রবিবারের পড়া: ‘কাকে বলে ভালো থাকা?’ এমন প্রশ্ন তিনিই তুলতে পারেন

0

পাপিয়া মিত্র

এক কবি যেতে চেয়েছিলেন কীর্তনখোলা নদীর তীরে। আর এক কবি যেতে চেয়েছিলেন সান্ধ‍্যনদীর ধারে। জীবনের প্রান্ত সময়ে। কিন্তু দুঃসময় বলে কয়ে আসে না। তাই তাঁদের শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়নি সেই অর্থে। গিয়েছিলেন শেষ ইচ্ছের আরও বছর দুই আগে। দুই কবিই বরিশালের ভূমিপুত্র।

Loading videos...

কবি অরবিন্দ গুহর স্মরণসভায় গভীর নিবিড় আর অত‍্যন্ত কাছ থেকে শঙ্খবাবুকে দেখা আমার। দু’জনেই আপাত আটপৌরে পোশাকে অথচ প্রবল ভাবে ব‍্যক্তিত্বময় দুই পুরুষ।

সামান্য গুঞ্জন, তিনি আসছেন। সবাই উঠে দাঁড়ালেন। ধীর পায়ে এলেন, বসলেন। বছর তিনেক আগের সময়। কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউস। বহু ভালোবাসার মানুষের উপস্থিতি। তারই মাঝে শ্বেতশুভ্র পোশাকে শঙ্খবাবু। খানিক তফাতে বাকি সকলে। এক সময়ে আমার কিছু বলার পালা এল।

বলতে উঠে প্রথম কথা অরবিন্দ গুহ (ইন্দ্রমিত্র) ছিলেন আমার কাছে মেসোমশাই। প্রথম সারিতে বসা ধুতির পা একটু জমিয়ে বসল। নিজের মতো করে বলায় স্বাভাবিক ভাবেই খানিক থামা। বহু স্মৃতির জট মাথায়। বলতে বলতে সামনে তাকাতেই সেই মানুষটির স্থির দৃষ্টি যেন মনে হল আমার না-বলা কথামালা দ্রুত সব পড়ে ফেলছেন। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। খুব কাছ থেকে দেখা এই আমার শঙ্খবাবুকে। তা-ও মাত্র বছর তিনেক আগে।

বহু বার দেখেছি দূর থেকে, পর্দায়, মঞ্চে। দেখেছি বেশি, শুনেছি কম। আসলে বড়ো কম কথার মানুষ ছিলেন কিনা। এখানেই তিনি মাস্টারমশাই, অন্তত আমার কাছে।  শিখতে পারিনি কী করে কম কথা বলে কলমে গর্জে ওঠা যায়। কোনো দিন যেতে পারিনি বইপাহাড়ে ঘিরে থাকা ফসলঘরে। মনে হয়েছে অসম্ভব গাম্ভীর্যপূর্ণ শান্ত মানুষটিকে ফোন করব? ভয়ে, সত্যি সেই ভয় আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে আজীবন। যদি উনি সম্মত হন তা হলে আমি কী ভাবে সামনে দাঁড়াব? আমার কটা কবিতার লাইন নিয়ে? আমার প্রায় কিছুই করতে-না-পারা জীবনের জন্য উনি মূল্যবান সময় ব‍্যয় করবেন? গিয়ে যদি দেখি একঘর ছেলেমেয়ে! আর উনি বলছেন, “তোমরা এসেছ তাই তোমাদের বলি/এখনো সময় হয়নি।/একবার এ মুখে একবার অন‍্য মুখে তাকাবার এই সব প্রহসন/আমার ভালো লাগে না।”

কিন্তু করেছেন, বহু মানুষের পাশে থেকে স্নেহের কলম উপহার দিয়েছেন। তাই তিনি স‍্যার, মাস্টারমশাই। কাছে না যেতে পারলেও আপনি আমার কাছে মাস্টারমশাই শঙ্খবাবু। মনে হয়েছে এক জন শিক্ষকই বলতে পারেন এমন কথা। দিতে পারেন এমন উপদেশ – “অন্ত নিয়ে এতটা ভেবো না।/মৃত্যুপথে যেতে দাও/মানুষের মতো মর্যাদায়– শুধু/তোমরা সকলে ভালো থেকো।/কিন্তু কাকে বলে ভালো থাকা? জানো?” এমন বাস্তব প্রশ্ন তিনিই তুলতে পারেন, কারণ তিনি এই সমাজের মাস্টারমশাই। এই অশান্ত সময়ে তিনি চেতনায় নাড়া দিয়ে গেছেন। “কাকে বলে ভালো থাকা?” এই ভালো থাকার বীজমন্ত্র তিনি তো তাঁর ভাবীকালকেই দিয়ে গেছেন, যাঁরা তাঁর সান্নিধ‍্য পেয়েছেন গভীর ভাবে, নিবিড় ভাবে।

আরও পড়ুন: নিঃশব্দেই, তিনি তর্জনী উঠিয়ে থাকবেন

স্বভাবসিদ্ধ মন্দ্রতারে বাঁধা মাস্টারমশাইয়ের কাঠামো ঠিক সাধারণের বৃত্তে ধরা পড়ত না। যেমনটি এই কলমচির পড়েনি। তাই দূর থেকে তাঁর বিভার ওম নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই দুর্যোগের সময় ৪০ ও ৫০-এর দশকের কৃষ্টির অভিভাবকেরা জায়গা ফাঁকা করে দিচ্ছেন। সময়ের ডাকে হাত মেলাচ্ছেন। মাস্টারমশাই আপনার প্রবাদ দিয়ে ডাক দিই “কিছুই কোথাও যদি নেই/তবুতো কজন আছি বাকি/আয় আরো হাতে হাত রেখে/আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি”। আপনার শিক্ষা বহু মানুষের চলার পথের পাথেয়। প্রতিবাদী হওয়ার শিক্ষা, নানা পুরস্কারে উজ্জ্বল হয়েও কী ভাবে নিরুত্তাপ থাকা যায়, সেই শিক্ষা। তবে আপনাকে মাপার সাহস আমার নেই মাস্টারমশাই।

বাংলা ভাষার ওপর মাস্টারমশাইয়ের দখল প্রায় ক্লাসিক‍্যাল। আমাদের ভাষার নিজস্ব এক সৌন্দর্য আছে। প্রতিটি শব্দের যে আলাদা আলাদা ধার ও ভার আছে তা মাস্টারমশাইয়ের চেয়ে ভালো করে খুব কম লেখকই অনুভব করেছেন। কোনো পুরস্কারই মাস্টারমশাই আপনাকে মাটিছাড়া করেনি। মাথা আকাশ ছুঁলেও পা দু’খানি বাঁধা ছিল আটপৌরে সংসারে। “আমিই সবার চেয়ে কম বুঝি, তাই/আচম্বিতে আমার বাঁ-পাশে এসে হেসে/পিঠ ছুয়ে চলে যাও;/অত কি সহজ? বলো তুমি।”

ছবি ফেসবুক থেকে নেওয়া।

আপাতগম্ভীর মানুষটির আড্ডা ছিল না? এক জায়গায় নবনীতা দেবসেন লিখছেন, সারা বিকেল সারা সন্ধে আড্ডা দেওয়ার সুন্দর বন্ধুরা ছিলেন সুবীর, প্রণবেন্দু, অমিয়, স্বপন, সৌরীন, মানব, শঙ্খদা, চিত্তবাবু, পিনাকেশ, অশোক, পরে এলেন পবিত্র। যাদবপুরের ঝিলের ধারে, ফ‍্যাকালটি ক্লাবের টেবিল ঘিরে চা অমলেট টোস্টের আড্ডা। কত কিছু জানা ও শেখা ওই চায়ের আসর থেকে। সেই আড্ডার রংরসের তুলনা হয় না। সকলেই কিছু না কিছু লিখছেন। যে যার কাজ নিয়ে কথা হয়। একে অন‍্যের কাছে উপকৃত হয়। তখন কলকাতা দূরদর্শন নবজাতক। শঙ্খদা আর স্বপন পঙ্কজকে সাহিত্যসম্পর্কিত অনুষ্ঠানের নানা আলোচনায় সাহায্য করতে যেতেন। সুবীর, সৌরীনের ভারতকোষ, অশোকের সমার্থক বাংলা অভিধান, প্রণবেন্দুর অলিন্দ, কৃত্তিবাস চলছে রমরমিয়ে, নিত‍্যনতুন নাটক তৈরি হচ্ছে শহর কলকাতায়। বাংলাদেশ থেকে নাটকের দল আসছে। শম্ভু মিত্র এসে শুনিয়ে যাচ্ছেন চাঁদ বণিকের পালা। মাঝে মাঝে শঙ্খদা সমেত যাদবপুর থেকে দল বেঁধে নাটক দেখতে যাচ্ছি। তখন চারদিকের বাতাসে নবীন সৃষ্টির উত্তেজক মুহূর্ত ভেসে বেড়াচ্ছে। এরই মধ‍্যে নিত্য নতুন বই বেরিয়ে যাচ্ছে শঙ্খবাবুর।

সময় ১৯৫১। সংকটে বার বার উদ্ধত হয়েছে কলম। কোচবিহারের ভুখা মিছিলে অসহায় মানুষের ওপরে চলেছিল পুলিশের গুলি। কবিতা বসু (২৫), বন্দনা তালুকদার (১৬), বাদল বিশ্বাস (২০), সতীশ দেবনাথ (১৫) আর বকুল তালুকদারের (৭) দেহ রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। কবির সৃষ্টি ‘যমুনাবতী’ এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল, “আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি বাঁচার আনন্দে।”

জরুরি অবস্থার প্রতিবাদ কেমন ছিল? “ভোর এল ভয় নিয়ে, সেই স্বপ্ন ভুলিনি এখনো/স্থির অমাবস‍্যা, আমি শিয়রে দাঁড়িয়ে আছি দিগন্তের ধারে/দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে /আমার শরীর যেন আকাশের মূর্ধা ছুঁয়ে আছে।” অথবা “পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, রক্তে জল ছল ছল করে/নৌকার গলুই ভেঙে উঠে আসে কৃষ্ণা প্রতিপদ/জলজ গুল্মের ভারে ভরে আছে সমস্ত শরীর/আমার অতীত নেই, ভবিষ্যৎও নেই কোনোখানে।”

কবিতা সংগ্রহ/দে’জ পাবলিশিং/প্রথম প্রকাশ পৌষ ১৩৬৭/প্রচ্ছদ পূর্ণেন্দু পত্রী/দাম কুড়ি টাকা। কবির প্রয়াণের দিনই সোশ্যাল মিডিয়া মারফত এসে পড়ে পিডিএফ। কোনো এক শুভাকাঙ্ক্ষী পাঠিয়েছেন। ঈশ্বর জানেন আমি কম জানি, পড়ি তার থেকেও কম। ইচ্ছার প্রাধান‍্যে এসে পড়ে কিছু কিছু হাতে। ঠিক এই ভাবে “লাইনেই ছিলাম বাবা” পেয়ে গিয়েছিলাম অফিসে কাজ করতে করতে। কটা বাক‍্যে এই বিশাল ব‍্যাপ্তিময় কবিকে কী ভাবে ধরব? রবীন্দ্রচর্চায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন মাস্টারমশাই। অনুবাদের কাজেও তাঁর কলম চলেছে সমান গতিতে। বিশ্বের কবিতা থেকে চয়ন করে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর সঙ্গে জুটি বেঁধে সম্পাদনা করলেন ‘সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত’। সাহিত্যের প্রতি তাঁর সত‍্যানুরক্তি ও সদাশয়তা ছিল অপার। শক্তি চট্টোপাধায়কে নিয়ে একটি অবিশ্বাস্য প্রবন্ধ লেখেন ‘এই শহরের রাখাল’। বাংলা সাহিত্যজগতে প্রায় সমবয়সি প্রতিদ্বন্দ্বী কবির ভূয়সী প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত হননি কখনও।

কিন্তু এ বড়ো যন্ত্রণাময় পরিস্থিতি। কে বাঁচি, কে থাকি এটুকু নিয়ে যাপনের শ্বাস ফেলা। এখন “যেদিকেই যাও শুধু প্রাচীনের ভস্ম ঝরে পড়ে/মাথার উপরে/বন্ধ হয়ে আসে সব চোখ/ভুলে গেছি কে দেয় কে দিতে পারে/কেইবা প্রাপক/এই মহা ক্রান্তিকালে।” তবু জানি আমার এক কোল আছে, আছে এক আশ্রয়। আছেন আমার মাস্টারমশাই। কবি জয় গোস্বামীর কলম দিয়ে এই আশ্রয়টুকু প্রাপ্তি হয়ে থাক – “আমি আছি তোমার আশ্রয়ে/এই দিন পুড়ে যাওয়া দিন/এ জীবন, ঝলসানো জীবন/এসে বসি তোমার আশ্রয়ে/তুমি দাও ক্ষতের ওষধি/দাও শ্বাসবায়ু। (কবি শঙ্খ ঘোষকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখা ‘আশ্রয়’ কবিতার অংশবিশেষ)  

আরও পড়ুন: শঙ্খ ঘোষ নেই, তাঁর ধুম লেগেছে হৃৎকমলে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন