রবিবারের পড়া: বিজ্ঞাপনী–প্রতারণা থেকে মানুষকে বাঁচাতে ১৩২ বছর আগের উদ্যোগ

নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে ‘অনুসন্ধান’ দু’ দশক জনগণের সেবা করে গিয়েছে।

0
title page of the paper anusandhan
'অনুসন্ধান' পত্রিকার পঞ্চম বর্ষের আখ্যাপত্র। ছবি সৌজন্যে অবসর ডট নেট।

শীর্ষ গুপ্ত

দিনটা ছিল ২৮ জুলাই, ১৮৮৭, ১৩ শ্রাবণ ১২৯৪ বঙ্গাব্দ – আজ থেকে ঠিক ১৩২ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল পাক্ষিক পত্রিকা ‘অনুসন্ধান’। পত্রিকাটি ছিল সব দিক দিয়েই অনন্য। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ভাবলে আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। ‘অনুসন্ধান’-এর উদ্দেশ্য ছিল, বিজ্ঞাপনী-জুয়াচুরি থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচানো।

হাল আমলে ক্রেতা-সুরক্ষার দিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়। কিন্তু ১৩২ বছর আগে এই ভাবনা যে তখনকার মানুষের মাথায় এসেছিল তা ভাবলেই চমকে উঠতে হয়। বিজ্ঞাপনী-জুয়াচুরি থেকে কী ভাবে ক্রেতা-সাধারণকে বাঁচানো যায়, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছিলেন ২৩ বছরের যুবক দুর্গাদাস লাহিড়ী। সেই উদ্দেশ্যে গড়ে তুলেছিলেন অনুসন্ধান ‘সমিতি’, আর ঠিক তার এক বছর পরে প্রকাশ করে ফেললেন পাক্ষিক পত্রিকা ‘অনুসন্ধান’।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান / পর্ব ১

সময়টা উনিশ শতকের প্রায় শেষ ভাগ। তখনকার সমাজেও মানুষ নানা ভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। আর এই প্রতারণার অন্যতম মাধ্যম ছিল বিজ্ঞাপন। প্রতারকরা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিথ্যা প্রচার করে সাধারণ মানুষকে নানা রকম ফাঁদে ফেলত। তা ছাড়া তখনকার দিনেও গ্রাম থেকে, মফস্‌সল থেকে, এমনকি ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে রুজির সন্ধানে সাধারণ মানুষ রাজধানী কলকাতায় অবিরাম আসতেন। তাঁরা এই শহরে এসে নানা ভাবে লড়াই করে টিকে থাকতেন। দুর্গাদাস লক্ষ করেছিলেন, প্রধানত শহরের বাইরে থেকে আসা মানুষজনই বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে নানা ভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। এ সব দেখে ব্যথিত হয়েছিলেন তিনি। এই বিজ্ঞাপনী-প্রতারণার ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করতে কয়েক জন সহচরকে নিয়ে দুর্গাদাস গড়েছিলেন ‘অনুসন্ধান সমিতি’। সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপনী-জুয়াচুরি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা এবং সম্ভব হলে যতটা সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

সংবাদপত্র বা সাময়িকপত্রে কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে বা লিফলেট মারফত কোনো বিজ্ঞাপন প্রচারিত হলে সমিতির সদস্যরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিজ্ঞাপনদাতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তেন। বিজ্ঞাপনে প্রতারণার আঁচ পেলেই তা প্রকাশ্যে এনে জনগণকে সতর্ক করতেন।

সমিতি কী ভাবে জনগণকে সতর্ক করত? বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, পারসি, গুজরাতি প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রে জুয়াচুরি সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করে খবর পাঠানো হত।

কিন্তু সমিতির এক বছরের মাথায় হঠাৎ নিজস্ব মুখপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হল কেন? পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথম সংখ্যায় বলা হল –

“ অনুসন্ধান-সমিতি 
“ একবর্ষ মাত্র স্থাপিত হইয়াছে; আজ আনন্দের দিন যে, সে দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করিল। জগতের নিয়মই এই যে, বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কার্য্যক্ষেত্রও বিস্তৃত হইযা পড়ে; সৌভাগ্যের কথা দিন দিন সজ্জনের সহানুভূতি পাইয়া সমিতির কার্যক্ষেত্রও বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছে। এতদিন সমিতির বিবরণ ইত্যাদির প্রচার জন্য কেবল দেশের সম্পাদকগণই সহায় ছিলেন; তাহাতে দেশের অনেক উপকার হইয়াছে বটে, কিন্তু তাঁহারা নানা কার্য্যে লিপ্ত থাকায় সকল সময় তাঁহাদের দ্বারা আমরা আশানুরূপ ফলপ্রাপ্ত হইতে পারি নাই। অনুসন্ধান-সমিতি গুরুভার বুঝিয়া জুয়াচোরগণের সন্ধানে সর্ব্বদাই তটস্থ আছেন; জুয়াচোরগণ কখন কিরূপভাবে কার্য্য করিতেছে, সেদিকে নিয়তই তাঁহার লক্ষ্য। আর, সেদিকে লক্ষ্য রাখিতে যাইলে কখন কোন ব্যক্তি কিরূপ ভাবে কার্য্য করিতেছে সংবাদপত্রে প্রকাশ করিয়া তাহা সাধারণকে জানান কর্ত্তব্য কিন্তু সকল সংবাদপত্র দ্বারা ঠিকঠাক সময়ে সে কার্য্য হওয়া অসম্ভব; আমরা যে সময়ে রিপোর্ট পাঠাই না কেন,নানা কার্য্যে লিপ্ত সংবাদপত্রে ঠিক সময়ে তাহার আলোচনা হয় না। আর বিলম্বে আলোচনা হেতু তাহাতে অনেকে ঠকিয়া যান ও জুয়াচোর সাবধান হয়। তাছাড়া বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞাপিত দ্রব্যের গুণাগুণ বিচারে অনেক সময় আবশ্যক; কিন্তু সংবাদপত্রে সকল সময়ে তাহারও স্থান মিলে না। এই সকল কারণেই, লোকে যাহাতে আর সামান্যরূপও না ঠকেন-এই আশায় সমিতির মুখপত্র হিসাবে ‘অনুসন্ধান’ প্রকাশিত হইতে চলিল।”

যা বলা হয়েছে তাতেই স্পষ্ট, বিভিন্ন কাগজে খবর পাঠিয়ে জনসাধারণকে ঠিকঠাক সময়ে সতর্ক করা যাচ্ছিল না। সমিতির তরফ থেকে ঠিক সময়ে রিপোর্ট পাঠানো হলেও তা সংবাদপত্রে যথাযথ সময়ে প্রকাশিত হত না। কারণ ওই সব সংবাদপত্রে নানা ধরনের বিষয়ে আলোচনা হত। সমিতির পাঠানো বিষয় উপেক্ষিত থেকে যেত, কিংবা প্রকাশে বিলম্ব হয়ে যেত। ফলে তত দিনে জনগণ ঠকে যেতেন অথবা জুয়াচোর সাবধান হয়ে যেত। তা ছাড়া অনেক সময়ে সমিতির পাঠানো খবর যথাযথ স্থান বা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হত না। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সমিতি গড়া হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যই সাধিত হচ্ছিল না। তাই সমিতির নিজস্ব মুখপত্র প্রকাশের ব্যবস্থা হল, সমিতির নামেই নাম হল ‘অনুসন্ধান’।      

পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই পাঠকদের বোঝানো হয়েছিল কলকাতায় কী ভাবে জুয়াচুরি হয়। জুয়াচুরির ধরনকে আট ভাগে ভাগ করা হয়েছিল –

“১নং জুয়াচুরী – ইহারা যে কোন ঠিকানায় যে কোন নামে প্রলোভনপূর্ণ জাঁকাল বিজ্ঞাপন দেয় ও নিজে অপর এক ঠিকানায় বসিয়া পোস্ট অফিসের সহিত বন্দোবস্তে টাকা গ্রহণ করে ও গ্রাহককে বিজ্ঞাপিত দ্রব্যাদি দেয় না।…।  
“২ নং জুয়াচুরী – ইহাদের একটা আড্ডা ও লোক আছে; ইহারা একটি নির্দ্দিষ্ট সময় পর্য্যন্ত কোন জিনিসের লোভপূর্ণ বিজ্ঞাপন দেয় এবং সেই সময়ের মধ্যে যত টাকা হয় সংগ্রহ করিয়া তথা হইতে অন্তর্হিত হয় ও লোকে ঠকিয়া পূর্ব্ব স্থানে সন্ধান পায় না। 
“৩ নং জুয়াচুরী – ইহারা জিনিসের ক্রমশঃ অংশমাত্র দিতে দিতে প্রলোভনে লোক ভুলায় এবং দেয় জিনিসের সামান্য অংশ দিয়াই গা-ঢাকা দেয়।
“৪ নং জুয়াচুরী – ইহারা এক জিনিস দিতে চাহিয়া টাকা লয়; কিন্তু জিনিস দেবার সময় তার চেয়ে ঢের খারাপ জিনিস দেয়…পুস্তক, পত্রিকা, ঔষধ ও নানাবিধ দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিয়তই এ ব্যাপার ঘটিতেছে।…  
“৫ নং জুয়াচুরী – ইহারা বড় লোকের দোহাই দেয়; জিনিস খারাপ হইলে টাকা ফেরত দিতে চায়। কিন্তু সন্ধান করিলে সবই ফাকা।…। 
“৬ নং জুয়াচুরী – উপহার বিতরণ ও মূল্য কম। প্রথমতঃ কএকটি লোক সদুদ্দেশ্যে গ্রাহক-সংগ্রহ জন্য এইরূপ বিজ্ঞাপন দেন। তাঁদের দেখাদেখি এখন অনেকে ঐ বৃত্তি অবলম্বন করিয়া অসৎ পথে পদার্পণ করিতেছে। ফলতঃ এরূপ দান, উপহার বা মূল্য কম সম্বন্ধে গৃহীতার একবার বিবেচনা করা উচিত যে, বিজ্ঞাপনদাতা কি সদাব্রত করিতে বসিয়াছে?…। 
“৭নং জুয়াচুরী – কেবলমাত্র ডাকমাশুল লইয়া দান। এহারা ডাকমাশুল বলিয়া টাকা লইয়া যে জিনিস দেয়, ন্যায়মত ধরিতে গেলে সে জিনিসের মূল্য ও মাসুল তদপেক্ষা ঢের কম।
“৮নং জুয়াচুরী – এইরূপ জুয়াচুরী ভ্যালু-পে-এবলে ডাকেই সাধিত হয়; পূর্ব্বোক্ত প্রকারেই জুয়াচোরগণ ‘বিশ্বাস না হয় ভ্যালু-পেএবলে লইবেন’, ইত্যাদি চমক দেখাইয়া বিশ্বাস জন্মাইয়া, যা’ তা’ পাঠাইয়া দেয় ও লোকে ভ্রমে ঠকিয়া মরে।

‘অনুসন্ধান’-এর প্রথম পাতায় থাকত শিরোনাম ‘প্রতারণা-প্রবঞ্চনা’। সমিতির সদস্যরা কোনো বিজ্ঞাপনে মিথ্যা প্রচার বা জালিয়াতির সন্ধান পেলে প্রতারক বিজ্ঞাপনদাতার নামধাম-সহ জালিয়াতির ধরনটি সবিস্তার প্রকাশ করতেন সেখানে। দু’-একটি নমুনা –

পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদ — ‘‘নফরচন্দ্র দত্ত, ৪৬ নং শোভাবাজার স্ট্রিট। কলিকাতা। এই ব্যক্তি নানাবিধ ঔষধ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূল্য দিলে সুলভমূল্যে পাওয়া যাইবে বলিয়া ‘গৃহচিকিৎসাসার’ নামক পুস্তকের জাঁকালো বিজ্ঞাপণ দেন। কিন্তু বিজ্ঞাপণে ভুলিয়া টাকা পাঠাইয়া লোকে পুস্তক তো পানই না, তাছাড়া ঔষধেরও ফল নাই। সন্ধানে জানা যায়, নফর দত্ত ও বহুরূপী দত্তজা জুড়িদার এবং স্বয়ং গা-ঢাকা দিয়াছেন।’’

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান / শেষ পর্ব

ওই সংখ্যাতেই প্রকাশিত আরও একটি সংবাদ – ‘‘রজনীকান্ত ভট্টাচার্য, ২ নং হাটখোলা। ইনি ১৮৮৬-’৮৭ সালের এন্ট্রেন্স পরীক্ষার্থীর জন্য ইংরাজি-অর্থ পুস্তক বাহির করিবেন বলিয়া অগ্রিম টাকা লন। কিন্তু পুস্তক প্রকাশ দূরে থাক, পাড়ার লোকে বলে এখন দেশে পলাইয়াছে।’’

‘অনুসন্ধান’-এর এই উদ্যোগ জনমনে বিপুল প্রভাব ফেলল। বহু মানুষ পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠলেন এই পত্রিকার। ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই পত্রিকা। সাধারণ মানুষের আস্থায় ভর করে এই পত্রিকা তার অষ্টম বর্ষে ১৩০১ বঙ্গাব্দের ২১ বৈশাখ থেকে সাপ্তাহিক হল। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে ‘অনুসন্ধান’ দু’ দশক জনগণের সেবা করে গিয়েছে।   

ঋণ স্বীকার

১। অনুসন্ধান – দীপক সেনগুপ্ত http://www.abasar.net

২। সচেতনতার অনুসন্ধান – দীপঙ্কর ভট্টাচার্য www.anandabazar.com

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here