nandan, kolkata
নন্দন চত্বর।
jahir raihan
জাহির রায়হান

কাজ ছিল না কিছুই কলকাতায়, বউ-বেটিও নেই বাড়িতে। নির্ভেজাল এই পড়ে পাওয়া অবসরের দিনকয়েক আগে থেকেই অবশ্য মন উচাটন নন্দন-ববীন্দ্র সদন চত্বরের পানে। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনেই যে ক্যান্টিনটা রয়েছে, তার মাছভাত বড়ো প্রিয় আমার। অথবা ময়দান মেট্রো স্টেশনে নেমে ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে কলকাতা দেখতে দেখতে নন্দনে পৌঁছোনো, সেটাও বেশ ভালো রকমের পছন্দের। ছাত্রজীবনে প্রায়শই যেতাম, কখনও একা, কখনও সঙ্গে দু-একজন ন্যাকা ন্যাকা বান্ধবী। নন্দনের সিটে বসে পিছনপানে ঠেলা দিলেই সিটখানি সরে গিয়ে আমাকে প্রায় শুয়ে পড়ার স্বাধীনতা দিত, খুব ভালো লাগত। অথবা তিরিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে দু-আড়াই ঘণ্টা একটানা বাতানুকূল পরিমণ্ডলে নির্বাক বসে থাকার বেবাক যে বিলাসিতা তা-ও দিত নন্দন, অবলীলায়।

এ সবই আসলে মিস করছিলাম বিগত কয়েক দিন। একটা ব্যাপার আমি বড়ো অদ্ভূত ভাবে খেয়াল করেছি, জ্ঞান হওয়ার পর ইস্তক আমাদের চিন্তাভাবনা থাকে বেশ ঊর্ধ্বমুখী। পেশাগত একটা ভাবনা মাথায় কাজ করে, আমায় ডাক্তার বা মাস্টার হতে হবে, মডেল কিংবা সিনে-তারকা, নিদেনপক্ষে সিরিয়ালের কোনো একটি চরিত্র আমার হতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আরও একটা চাহিদা মাথায় ধূমায়িত হয়, বন্ধু-বান্ধবী, প্রেমিক-প্রেমিকার প্রয়োজন। প্রেমিক-প্রেমিকা জুটে গেলে পরের ধাপটাই হল বিয়ে, লাল টুকটুকে বউ বা ড্যাশিং হাজব্যান্ড, মোটা মাইনেওলা। তা বিয়ে তো হয়ে গেল, সংসারযাত্রাও শুরু হল, দিন কাটতে লাগল আনন্দে-নিরানন্দে। বাবা-মা হওয়াও হল, পাওয়া গেল সন্তানসুখ। এ দিকে ঝামেলাটা হয়েছে, প্রেম থেকে পিতা-মাতা হতে গিয়ে মাঝে যে সময়টা অলক্ষ্যে অতিবাহিত হল, তারই ফাঁকে আমাদের ঊর্ধ্বমুখী চিন্তাটা কখন যে মাথা নামিয়ে নিম্নমুখী যাত্রা শুরু করেছে, আমরা টের পাইনি। কেননা কখনোই শুনবেন না বা নিজেও অনুভব করবেন না যে আমি দাদু হতে চাই, দিদিমা-ঠাকুমা হতে চাই বা শ্বশুর-শ্বাশুড়ি হতে পারলে বড়ো ভালো হত। আবার মজার ব্যাপার এখানেই, আপনি-আমি না চাইলেও প্রকৃতি ঘাড় ধরে আমাদের সে পথে নিয়ে যাবে, কোনো ছাড় নেই। আর ঠিক এই টালবাহানার সময়ই আপনার অতীতের কথা মনে পড়বে। শীতের রাতে চাদরে মুখ ঢেকে ব্লু-ফ্লিম দেখা, বান্ধবীর সাথে বোস কেবিনে আধা আলোয় প্রেমালাপ, পাশাপাশি সিটের সিনেমা হলে হাত ধরাধরি করে বসে থাকা, অথবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধূলা, হইহুল্লোড়, হাসি-মস্করা, আড্ডা। কারও কারও একাকী যাপনের জন্যও মন কেমন করে, যেমন আমি, বিয়ের ছ’ বছরের মাথায় আমার নন্দন-রবীন্দ্র সদন চত্বরের জন্য মন কেমন শুরু হল। মনে পড়ে গেল একুশে ফেব্রুয়ারি সারা রাত জাগার কথা, মনে পড়ে গেল তালিকা মিলিয়ে বস্তা ধরে বইবাজারে সস্তায় বই কেনার কথা। গন্ধ পেলাম সেই এগরোলটির যেটা খাইয়েছিল সংগীতা চত্বরের কোণার ওই দোকানটি থেকে কিনে। শিশির মঞ্চের কোণে একটা লুকোনো টয়লেট ছিল, ব্যবহারে পয়সা লাগত না, তার কথাও মনে পড়ল।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: মকবরা… সাদত আলী খান এবং মুশিরজাদী মকবরা / প্রথম পর্ব

সুতরাং কোনো কাজ না নিয়েই গেলাম কলকাতা। বাড়ি থেকে বেরোলামও দেরি করে, ঘণ্টা চারেকের রাস্তা, বেলায় বেরোনো দেখে প্রতিবেশী বাক্কারভাই বললেন, অবেলায় কলকাতা? ছোটো করে জানালাম, ১টার পর পৌঁছোলেও হবে। হলও তা-ই, ১টা ৪০ নাগাদ আমি ক্যান্টিনের সামনে, মাছভাতের টানে। মাছভাত এখন ৮০ টাকা, এত দাম তো ছিল না? জিএসটি লাগছে নাকি? ভাবতে ভাবতেই খোলা আকাশের নীচে গাছের ছায়ায় পেতে রাখা লাল টেবিলে থালা নামাতেই উড়ে এল রাজ্যের কাক, ঠিক আগের মতোই। অভ্যেস যাবে কোথায়? আধারের পরিবর্তন হয়, অভ্যেসের নয়, কাকেদের দেখেই বুঝলাম। আমি ঠিক সেখানেই বসেছি যেখানে বরাবর বসতাম, সামনের চেয়ারটা ফাঁকা থাকে, এ বারেও তা-ই আছে। তার মাথায় একটি কাক আমার দিকে দৃষ্টি হেনে বসে আছে, অপেক্ষা করছে আমার অন্যমনস্কতার, সুযোগ পেলেই ছোঁ মারবে, জানি আমি। মাথায় কাক নিয়ে গোগ্রাসে খাওয়ার যে টেনশন সেটাও দেখলাম মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, আগের মতোই, বুঝলাম সব একই আছে, পূর্ববৎ। যদিও আমার কান, আমার পিছনে মহিলামণ্ডলের আক্ষরিক অর্থেই যে গোলটেবিল বৈঠক চলছে সে দিকে খাড়া হয়ে আছে। প্রত্যেকের হাতে নরম পানীয় আলুর চিপস সহযোগে। নানান গল্পে তারা মশগুল, রবিবারের ছুটি তারা উপভোগ করছে নিজেদের মতো করে।

এর আগের বার ঠিক ওই টেবিলেই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুনেছিলাম। প্রশ্ন করেছিল একটি ছেলে। সে আসার আগে দেখেছিলাম দু’ জন তরুণী এসে বসল, একজনের মুখশ্রী সরস্বতী প্রতিমার মতো, কোনো একটা উদ্ভূত সমাধানহীন সমস্যা নিয়ে তারা আলোচনা করছিল। কিছুক্ষণ পর সেই প্রতিমা ব্যাগ হতে সিগারেট বের করে হাতে রাখল। আমি ব্যাটা গেঁয়ো ভূত, ওই দৃশ্য দেখেই আমার সব প্রেমানল দপ করে নিভে গেল। আর কিছুটা সময় পর, লম্বা ফরসা একটা ছেলে এসে বসল। কান খাড়া রেখে বুঝলাম এটাই সেই সমস্যা যা নিয়ে চলছে এখন ত্রিমাত্রিক আলোচনা। হঠাৎই উত্তেজিত হয়ে ছেলেটি বলে উঠল, কোথায় লেখা আছে দু’জনকে আমি একসাথে ভালোবাসতে পারি না? বলা বাহল্য এ প্রশ্নের যথাযথ উত্তর আমার কাছে ছিল না, আমার নিজের মাথাতেই তখনও একটা অন্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, এমন ধারা সুন্দরী সিগারেট খায় কেন?

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: মকবরা… সাদত আলী খান এবং মুশিরজাদী মকবরা / শেষ পর্ব

সবটা যে ঠিক নেই, তা বুঝলাম বাড়তি ভাত চেয়ে। ভাত চাইতে বলল, ক’ বাটি? তরকারি লাগবে? অবাক হলাম, আগে ভাত চাইলে বালতি করে আনত, আলাদা দাম লাগত না, এখন লাগবে বুঝি? অচ্ছে দিনের সময়, হতেও পারে কিছুই বলা যায় না। হলও তাই, থালায় ভাত ঢেলে দিয়েই অন্নদাতা বলল, যাবার সময় কাউন্টারে পাঁচ টাকা দিয়ে যাবেন। আমি মাথা ইতিবাচক নাড়ালাম, কিন্তু শেষমেশ আর দিইনি, মুর্শিদাবাদ থেকে উজিয়ে অতীতকে ছুঁতে গেছি, অতীত ধরাও দিচ্ছে, পাঁচ টাকার জন্য তাকে হাতছাড়া করতে জান চাইল না।

খাওয়ার পর চত্বরে অভ্যস্ত চোখ এখানে-ওখানে প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল খুঁজছিল। সত্য স্বীকার করি, সুপ্রিম কোর্ট রামধনু জুটির পক্ষে রায় দেওয়ায় সেই জুটিও খুঁজছিলাম ইতিউতি। তাদের পেলাম না তবে একটা অস্বস্ত্বিকর প্রশ্ন মাথায় এল, আচ্ছা আমি যদি আমার কোনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিই, অথবা অন্য দু’টি ছেলে বা অন্য দু’টি মেয়ে একসাথে গল্পগুজব করে, তা হলে পথচলতি অপরিচিত লোকজন কি তাদের রামধনু জুটি ভাববে? যুগের যা হাওয়া তাতে সেটা ভাবা কি অন্যায়, না স্বাভাবিক? এ প্রশ্নেরও উত্তর পেলাম না যথারীতি। অগত্যা ফোন করলাম বিদ্যুৎদাকে।

বিদ্যুৎদা ট্রাভেল রাইটার্স ফোরামের একজন সক্রিয় কর্মকর্তা। ফোরামের উদ্যোগে চলছে তিন দিনের ভ্রমণ বিষয়ক আলোকচিত্রের প্রদর্শনী গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায়। আর হ্যাঁ, ফোরামের বার্ষিক সংকলনে আমার একটি লেখাও রয়েছে। বিদ্যুৎদার কন্ঠস্বর খুব আন্তরিক। বললেন, জাহির আমি যাচ্ছি, ততক্ষণে তুমি নন্দনে একটা সিনেমা দেখে নাও। একী! এ তো ‘আমারও ছিল মনে, কেমনে দাদা পেরেছে সেটা জানতে’! সুতরাং হ্যাপি পিল, তিরিশ টাকায় ঠান্ডা হাওয়া সেই পুরোনো দিনের মতোই।

সিনেমা শেষ, হ্যাপি হ্যাপি মুড নিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি নব্য তরুণ–তরুণীর জটলা, চলছে ইতিউতি আড্ডা, সেলফির মহড়া, সেই চির চেনা দিনগুলির মতোই। গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালা তখন জমজমাট, দুর্দান্ত, দুরন্ত ছবির সমাবেশে অতবড়ো হল উজ্বল, ভাস্বর। কাকে ছেড়ে কাকে দেখি অবস্থা। একে একে সব দেখা হল, বিদ্যুৎদা এলেন, হাতে ধরিয়ে দিলেন সৌজন্যের সংখ্যা ‘ভ্রমী’, বাইরের কংক্রিটের ধাপীতে বসে ‘ভ্রমী’র পাতা উলটাতে লাগলাম, দেখলাম বিখ্যাত সব লিখিয়েদের ভিড়ে অর্বাচীন জাহির রায়হানের লেখাটিও স্থান পেয়েছে, ভালোবাসার অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে ‘সহসা কাঞ্চন ও গজলডোবার তিস্তা’।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here