Connect with us

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ২ / সাহিত্যের ভাবনা-ভাষা চুরি

তপন মল্লিক চৌধুরী

‘প্ল্যাজিয়ারিয়াস’ একটি লাতিন শব্দ যার অর্থ হচ্ছে সাহিত্যভাবনা চুরি বা অনুকরণ। রোমান কবি মার্শাল এক সময় অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তাঁর একটি কবিতা চুরি করেছেন অন্য এক কবি। আর সেই থেকেই সাহিত্যে অন্য লেখকের ভাব বা রচনা চুরিকে প্ল্যাজিয়ারিজম বলা শুরু। এই ঘটনাটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর। এর পর ১৬০১ সালে শব্দটিকে ইংরেজি সাহিত্যে পরিচয় করিয়ে দেন নাট্যকার বেন জনসন। তাঁর মতে, কোনো কবি-ঔপন্যাসিক বা নাট্যকারের সাহিত্যভাব বা রচনা চুরি হওয়া মানে প্ল্যাজিয়ারিজম। যদিও সাহিত্যে প্রায় অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত অনেক লেখকই অন্যের ভাবভাষা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো সাহিত্যধারণা নকল করে লেখার পরও তেমন করে নিন্দিত হননি। উনিশ শতক পর্যন্ত ধারণা ছিল যে, সাহিত্য কোনো লেখকের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। লেখক সাহিত্য রচনা করলেও সেটি সর্বজনীন আর সেই কারণেই লেখকদের মধ্যে একে অপরের ধারণা বা ভাষার অনুকরণ দোষের বলে মনে হত না। বরং পূর্বে রচিত সাহিত্যকর্মের প্রতি আনুগত্যকে শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হত। মাইকেল মদুসূদন দত্ত মেঘনাদবধ কাব্য রচনা করার পর মূল রামায়ণ-এর প্রতি অনুগত না থাকায় রাবণের প্রতি তার মমত্ববোধ নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছিলেন অনেক সমালোচক। সাহিত্যে অন্য লেখকের ভাবনা চুরি করা অনৈতিক কিংবা লেখক অসৎ হিসেবে বিবেচিত হওয়া শুরু বিংশ শতাব্দীতে।  

লেখালেখির ক্ষেত্রে ভাবনা চুরির প্রতিরোধে আজও কোনো আইন তৈরি হয়নি। বলা দরকার কপিরাইট আইনকে সাহিত্যে ভাবনা-চুরি প্রতিরোধক হিসেবে মনে করাটা ভুল হবে। কারণ, কপিরাইট আইন হচ্ছে, কারও বই অথবা নিবন্ধের হুবহু নকল সংক্রান্ত, কিন্তু প্ল্যাজিয়ারিজম হচ্ছে অন্যের সাহিত্যভাবনার অংশবিশেষ চুরি বা অংশবিশেষের প্রভাব, একেবারে হুবহু নকল নয়। শিল্প বা সাহিত্যে তো কেবল সর্বোচ্চ সৃজনশীলতা নয়, তার স্বাতন্ত্র্যতাও বিবেচ্য। সেই কারণে বহু কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিকের লেখা চিন্তার দৈন্যতায় অভিহিত হয়। কারো সাহিত্যকর্মের বিরুদ্ধে ওঠে নকল বা চুরির অভিযোগ। তবে প্রভাবিত হয়ে বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে অন্যের ভাবনা অনুকরণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো ভাবনা, ভাষা বা ঘটনাপ্রবাহের হুবহু চুরির ঘটনা বহু কাল ধরেই চলছে।

helen keller

হেলেন কেলার

এই প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা যায় একাদশ শতকে লেখা ইরাকের লেখক আল খাতিব আল বাগদাদিদ-এর জীবজন্তুদের নিয়ে লেখা বই ‘আলজাহিদ’-এর কথা, যেটি কি-না অ্যারিস্টটলের ‘কিতাব আল হাইওয়ান’-এর অনুকরণে লেখা বলে অভিযোগ। এর পরও বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। ১৮৭২ সালে আমেরিকার তরুণ লেখিকা হেলেন কেলারের বিরুদ্ধে লেখা চুরির অভিযোগ আনেন গল্পকার মার্গারেট টি ক্যানবি। তিনি বলেন, হেলেন কেলারের দ্য ফ্রস্ট কিংগল্পটি তার দ্য ফ্রস্ট ফেয়ারিজগল্পের হুবহু অনুকরণ। পরবর্তীতে পারকিন্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য ব্লাইন্ড আদালতে হেলেন কেলার স্বীকার করেন যে, তিনি মার্গারেটের গল্পটি পড়েছিলেন। ফলে তাঁর গল্পে কিছুটা প্রভাব থাকলেও থাকতে পারে।

এ বার যে ঘটনার কথায় যেতে হয় সেটি আইন-আদালতের পরেও অমীমাংসিত থেকে গেছে। কিন্তু যার বিরুদ্ধে লেখা চুরির অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল তিনি বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। আলফ্রেড হিচককের ‘১৯৪০: রেবেকাউপন্যাসটির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ এনেছিলেন লেখক এডউইন ম্যাকডোনাল্ড। তিনি আদালতে অভিযোগ করেছিলেন, হিচককের ‘১৯৪০: রেবেকা’ তাঁর ব্লাইন্ড উইডোউপন্যাসের ধারণা থেকে নেওয়া। যদিও বিচারকরা দু’টি উপন্যাসের ভেতর কোনো মিল খুঁজে পাননি। অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে’-র ভাবনা পুরোপুরি লেখক জে কে হুইসম্যানের ‘এ রিবোর্স’ থেকে নেওয়া। অস্কার ওয়াইল্ড অবশ্য ওই অভিযোগ প্রাথমিক ভাবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কবি টি এস এলিয়টের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিল যে তিনি নাকি ইংল্যান্ডের অখ্যাত কবি ম্যাডিসন কেইনের কবিতা হুবহু নকল করেছিলেন। লেখক ইয়ান ফ্লেমিং (১৯০৮-১৯৬৮)-এর সেক্স, স্যাডিজম অ্যান্ড স্নোবারিবইটির বিরুদ্ধে ভাবনা চুরির অভিযোগ এনেছিলেন লেখক কেভিন ম্যাকগ্লোরি। ম্যাকগ্লোরি আদালতে জানান, ‘সেক্স, স্যাডিজম অ্যান্ড স্নোবারিবইটি লিখেছিলেন ইয়ান ফ্লেমিং, তিনি নিজে এবং লেখক জ্যাক হুইটিংহাম মিলে। কিন্তু ইয়ান ফ্লেমিং অন্যদের নাম বাদ দিয়ে নিজের নামেই বইটি প্রকাশ করেন। অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত সেক্স, স্যাডিজম এবং স্নোবারিবইয়ের প্রকাশককে পঁয়ত্রিশ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন।

da vinci code and dan brown

দা ভিঞ্চি কোড, ড্যান ব্রাউন

বিখ্যাত লেখক ড্যান ব্রাউনের দ্য ভিঞ্চি কোডবইটির বিরুদ্ধেও ভাবনা চুরির অভিযোগে দুবার মামলা হয়েছে। ড্যান ব্রাউনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আনেন লেখক মিখাইল বাইগনেট। তিনি দ্য ভিঞ্চি কোডবইটিকে তার দ্য হলি ব্লাড অ্যান্ড দ্য হলি গ্রেইলবইয়ের অনুকরণ বলে অভিযোগ করেন। দ্বিতীয় অভিযোগটি আনেন লেখক লুইস পারডু। তিনি দ্য ভিঞ্চি কোডবইটির ধারণা তার দ্য ভিঞ্চি লিগাসি’ (১৯৮৩) থেকে নেওয়া বলে অভিযোগ আনেন। তবে দু’টি মামলাই বিচারকরা খারিজ করে দেন অভিযোগ নির্ভরযোগ্য নয় বলে। ১৯৯৯ সালে লেখিকা জে কে রাঊলিং-এর হ্যারি পটারউপন্যাসের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ আনেন ন্যান্সি স্টোগার নামে এক লেখিকা। তাঁর অভিযোগও যথার্থ নয় বলে মামলা খারিজ করে দেওয়া হয়।

kaavya vishwanathan

কাব্য বিশ্বনাথন।

অনাবাসী ভারতীয় কাব্য বিশ্বনাথনের লেখা প্রথম উপন্যাস হাউ অপাল মেহতা গট কিসডউপন্যাসটির বিরুদ্ধে সলমন রুশদি-সহ অন্য লেখকের পাঁচটি উপন্যাসের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সরাসরি চুরির অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগ সত্যি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ওই লেখিকা বাজার থেকে সব বই প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। আমেরিকান ঔপন্যাসিক আলেক্স হালে ১৯৭৭ সালে আরেক আমেরিকান ঔপন্যাসিক হ্যারল্ড কুরল্যান্ডারের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের আদালতে লেখা চুরির অভিযোগ করেন। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, হ্যারল্ড কুরল্যান্ডারেরের দ্য আফ্রিকানউপন্যাসটির প্রায় ৮০ পৃষ্ঠা আলেক্স হালের উপন্যাস রুটসথেকে টোকা। মামলা বিচারাধীন অবস্থায় কুরল্যান্ডারের আলেক্স হালের সঙ্গে সাড়ে ছয় লাখ ডলারের বিনিময়ে আপস করেছিলেন।

২০১১ সালে আমেরিকার লেখক কোয়েন্টিন রায়ানের প্রথম উপন্যাস অ্যাসাসিন অব সিক্রেটসপ্রকাশিত হলে একই সঙ্গে ১১ জন লেখক তাঁর বিরুদ্ধে নকলের অভিযোগ আনেন। ঘটনা সত্যি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সব বই বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেন। ১৯৯৭ সালে আমেরিকার বেস্ট সেলার লেখিকা জ্যানেট ডাইলে স্বীকার করে নেন যে, তার নাইনটি থ্রি বডিস রিপারউপন্যাসটি, যেটি বিক্রি হয়েছিল প্রায় দু’শো মিলিয়ন কপি, সেই উপন্যাসটির অনেক অংশ ঔপন্যাসিক নোরা রবার্টসের উপন্যাস থেকে চুরি করা। অপরাধ স্বীকারের সময় তিনি বলেন, “লেখালেখিতে ক্রমাগত অপরের ভাবনা নকল বা অনুসরণ করা আমার জন্য মনস্তাত্ত্বিক এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। নোরা রবার্টসের যে সব ধারণা বা অংশের নকল আমি করেছি, তা করার ইচ্ছে আমার কোনো সময়ই ছিল না। এ সমস্যা নিয়ে আমি বর্তমানে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না, এ আশ্বাস দিতে পারি আমার পাঠকদের।”

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: ভারতীয় ক্রিকেট-বিপ্লবের দুই কারিগর

শ্রয়ণ সেন

১০ নভেম্বর, ২০০০। ঢাকায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্ট খেলছে নামছে ভারত। প্রথম বার সাদা জার্সিতে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিতে চলেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ভারতীয় ড্রেসিং রুমে থেকে দেখা যাচ্ছে এক বিদেশি মুখকে। জন রাইট (John Wright)।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ওই টেস্টটা সৌরভের যেমন অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্ট তেমনই ভারতের প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে জন রাইটেরও।

পরবর্তী সাড়ে চার বছর ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সুবর্ণ অধ্যায় ছিল। সেই অধ্যায়ে অর্জুন যদি হন সৌরভ, তা হলে নিঃসন্দেহে তাঁর দ্রোণাচার্য হলেন জন রাইট।

কী অদ্ভুত সমাপতন না! আজই গুরু পূর্ণিমা। আবার ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম বিদেশি কোচের জন্মদিন। তিন দিনের মাথায় অর্জুনেরও জন্মদিন।

২০০০ সালটা ভারতীয় ক্রিকেটের কাছে মহাপরিবর্তনের যুগ ছিল। মার্চেই ভারতীয় দলের ব্যাটনটা সচিনের হাত থেকে সৌরভের হাতে চলে আসে।

কিন্তু তার পরের কয়েক মাস, সৌরভদের কাছে অত্যন্ত কঠিন একটা সময় ছিল। গড়াপেটার কলঙ্ক লেগে গিয়েছে ভারতীয় দলে। সাসপেন্ড হয়েছেন একাধিক সিনিয়র ক্রিকেটার।

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি থেকে ভারতীয় দলকে টেনে বের করে আনার দায়িত্ব নেন সৌরভ, সচিন, দ্রাবিড়রা। সেই সঙ্গে জুটে যান যুবরাজ, জাহির খানদের মতো জুনিয়র। ২০০০-এর অক্টোবরেই বাজিমাত। সবাইকে চমকে দিয়ে আইসিসি মিনি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের রানার্স আপ। অল্পের জন্য ট্রফি হাতছাড়া। গ্রুপ স্টেজে অস্ট্রেলিয়া আর সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা বধ করে আসা। ভারতীয় ক্রিকেটের চরিত্রটা কিন্তু বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে।

এই চারিত্রিক বদলের ব্যাপারটি পূর্ণ মর্যাদা পেল জন রাইটের আগমনে। বিদেশি কোচের সুবিধা হল, তাঁর মধ্যে প্রাদেশিকতার কোনো ব্যাপার থাকে না, যেটা দেশি কোচদের নিয়ে সব থেকে বড়ো সমস্যার।

জন রাইটকে ভারতীয় দলের কোচ করে আনার পেছনে রাহুল দ্রাবিড়ের (Rahul Dravid) একটা ছোট্ট কিন্তু মহৎ ভূমিকা রয়েছে।

রাইটের কথা প্রথমে সৌরভকে বলেন দ্রাবিড়ই। ২০০০-এর গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডে কেন্টের হয়ে কাউন্টি খেলেন দ্রাবিড়। সেই দলেরই কোচ ছিলেন রাইট। তখন সৌরভ আবার খেলছেন ল্যাঙ্কাশায়ারে। সেখান থেকে সৌরভের সঙ্গেও রাইটের পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

এর পরেই বিশ্ব দেখল সৌরভ আর রাইটের সেই বিখ্যাত জুটি। সৌরভ-রাইট জুটির প্রথম পরীক্ষা ছিল ২০০১-এর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তিন টেস্টের সিরিজটা।

স্টিভ ওয়ের অস্ট্রেলিয়া তখন অশ্বমেধের ঘোড়া। টানা ১৫টা টেস্ট জিতে ভারতে পা রেখেছে। বিপক্ষে ভারত তখন একঝাঁক তরুণ, অভিজ্ঞতাও সে ভাবে কম। তা এ হেন অস্ট্রেলিয়া যখন প্রথম টেস্টেই ভারতের ওপরে বুলডোজার চালিয়ে দিয়ে গেল, কেউ হয়তো কল্পনাই করতে পারেননি যে পরের দু’টো টেস্ট জিতে ভারত ইতিহাস গড়বে।

কিন্তু সেটাই করে দেখাল বদলে যাওয়া ভারত। সিরিজ শুরু হওয়ার আগে পঞ্জাবের তরুণ অফ স্পিনার হরভজন সিংহের হয়ে প্রবল জোরে গলা ফাটিয়েছিলেন সৌরভ। অবশ্যই রাইটের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল এই ব্যাপারে।

এই হরভজনই ভারত আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে তফাতটা গড়ে দিয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে উঠে এলেন ভিভিএস লক্ষ্মণও। ইডেনে দ্বিতীয় টেস্টে ফলোঅন করে ভারত কার্যত পরাজিত হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। রাহুল দ্রাবিড়কে সঙ্গে নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন লক্ষ্মণ। পঞ্চম দিনের শেষ লগ্নে এসে ঐতিহাসিক জয় পেল ভারত। এর পর চেন্নাইয়ের শেষ টেস্টও জিতে নিয়ে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফি দখল করে নিল ভারত।

স্টিভ ওয়ের ‘ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’ দখল করার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।

ভারতের মাটিতে ট্রফি জয় এক জিনিস আর সেই ট্রফিটাই যখন বিদেশের মাটি থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়, তার মাহাত্ম্য আরও অনেকটাই বেশি।

আড়াই বছর পর, ২০০৩-০৪-এর শীতটা ভারতীয় ক্রিকেটে আরও এক সোনালি মুহূর্ত নিয়ে এল। এ বার সিডনি থেকে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফিটি ভারতে নিয়ে চলে এলেন সৌরভ। স্টিভ ওয়, রিকি পন্টিংরা হাঁ করে দেখতে থাকলেন।

না, ওই সিরিজটা ভারতের জেতা হয়নি। চার টেস্টের সিরিজ অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয়েছিল ১-১। কিন্তু শেষ টেস্টের শেষ বিকেলে স্টিভ ওয় ও রকম প্রতিরোধ না গড়ে তুললে ২-১ ব্যবধানে সিরিজটা যে ভারতই জিতত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তার বছর দুয়েক তিনেক আগে থেকেই বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা রপ্ত করতে শিখেছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। ২০০১-এ জিম্বাবোয়ে আর শ্রীলঙ্কায় টেস্ট ম্যাচ জিতলেও ২০০২-টা ছিল মোড়ঘোরানো বছর।

ওই বছর এপ্রিল-মে’তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে পোর্ট অব স্পেনে ঐতিহাসিক টেস্ট জিতল ভারত। দুর্ভাগ্যবশত, পরের দু’টি টেস্ট হেরে যাওয়ার ফলে সিরিজটা জেতা হয়নি, কিন্তু তার মাস তিনেকের মধ্যেই ইংল্যান্ডে আরও বড়ো সাফল্য এলে ভারতীয় দলের জন্য।

হেডিংলি টেস্টে জয় আজও বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দলের সেরা টেস্ট জয়ের মধ্যে একটি হিসেবে গণ্য হয়। ওই টেস্টে ইনিংসে জয়ের হাত ধরে, ইংল্যান্ডে মাটিতে টেস্ট সিরিজ অমীমাংসিত রাখার বিরাট কৃতিত্ব অর্জন করল ভারত।

তখন থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটের ভাবমূর্তি বদলাতে শুরু করেছে। ভারত আর ‘বিদেশের মাঠে শক্ত পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র’ নয়। সৌরভের ‘চোখে চোখ রেখে কথা বলা’ মনোভাবের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় দল তখন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

হরভজনের পাশাপাশি আরও কয়েক জন তরুণের আগমন ঘটল ভারতীয় দলে, যারা নিজেরাই এক একজন ম্যাচ উইনার। একদিনের ব্যাটিং তো বটেই, ভারতীয় ফিল্ডিং নতুন রূপ পেল যুবরাজ সিংহ আর মহম্মদ কাইফের আগমনে। অন্য দিকে বীরেন্দ্র সহবাগকে মিডিল অর্ডার থেকে ওপেনার হিসেবে তুলে আনা একটি বিশাল বড়ো মাস্টারস্ট্রোক ছিল, তা তো পরের কয়েকটি বছরেই জানা যায়।

আর প্রতিপক্ষ শিবিরে থরহরিকম্প ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতীয় দলে আগমন ঘটল জাহির খান আর আশিস নেহরার।

সৌরভ-রাইট জুটি আরও একটি মাস্টারস্ট্রোকীয় চাল চাললেন। রাহুল দ্রাবিড়কে এক দিনের দলে উইকেটকিপার করে আনা। দ্রাবিড়ের এক দিনের ব্যাটিং ফর্ম কিছুটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে এক দিনের দল থেকে বাদ পড়েছিলেন।

কিন্তু সৌরভ-রাইট বুঝতে পারে, দ্রাবিড়ের মতো ব্যাটসম্যানকে এক দিনের দলের বাইরে রাখা উচিত নয়। এর ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মরল। ভারতীয় দলে বাড়তি ব্যাটসম্যানও এল, আর উইকেটে পেছনে মোটামুটি নির্ভরযোগ্য একজনকে পাওয়াও গেল।

উইকেটকিপার হিসেবে দ্রাবিড় কতটা দক্ষ ছিলেন, সেটা তো ২০০৩ বিশ্বকাপেই দেখেছি আমরা। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সময়েও ব্যাট হাতেও বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

এই বিশ্বকাপটি সৌরভ-রাইট জুটির আরও একটা সাফল্যগাথা বলা যায়। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের চমকে দিয়ে টানা ৮টা ম্যাচ জিতে ভারত চলে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে। পরাজিত হল এমন একটা অস্ট্রেলিয়ার দলের কাছে, যারা ওই সময়ে অন্য গ্রহের কোনো দলের মতো খেলছিল। এই হারে কোনো লজ্জা ছিল না, বরং রানার্স হওয়ার জন্য দেশবাসীর চূড়ান্ত বাহবা কুড়িয়েছিল সৌরভের ভারত।

সাফল্য তো আরও বাকি। ১৫ বছর পর পাকিস্তান সফর করে টেস্ট আর এক দিনের সিরিজ দু’টোই বাগিয়ে আনা।

কিন্তু সৌরভ-রাইট জুটির এই সাফল্যগাথাটা আচমকাই ফিকে হতে শুরু করে। ২০০৪-এ অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার ভারত আগমন দিয়ে শুরু। দেশের মাঠে সিরিজ হেরে যায় ভারত, যা এক সময়ে অকল্পনীয় ছিল কার্যত। এর কয়েক মাস পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও দেশের মাঠে টেস্ট সিরিজ জিততে ব্যর্থ হয় ভারত।

সৌরভ আর রাইটের জুটিও ভেঙে যায়। ২০০৫-এর এপ্রিলের ভারতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে যান তিনি। এর পর আগমন হয় গ্রেগ চ্যাপেলের। তার পরের দু’ বছর ভারতীয় দল কী রকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তা তো আমরা জানিই।

কী কাকতালীয়, রাইটের চলে যাওয়া আর ক্রিকেট-রাজনীতির শিকার হয়ে সৌরভের অধিনায়কত্ব আর দলে জায়গা হারানো প্রায় একই সময়ে ঘটেছে।

রাইট আর সৌরভের মধ্যে ছোটোখাটো কিছু মিলও রয়েছে। প্রথমত, দু’জনেই বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান। রাইট দু’ ধরনের ক্রিকেটেই ওপেনার ছিলেন, সৌরভ একদিনের ক্রিকেটে ওপেনিংয়ে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন। আবার দু’ জনেই টেস্টে দু’বার করে ৯৯-এ আউট হয়েছেন।

খেলার দুনিয়ায় কিছু কিছু কোচ-অধিনায়ক জুটি হয়, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। এমনই একটি জুটিই ছিলে সৌরভ আর রাইটের মধ্যে। ঠিক যেমন ২০১১ বিশ্বকাপের সময়ে গ্যারি কার্স্টেন আর মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মধ্যে জুটি ছিল।

গত বছর বিশ্বকাপের সময়ে একটি টিভি সাক্ষাৎকারে একসঙ্গে দেখা সৌরভ আর রাইটের। রাইটকে উদ্দেশ করে সৌরভ সরাসরিই বলে দেন, “আমার প্রিয় কোচ।”

রাইট বলেন, “ভারতকে কোচিং করানোর ব্যাপারটা আমার কাছে খুব সম্মানের ছিল। শুরুটা দু’ জনের কাছেই খুব শক্ত ছিল। কিন্তু আমাদের দু’ জনের কাছেই প্রমাণ করার তাগিদ ছিল কোচ আর অধিনায়ক হিসেবে আমরা দু’ জনই ভারতীয় ক্রিকেটে সাফল্য এনে দিতে পারি।”

দু’ দশক হয়ে গেল একটা দলের স্বার্থে এই দু’ জন লোক হাত মিলিয়েছিল। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভারতীয় ক্রিকেটের যুগান্তকারী পরিবর্তনের কান্ডারি এই দু’ জন।

শুভ জন্মদিন জন রাইট। জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

চিরঞ্জীব পাল

সে দিনটা ছিল সূর্যগ্রহণের ঠিক আগের দিন। সকালবেলা বাড়ির পরিচারিকা ঘর মুছতে মুছতে বলল, ‘‘বৌদি কাল সূর্যগ্রহণ। সাড়ে ন’টা থেকে শুরু হবে। তাড়াতাড়ি রান্না–খাওয়া করে নিও। ও বাড়ির বৌদি বলছিল।’’

‘ও বাড়ির বৌদি’ মানে আমার বাড়িতে কাজে আসার আগে যে বাড়িতে ও কাজ করে এসেছে সে-ই বাড়ির মালকিন। ভদ্রমহিলা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। 

মেয়েটির কথা শুনে খুব একটা অবাক হইনি, কিন্তু যখন ও বৌদির প্রসঙ্গ তুলল তখন একটু ধাক্কা খেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার জানা জগৎটা এখনও অনেকটা অজানা। এক পা আগে দু’ পা পিছে করতে গিয়ে আমরা কখন যেন শুধু পেছনেই হাঁটতে শুরু করেছি। পিছনে হাঁটাতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা হয়েও উপদেশ দেন সূর্যগ্রহণের সময় না-খাওয়ার। অথচ সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার। আমরা সবাই জানি কেন সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ হয়। টিভিতে লাইভ সূর্যগ্রহণ দেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ টেলিকাস্ট হয়। তবুও গ্রহণের সময় না-খাওয়ার কুসংস্কারটা আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে। ঠিক যেন বাপ-ঠাকুর্দার দেওয়া ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো। যুক্তিবোধ সেখানে ঠুনকো।

অন্তহীন এক গ্রহণ

সূর্যগ্রহণের ঠিক দু’দিন পর মারা গেলেন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। খবরটা পেয়ে মনে হল আমার জানা একটা সূর্য ঢাকা পড়ে গেল মৃত্যুর ছায়ায়। সেই সূর্য আর গ্রহণ ছেড়ে বেরোবে না। তবে কি পৃথিবীটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে?

একটা ফোন কিছু মুহূর্ত

সাল: ২০০২।

হ্যালো স্যার? আমাদের পাড়ায় একটা স্লাইড শো করব?

কবে করবে বাবা! আগামী সপ্তাহ আমি পারব না। তার পরে একটা দিন ঠিক করো।

দিন ঠিক করলাম। ফোনে জানালাম স্যারকে। স্যার মানে অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’ দিন ধরে চলল মাইক-প্রচার। অনুষ্ঠানের দিন যথা সময়ে তিনি হাজির হলেন। স্লাইড রেডি করে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু লোক নেই। মাইকে ঘোষণা চলছে। কেউ কেউ উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে সরে পড়ছেন। উদ্যোক্তা হিসাবে আমাদের অবস্থা তো কাহিল। গা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। এই বুঝি স্যার বলেন, লোক জোগাড় করতে পারবে না যখন আমাকে ডাকলে কেন। জল মাপার জন্য গুটি গুটি পায়ে ওঁর কাছে গেলাম। বললাম, স্যার দশ মিনিট বাদে শুরু করুন লোকজন চলে আসবে। 

স্যার বললেন, ঠিক আছে বাবা, একটু দেখে নিই, যে ক’জন আছে তাদের নিয়েই শুরু করব। 

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

মনে মনে গুণে দেখলাম জনা ছয়েক দর্শক আছেন। এঁদের মধ্যে একজন একটি স্কুলের দিদিমণি, তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বেগতিক দেখে ক্লাবের বাইরে বসে থাকা কয়েক জন বিহারী মিস্ত্রিকে বললাম, মাঠে যাও চাঁদ-তারা দেখাবে। তাঁরা প্রতি দিন এই সময় কাজ থেকে ফিরে গল্প করেন। আমাদের কথা শুনে তাঁরা মাঠে গিয়ে বসলেন। শুরু হল স্লাইড শো। মিনিট তিনেক চলার পর পরিস্থিতি বদলে গেল। ছোটো মাঠ ভরে গেল দর্শকে। মহাবিশ্বের নানা রহস্য একের পর এক উজাড় করে দিচ্ছেন স্যার। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে। জলে যে ভাবে মাছ থাকে কখন যে তিনি সে ভাবে দর্শকের মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন কেউ বুঝতে পারেনি। মনের মধ্যে সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি আরও গভীরে পৌঁছোতে চাইছেন। শো চলাকালীন কেউ বেরোলেন না। এমনকি ওই মিস্ত্রিরাও না।

শো-এর শেষ পর্বে উনি মহাকাশকে ঘিরে কুসংস্কার প্রসঙ্গে বললেন। এল গ্রহণের সময় না খাওয়ার প্রসঙ্গও। আক্ষরিক অর্থে জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন যে, গ্রহণের সময় খেলে কোনো ক্ষতি হয় না।

এ রকমই মন্ত্রমুগ্ধতা দেখেছিলাম নৈহাটি পুরসভার হলে একটি অনুষ্ঠানে। হল ‘হাউসফুল’। অনেকে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যেন নামী কোনো নায়কের ছবির প্রথম শো। আলো নেভার কিছুক্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্রমুগ্ধতা।

মাটির কাছাকাছি এক তারা

পৃথিবী থেকে কোটি কোটি যোজন দূরে থাকা তারা, গ্রহ, উপগ্রহ নিয়ে কাজ করেও তিনি যেন মাটির মানুষ। বোঝানোর সময় যথাসম্ভব বাংলা পরিভাষার ব্যবহার, দর্শকদের প্রশ্নগুলো ভালো করে শোনা, তাদের বোধগম্য করে উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি ছিল শিক্ষণীয়। অনেক ‘বড়ো মাপের’ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির একটা ‘তেজরশ্মি’ বেরোয়। সেই রশ্মির কাছে কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে না ‘সাধারণ মানুষ’। অমলেন্দুবাবু নামী জ্যোর্তিবিজ্ঞানী। মাঠেঘাটে গিয়ে স্লাইড দেখানোর সময় তাঁর সেই রশ্মির খোঁজ করেছি। দেখতে পাইনি। তাই তাঁকে ছুঁয়েছি। প্রশ্ন করেছি। 

আমরা জেনেছিলাম, তিনি নারকোল-মুড়ি খেতে ভালোবাসেন। একবার এক ঘরোয়া স্লাইড শোর শেষে তাঁকে মুড়ি-নারকোল খেতে দিয়েছিলাম। কী তৃপ্তি করে যে খেয়েছিলেন!

মৃত্যুকালে অমলেন্দুবাবুর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। আড়াই বছর আগে মেয়েকে নিয়ে সোদপুরে তাঁর একটি স্লাইড শো দেখতে গিয়েছিলাম। শরীরের কারণে গতি শ্লথ হলেও বোঝানার সময় আগের মতোই তারুণ্য উপচে পড়ছিল। সেই স্লাইড শো দেখে মেয়ের প্রশ্ন আর থামে না। 

ভুল ভুল আমি ভুল

না! না! সূর্য কখনও অনন্ত গ্রহণে থাকতে পারে না। আপনজনের মৃত্যুর খবরে ও আমার মনের বিকার। বিড়লা তারামণ্ডলের ডিরেক্টর পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি শুধু বিজ্ঞান গবেষণা করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে স্লাইড নিয়ে ছুটে গেছেন মাঠে ঘাটে। কারণ, তিনি মনে করতেন ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’। এই সত্যিটা না বুঝলে মানতে হবে প্লাস্টিক সাজার্রি করে গণেশের মাথা বসানো হয়েছে কিংবা গোমূত্র সর্বরোগহর।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বঙ্কিম দত্ত

সম্প্রতি প্রয়াত হলেন (২২-০৬-২০২০) ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। 

নব্বই বছর বয়স পার করেও এই বিশিষ্ট জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং সক্রিয়। এর রহস্য কী জানতে চাইলে, উত্তরে বলতেন, আনন্দের সঙ্গে কাজ, স্বল্পাহার, সরল ও নিয়মানুগ জীবনযাপন। দু’ দশকের বেশি ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গলোভী বর্তমান লেখক বুঝেছেন এগুলো কেবল কথার কথা না। তাঁর জীবনই ছিল তাঁর বাণী।

জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করবেন বলেই বর্ধমানের মুগকল্যাণ গ্রামের স্কুল থেকে সোজা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও গবেষণার কাজ। জ্যোর্তিবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহের বীজ অন্তরে লালিত হয়েছিল বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার পরোক্ষ প্রভাবে। এমএসসি ক্লাসে তাঁর শিক্ষক গণিতবিদ ভি ভি নারলিকার (প্রখ্যাত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকারের বাবা) এ বিষয়ে তাঁকে গবেষণায় আগ্রহী করে তোলেন। প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ৫০-এর বেশি। 

বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা চাইতেন সমাজে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হোক এবং সেই প্রয়োজনে সহজ ভাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বই লিখে তিনি প্রচার করতেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সায়েন্স অ্যান্ড কালচার’ পত্রিকা যাতে সামাজিক অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞানকে প্রয়োগের নানা আলোচনা থাকত। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ও মহাকাশ নিয়ে মানুষের মনে আগ্রহ ও এই বিষয়ে ভুল ধারণা দূর করার জন্য সর্বসাধারণের উপযোগী বই লিখেছেন, রেডিও-দূরদর্শনে বক্তৃতা করেছেন, জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে সহজ ভাষায় প্রচুর প্রবন্ধ (আড়াই হাজারের বেশি) লিখেছেন এবং স্থিরচিত্রের সাহায্যে হাজার হাজার বার (প্রায় ন’ হাজার) আলোচনা করতে ছুটে বেড়িয়েছেন দূরদূরান্তের গ্রাম-শহরে। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাধ সাধতে পারত না বেশির ভাগ সময়েই। জিজ্ঞেস করলে আয়োজকদের অসহায়তার কথা বলতেন। প্রচণ্ড গরমে ঘামছেন, প্রেক্ষাগৃহ দর্শকের ভিড়ে উপচে পড়ছে। তিনি অবিচল, কারণ উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন হলের শীতাতপ ব্যবস্থাটি মহার্ঘ। অনুষ্ঠান শেষে সঙ্গের অ্যাট্যাচি খুলে ভিজে গেঞ্জি পালটে নিলেন যখন, তখনও সমান নির্বিকার। জিজ্ঞেস করলেন, অনুষ্ঠান সবার কেমন লাগল! 

আসলে এই কাজ তিনি ভালোবাসতেন আর একে তিনি সামাজিক দায় হিসাবেই দেখতেন। এমন তো হয়েছেই, যখন দেখেছি অনুষ্ঠানে পৌঁছে দেখা গেল মাত্র কয়েক জন বসে আছেন দর্শক আসনে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অনেকেই ফিরে গেছেন ঘরে। অনুষ্ঠানে স্লাইড নিয়ে মহাকাশের বিষয়ে চিত্তাকর্ষক বক্তব্য রাখলেন অন্য দিনগুলোর মতোই, সমান উৎসাহের সঙ্গে।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

একবার বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন করার জন্য আয়োজকরা স্যারকে (এ ভাবেই আমরা সম্বোধন করতাম) নিয়ে গেছেন। উদ্বোধনের পর স্লাইড চিত্র-সহযোগে বলবেন ‘জ্যোতিষ কেন বিজ্ঞান নয়’ এই প্রসঙ্গে। উদ্বোধনের কাজ শুরু হতে অনেক দেরি হচ্ছে। বিশেষ অতিথি এসে পৌঁছোতে দেরি করছেন। আমরা কয়েক জন রয়েছি সঙ্গে এবং বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলছি। স্যার কিন্তু আমাদের নিরস্ত করছেন। কত কষ্ট করে অর্থ আর শ্রম দিয়ে এ সব মেলা আয়োজন করতে হয়, তাই একদিন আমাদের কষ্ট হলই বা! এই সব কথা তিনি আমাদের বোঝাতেন আন্তরিক ভাবেই। 

জ্যোতিষ-বিরোধিতা প্রসঙ্গে স্যারের ছিল ক্ষুরধার যুক্তি। জ্যোতিষশাস্ত্রের অসারতা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে স্লাইড প্রদর্শনগুলোতে তিনি কোনো বাগাড়ম্বর নয়, ব্যবহার করতেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যকে। আর এ বিষয়ে তাঁর প্রজ্ঞা ছিল অপরিসীম। দীর্ঘদিন (১৯৬৮-১৯৮৮) প্রথমে নটিক্যাল অ্যালামনাক ও পরে এই সংস্থার নাম পরিবর্তন হয়ে তৈরি পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার-এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, বিভিন্ন তিথিগণনা, চন্দ্র-সূর্যের উদয়-অস্তের সময় মাপা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ তারিখ, সময় ধরে পূর্বাভাস দেওয়ার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটা বৈজ্ঞানিক ভাবে ভারতে এই একমাত্র প্রতিষ্ঠানেই হয়।

পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান যা বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার ফল। যদিও এটি প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর আগেই মেঘনাদ সাহা মারা যান (১৯৫৬)৷ যাদের ধারাবাহিক পরিশ্রমে চিন ও জাপান ছাড়া এশিয়া মহাদেশের তৃতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি রূপ পায় ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অগ্রণী ও অন্যতম প্রধান। জ্যোতিষশাস্ত্রের কারবারিরা এই সংস্থার তথ্যগুলো ব্যবহার করেন কিন্তু দুর্বোধ্য আঁকিবুকি কেটে গ্রহের সঙ্গে মানুষের ভাগ্যের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন যা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। স্যার এ সবের সরব প্রতিবাদ করতেন সব সময়।

তাঁর লেখা ‘জ্যোতিষশাস্ত্র কি বিজ্ঞান?’ বইটি বহূল প্রচারিত৷ বইটির ইংরাজি অনুবাদও যথেষ্ট জনপ্রিয়। বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে জ্যোতিষীদের ভ্রান্ত ধারণা প্রচার ও মানুষকে প্রতারণা তিনি মেনে নেননি কখনোই। প্রাসঙ্গিক ভাবে বলা যায় যে এর ফলে প্রমাদ গুনলেন একদল জ্যোতিষী। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা প্রাণনাশের হুমকি দিলেন – অবিলম্বে এ সব প্রচার বন্ধ করতে হবে। অবশ্য সে যাত্রায় ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন রক্ষা পায় পুলিশ প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ অফিসারের সক্রিয় ভূমিকায়। উল্লেখযোগ্য যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জ্যোতিষ-বিরোধিতায় তিনি ছিলেন অবিচল যা মেঘনাদ সাহার  ভূমিকার উজ্জ্বল অনুসরণকেই মনে করিয়ে দেয় আমাদের।

Continue Reading
Advertisement
বিনোদন9 mins ago

‘তারক মেহতা…’ বাদে সোমবার থেকে হিন্দি বিনোদনের চ্যানেলগুলোয় ফিরছে নতুন এপিসোড

দেশ36 mins ago

বলিউড ছবির ধাঁচে কী ভাবে রচিত হয় বিকাশ দুবের ধরা দেওয়ার চিত্রনাট্য?

রাজ্য43 mins ago

ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন মহীনের অন্যতম ‘ঘোড়া’, রঞ্জন ঘোষাল

দেশ1 hour ago

সক্রিয় করোনা রোগীর ৯০ শতাংশই আটটি রাজ্যে!

বিদেশ2 hours ago

বিদেশি ছাত্রদের বিতাড়ন সংক্রান্ত নয়া মার্কিন নির্দেশিকার বিরুদ্ধে মামলা হার্ভার্ড ও এমআইটির

গাড়ি ও বাইক2 hours ago

এ বার অনলাইনেই কেনা যাবে হোন্ডার বাইক-স্কুটার

Kolkata High Court
কলকাতা3 hours ago

শুক্রবার থেকে বন্ধ কলকাতা হাইকোর্ট

Mamata Banerjee
রাজ্য4 hours ago

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অক্সফোর্ডে বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ

দেশ8 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ২৪৮৭৯, সুস্থ ১৯৫৪৭

currency
শিল্প-বাণিজ্য3 days ago

পিপিএফের ৯টি নিয়ম, যা জেনে রাখা ভালো

কলকাতা23 hours ago

কলকাতায় লকডাউনের আওতায় পড়া এলাকাগুলির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত

রাজ্য2 days ago

পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু জায়গায় ফের কড়া লকডাউনের জল্পনা

দেশ2 days ago

দ্রুত গতিতে বাড়ছে সুস্থতা, ভারতে এক সপ্তাহেই করোনামুক্ত লক্ষাধিক

ক্রিকেট3 days ago

ওপেনার সচিন তেন্ডুলকরের গোপন রহস্য ফাঁস করলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

বিদেশ2 days ago

অনলাইনে ক্লাস করা ভিনদেশি পড়ুয়াদের আমেরিকা ছাড়তে হবে, নির্দেশ ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের

রাজ্য2 days ago

বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা থেকে রাজ্যের কনটেনমেন্ট জোনগুলিতে কড়া লকডাউন

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 days ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

কেনাকাটা3 days ago

রান্নাঘরের টুকিটাকি প্রয়োজনে এই ১০টি সামগ্রী খুবই কাজের

খবরঅনলাইন ডেস্ক : লকডাউনের মধ্যে আনলক হলেও খুব দরকার ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভালো। আর বাইরে বেরোলেও নিউ নর্মালের সব...

কেনাকাটা4 days ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

DIY DIY
কেনাকাটা1 week ago

সময় কাটছে না? ঘরে বসে এই সমস্ত সামগ্রী দিয়ে করুন ডিআইওয়াই আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক :  এক ঘেয়ে সময় কাটছে না? ঘরে বসে করতে পারেন ডিআইওয়াই অর্থাৎ ডু ইট ইওরসেলফ। বাড়িতে পড়ে...

নজরে