শিখা দত্ত

আড্ডা কাকে বলে, এই প্ৰশ্নটা দিয়ে শুরু করতে গিয়ে গুগলে আড্ডার যে ডেফিনেশন পেলাম তা হল, এক সঙ্গে কয়েক জন বসে বৌদ্ধিক মতবিনিময় বা ভাববিনিময়ের চর্চা। সে হিসাবে আড্ডা নিছক অলসবেলার অবসর বিনোদন নয়, আড্ডা মানে বাতিকও নয়, আড্ডা মানে নয় সময়ের কর্মনাশা অপব্যবহারও।

বাঙালি কি তার আড্ডার মহিমা, বৈভব হারাচ্ছে্? ইদানীং গোটা বঙ্গদেশে প্রসিদ্ধ কোনো আড্ডার ঠিকানা আজকালকার দিনে কারও কাছেই নেই। কফিহাউসের মতো বিখ্যাত আড্ডায় এখন আর তেমন বিখ্যাত ব্যক্তি নেই। নেই কেন, সে-ও এক প্রশ্ন। তা হলে কি বাঙালির প্রতিভা কমে যা‌চ্ছে নাকি!

Loading videos...

সে যা-ই হোক, হাতে এখন সময় কম। তা ছাড়া সবাই এখন পৃথগন্ন। পুরুষ মানুষেরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাজার ফেরত পাড়ার চাদোকানের বেঞ্চে খানিক পিছন ঠেকিয়ে দু’এক পাত্র চাপান করেন। ফাউ হিসাবে পাওয়া যায় সকালের খবরের কাগজটা। এইটুকুই আড্ডা। বড়োজোর দু’ একটি মন্তব্য। দেশদশ নিয়ে চিন্তার জায়গা রাস্তার ধারঘেঁষা পাড়ার চায়ের দোকান।

আড্ডা আসলে সচেতনতার পাঠক্রম। জীবনে এক এক সময়ে মানুষ এক এক রকম ভাবে ভাবেন। যে ভাবে সে কৈশোরে্ ভেবেছিল, সে ভাবে কখনও সে যৌবনে ভেবেছে কি? মনে হয়, একটি মানুষ কী ভাবে ভাবনাচিন্তা করবেন, তার ভূতভবিষ্যতের সবটুকু পরিণাম মানুষ জাত হওয়ামাত্র অর্জন করে। তার পর তাকে হাতে পেতে হয়। হাতে ধরে না খেলে মানুষের সয় না।

তবে কিনা সত্যকে চেটেপুটে খা্ওয়া্র পরে তার বদহজম কিংবা হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠা – দুইই সত্যের বিরুদ্ধে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার নিরিখে একএকটি পরিণাম। তাই কবি বলেছেন, সত্যরে লও সহজে।

অফিসে কাজের ডেস্কে বসে আড্ডা, আড্ডার নামে জালিয়াতির সমান। কাজের জায়গায় বিঘ্ন ঘটিয়ে যে আড্ডার আয়োজন, সে তো চেনা বামুনের পৈতের মতো পুরোনো ঝোঁক। এই প্রবণতা রুখতে কর্মসংস্কৃতি. ডু ইট নাউ স্লোগান তৈরি করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

এই আমলে ক্লাব কালচার সরকারি আনুকূল্য পাচ্ছে। পাড়া বা গ্রামস্তরের ক্লাবগুলিকে নিয়মিত টাকার জোগান দিচ্ছে সরকা‌র। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। ক্লাবের আড্ডাও সর্বগ্রাসী। তাস, ক্যারাম থেকে শুরু করে আড্ডার উপকরণ হিসাবে সেখানে থাকতে পা্রে টিভি, মোবাইল, খবরের কাগজ। মিডিয়াও এখন আড্ডার এক প্রিয় বিষয়। বরং, আরও ভালো করে বললে বলা ভালো, মিডিয়া বিনে গীত নাই।

মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় নিয়ে আড্ডা মারেন, সে ব্যাপারে যদি নজর দেন, তা হলে লক্ষ করে দেখবেন যে, এ যুগের মানুষ খবরাখবর নিয়ে কথাবার্তা বলতে ভালোবাসেন। নিজের জীবন সম্পর্কে মানুষের প্রকাশ্যে বলার কথা অল্প। ছেলেমেয়ের বিয়ে বা পড়াশোনা, নিজের ওষুধপত্র সম্পর্কে বলার চেয়ে সমাজ নিয়ে কথা বলতেও ভালো, শুনতে ভালো। যদিও সে কারণেই আবার আড্ডাগুলি কেমন ছাড়াছাড়া লাগে। কেননা বিখ্যাত আ্ড্ডার বিখ্যাত গুণ হল, প্রত্যেক আমরা পরে তরে! আড্ডায় তা হলে কি আজ বিশ্বাস জিনিসটিই অনুপস্থিত?

আড্ডার যে ডেফিনেশন গুগল সার্চ করে খুঁজে পেলাম, তাতে দেখা যাচ্ছে, আড্ডা জিনিসটি আসলে সৃষ্টিশীল। যে ভাবে ইমারত তৈরি হয়, আড্ডার মণিমুক্তাগুলি সে ভাবে কিছু না কিছু বহুমূল্য উপহার দেয়। যুক্তিতক্কো করে আ্ড্ডা এমন এক গল্প তৈরি করে, যা সম্পর্কগুলিকে মাধুর্য দেয়।

কিন্তু শক্রর সঙ্গে আড্ডা চলে না! মহামতি যুধিষ্ঠির ওই কম্মোটি করতে গিয়ে হেরেহুরে সর্বনাশের কিনারায় পৌঁছে গভীর অনিশ্চয়তার খাদে ঝাঁপ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাণ্ডবদের বনবাস কতটা যুধিষ্ঠিরের স্বেচ্ছাকৃত ভালোমানুষির জের, তা ভারতবাসী মাত্রেই জানেন। শকুনির পাশাখেলার স্থানটি তাই বিরল থেকে বিরলতম জাহান্নমের মতো আড্ডাস্থলের একটি কুদৃষ্টান্ত।

আড্ডা বলতে যে কোনো বাঙালি গুনগু‌ন করে গাইবেন, কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই। ওই গান শুনেই কত তরুণতরুণী কফিহাউসে ঘুরতে গিয়ে বিস্ম‌িত হয়েছেন।

এখন তো ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপসহ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আড্ডার বিস্তর সুযোগ। জিও আনলিমিটেডে খুব অল্প খরচে আড্ডার সুযোগ। কিন্তু এ ধরনের আড্ডাগুলি যেন অশরীরি আড্ডার মতন। পাত্রপাত্রী অন্যত্র থাকলে, তাকে না ছোঁয়া গে্লে সে্ আড্ডাটা তেমন প্রাণ পায় না। আসলে আড্ডায় কীসে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়, সে ব্যাপারে একদিন আমাদের বাঙালিদের জুড়ি মেলা ছিল ভার।

আড্ডা হরেক রকমও। যেমন, রাজনৈতি্ক আড্ডা, সামাজিক আড্ডা, আত্মীয়পরিজনদের বা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা, স্বার্থ চরিতার্থ করতে আড্ডা, রকের আড্ডা, অফিসের আড্ডা থেকে শুরু করে নির্ভেজাল আড্ডাও ওই তালিকার পড়ছে। বলা বাহুল্য, এর ভিতর সব চেয়ে ভালো আড্ডা হল নির্ভেজাল আড্ডা।

তবে আজকালের আড্ডা নিয়ে অনেকেরই নানা অভিমান আছে। এক ভদ্রমহিলা দারুণ আড্ডারসিক। ইদানীং তিনি আড্ডা মারা বন্ধ করে দিয়েছেন দেখে তার কাছে জানতে চাই, কী ব্যাপার, আজকাল আড্ডা দিচ্ছেন না নাকি? ভদ্রমহিলা মনখারাপ করে বললেন, নাহ, আড্ডার জা‌য়গাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আজকাল আর আড্ডা কোথায় হয! পরনিন্দাই চলে বেশি। তাই আড্ডা মারাটাই বন্ধ করে দিয়েছি।

বেহুলার বাসরঘরে যেমন সর্প প্রবেশ করেছে, আড্ডায় জমাট না হলে কোনো না কোনো ছিদ্র দিয়ে সেখানে কালসর্প প্রবেশ করে আড্ডাটির বারোটা বাজিয়ে দিতেই পারে।

তাই আড্ডা মারার আগেপরে দেখে নিন, ‌যাকে আপনি আড্ডা হিসাবে মনে করছেন, আড্ডা হওয়ার মতো গুণাগুণ তার আছে কী নেই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.