, সুর সংযোজন এবং গাওয়ার পাশাপাশি রচনা করেছেন ‘ট্যারানটুলা’ প্রভৃতি গীতিকাব্যের নিরীক্ষাধর্মী সংকলন, আত্মজীবনীমুলক গ্রন্থ ‘কোরনিকেলস’; তবে এখানেও থেমে থাকেননি বব ডিলান। জীবনের বহু সময়ে গান না থামিয়েই, গিটার, হারমোনিকা নামিয়ে তুলে নিয়েছেন প্যালট, রঙ, তুলি। ছবি আঁকা-আঁকি শুরু হয়েছিল ছেলেবেলা থেকেই। গান গাওয়া, পিয়ানো বাজানোর পাশাপাশি ছবিও আঁকতেন ভালোবাসার মন দিয়ে। সেই ভালো লাগা রয়েই যায়, তাই মাঝে মাঝেই ক্যানভাসে কল্পনার রঙ-রেখা তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন ভালোলাগা ছবি।

the brazil series
দ্য ব্রাজিল সিরিজ।

ছোটোবেলা থেকেই গানের পাশাপাশি ছবি আঁকার চর্চা চালিয়ে গেলেও অনেক পরে চিত্রশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন বব ডিলান। প্রথম বারের মতো ডিলানের চিত্রকলা সবার নজরে আসে ১৯৭০ সালে। সে বছর ডিলানের অন্যতম জনপ্রিয় অ্যালবাম ‘সেলফ পোর্ট্রেট’ প্রকাশিত হয়েছিল। অ্যালবামটির প্রচ্ছদে ছিল রঙ তুলিতে আঁকা বব ডিলানের প্রতিকৃতি। ডিলান নিজে অ্যালবামটির প্রচ্ছদ হিসেবে নিজের মুখমণ্ডলের একটি প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন। পরবর্তীতে ডিলানের আঁকা নিজের এই প্রতিকৃতি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। বলা যায় ‘সিংগার অ্যান্ড সং রাইটার’ বব ডিলানের ভক্তবৃন্দও এই প্রথম তাদের প্রিয় সংগীতশিল্পীর কথা আরো বিস্তারিত জানল।

এর পরও কি ডিলান নিয়মিত ছবি আঁকেন? না, ছবি আঁকার ব্যাপারে তাঁর যেমন কোনো প্রথাসিদ্ধ শিক্ষা ছিল না, তেমনই নিয়ম করে ছবি আঁকাও তাঁর ধাতে নেই। ছেলেবেলার ভালোবাসা তাঁকে পেয়ে বসে মাঝেমধ্যেই, গানবাজনার মতোই রং-তুলি-ক্যানভাসে মেতে ওঠেন ডিলান। তবে তাঁর আঁকাআঁকি দেখলেই বোঝা যায়  রং-রেখা তাঁর বেজায় দখলে, আনাড়ি হাতে ধরা তুলি কিংবা রঙের মানে না জানা আঁকিয়ে তিনি মোটেও নন। আর তাঁর ছবিও কেবল প্রতিকৃতি অথবা গাছ-ফুল-চাঁদ-তারা-আকাশ-নদী, এমনটাও নয়। এর পর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত অ্যালবাম ‘প্ল্যানেট ওয়েভস’-এর প্রচ্ছদও ডিলান নিজেই আঁকেন। সেটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এর পর বেশ কিছু কাল তাঁর ছবি আঁকআঁকি নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন আলোচনা আর শোনা যায়নি। প্রায় বছর কুড়ি পর ১৯৯৪ সালে প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম বুক হাউজ প্রকাশ করে ডিলানের প্রথম চিত্রকলার বই ‘ড্রন ব্ল্যাঙ্ক’। বইটি চিত্রকর কিংবা চিত্ররসিক মহলে যে খুব সাড়া ফেলেছিল, সে কথা বলা যায় না। তবে প্রথম ছবির বই প্রকাশ হওয়ার পরও তাঁর ছবির কোনো প্রদর্শনী কোথাও হয়নি। প্রায় ১৩ বছর পর ডিলানের চিত্রকলার প্রথম প্রদর্শনী হয়, তা-ও আমেরিকায় নয়। ২০০৭ সালে জার্মানির কেমনিৎজ শহরের কুনস্টশামলুনগেনে ‘দ্য ড্রন ব্ল্যাঙ্ক সিরিজ’ নামে একটি  প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। বব ডিলানের জলরং এবং গোয়াশ মাধ্যমে আঁকা দু’শোর বেশি ছবি সেখানে প্রদর্শিত হয়। ওই প্রদর্শনী থেকেই সেরা ১৭০টি বাছাই করা ছবি একত্র করে সে বছর প্রকাশিত হয় ডিলানের দ্বিতীয় চিত্রকলার বই ‘দ্য ড্রন ব্ল্যাঙ্ক সিরিজ’।

the drawn blank series
দ্য ড্রন ব্ল্যাঙ্ক সিরিজ।

ড্রন ব্লাঙ্ক সিরিজ-এর পর ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ডেনমার্কের জাতীয় গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় ডিলানের ছবির দ্বিতীয় প্রদর্শনী। এখানে আর জল রঙ কিংবা গোয়াস মাধ্যমে আঁকা ছবি ছিল না, প্রদর্শিত হয় কেবলমাত্র ৪০টি বিশাল অ্যাক্রেলিক ক্যানভাস। বোঝা গেল বব ডিলান প্রশিক্ষিত একজন চিত্রকর, যাঁর দখলে রয়েছে জল রঙের মতো কঠিন মাধ্যম ছাড়াও অন্যান্য মাধ্যমে আঁকার ক্ষমতা এবং দক্ষতা। ডেনমার্কের জাতীয় গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত  চিত্রপ্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয় ‘দ্য ব্রাজিল সিরিজ’। সে বছরও ওই একই অর্থাৎ ‘দ্য ব্রাজিল সিরিজ’ নামে ডিলানের তৃতীয় চিত্রকলার বই প্রকাশিত হয়।

দ্য ব্রাজিল সিরিজ প্রদর্শনীর পর ওই বছরের জুলাই মাসে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় গ্যালারি ‘গিগোজিয়া গ্যালারি’র পরিচালক ডিলানের আঁকা ছবি প্রদর্শনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখান। বব ডিলান রাজি হওয়াতে গিগোজিয়া গ্যালারির যুক্তরাষ্ট্র শাখার গিগোজিয়া ম্যাডিসন এভিনিউ গ্যালারিতে সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ থেকে শুরু হয় ডিলানের ছবির তৃতীয়  প্রদর্শনী। ওই প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয় ‘দ্য এশিয়া সিরিজ’। এশিয়া সিরিজের ছবিগুলি ছিল সম্পূর্ণতই অন্য ধরনের। সেই ছবিগুলি মূলত চিন এবং পূর্ব প্রাচ্যের বেশ কিছু দেশের বিভিন্ন স্থানের দৃশ্য। বব ডিলানের ‘দ্য এশিয়া সিরিজ’ প্রচুর পরিমাণে জনপ্রিয়তা পাওয়ায় প্রায় সাত মাসের বেশি সময় ধরে এই প্রদর্শনী চলে। পাশাপাশি নিউইয়র্ক টাইমসে বব ডিলানের ছবি ঘিরে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার কারণে ‘দ্য এশিয়া সিরিজ’ সারা দুনিয়ার চিত্রশিল্পীদের মধ্যে বিশাল আলোড়ন তোলে।  গান এবং কবিতার পাশাপাশি চিত্রশিল্পী হিসেবেও বব ডিলান  পেয়ে যান এক অনন্য অবস্থান। এর পর ২০১২ সালের নভেম্বরে ডিলানের ৩০টি ছবি  নিয়ে গিগোজিয়া গ্যালারিতে ‘রেভিসিওনিস্ট আর্ট’, ২০১৩ সালে ইতালির বিখ্যাত পর্যটন শহর মিলানের প্লাৎজো রিয়ালে-তে ‘নিউ অর্লিন্স সিরিজ’ নামে পর পর দু’টি প্রদর্শনী হয়। এর পর ডিলান চিত্রকলার জগতে আরও বেশি প্রশংসিত হন। এ ছাড়া ২০১৩ সালে আগস্ট মাসে ব্রিটেনের ন্যাশনাল পোট্রেট গ্যালারিতে ‘ফেস ভ্যালু’ এবং নভেম্বরে লন্ডনের হ্যাল্কন গ্যালারিতে ‘মুড সুইংস’ শিরোনামে ডিলানের চিত্রকলার দুইটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

the asia series
দি এশিয়া সিরিজ।

এ পর্যন্ত ডিলানের মোট ৬টি চিত্রকলার বই প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলি যথাক্রমে ‘ড্রন ব্ল্যাঙ্ক’ (১৯৯৪), ‘দ্য ড্রন ব্ল্যাঙ্ক সিরিজ’ (২০০৮), ‘দ্য ব্রাজিল সিরিজ’ (২০১০), ‘দি এশিয়া সিরিজ’ (২০১১), ‘রেভিসিওনিস্ট আর্ট’ (২০১৩) এবং ‘বব ডিলান: ফেস ভ্যালু’ (২০১৪)। বিভিন্ন সময়ে এই বইগুলি বেস্ট সেলারের তালিকার শীর্ষ স্থানে থেকেছে, আলোচনা  হয়েছে বই এবং ছবি নিয়ে। নোবেল প্রাপ্ত গীতিকাব্যকার বব ডিলানের চিত্রকলার প্রতিভাকে তাই কোনো ভাবেই খাটো করে ভাবা যাবে না। তাঁর গানের মতো ছবিতেও বব ডিলান স্বাধীন, মানবিক চেতনাসম্পন্ন এবং যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী।

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here