Connect with us

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: সখী ভালোবাসা কারে কয়?

Published

on

দীপঙ্কর ঘোষ

সে দিন আমাদের বৃদ্ধ ডাক্তার ছুটির মেজাজে ছিলেন। চেম্বারে না গিয়ে বিমলবাবুর চায়ের দোকানের পাশে গাছতলায় বসে খোশমেজাজে চা পান করছিলেন। পাশেই কয়েক জন কমবয়সি ছেলেমেয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। বুড়ো কান খাড়া করে শুনছিলেন। কথোপকথনের সুবিধার্থে ধরে নিলাম ওদের নাম কাজু, সুজি, কিশমিশ, লবঙ্গলতিকা আর জিলিপি। কিশমিশ, লবঙ্গলতিকা আর জিলিপি  মেয়ে, বাকি দু’টি ছেলে। হঠাৎ ওদের ভেতরে কাজু কাতরোক্তি করল, “সুলোচনা, সুলোচনা গো, তুমি ভালো না বাসলে আমি আর বাঁচব না।”

একজন ফিসফিসাল, “এই বুড়োটা কিন্তু সব শুনছে।”

Loading videos...

কাজু ধূমপানরত টাকলা বুড়োকে উদ্দেশ করে বলল, “দাদু গো সুলোচনাকে না পেলে আমি মরেই যাব।”

ডাক্তার দু’ আঙুলের ফাঁকে সিগারেট রেখে উত্তর দিলে্‌ন, “তা তো বটেই। ভালোবাসা ছাড়া তো বাঁচাই যায় না…।”

ওরা বলল, “জ্জিও দাদু, ক্কী দিলে গো?”

বৃদ্ধ সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিয়ে বললেন, “হ‍্যাঁ গো দাদুভাইরা, ভালোবাসা ছাড়া কেউই বাঁচাতে পারে না। ভালোবাসাহীন হয়ে, মানে সে ভাবে একা হয়ে গেলে একটা মানুষ মরেও যেতে পারে।”

কথাটা শুনে সব ক’টাই চোখ কপালে তুলল – “বলো কীগো দাদু, এ তো কোনো দিন শুনিনি। তুমি কি কবিতা-টবিতা লেখ নাকি গো?”

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: খাবারের কোনো ধর্ম নেই, খাবার নিজেই একটি ধর্ম

বৃদ্ধ টাকে হাত বোলালেন, “উফফফফফফফ গলাটা একদম শুকিয়ে গেছে।” পুড়ে যাওয়া ফিল্টারটা টুসকি দিয়ে অমোঘ লক্ষ্যে বিমলবাবুর নোংরা ফেলার ঝুড়ির ভেতরে ফেললেন। তৎক্ষণাৎ জিলিপি হাঁক পাড়ল, “বিমলদা, গল্পদাদুকে একটা চা গরমাগ্রম আমার খাতায়…।”

ডাক্তার হাতে চায়ের ভাঁড়টা ধরামাত্রই কাজু প্রশ্ন করল, “ যে কোনো মেয়েকে দেখলেই অনেকের ঘুম আসে না, অস্থির লাগে, এটা কী?”

বৃদ্ধ মাটির গন্ধমাখা চায়ের ভাঁড়ে একটা লম্বা সুড়ুৎ করে বললেন, “এটা ইনফ‍্যাচুয়েশন। অর্থাৎ যে কোনো মানুষকে দেখলে সব সময় তার কথা ভাবা, একই কথা শয়নে-স্বপনে ঘোরা, এটা আসলে ইনফ‍্যাচুয়েশন। এটা সাধারণত কৈশোরে বেশি হয়। এটাকে আমরা অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিস‌অর্ডারও বলতে পারি।”

কিশমিশ কিয়ৎ বিস্মিত – “অসুখ? যাহ্ ব্বাবা! এটা আবার কেন হয়?”

বৃদ্ধ হাসেন – ওঁর চোখ আর গাল হাসিতে কুঁচকে ওঠে – “দেখা যায় এই ধরনের মানুষদের শরীরে সেরোটোনিন বলে একটা নিউরোট্রান্সমিটার একটু কম থাকে।”

লবঙ্গলতিকা চোখ বড়ো বড়ো করে প্রশ্ন করে, “গল্পদাদু তোমার ওই রকম কোনো  ক্রাশ ছিল নাকি?”

বুড়ো চশমাটা কপালে তুলে আকাশপাতাল ভাবেন।

“কী হল? বলো।”

“ছিল রে ছিল…মানে আজও আছে…রাত্তিরে শুয়ে তার ঘাড় ঘুরিয়ে ঠোঁট কামড়ে ব‍্যাঁকা হাসির কথা, আড়নয়নে চাহনির কথা ভাবলে, এখনও আমার পাঁজঞ্জুরিতে  তিড়িতাঙ্ক লাগায়।”

এ বার সবাই সমস্বরে জানতে চায়, “কে? কে গো তোমার সেই অবসেশন?”

বুড়ো চোখ মটকে হাসেন, “অপর্ণা সেন…আমার কিশোরবেলার অবসেশন।”

সবাই একটু হতাশ হয়ে সমবেত দীর্ঘশ্বাস ফেলে – “ এ বাবা! শেষে ফিল্মস্টার!”

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: ওজোন চাই? চলুন গাছ লাগাই

“এটাই তো অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিস‌অর্ডার – একটা অবাস্তব কিছু নিয়ে মাথাটা খারাপ করা… সেটা হাত ধোওয়া হতে পারে… কিংবা পুজোআচ্চা ধর্ম কিংবা  রাজনীতি অথবা চিত্রতারকা…।”

সুজি প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে, “ধরাব? তুমি কিছু মনে করবে না তো?”

“আরে না না। শাস্ত্রে বলা আছে, প্রাপ্তেষু ষোড়শ বর্ষে পুত্র মিত্রবৎ আচরেৎ।”

সুজি সিগারেট ধরিয়ে বলে, “যাঃ বাবা! এ তো অং বং চং আওড়াচ্ছ দেখি। তা হলে এ বার বলো দেখি, ভালোবাসা কী জিনিস? এই যে কাজু হা-হুতাশ করছে… ঘুম নেই, খাওয়া নেই, গানবাজনা, লেখাপড়া সব বাদ দিয়ে সুলোচনা সুলোচনা করে কেঁদে মরছে, এটাও কি ইনফ‍্যাচুয়েশন?”

“এসো, আজ তা হলে এই গাছতলায় বসে প্রেম সম্বন্ধে একটু গ‍্যাঁজানো যাক?”

“ভালোবাসা জিনিসটা কী করে হয়?”, বিমর্ষ কাজু ব‍্যাজার মুখে প্রশ্ন করে। 

“তা হলে বাচ্চারা চুপচাপ ধৈর্য ধরে বসো। আমি গল্পটা বলি – সব কিছু কিন্তু আমি জানি না… যতটুকু জানি ততটুকুই বলব।”

“প্রশ্ন করা অ্যালাওড তো?” কিশমিশ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করে। 

“অবশ্যই। দু’তরফ অংশ না নিলে আড্ডা জমে নাকি গো?” বুড়ো নাক কুঁচকে একগাল হাসেন।

বুড়ো ডাক্তার গ‍্যাঁট হয়ে বসে বলতে শুরু করেন, “আমি একটু গুছিয়ে বলার চেষ্টা করি। ভালোবাসা আসলে খুবই জটিল। তোমরা গোরু দেখেছ? গোরুর দুধ দোয়ানোর সময় বাছুরটাকে দূরে বেঁধে রেখে একটা খড় দিয়ে তৈরি বাছুর মা-গোরুটার কাছে ধরা হয়…।”

চশমা পরা কিশমিশ অবাক, “এম্মা! তা-ই নাকি? কেন?” ও এ রকম কথা কোনো দিন শোনেইনি। তাই চশমার ভেতরে ওর চোখদুটো গোলগোল হয়ে যায়।

“হ‍্যাঁ ভয়ানক রকম সত্যি। ওই পুতুল-বাছুরটাকে দেখলে মা গোরুর অক্সিটোসিন হরমোন বেশি করে বেরোতে থাকে, তখন তার দুধের প্রবাহ বেড়ে যায়। এই রকম ঘটনা মানুষের ক্ষেত্রেও হয়। সদ‍্য সন্তান প্রসব করেছে, এমন মায়ের কোলে অন‍্যের সন্তান তুলে দিলেও নিজের সন্তানের মতোই তার শরীরে অক্সিটোসিনের পরিমাণ বাড়বে। ফলে দুধ প্রবাহিত হবে।”

কাজু মুখ ব‍্যাজার করে, “এ বাবা! এ তো সন্তানস্নেহ… এগুলো তো অন্য জিনিস… প্রেম কোথায়?”

জিলিপি বলল, “তাই তো। গল্পদাদু প্রেম কোথায়?”

“আঃ! বাচ্চাগুলো প্রেম প্রেম করে গলা শুকোচ্ছে…হবে হবে সব হবে…একটু ধৈর্য ধরে বসো না বাপু”, ডাক্তার ধমকে দেন।

ইতিমধ্যে বিমলবাবু সবার জন্য অর্ডার অনুযায়ী ঘুগনি নিয়ে এসেছেন। তবে যে হেতু জানেন বুড়ো ডাক্তারের ঘুগনি সহ‍্য হয় না, তাই ওঁর জন্যে দু’টো টোস্ট নিয়ে এসেছেন। ডাক্তার টোস্টে কামড় দিয়ে বললেন, “অক্সিটোসিন কি কেবল মেয়েদের‌ই বেরোয়, নাকি ছেলেদের ব্রেন থেকেও বেরোয়?”

সুজি বলল, “উঁউঁ তাই তো! ছেলেদেরও বেরোয় পোস্টিরিয়ার পিটুইটারি থেকে – তাই না?”

“হ‍্যাঁ, ওখান থেকে দু’টো হরমোন বেরোয়, অক্সিটোসিন আর ভ্যাসোপ্রেসিন, দু’টোই প্রেমের গল্পে জড়িয়ে আছে, তাই এক‌ই জায়গা থেকে বার হয়।”

কাজু অধৈর্য হয়ে তাড়া দেয়, “ওফফফ! এ তো বায়োলজি, প্রেম কোথায়?”

“অধৈর্য হলে প্রেম হয় না বুঝলে খোকা?” বুড়ো ডাক্তার টোস্টে আরেক দফা কামড় দিয়ে বলেন, “তা হলে প্রসঙ্গে ফেরা যাক। আমরা প্রেমকে তিনটে ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমে আসে ‘লাস্ট’ মানে কামনা, তার পর অ্যাট্রাকশন মানে মানসিক আকর্ষণ, সব শেষে কম্প‍্যানিয়ন মানে সঙ্গে থাকা। লাস্ট আর ইনফ‍্যাচুয়েশন দু’টো আলাদা জিনিস। লাস্ট অর্থাৎ শারীরিক সৌন্দর্য মানে ইয়ে তার ফিগার দেখে কামনা অনুভব করা। এ ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন অথবা এস্ট্রোজেন কামনা জাগায়। এটা ক্ষণস্থায়ী – হেঁচকির মতো। কিছুক্ষণ থাকে তার পর ভ‍্যানিশ। এ বার যেই মাত্র একজন প্রেমে পড়ে তার হাত ঘামে, ঘিলু মানে বুদ্ধি কাজ করে না, বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে থাকে – তাই না কাজু?”

কাজু বিষণ্ণ বদনে ঘাড় নাড়ে, হ‍্যাঁ তাই।

সুজি প্রশ্ন করে, “এটা কেন হয়?”

“অক্সিটোসিন যখন বেরোয় তখন তোমার স্নেহ বা ভালোবাসা জন্মাল। এ বার মানসিক আকর্ষণের সময় সেরেটোনিন অ্যাড্রিন‍্যালিন আর ডোপামিন বেরোয়। এরা হৃদস্পন্দন বাড়ায়, তোমাকে আনন্দিত রাখে, জাগিয়ে রাখে, উত্তেজিত রাখে, বুদ্ধিসুদ্ধি ঘুলিয়ে দেয়।”

কাজু স্বগোতোক্তি করে, “তাই তো! আমারও তো তাই হয়। তার মানে আমার এখন মানসিক আকর্ষণের দশা চলছে?”

লবঙ্গলতিকার মন্তব্য ‘শনির দশা’, তৎক্ষণাৎ জিলিপির পালটা মন্তব্য ‘মরণ দশা’। সুজি আর কিশমিশ পালা করে কাজুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, “আহা রে বেচারা…তোরা আর ওর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিস না।”

“যা-ই হোক, তোরা একটুস মন দিয়ে শোন – ডোপামিন আমাদের ভালোবাসার পুরস্কার। সংক্ষেপে এটা মন ভালো রাখে। নতুন কিছু করার উৎসাহ জোগায়। কোনো কাজে নতুন উদ‍্যম জোগায়। ঘুম কমিয়ে দেয়। পেশির কর্মক্ষমতা বাড়ায় – এই সব আর-কি।”

বুড়ো ডাক্তার দম নেওয়ার জন্যে পকেটে হাত ঢোকান। শূন্য প‍্যাকেট বেরিয়ে আসে। সুজি বিমলবাবুকে ওদের গল্পদাদুর জন্যে একটা সিগারেট দিতে বলে। কাজু তখনও বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বসে আছে।

“এর পর আসে কম্প‍্যানিয়ন ফেজ। এখানে অক্সিটোসিন আর ভ্যাসোপ্রেসিন কাজ করে। অক্সিটোসিন শান্তির হরমোন – ঘর বাঁধার হরমোন আর ভ্যাসোপ্রেসিন প্রিয়জনকে রক্ষা করার হরমোন – সেটা সন্তান বা প্রিয়তম, যে কেউ হতে পারে। স্বভাবতই মেয়েদের অক্সিটোসিন বেশি থাকে, ছেলেদের ভ্যাসোপ্রেসিন। তবে প্রেয়‌ইরি ইঁদুরের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে পুরুষ ইঁদুরের নাকে অক্সিটোসিন ড্রপ দিলে তারাও প্রচুর পরিমাণে সন্তানস্নেহ দেখায়।”

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: ব্ল্যাক হোল-এর কত কথা

“আচ্ছা… কেউ প্রেমে পড়ে, কেউ পড়ে না। এটা কেন হয় আর আমি কী করে নিজের ঠিকঠাক জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পাব?” লবঙ্গলতিকা যোগ করে, “আর ব‍্যর্থ প্রেমে মানুষ মরে যাবে, কেন হবে সেটা?”

“প্রেম ব‍্যর্থ হলে অক্সিটোসিন, ডোপামিন, সেরেটোনিন – সব কিছুর মাত্রা এত কমে যায় যে তার শরীর আর ঠিক ভাবে কাজ করে না – চরম একাকিত্ব থেকেও এটা হতে পারে, মনে রেখো ডোপামিনের অভাবেই পার্কিন্সন’স অসুখ হয়”, ডাক্তার ধোঁয়া উড়িয়ে বলতে থাকেন, “এ বার শোন তোরা – কুড়ি নম্বর ক্রোমোজোমের বারো নম্বর ইন্টারফেজিক পজিশনে একটা জিন থাকে। সেটা ঠিক করে দেয় কার কতটুকু অক্সিটোসিন বেরোবে। অক্সিটোসিন হল কাডলিং হরমোন, এটা প্রেমের হরমোন। এটা যার বেশি থাকবে সে প্রেমে পড়বে, অন‍্যরা পড়বে না।”

সুজি বলে, “শুধুমাত্র হরমোন? আর কোনো ফ‍্যাক্টর নেই?”

“অবশ্যই আছে। তোমার শিক্ষা, তোমার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, সব কিছু। যেমন ধরো, তুমি ভীষণ ধর্মপ্রাণ বাড়িতে মানুষ, তুমি একজন নাস্তিক বিধর্মীর প্রেমে সাধারণ ভাবে পড়বে না। আবার তোমার পূর্বপুরুষ যদি তোমার জিনে সংগীতপ্রীতি দিয়ে থাকেন, তবে তুমি হয়তো একজন সংগীতপ্রেমী মানুষকেই ভালোবাসবে। তোমার শিক্ষা, তোমার জীবনের অন‍্যান‍্য চাহিদাও একটা ফ‍্যাক্টর। যাকে দেখে ভালো লাগে সে-ই যে তোমার ঠিকঠাক জীবনসঙ্গী, তা নাও হতে পারে। যে দিন দু’ জন এক‌ই মানসিকতার মানুষ একই রকম অক্সিটোসিন নিয়ে কাছে আসবে সেই দিন‌ই তোমার প্রেম পূর্ণতা পাবে।”

কাজু হাঁফ ছাড়ে, “যাক বাবা! তা হলে আমার সুলোচনার জন্য কাঁদার কিছু নেই বলো? চলো নতুন করে খুঁজে দেখি আর আবার ভালোবাসার স্বপ্ন দেখি।”

জিলিপি হাসিমুখে বুড়োকে প্রশ্ন করে, “বুড়ো, তুমি ভালোবাসার স্বপ্ন দেখ না?”

ডাক্তার খরগোশের মতো কান খাড়া করে কী যেন শোনার চেষ্টা করেন। একটু পরে এক বুড়ো অন্ধ ভিখারি একটা ছোট্ট বাচ্চার হাত ধরে এগিয়ে আসছে দেখা যায় – তার চোখের কালো চশমার এক দিকের কাচের জায়গায় কাগজ সাঁটানো আছে। বাচ্চাটা রিনরিনে গলায় গান গাইছে, “আর না হবে মোর মানবজনম।” বুড়ো অন‍্য মনে কী যেন ভাবতে থাকেন।

“কী গো, বললে না তো, কোনো স্বপ্ন দেখ?” বুড়ো গালে ভাঁজ ফেলে হাসেন, “স্বপ্ন দেখি সৈন‍্যরা বাগান করছে, এক সঙ্গে গিটার হাতে গান গাইছে আঙুরের বাগানে – ভারতে, ইয়েমেনে, ইথিওপিয়ায় নাইজেরিয়ায় সব বাচ্চা স্কুলে যাচ্ছে, খেতে ফসল ফলে আছে…”, বলতে বলতে আনমনা ডাক্তার স্কুটারের দিকে র‌ওনা দেন।

বিনোদন

রবিবারের পড়া: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

‘বর্ণালী’ ছবিতে নৌকায় শর্মিলার কণ্ঠে ‘যখন ভাঙল মিলন মেলা ভাঙল’ গানটি শুনে মনে হল গীতবিতান তোমার কাছে আত্মার শান্তি আর আবোলতাবোল তোমার প্রাণের স্পন্দন।

Published

on

'তিন ভুবনের পারে' ছবিতে তনুজার সঙ্গে।

পাপিয়া মিত্র

এই বাদামগাছের ছায়ায় / তোমায় আমি উপহার দেব একটি শোক / জেনো আজ এই চৈত্রদিনের সন্ধ্যার / তার থেকে আপন আর তোমার কেউ নেই। (এই বাদাম গাছের ছায়ায়)

তাঁর লেখা কবিতা দিয়েই আজকের লেখা শুরু। তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো, খানিক গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোর মতো। চৈত্রের দিন নয়। হেমন্তের প্রান্তদিনের মধ‍্যগগনে মনের মধ‍্যে শেষ চৈত্রের ঝড় এল – চলে যায় মরি হায় বসন্তের দিন। সৌমিত্র মানে বসন্ত। সে বসন্ত যৌবনের, সে বসন্ত প্রৌঢ়ের, আবার সে বসন্ত বার্ধক্যেরও। এই তিন পর্যায়ের বসন্তের এক তৃপ্ত আকর্ষণ আছে, যার টানে প্রেক্ষাগৃহে দেখা গেছে নানা স্তরের দর্শকদের। তাঁকে বা তাঁর অভিনয়ক্ষমতা বিশ্লেষণ করার স্পর্ধা নেই। বরং নতমস্তকে আজ মনে করব সেই সব চিরসবুজ, চিরযৌবনের গানের কলি।  কখনও সৌমিত্র গেয়েছেন আবার কখনও তাঁর নায়িকারা। কখনও বা তিনি একাই।

Loading videos...
‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিতে শর্মিলার সঙ্গে।

জনসমুদ্রের মাঝে আমাদের অপু, ক্ষিদদা, অমল, ফেলুদা তথা প্রদোষচন্দ্র মিত্র, গঙ্গাচরণ, সন্দীপ, অসীম, ময়ূরবাহন, অমিতাভ রায়, নরসিং, রতন, অরুণাভ মুখার্জি, শ‍্যাম, উদয়ন পণ্ডিত। সুধীন দাশগুপ্তের কথা, পুলক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের সুর, মান্না দের কণ্ঠ আর লেজেন্ডের লিপ – এই শহর থেকে আরও অনেক দূরে / চলো কোথাও চলে যাই। গঙ্গায় নৌকায়, দূরে বিবেকানন্দ সেতু। সঙ্গে ‘প্রথম কদমফুল’ ছবির নায়িকা তনুজা।

রবিবারে অলস দুপুরে তখন রাজপথে রাজার মতো অনন্তশয‍্যায় চলেছেন কিং লিয়র। এই শহর ছেড়ে যাওয়ার কথা সৌমিত্র কখনও ভাবেননি বা বলেননি। কৃষ্ণনগর জন্মস্থান আর কৈশোর যৌবন প্রৌঢ়কালের জীবনযুদ্ধের খেলাঘর তাঁর সৃষ্টির শহর এই কলকাতা। এই শহর দেখেছে তাঁর প্রথম সব কিছু। এই শহর দেখেছে ‘জীবনে কী পাবো না’র মতো যৌবনের উদ্দাম টুইস্ট। না বলা বাণী দিয়ে অনেক সময় চিরনবীন বসন্ত বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রেমিক হতে হয় কেমন করে।

‘বসন্ত বিলাপ’ ছবিতে অপর্ণার সঙ্গে।

সংস্কৃতি জগতের কিংবদন্তি শেষ স্তম্ভকে বিদায় জানাতে যে জনদেবতার শোকমিছিল পায়ে পায়ে এগিয়েছে সেখানে ততই জীবন্ত হয়ে উঠছিল আমাদের ‘গণদেবতা’। মন বলে ওঠে চাই, তোমায় ফিরে পেতে চাই। তুমি যে চলেছ অনন্তধামের দিকে… ভুল ভেঙে যায়। সুইমিংপুলের ধার ঘেঁষে গলার শিরা ফুলিয়ে ক্ষিদদার ‘ফাইট কোনি ফাইট’ চিৎকার কানে আসছে। চোয়াল তোমার দৃঢ়, তুমি বলছ, ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি মগনলাল। অশনি সংকেতের হনহনিয়ে হেঁটে চলা পণ্ডিতমশাইয়ের ছাত্র পড়ানোর আওয়াজ কানে আসছে।

১৫ নভেম্বর দুপুর ১২.১৫ মিনিটে কিছু ক্ষণের জন্য সব থেমে গেলেও এই কয়দিনের সকালের পুবালি হাওয়া জানান দেয় আসলে তুমি এই শহরের জনস্রোতের মধ্যে মিশে আছ। শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে? যেখানে প্রেমের জন্য দুরন্ত বন‍্য হওয়ার অমন নিবেদন করার কেউ থাকবে না? আশুতোষ মুখোপাধ‍্যায় পরিচালিত তনুজা অভিনীত বখাটে ছেলেটি আজ ৮৬র ঘরে। তোমার অসংখ্য নন্দিনীরা ঘর থেকে রাজপথে। হেমন্তের ছায়ানামা ছাদ থেকে বারান্দায়। তোমার নায়িকারা টিভির সামনে খুঁজে বেড়াচ্ছেন ‘দূরে দূরে কাছে কাছে এখানে ওখানে’ কত দূরের সেই মানুষটিকে।

ভিড়ে, ফুলে মানবসমুদ্রের মধ্যে দিয়ে তোমার শকট চলেছে হাসপাতালের দুয়ার থেকে অমৃতলোকের সিংহদুয়ারের দিকে। সে যাক। সেটা তোমার শুধুমাত্র শরীরটা। ‘মন্ত্রমুগ্ধ’র মতো মানুষ তোমার কত স্মৃতি মনে করে চলেছে। তোমার ধুতির কোঁচা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। বগলে চোলাইয়ের বোতল নিয়ে তুমি গাইছ ‘একটু চোলাই খাব আর ধোলাই খাব না?’ তোমার নায়িকা সাবিত্রীকে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছ ‘মাতাল হব আর পাতালে যাব না?’ কী একস্প্রেশন দিয়েছ তুমি!

চারুলতা’ ছবিতে মাধবীর সঙ্গে।

এখন আর দুঃখ নয়। তোমার রেখে যাওয়া সম্পদ দিয়ে তোমার জন্মদিনের মালা গাঁথা শুরু। সোনালি রোদকে সঙ্গী করে সাইকেলের চাকা এগিয়ে চলেছে এক নতুন পৃথিবীর দিকে। ‘ও আকাশ সোনা সোনা, এ মাটি সবুজ সবুজ’ নায়ক সৌমিত্রের আটপৌরে পোশাকে নতুন রঙ ধরিয়ে দিল সোনার পৃথিবীতে। মাধবী-সৌমিত্রের দুরন্ত অভিনয় উপহার দিল ‘অজানা শপথ’। নায়িকা তন্দ্রা বর্মনের সঙ্গে সৌমিত্র ‘অতল জলের আহ্বান’-এ গাইলেন ‘একি চঞ্চলতা জাগে আমার মনে’। ‘কে যেন গো ডেকেছে আমায়’- আরও এক নায়িকা সন্ধ্যা রায়কে শেখাচ্ছেন গান। ‘মরমিয়া কেন গো…ফাগুন আগুন লাগে মন কোনও কাজে লাগে না, কি করিতে কী যে হয়ে যায়’।

আজ মন বড়ো চঞ্চল। কেন না তুমি নাকি নেই। এই তো মানবমন। যেখানের পৃথিবীর সীমারেখা শুধুই খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার পর্যন্ত। সেই-ই তো নায়ক, সেই ‘অগ্রদানী’র ঠাকুরমশাই হয়ে আনন্দে গান ধরেছ নদী পার করে বটের ঝুরি ধরে – ‘শোনো গাঁয়ের মাঠঘাট/ শোনো বৃক্ষলতা / গ্রামবাসী প্রতিজনে / শোনো সুখের কথা / আমার বংশে দিতে বাতি / আমার ঘরে আসছে এবার আমার বাপের নাতি / এত দিনে ঘুচল বুঝি পাপ / আমার বৌ হবে মা আমি হব বাপ।’ কী অভিব‍্যক্তি! যখন তুমি বাবা হওয়ার খবর শুনলে।

‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে সুচিত্রার সঙ্গে।

তুমি ‘সুদূর নীহারিকা’ হয়ে থেকে যেও না। সুমিত্রা মুখোপাধ‍্যায় নাচছে ‘আজ এই রাত জলসার রাত’ গানের সঙ্গে। ওই একই চলচ্চিত্রে সোমা দের সঙ্গে গাইলে ‘জীবন মরণের সাথী’। মানবেন্দ্রের কণ্ঠে ঠোঁট মেলালে ‘কার মঞ্জীর ঝঙ্কার’ গানে। আবার ‘শেষ পৃষ্ঠায় দেখুন’-এ নায়ক যদি গায় ‘এ কী এমন কথা তাকে বলা গেল না’ পাশাপাশি নায়িকা অপর্ণা গেয়ে ওঠেন ‘নেই সত‍্যি বলে কিছু নেই’।  তা হলে তো বলতেই হয় তুমি কোথাও যেতে পার না। তুমি উদয়ন পণ্ডিত হয়ে থেকে গেছ পাঠশালার শিশুদের মধ‍্যে।

‘বেনারসী’ ছবিতে বেলডাঙার বেনারসী বাইজিকে (রুমা গুহঠাকুরতা) পানের দোকানে চিনে ফেলে রতন (সৌমিত্র)। কিশোরী সোনা গঙ্গাস্নানে হারিয়ে গিয়ে পরবর্তীতে বেনারসী বাইজি হয়। টান টান আভিজাত‍্যের মোড়কে গল্প এগিয়ে গিয়েছে। আবার মিনু কাফে চায়ের দোকানের মালিক সঞ্জুদা হয়ে তুমি ‘নতুন দিনের আলো’য় বন্ধুদের মাঝে গান ধরলে ‘চলেছে, চলছে চলবেই / যা কৈলাশে জমে আছে বরফের স্তূপ হয়ে / সে তো বন‍্যার স্রোত হতে গলবেই’।

নানা রঙের চরিত্রের পাশে কতই না নায়িকা অভিনয় করেছেন। শর্মিলা ঠাকুর, তনুজা, অরুন্ধতী দেবী, মাধবী মুখোপাধ‍্যায়, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া চৌধুরী, সাবিত্রী চট্টোপাধ‍্যায়, তন্দ্রা বর্মন, অপর্ণা সেন, আরতি ভট্টাচার্য, সুমিত্রা মুখোপাধ‍্যায়, সন্ধ্যা রায়, লিলি চক্রবর্তী, সুমিতা সান‍্যাল, অঞ্জনা ভৌমিক, মৌসুমী চট্টোপাধ‍্যায়, রুমা গুহঠাকুরতা, মমতাশঙ্কর, নন্দিনী মালিয়া-সহ বহু নায়িকা। প্রবীণদের পাশাপাশি অনেক নবীন অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করে ছবিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছ।

‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে স্বাতীলেখার সঙ্গে।

এমন মজাদার গানের আগে পরে আমরা পাই ‘ঘরে বাইরে’র সন্দীপকে, ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান’ গানটিতে। ‘বর্ণালী’ ছবিতে নৌকায় শর্মিলার কণ্ঠে ‘যখন ভাঙল মিলন মেলা ভাঙল’ গানটি শুনে মনে হল গীতবিতান তোমার কাছে আত্মার শান্তি আর আবোলতাবোল তোমার প্রাণের স্পন্দন।

এ বার সব বাধা দূরে সরিয়ে একবার বলে ওঠ তো ‘মুশকিল আসান, আমি এসে গেছি’।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

সৌমিত্র, কবে যে চলে এলে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায়

Continue Reading

ক্রিকেট

রবিবারের পড়া ২ / রানআউটে শুরু, রানআউটেই শেষ…

ধোনি কিন্তু নিজের মর্জিমাফিক চলেন বোঝা যায়। টেস্ট থেকে যেমন আচমকা অবসর ঘোষণা করেছিলেন, তেমনই সীমিত ওভারের ক্রিকেট থেকে যখন অবসর ঘোষণা করলেন তখন তাঁর জন্য একটি বিদায় ম্যাচের আয়োজন করারও উপায় নেই।

Published

on

শ্রয়ণ সেন

১০ জুলাই ২০১৯। নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপ্টিলের দুরন্ত একটা থ্রো শেষ করে দিল ১৩০ কোটির স্বপ্ন। একটুর জন্য ক্রিজের ভেতরে ঢুকতে পারেনি তাঁর ব্যাট, আর তাতেই সব স্বপ্নের জলাঞ্জলি।

বরাবরের আবেগহীন মহেন্দ্র সিংহ ধোনি সে দিন কিন্তু নিজের আবেগকে চেপে রাখতে পারেননি। প্যাভিলিয়নে ফেরার সময়ে তাঁর চোখে জল দেখা গিয়েছিল স্পষ্ট। ভারতকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে ধোনির ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার ঘটনা ভারতীয় ক্রিকেটে খুব একটা ঘটেনি, কিন্তু সে দিন হয়েছিল।

গত দু’ বছর ধরেই ধোনির ফর্ম পড়ে গিয়েছিল। শেষের দিকে নেমে রান পেলেও আগের মতো সেই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ধোনি কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন। তবুও একটা স্বপ্ন ছিল, ধোনির হাত ধরেই ভারত আরও একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে।

Loading videos...

কিন্তু সেই সব স্বপ্ন শেষ করে দিল সেই দুঃস্বপ্নের রানআউট। রানআউট হওয়ার আগে ওই ম্যাচটায় খারাপ খেলেননি ধোনি। অর্ধশতরান করেছিলেন। কিন্তু ভারতের ব্যর্থতায় সেই সব কিছুই চাপা পড়ে গেল।

ধোনি কিন্তু ভারতের হয়ে আর কোনো ম্যাচ খেলেননি। তাঁর অবসরের ঘোষণা ছিল শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। তবুও আশায় ছিলেন ক্রিকেটভক্তরা। যদি কোনো ভাবে নিজের মত বদল করেন তিনি।

সেই সেমিফাইনালে রানআউটের মধ্যে দিয়ে শেষ হওয়া কেরিয়ারের সুচনাও হয়েছিল রানআউট দিয়েই।

সেটা ২০০৪-এর ডিসেম্বর। ঘরোয়া ক্রিকেটে তখন ফুলিঝুরি ঝরাচ্ছেন বছর ২৩-এর ধোনি। রাহুল দ্রাবিড়ের ওপর থেকে ভার কিছুটা হালকা করার জন্য একদিনের ক্রিকেটে ভারতের দরকার ভালো নির্ভরযোগ্য উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জোরাজুরির কারণে বাংলাদেশ সফররত ভারতের একদিনের দলে ধোনিকে জায়গা দিতে বাধ্য হলেন নির্বাচকরা।

[চট্টগ্রামের অভিষেক ম্যাচে রানআউট ধোনি]

কিন্তু শুরুটা যে ভালো হল না ধোনির। চট্টগ্রামে প্রথম ম্যাচে ব্যাট করতে নেমেই রানআউট। খাতা খোলার সুযোগই এল না তাঁর কাছে। ঘরোয়া ক্রিকেটে মোটামুটি নাম করে ফেলা ধোনির এ হেন অভিশপ্ত অভিষেক কেউ কল্পনাই করতে পারেননি।

তবে ধোনিকে নিজের জাত চেনাতে লাগল মাত্র পাঁচটা ম্যাচ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একদিনের ম্যাচ ছিল সেটা। ফাটকা খেলে তিন নম্বরে ধোনিকে নামিয়েছিলেন সৌরভ। আর তাতেই বাজিমাত। ১২৩ বলে ১৪৮ রানের দুর্ধর্ষ একটি ইনিংস। ব্যাস, তার পর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি।

[বিশাখাপত্তনমে শতরানের পর]

কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও ধোনি-তাণ্ডব। এ বার জয়পুরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। তাঁর ব্যাট থেকে বেরোল অপরাজিত ১৮৩ রানের দুর্ধর্ষ একটা ইনিংস।

এর পর টেস্ট ক্রিকেটেও নিয়ে আসা হল ধোনিকে। আর সেখানেও কয়েক মাস পরেই বাজিমাত। ২০০৬-এর পাকিস্তান সফরে ফৈজলাবাদ টেস্টে শোয়েব আখতারদের ঠেঙিয়ে ১৪৮ রানের তুখোড় একটি ইনিংস। ঝাঁকড়া চুলের ধোনি তত দিনে গোটা বিশ্বে পরিচিত হয়ে গিয়েছেন। তাঁর চুলের জন্য ফ্যান হয়ে গিয়েছেন স্বয়ং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পরভেজ মুশারফ। ধোনিকে চুল না কাটারও আবদার করেছিলেন মুশারফ। যদিও পরের বছরই সেই চুল ছেঁটে ফেলেন মাহি।

[ফৈজলাবাদ টেস্টে শতরান করে ধোনি]

আসলে দায়িত্ব বাড়তেই এই বাড়তি বোঝা নিজের শরীরের ওপর থেকে ঝেড়ে ফেলেন ধোনি। ধোনি তত দিনে ভারতের অধিনায়ক হয়ে গিয়েছেন। অধিনায়কের কেরিয়ারের শুরুতেই বাজিমাত।

২০০৭-এ ৫০ ওভারের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতের গ্রুপ লিগেই বিদায়ের পর কেউ ভাবতেই পারেনি যে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে টি২০ বিশ্বকাপে ভারত আদৌ ভালো ফল করতে পারবে বলে।

সম্ভবত নির্বাচকদেরও বেশি আশা ছিল না। আর তাই সৌরভ-সচিন-দ্রাবিড়দের বাদ দিয়ে পুরোপুরি যুবদল ভারত পাঠায় দক্ষিণ আফ্রিকায় টি২০ বিশ্বকাপের জন্য। অধিনায়ক করা হয় ধোনিকে। ওই দলে বেশি অভিজ্ঞতার যুবরাজ থাকলেও নির্বাচকরা ভরসা করেন ধোনির ওপরেই। আর এটাই হয়ে যায় এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

[২০০৭-এ টি২০ বিশ্বকাপে জয়ের পর]

ধোনির নেতৃত্বে টি২০ বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ভারত। টুর্নামেন্টের ফাইনালে পাকিস্তান, সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়া, তার আগে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে হারিয়ে নজির তৈরি করে ভারত। এই বিশ্বজয়ের পরেই ভারতের একদিনের আর টেস্ট দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেন রাহুল দ্রাবিড়। একদিনের অধিনায়কের কুর্সিতেও বসে পড়েন ধোনি।

তার পরেই ভারতীয় ক্রিকেটের এক স্বর্ণযুগের শুরু। কার্যত ‘ম্যান উইথ দ্য মিডাস টাচ’ হয়ে যান ধোনি। ২০০৮-এ অনিল কুম্বলের অবসরের পরে টেস্ট দলের দায়িত্বও তাঁর হাতে চলে আসে।

একদিনের দলকে নিজের মতো করে তৈরি করতে গিয়ে বেশ কিছু অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাঁকে। সৌরভ আর দ্রাবিড়ের মতো সিনিয়রদের একদিনের দল থেকে বাদ দিয়েছিলেন। প্রবল সমালোচিত হয়েছিলেন বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু তাঁর হাতে তৈরি ভারতীয় দল ফল দিয়েছিল।

ধোনি যে ভাবে একদিনের দল তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সেটাই করেছিলেন। আর তার ফলস্বরূপ ২০১১-তে বিশ্বজয়।

[২০১১-এ বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে ধোনি]

নিঃসন্দেহে ধোনির কেরিয়ারে সব থেকে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ভারতের এই বিশ্বজয়। এর ঠিক দু’ বছরের মাথায় আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও দখল নিল ভারত। ধোনিই প্রথম অধিনায়ক যিনি আইসিসির তিনটে টুর্নামেন্টেই নিজের দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেন।

পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে ভারতের সব থেকে সফল অধিনায়ক হয়ে যান ধোনি। সৌরভের রেকর্ড ভেঙে টেস্টে সর্বাধিক জয়ের রেকর্ডেরও মালিক হন অধিনায়ক ধোনি, পরবর্তীকালে যে রেকর্ডের দখল নিয়েছেন বিরাট কোহলি।

কিন্তু এর মধ্যে একটি বিতর্কও থেকে যায়। পরিসংখ্যানের দিক থেকে সব থেকে সফল অধিনায়ক হলেই কি তাঁকে সফল বলা চলে?

বিদেশে টেস্ট জয়ের নিরিখে ধোনি কিন্তু সৌরভ আর বিরাট কোহলির থেকে পিছিয়েই শেষ করলেন। বিদেশের মাঠে ২৫টা টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে মাত্র ৬টায় ভারতকে জিতিয়েছেন ধোনি। ভারত হেরেছে ১১টি টেস্টে।

তবে ধোনির টেস্ট ক্রিকেট খুব একটা প্রিয় ছিল না, সেটা তিনি বুঝিয়ে দেন ২০১৪-এর ডিসেম্বরে। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে সবাইকে চমকে দিয়ে টেস্ট থেকে নিজের অবসরের কথা ঘোষণা করেন মাহি। এর পর শুধুই সীমিত ওভারের ক্রিকেটে মনোনিবেশ করেন তিনি।

২০১৫-এর বিশ্বকাপে ধোনির নেতৃত্বে ভারত সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। গোটা টুর্নামেন্টে ভারত একটা মাত্র ম্যাচেই হেরেছিল। অস্ট্রেলিয়ার কাছে সেমিফাইনালে।

এর পরের বছরের এক্কেবারে শেষলগ্নে একদিনের ম্যাচের অধিনায়কত্বও ছেড়ে দেন মাহি। বিরাট কোহলির কাঁধে দায়িত্ব চলে আসে। তবে বকলমে ভারতের অধিনায়ক ধোনিই ছিলেন, সেটা পরতে পরতে বোঝা গিয়েছে। উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে ধোনিকে অনেক বার ফিল্ড সেট করতে দেখা গিয়েছে।

বিরাট কোহলিও ধোনিকে অসম্ভব ভরসা করতেন। আর সেই কারণেই শেষ দু’ বছর তাঁর ব্যাটিং ফর্ম পড়ে গেলেও ধোনি সম্পর্কে কোনো বিরূপ ধারণা তৈরি হয়নি কোহলির। অধিনায়কের ব্যাকিং সব সময়ে পেয়ে গিয়েছিলেন ধোনি। এমনকি ক্রিকেটবিশ্ব যখন ধোনির সমালোচনায় মুখর, তখন তার জবাব কোহলিই দিয়েছেন।

কিন্তু যতই অধিনায়কের সমর্থন থাকুক, ধোনির নিজের ফর্ম যে পড়তির দিকে সেটা তিনিও সম্ভবত বুঝতে পারছিলেন। তবুও তাঁর আশা ছিল ভারতকে আরও একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেই ক্রিকেট মাঠকে বিদায় জানাবেন তিনি।

কিন্তু মার্টিন গাপ্টিলের একটা রানআউট তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দিল না। রানআউটে শুরু হওয়া একটি কেরিয়ার শেষ হল রানআউটের মধ্যে দিয়েই।

[যে রানআউটে শেষ হয়ে গেল ১৩০ কোটির স্বপ্ন]

ধোনি কিন্তু নিজের মর্জিমাফিক চলেন বোঝা যায়। টেস্ট থেকে যেমন আচমকা অবসর ঘোষণা করেছিলেন, তেমনই সীমিত ওভারের ক্রিকেট থেকে যখন অবসর ঘোষণা করলেন তখন তাঁর জন্য একটি বিদায় ম্যাচের আয়োজন করারও উপায় নেই।

তবুও আমরা চাই, আপামর ক্রিকেটভক্ত চায়, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনও চান, অন্তত একটা ফেয়ারওয়েল ম্যাচ খেলুন ধোনি। করোনার দাপট কমে গেলে সামনের বছর দর্শকভরতি কোনো স্টেডিয়ামেই হোক এই ম্যাচ।

আপাতত চেন্নাই সুপারকিংসের হলুদ জার্সিতে দেখা যাবে ধোনিকে। কিন্তু নীল জার্সির মাহাত্ম্য যে সব সময় আলাদা।

২০১১-এর বিশ্বকাপের ফাইনালে ছয় মেরে ভারতকে জেতানোর সময়ে রবি শাস্ত্রীর বিখ্যাত ধারাবিবরণীটা এখনও মনে পড়ে, “ধোনি ফিনিসেজ অফ ইন স্টাইল!”

সেটাই কিন্তু এ বারও হল। একবারে নিজস্ব ঢঙে, নিজস্ব কায়দায় কেরিয়ার শেষ করলেন মাহি।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ১ / ঠিক ৪০ বছর আগের ১৬ আগস্ট

ঘরে ঘরে প্রিয়জনদের উদগ্রীব অপেক্ষা – ছেলেটা ঘরে ফিরল? পাড়ায় পাড়ায় জিজ্ঞাসা – ছেলেটা ফিরেছে?

Published

on

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

মায়ের সঙ্গে একবার গঙ্গাস্নান করতে বাবুঘাটে এসে ছেলেটি অবাক হয়ে দেখেছিল, একটু দূরে সেনাব্যারাকের পাশের মাঠে একদল গোরা একটা পেটমোটা গোল জিনিস নিয়ে খেলছে, ছুটছে, পায়ে পায়ে কেড়ে নিচ্ছে…। হঠাৎ ফেনসিং-এর ধারে সেই গোল জিনিসটা চলে এল। একজন গোরা ছুটে এসে সেটা চাইল। ছেলেটি তৎক্ষণাৎ সেই গোল জিনিসটা তুলে নিয়ে গোরার দিকে ছুড়ে দিল। তার পর তার ফিরে আসা মায়ের সঙ্গে। কিন্তু মনের মধ্যে সেই মুহূর্তগুলো জ্বলজ্বল করতে লাগল। ভাবনায় বার বার ঘুরে ঘুরে আসতে লাগল।

ছেলেটি কলকাতার হেয়ার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তার অভিজ্ঞতার কথা বন্ধুদের কাছে বলল। জানল, ওই পেটমোটা গোল বস্তুটা হল ‘বল’, আর খেলাটার নাম ‘ফুটবল’। ছেলেটির নাম নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। তারই উদ্যমে কেনা হল একটি বল। সেই জোগাড় করল তার স্কুলের সহপাঠীদের। নামল সবাই মিলে মাঠে, শুরু হল খেলা। কিন্তু সে খেলা ছিল এলোপাথাড়ি – যে যে দিকে পারে ছুটছে, এলোপাথাড়ি লাথি মারছে, বল পায়ে পেলে যে দিকে খুশি মেরে দিচ্ছে – সে এক হট্টগোলের হল্লাগুল্লা খেলা।

Loading videos...

১৮৭৯-এর সেই গোড়ার কথা

পাশেই হিন্দু কলেজ। সেখানকার কয়েক জন ছাত্রও জুটে গেল তাদের সঙ্গে। কয়েক দিন পরে হিন্দু কলেজের (পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ, অধুনা বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক বি ভি স্ট্যাকের নজরে পড়ল ঘটনাটা। শেষে তিনিই উদ্যোগী হয়ে নিয়ে এলেন নতুন বল। শেখালেন খেলার নিয়মকানুন। ছাত্রদের দু’ দলে ভাগ করে দিয়ে তিনিই রেফারি হিসাবে মুখে বাঁশি নিয়ে মাঠে নামলেন। শুরু হল বাংলার মাটিতে ফুটবলের ইতিহাস। সময়টা ১৮৭৯।

নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী।

তখন থেকেই শুরু বাংলা ও বাঙালির ফুটবল-ইতিহাসের অগ্রগতি। একে একে জন্ম নিল ওয়েলিংটন ক্লাব (পরে টাউন ক্লাব), শোভাবাজার ক্লাব, মোহনবাগান ক্লাব, ইস্টবেঙ্গল ক্লাব, মহমেডান স্পোর্টিং, ঢাকার ওয়েলিংটন ক্লাব (পরে উয়াড়ি ক্লাব), ঢাকা স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি। বাঙালির আবেগে, রক্তে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হল ফুটবলের আকর্ষণ, উত্তেজনা। স্বামী বিবেকানন্দও তাঁর কৈশোরকালে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন। অনুভব করেছিলেন ফুটবল খেলার মাধ্যমে শরীরচর্চার তাৎপর্য, তাই ডাক দিতে পেরেছিলেন ফুটবল খেলতে।

ফুটবল খেলার মধ্য দিয়ে একটা জাতিয়তাবাদী সত্তা ও আবেগ জন্ম নিয়েছিল পরাধীন ভারতবর্ষে। তাই তো বোধহয় ১৯১১-তে ১১ জন বাঙালির যুবকের খালি পায়ে লড়াই বাঙালিকে ইংরেজের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল।

গত শতকের প্রতিটি দশকে বাঙালি ও ফুটবল একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। আর সেই খেলার ২২ জন খেলোয়াড় ছাড়া বাকি যে বিরাট অংশ – সেই বঙ্গসন্তানেরা কখনও মাঠের ধারে, কখনও বা গ্যালারিতে বা রেডিও ধারাবিবরণীতে মশগুল হয়ে থাকত। প্রিয় দলের জেতা-হারায় ছিল আনন্দ-দুঃখের অভিব্যক্তি। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, মফস্‌সলে কৈশোর, যৌবন ফুটবল খেলার প্রতি ছিল নিবেদিত প্রাণ। সেই আবেগ এমনই ছিল বা বলা যায় আজও আছে, যে বিশ্ব ফুটবলের প্রতিযোগিতায় বাঙালি দলে দলে বিভক্ত হয়ে যায় – ব্রাজিল, আর্জেন্তিনা, জার্মানি, ইংল্যান্ড ইত্যাদির পক্ষে। ঠিক যেমন, দেশের মাটিতে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহমেডান…।

সেই দিনটিতে ফুটবল কাঁদিয়েছিল

সেই ফুটবল খেলা, যা বাঙালিকে আনন্দ দেয়, উত্তেজনায় ভরপুর করে তোলে, শপথে-প্রতিজ্ঞায় সুদৃঢ় করে তোলে, সেই ফুটবল বাঙালিকে কাঁদিয়েও তোলে, যখন বাঙালির মনে পড়ে আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগের একটি দিনের ইতিহাস, যে দিন ফুটবলের চোখে নেমেছিল কান্না, হাহাকার।

দিনটা ছিল ১৯৮০ সালের ১৬ আগস্ট। খেলার নন্দনকানন ইডেন গার্ডেনস। কলকাতা লিগের ডার্বি ম্যাচ – প্রতিপক্ষ দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল। গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। দর্শকসংখ্যা ৭০ হাজারের কিছু বেশি। রেডিওতে কান পেতেছে লক্ষ লক্ষ ফুটবলপ্রেমী। দূরদর্শনে চোখ রেখেছে আরও অনেকে। মোহনবাগানের ক্যাপ্টেন কম্পটন দত্ত আর ইস্টবেঙ্গলের সত্যজিৎ মিত্র। রেফারি সুধীন চ্যাটার্জি।

টানটান উত্তেজনায় শুরু হল খেলা। দু’ পক্ষই অঙ্গীকারবদ্ধ – জিততেই হবে। গ্যালারিতে সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে দর্শকদের অন্তরে অন্তরে – শরীরী ভাষায় আর তাদের শিরায় শিরায় বইছে উত্তেজিত রক্তস্রোত। খেলা এগোচ্ছে, দু’ দলই মরিয়া তাদের সম্মান-ঐতিহ্য অটুট রাখতে। মাঠের মধ্যে ৯০ মিনিটের প্রতি সেকেন্ডে খেলোয়াড়দের যেমন চোয়াল শক্ত করে চলছে লড়াই, ঠিক তেমনই গ্যালারির বুকে হাজার হাজার সমর্থকের হৃদপিণ্ডে চড়ছে উত্তেজনার পারদ। এক সময় খেলা শেষ হল, ফল ০-০। কিন্তু ততক্ষণে মাঠের গ্যালারিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্যালারিতে শুরু হয়ে গিয়েছিল বিশৃঙ্খলা, ভেঙে পড়েছিল প্রশাসনিক দৃঢ়তা। দর্শকরা যে যার মতো করে প্রাণ হাতে করে ছুটতে শুরু করল। দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হাজার হাজার মানুষ। কে রইল পেছনে, কে রইল পায়ের নীচে – সে সব চিন্তা তখন কারও নেই। সবার অবস্থা তখন ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’।            

সে দিনের বিশৃঙ্খলা।

ঘটে গেল কলকাতার ফুটবলের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ঘটনা। পদপিষ্ট হয়ে মারা গেলেন ১৬ জন ফুটবলপ্রেমী – ১৯৮০-র ১৬ আগস্ট। সারা মাঠ, সারা শহর, বাংলার গ্রাম-গঞ্জ-মফস্‌সল সে দিন হতবাক, শোকে বিহ্বল। হাহাকারে, আর্তনাদে ভরে গিয়েছিল বাঙালির মন-প্রাণ।

খেলা দেখতে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরল না ১৬টি তরতাজা প্রাণ – হিমাংশুশেখর দাস, উত্তম ছাউলে, কার্তিক মাইতি, সমীর দাস, অলোক দাস, সনৎ বসু, বিশ্বজিৎ কর, নবীন নস্কর, কার্তিক মাজী, ধনঞ্জয় দাস, প্রশান্তকুমার দত্ত, শ্যামল বিশ্বাস, রবীন আদক, মদনমোহন বাগলি, অসীম চ্যাটার্জি এবং কল্যাণ সামন্ত। সে দিন আহত হয়েছিল কয়েকশো ফুটবলপ্রেমী দর্শক।

১৬ আগস্টের সন্ধ্যা-রাত্রি ভীষণ ভারী হয়ে উঠেছিল বাংলার বুকে, বড়ো দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল, কিছুতেই সকাল হতে চাইছিল না সেই রাত। ঘরে ঘরে প্রিয়জনদের উদগ্রীব অপেক্ষা – ছেলেটা ঘরে ফিরল? পাড়ায় পাড়ায় জিজ্ঞাসা – ছেলেটা ফিরেছে? সারা বাংলা সে দিন গুমরে গুমরে কাটিয়েছিল নিদ্রাহীন রাত।

পরের দিন প্রভাতী সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রকাশিত খবরের অক্ষরগুলো যেন কেঁদে উঠেছিল। আকাশবাণীতে ঝরে পড়েছিল কষ্টের উচ্চারণ ‘সংবাদ বিচিত্রা’য়। উপেন তরফদারের উপস্থাপনায় প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল উত্তম ছাউলে, মদনমোহন বাগলিদের (তখনও পর্যন্ত সকলের নাম জানা যায়নি) প্রতি। সে দিন বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ শুনেছিলেন সেই অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে শোনা গিয়েছিল এক সন্তানহারা পিতার আর্তনাদ – খো…কা, খো…কা।  

‘খেলার মাঠে কারও খোকা আর না হারায় দেখো’

বাংলার মানুষ শুনেছিলেন বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম নক্ষত্র সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা সেই ঐতিহাসিক গান – ‘খেলা ফুটবল খেলা, খোকা দেখতে গেল সেই সকালবেলা’। সেই সন্তানহারা পিতার কান্নাই বোধহয় তাঁকে দিয়ে এই গান লিখিয়ে নিয়েছিল। গানটিতে সুর দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সুরকার নচিকেতা ঘোষের পুত্র সুপর্ণকান্তি ঘোষ। গেয়েছিলেন মান্না দে।

গানটি ১৯৮১ সালের সরস্বতী পুজোর আগে এইচএমভি থেকে প্রকাশ করা হয়। ফুটবল-শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ক্যালকাটা স্পোর্টস জার্নালিস্টস ক্লাব এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেই অনুষ্ঠানেই ওই গানটি প্রকাশ করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন স্বয়ং মান্না দে, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপর্ণকান্তি ঘোষ, সেই সময়কার অ্যাডভোকেট জেনারেল স্নেহাংশুকান্ত আচার্য, পি কে ব্যানার্জি, চুণী গোস্বামী, সুঁটে ব্যানার্জি, পঙ্কজ রায়, বিদেশ বসু, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, কম্পটন দত্ত, সত্যজিৎ মিত্র-সহ বাংলার ক্রীড়া ও সংস্কৃতি জগতের নক্ষত্ররা।

গানটি ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ মিনিটের। শেষে সন্তানহারা পিতার সেই মর্মস্পর্শী আবেদন প্রোথিত হয়ে যায় বাঙালির মর্মস্থলে – ‘তোমরা আমার একটা কথাই রেখো / খেলার মাঠে কারও খোকা আর না হারায় দেখো’।

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
দেশ36 mins ago

‘মুম্বই হামলা কোনো দিনই ভুলব না’: ভারতীয় হাই কমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী

বাংলাদেশ41 mins ago

‘মারাদোনার ক্রীড়া নৈপুণ্য যুগে যুগে ফুটবলারদের অনুপ্রেরণা জোগাবে’, শোকপ্রকাশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

রাজ্য1 hour ago

রাজ্যপালের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হোক, পুলিশকে পরামর্শ তৃণমূলের

coronavirus flights west bengal
দেশ2 hours ago

আন্তর্জাতিক উড়ান পরিষেবা স্থগিতের মেয়াদ বাড়াল কেন্দ্র

ভ্রমণ কথা3 hours ago

রূপসী বাংলার সন্ধানে ২/ সাগর থেকে জঙ্গলমহলে

দেশ4 hours ago

ধর্মঘট আপডেট: জায়গায় জায়গায় পথ ও রেল অবরোধ বাম-কংগ্রেস কর্মীদের, ব্যাহত জনজীবন, বিক্ষিপ্ত অশান্তি

ফুটবল4 hours ago

রাত ১০টায় বিপুল হাততালি, রাজপুত্রকে আবেগপ্রবণ বিদায় জানাতে তৈরি হচ্ছে আর্জেন্তিনা

ফুটবল4 hours ago

ফকল্যান্ড যুদ্ধে হারের প্রতিশোধ নিল ‘ঈশ্বরের হাত’

দেশ6 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৪৪৪৮৯, সুস্থ ৩৬৩৬৭

বিনোদন3 days ago

মাদক মামলায় জামিন পেলেন ভারতী সিংহ ও হর্ষ লিম্বাচিয়া

দেশ4 hours ago

ধর্মঘট আপডেট: জায়গায় জায়গায় পথ ও রেল অবরোধ বাম-কংগ্রেস কর্মীদের, ব্যাহত জনজীবন, বিক্ষিপ্ত অশান্তি

ফুটবল2 days ago

পিকে-চুণী স্মরণে ডার্বি শুরুর আগে নীরবতা পালন হোক, আইএসএল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাল ইস্টবেঙ্গল

ফুটবল3 days ago

পেনাল্টি কাজে লাগিয়ে প্রথম ম্যাচে ৩ পয়েন্ট ঘরে তুলল হায়দরাবাদ

দেশ22 hours ago

সংক্রমণে লাগাম টানতে ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন বিধিনিষেধ, নির্দেশিকা জারি কেন্দ্রের

দেশ2 days ago

দুর্ভাগ্য! ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে, বৈঠকে বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

Allahabad High Court
দেশ2 days ago

‘প্রিয়ঙ্কা-সালামাতকে আমরা হিন্দু-মুসলিম হিসেবে দেখি না,” ঐতিহাসিক রায় এলাহাবাদ হাইকোর্টের

কেনাকাটা

কেনাকাটা5 hours ago

শীতের নতুন কিছু আইটেম, দাম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: শীত এসে গিয়েছে। সোয়েটার জ্যাকেট কেনার দরকার। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে কিনতে যাওয়া মানেই বাড়ি এসে এই ঠান্ডায়...

কেনাকাটা2 days ago

ঘর সাজানোর জন্য সস্তার নজরকাড়া আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরকে একঘেয়ে দেখতে অনেকেরই ভালো লাগে না। তাই আসবারপত্র ঘুরিয়ে ফিরে রেখে ঘরের ভোলবদলের চেষ্টা অনেকেই করেন।...

কেনাকাটা5 days ago

লিভিংরুমকে নতুন করে দেবে এই দ্রব্যগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরের একঘেয়েমি কাটাতে ও সৌন্দর্য বাড়াতে ডিজাইনার আলোর জুড়ি মেলা ভার। অ্যামাজন থেকে তেমনই কয়েকটি হাল ফ্যাশনের...

কেনাকাটা1 week ago

কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস, দাম একদম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: কাজের সময় হাতের কাছে এই জিনিসগুলি থাকলে অনেক খাটুনি কমে যায়। কাজও অনেক কম সময়ের মধ্যে করে...

কেনাকাটা3 weeks ago

দীপাবলি-ভাইফোঁটাতে উপহার কী দেবেন? দেখতে পারেন এই নতুন আইটেমগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই কালীপুজো, ভাইফোঁটা। প্রিয় জন বা ভাইবোনকে উপহার দিতে হবে। কিন্তু কী দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন...

কেনাকাটা4 weeks ago

দীপাবলিতে ঘর সাজাতে লাইট কিনবেন? রইল ১০টি নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আসছে আলোর উৎসব। কালীপুজো। প্রত্যেকেই নিজের বাড়িকে সুন্দর করে সাজায় নানান রকমের আলো দিয়ে। চাহিদার কথা মাথায় রেখে...

কেনাকাটা2 months ago

মেয়েদের কুর্তার নতুন কালেকশন, দাম ২৯৯ থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজো উপলক্ষ্যে নতুন নতুন কুর্তির কালেকশন রয়েছে অ্যামাজনে। দাম মোটামুটি নাগালের মধ্যে। তেমনই কয়েকটি রইল এখানে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র আরও ১০টি শাড়ি, পুজো কালেকশন

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই পুজো আর পুজোর জন্য নতুন নতুন শাড়ির সম্ভার নিয়ে হাজর রয়েছে এরশা। এরসার শাড়ি পাওয়া...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র পুজো কালেকশনের ১০টি সেরা শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো কালেকশনে হ্যান্ডলুম শাড়ির সম্ভার রয়েছে ‘এরশা’-র। রইল তাদের বেশ কয়েকটি শাড়ির কালেকশন অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

পুজো কালেকশনের ৮টি ব্যাগ, দাম ২১৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : এই বছরের পুজো মানে শুধুই পুজো নয়। এ হল নিউ নর্মাল পুজো। অর্থাৎ খালি আনন্দ করলে...

নজরে