Connect with us

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: বিজ্ঞাপনী–প্রতারণা থেকে মানুষকে বাঁচাতে ১৩২ বছর আগের উদ্যোগ

title page of the paper anusandhan

শীর্ষ গুপ্ত

দিনটা ছিল ২৮ জুলাই, ১৮৮৭, ১৩ শ্রাবণ ১২৯৪ বঙ্গাব্দ – আজ থেকে ঠিক ১৩২ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল পাক্ষিক পত্রিকা ‘অনুসন্ধান’। পত্রিকাটি ছিল সব দিক দিয়েই অনন্য। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ভাবলে আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। ‘অনুসন্ধান’-এর উদ্দেশ্য ছিল, বিজ্ঞাপনী-জুয়াচুরি থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচানো।

হাল আমলে ক্রেতা-সুরক্ষার দিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়। কিন্তু ১৩২ বছর আগে এই ভাবনা যে তখনকার মানুষের মাথায় এসেছিল তা ভাবলেই চমকে উঠতে হয়। বিজ্ঞাপনী-জুয়াচুরি থেকে কী ভাবে ক্রেতা-সাধারণকে বাঁচানো যায়, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছিলেন ২৩ বছরের যুবক দুর্গাদাস লাহিড়ী। সেই উদ্দেশ্যে গড়ে তুলেছিলেন অনুসন্ধান ‘সমিতি’, আর ঠিক তার এক বছর পরে প্রকাশ করে ফেললেন পাক্ষিক পত্রিকা ‘অনুসন্ধান’।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান / পর্ব ১

সময়টা উনিশ শতকের প্রায় শেষ ভাগ। তখনকার সমাজেও মানুষ নানা ভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। আর এই প্রতারণার অন্যতম মাধ্যম ছিল বিজ্ঞাপন। প্রতারকরা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিথ্যা প্রচার করে সাধারণ মানুষকে নানা রকম ফাঁদে ফেলত। তা ছাড়া তখনকার দিনেও গ্রাম থেকে, মফস্‌সল থেকে, এমনকি ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে রুজির সন্ধানে সাধারণ মানুষ রাজধানী কলকাতায় অবিরাম আসতেন। তাঁরা এই শহরে এসে নানা ভাবে লড়াই করে টিকে থাকতেন। দুর্গাদাস লক্ষ করেছিলেন, প্রধানত শহরের বাইরে থেকে আসা মানুষজনই বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে নানা ভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। এ সব দেখে ব্যথিত হয়েছিলেন তিনি। এই বিজ্ঞাপনী-প্রতারণার ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করতে কয়েক জন সহচরকে নিয়ে দুর্গাদাস গড়েছিলেন ‘অনুসন্ধান সমিতি’। সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপনী-জুয়াচুরি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা এবং সম্ভব হলে যতটা সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

সংবাদপত্র বা সাময়িকপত্রে কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে বা লিফলেট মারফত কোনো বিজ্ঞাপন প্রচারিত হলে সমিতির সদস্যরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিজ্ঞাপনদাতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তেন। বিজ্ঞাপনে প্রতারণার আঁচ পেলেই তা প্রকাশ্যে এনে জনগণকে সতর্ক করতেন।

সমিতি কী ভাবে জনগণকে সতর্ক করত? বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, পারসি, গুজরাতি প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রে জুয়াচুরি সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করে খবর পাঠানো হত।

কিন্তু সমিতির এক বছরের মাথায় হঠাৎ নিজস্ব মুখপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হল কেন? পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথম সংখ্যায় বলা হল –

“ অনুসন্ধান-সমিতি 
“ একবর্ষ মাত্র স্থাপিত হইয়াছে; আজ আনন্দের দিন যে, সে দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করিল। জগতের নিয়মই এই যে, বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কার্য্যক্ষেত্রও বিস্তৃত হইযা পড়ে; সৌভাগ্যের কথা দিন দিন সজ্জনের সহানুভূতি পাইয়া সমিতির কার্যক্ষেত্রও বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছে। এতদিন সমিতির বিবরণ ইত্যাদির প্রচার জন্য কেবল দেশের সম্পাদকগণই সহায় ছিলেন; তাহাতে দেশের অনেক উপকার হইয়াছে বটে, কিন্তু তাঁহারা নানা কার্য্যে লিপ্ত থাকায় সকল সময় তাঁহাদের দ্বারা আমরা আশানুরূপ ফলপ্রাপ্ত হইতে পারি নাই। অনুসন্ধান-সমিতি গুরুভার বুঝিয়া জুয়াচোরগণের সন্ধানে সর্ব্বদাই তটস্থ আছেন; জুয়াচোরগণ কখন কিরূপভাবে কার্য্য করিতেছে, সেদিকে নিয়তই তাঁহার লক্ষ্য। আর, সেদিকে লক্ষ্য রাখিতে যাইলে কখন কোন ব্যক্তি কিরূপ ভাবে কার্য্য করিতেছে সংবাদপত্রে প্রকাশ করিয়া তাহা সাধারণকে জানান কর্ত্তব্য কিন্তু সকল সংবাদপত্র দ্বারা ঠিকঠাক সময়ে সে কার্য্য হওয়া অসম্ভব; আমরা যে সময়ে রিপোর্ট পাঠাই না কেন,নানা কার্য্যে লিপ্ত সংবাদপত্রে ঠিক সময়ে তাহার আলোচনা হয় না। আর বিলম্বে আলোচনা হেতু তাহাতে অনেকে ঠকিয়া যান ও জুয়াচোর সাবধান হয়। তাছাড়া বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞাপিত দ্রব্যের গুণাগুণ বিচারে অনেক সময় আবশ্যক; কিন্তু সংবাদপত্রে সকল সময়ে তাহারও স্থান মিলে না। এই সকল কারণেই, লোকে যাহাতে আর সামান্যরূপও না ঠকেন-এই আশায় সমিতির মুখপত্র হিসাবে ‘অনুসন্ধান’ প্রকাশিত হইতে চলিল।”

যা বলা হয়েছে তাতেই স্পষ্ট, বিভিন্ন কাগজে খবর পাঠিয়ে জনসাধারণকে ঠিকঠাক সময়ে সতর্ক করা যাচ্ছিল না। সমিতির তরফ থেকে ঠিক সময়ে রিপোর্ট পাঠানো হলেও তা সংবাদপত্রে যথাযথ সময়ে প্রকাশিত হত না। কারণ ওই সব সংবাদপত্রে নানা ধরনের বিষয়ে আলোচনা হত। সমিতির পাঠানো বিষয় উপেক্ষিত থেকে যেত, কিংবা প্রকাশে বিলম্ব হয়ে যেত। ফলে তত দিনে জনগণ ঠকে যেতেন অথবা জুয়াচোর সাবধান হয়ে যেত। তা ছাড়া অনেক সময়ে সমিতির পাঠানো খবর যথাযথ স্থান বা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হত না। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সমিতি গড়া হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যই সাধিত হচ্ছিল না। তাই সমিতির নিজস্ব মুখপত্র প্রকাশের ব্যবস্থা হল, সমিতির নামেই নাম হল ‘অনুসন্ধান’।      

পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই পাঠকদের বোঝানো হয়েছিল কলকাতায় কী ভাবে জুয়াচুরি হয়। জুয়াচুরির ধরনকে আট ভাগে ভাগ করা হয়েছিল –

“১নং জুয়াচুরী – ইহারা যে কোন ঠিকানায় যে কোন নামে প্রলোভনপূর্ণ জাঁকাল বিজ্ঞাপন দেয় ও নিজে অপর এক ঠিকানায় বসিয়া পোস্ট অফিসের সহিত বন্দোবস্তে টাকা গ্রহণ করে ও গ্রাহককে বিজ্ঞাপিত দ্রব্যাদি দেয় না।…।  
“২ নং জুয়াচুরী – ইহাদের একটা আড্ডা ও লোক আছে; ইহারা একটি নির্দ্দিষ্ট সময় পর্য্যন্ত কোন জিনিসের লোভপূর্ণ বিজ্ঞাপন দেয় এবং সেই সময়ের মধ্যে যত টাকা হয় সংগ্রহ করিয়া তথা হইতে অন্তর্হিত হয় ও লোকে ঠকিয়া পূর্ব্ব স্থানে সন্ধান পায় না। 
“৩ নং জুয়াচুরী – ইহারা জিনিসের ক্রমশঃ অংশমাত্র দিতে দিতে প্রলোভনে লোক ভুলায় এবং দেয় জিনিসের সামান্য অংশ দিয়াই গা-ঢাকা দেয়।
“৪ নং জুয়াচুরী – ইহারা এক জিনিস দিতে চাহিয়া টাকা লয়; কিন্তু জিনিস দেবার সময় তার চেয়ে ঢের খারাপ জিনিস দেয়…পুস্তক, পত্রিকা, ঔষধ ও নানাবিধ দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিয়তই এ ব্যাপার ঘটিতেছে।…  
“৫ নং জুয়াচুরী – ইহারা বড় লোকের দোহাই দেয়; জিনিস খারাপ হইলে টাকা ফেরত দিতে চায়। কিন্তু সন্ধান করিলে সবই ফাকা।…। 
“৬ নং জুয়াচুরী – উপহার বিতরণ ও মূল্য কম। প্রথমতঃ কএকটি লোক সদুদ্দেশ্যে গ্রাহক-সংগ্রহ জন্য এইরূপ বিজ্ঞাপন দেন। তাঁদের দেখাদেখি এখন অনেকে ঐ বৃত্তি অবলম্বন করিয়া অসৎ পথে পদার্পণ করিতেছে। ফলতঃ এরূপ দান, উপহার বা মূল্য কম সম্বন্ধে গৃহীতার একবার বিবেচনা করা উচিত যে, বিজ্ঞাপনদাতা কি সদাব্রত করিতে বসিয়াছে?…। 
“৭নং জুয়াচুরী – কেবলমাত্র ডাকমাশুল লইয়া দান। এহারা ডাকমাশুল বলিয়া টাকা লইয়া যে জিনিস দেয়, ন্যায়মত ধরিতে গেলে সে জিনিসের মূল্য ও মাসুল তদপেক্ষা ঢের কম।
“৮নং জুয়াচুরী – এইরূপ জুয়াচুরী ভ্যালু-পে-এবলে ডাকেই সাধিত হয়; পূর্ব্বোক্ত প্রকারেই জুয়াচোরগণ ‘বিশ্বাস না হয় ভ্যালু-পেএবলে লইবেন’, ইত্যাদি চমক দেখাইয়া বিশ্বাস জন্মাইয়া, যা’ তা’ পাঠাইয়া দেয় ও লোকে ভ্রমে ঠকিয়া মরে।

‘অনুসন্ধান’-এর প্রথম পাতায় থাকত শিরোনাম ‘প্রতারণা-প্রবঞ্চনা’। সমিতির সদস্যরা কোনো বিজ্ঞাপনে মিথ্যা প্রচার বা জালিয়াতির সন্ধান পেলে প্রতারক বিজ্ঞাপনদাতার নামধাম-সহ জালিয়াতির ধরনটি সবিস্তার প্রকাশ করতেন সেখানে। দু’-একটি নমুনা –

পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদ — ‘‘নফরচন্দ্র দত্ত, ৪৬ নং শোভাবাজার স্ট্রিট। কলিকাতা। এই ব্যক্তি নানাবিধ ঔষধ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূল্য দিলে সুলভমূল্যে পাওয়া যাইবে বলিয়া ‘গৃহচিকিৎসাসার’ নামক পুস্তকের জাঁকালো বিজ্ঞাপণ দেন। কিন্তু বিজ্ঞাপণে ভুলিয়া টাকা পাঠাইয়া লোকে পুস্তক তো পানই না, তাছাড়া ঔষধেরও ফল নাই। সন্ধানে জানা যায়, নফর দত্ত ও বহুরূপী দত্তজা জুড়িদার এবং স্বয়ং গা-ঢাকা দিয়াছেন।’’

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান / শেষ পর্ব

ওই সংখ্যাতেই প্রকাশিত আরও একটি সংবাদ – ‘‘রজনীকান্ত ভট্টাচার্য, ২ নং হাটখোলা। ইনি ১৮৮৬-’৮৭ সালের এন্ট্রেন্স পরীক্ষার্থীর জন্য ইংরাজি-অর্থ পুস্তক বাহির করিবেন বলিয়া অগ্রিম টাকা লন। কিন্তু পুস্তক প্রকাশ দূরে থাক, পাড়ার লোকে বলে এখন দেশে পলাইয়াছে।’’

‘অনুসন্ধান’-এর এই উদ্যোগ জনমনে বিপুল প্রভাব ফেলল। বহু মানুষ পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠলেন এই পত্রিকার। ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই পত্রিকা। সাধারণ মানুষের আস্থায় ভর করে এই পত্রিকা তার অষ্টম বর্ষে ১৩০১ বঙ্গাব্দের ২১ বৈশাখ থেকে সাপ্তাহিক হল। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে ‘অনুসন্ধান’ দু’ দশক জনগণের সেবা করে গিয়েছে।   

ঋণ স্বীকার

১। অনুসন্ধান – দীপক সেনগুপ্ত http://www.abasar.net

২। সচেতনতার অনুসন্ধান – দীপঙ্কর ভট্টাচার্য www.anandabazar.com

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: ভারতীয় ক্রিকেট-বিপ্লবের দুই কারিগর

শ্রয়ণ সেন

১০ নভেম্বর, ২০০০। ঢাকায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্ট খেলছে নামছে ভারত। প্রথম বার সাদা জার্সিতে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিতে চলেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ভারতীয় ড্রেসিং রুমে থেকে দেখা যাচ্ছে এক বিদেশি মুখকে। জন রাইট (John Wright)।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ওই টেস্টটা সৌরভের যেমন অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্ট তেমনই ভারতের প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে জন রাইটেরও।

পরবর্তী সাড়ে চার বছর ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সুবর্ণ অধ্যায় ছিল। সেই অধ্যায়ে অর্জুন যদি হন সৌরভ, তা হলে নিঃসন্দেহে তাঁর দ্রোণাচার্য হলেন জন রাইট।

কী অদ্ভুত সমাপতন না! আজই গুরু পূর্ণিমা। আবার ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম বিদেশি কোচের জন্মদিন। তিন দিনের মাথায় অর্জুনেরও জন্মদিন।

২০০০ সালটা ভারতীয় ক্রিকেটের কাছে মহাপরিবর্তনের যুগ ছিল। মার্চেই ভারতীয় দলের ব্যাটনটা সচিনের হাত থেকে সৌরভের হাতে চলে আসে।

কিন্তু তার পরের কয়েক মাস, সৌরভদের কাছে অত্যন্ত কঠিন একটা সময় ছিল। গড়াপেটার কলঙ্ক লেগে গিয়েছে ভারতীয় দলে। সাসপেন্ড হয়েছেন একাধিক সিনিয়র ক্রিকেটার।

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি থেকে ভারতীয় দলকে টেনে বের করে আনার দায়িত্ব নেন সৌরভ, সচিন, দ্রাবিড়রা। সেই সঙ্গে জুটে যান যুবরাজ, জাহির খানদের মতো জুনিয়র। ২০০০-এর অক্টোবরেই বাজিমাত। সবাইকে চমকে দিয়ে আইসিসি মিনি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের রানার্স আপ। অল্পের জন্য ট্রফি হাতছাড়া। গ্রুপ স্টেজে অস্ট্রেলিয়া আর সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা বধ করে আসা। ভারতীয় ক্রিকেটের চরিত্রটা কিন্তু বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে।

এই চারিত্রিক বদলের ব্যাপারটি পূর্ণ মর্যাদা পেল জন রাইটের আগমনে। বিদেশি কোচের সুবিধা হল, তাঁর মধ্যে প্রাদেশিকতার কোনো ব্যাপার থাকে না, যেটা দেশি কোচদের নিয়ে সব থেকে বড়ো সমস্যার।

জন রাইটকে ভারতীয় দলের কোচ করে আনার পেছনে রাহুল দ্রাবিড়ের (Rahul Dravid) একটা ছোট্ট কিন্তু মহৎ ভূমিকা রয়েছে।

রাইটের কথা প্রথমে সৌরভকে বলেন দ্রাবিড়ই। ২০০০-এর গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডে কেন্টের হয়ে কাউন্টি খেলেন দ্রাবিড়। সেই দলেরই কোচ ছিলেন রাইট। তখন সৌরভ আবার খেলছেন ল্যাঙ্কাশায়ারে। সেখান থেকে সৌরভের সঙ্গেও রাইটের পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

এর পরেই বিশ্ব দেখল সৌরভ আর রাইটের সেই বিখ্যাত জুটি। সৌরভ-রাইট জুটির প্রথম পরীক্ষা ছিল ২০০১-এর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তিন টেস্টের সিরিজটা।

স্টিভ ওয়ের অস্ট্রেলিয়া তখন অশ্বমেধের ঘোড়া। টানা ১৫টা টেস্ট জিতে ভারতে পা রেখেছে। বিপক্ষে ভারত তখন একঝাঁক তরুণ, অভিজ্ঞতাও সে ভাবে কম। তা এ হেন অস্ট্রেলিয়া যখন প্রথম টেস্টেই ভারতের ওপরে বুলডোজার চালিয়ে দিয়ে গেল, কেউ হয়তো কল্পনাই করতে পারেননি যে পরের দু’টো টেস্ট জিতে ভারত ইতিহাস গড়বে।

কিন্তু সেটাই করে দেখাল বদলে যাওয়া ভারত। সিরিজ শুরু হওয়ার আগে পঞ্জাবের তরুণ অফ স্পিনার হরভজন সিংহের হয়ে প্রবল জোরে গলা ফাটিয়েছিলেন সৌরভ। অবশ্যই রাইটের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল এই ব্যাপারে।

এই হরভজনই ভারত আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে তফাতটা গড়ে দিয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে উঠে এলেন ভিভিএস লক্ষ্মণও। ইডেনে দ্বিতীয় টেস্টে ফলোঅন করে ভারত কার্যত পরাজিত হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। রাহুল দ্রাবিড়কে সঙ্গে নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন লক্ষ্মণ। পঞ্চম দিনের শেষ লগ্নে এসে ঐতিহাসিক জয় পেল ভারত। এর পর চেন্নাইয়ের শেষ টেস্টও জিতে নিয়ে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফি দখল করে নিল ভারত।

স্টিভ ওয়ের ‘ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’ দখল করার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।

ভারতের মাটিতে ট্রফি জয় এক জিনিস আর সেই ট্রফিটাই যখন বিদেশের মাটি থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়, তার মাহাত্ম্য আরও অনেকটাই বেশি।

আড়াই বছর পর, ২০০৩-০৪-এর শীতটা ভারতীয় ক্রিকেটে আরও এক সোনালি মুহূর্ত নিয়ে এল। এ বার সিডনি থেকে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফিটি ভারতে নিয়ে চলে এলেন সৌরভ। স্টিভ ওয়, রিকি পন্টিংরা হাঁ করে দেখতে থাকলেন।

না, ওই সিরিজটা ভারতের জেতা হয়নি। চার টেস্টের সিরিজ অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয়েছিল ১-১। কিন্তু শেষ টেস্টের শেষ বিকেলে স্টিভ ওয় ও রকম প্রতিরোধ না গড়ে তুললে ২-১ ব্যবধানে সিরিজটা যে ভারতই জিতত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তার বছর দুয়েক তিনেক আগে থেকেই বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা রপ্ত করতে শিখেছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। ২০০১-এ জিম্বাবোয়ে আর শ্রীলঙ্কায় টেস্ট ম্যাচ জিতলেও ২০০২-টা ছিল মোড়ঘোরানো বছর।

ওই বছর এপ্রিল-মে’তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে পোর্ট অব স্পেনে ঐতিহাসিক টেস্ট জিতল ভারত। দুর্ভাগ্যবশত, পরের দু’টি টেস্ট হেরে যাওয়ার ফলে সিরিজটা জেতা হয়নি, কিন্তু তার মাস তিনেকের মধ্যেই ইংল্যান্ডে আরও বড়ো সাফল্য এলে ভারতীয় দলের জন্য।

হেডিংলি টেস্টে জয় আজও বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দলের সেরা টেস্ট জয়ের মধ্যে একটি হিসেবে গণ্য হয়। ওই টেস্টে ইনিংসে জয়ের হাত ধরে, ইংল্যান্ডে মাটিতে টেস্ট সিরিজ অমীমাংসিত রাখার বিরাট কৃতিত্ব অর্জন করল ভারত।

তখন থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটের ভাবমূর্তি বদলাতে শুরু করেছে। ভারত আর ‘বিদেশের মাঠে শক্ত পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র’ নয়। সৌরভের ‘চোখে চোখ রেখে কথা বলা’ মনোভাবের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় দল তখন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

হরভজনের পাশাপাশি আরও কয়েক জন তরুণের আগমন ঘটল ভারতীয় দলে, যারা নিজেরাই এক একজন ম্যাচ উইনার। একদিনের ব্যাটিং তো বটেই, ভারতীয় ফিল্ডিং নতুন রূপ পেল যুবরাজ সিংহ আর মহম্মদ কাইফের আগমনে। অন্য দিকে বীরেন্দ্র সহবাগকে মিডিল অর্ডার থেকে ওপেনার হিসেবে তুলে আনা একটি বিশাল বড়ো মাস্টারস্ট্রোক ছিল, তা তো পরের কয়েকটি বছরেই জানা যায়।

আর প্রতিপক্ষ শিবিরে থরহরিকম্প ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতীয় দলে আগমন ঘটল জাহির খান আর আশিস নেহরার।

সৌরভ-রাইট জুটি আরও একটি মাস্টারস্ট্রোকীয় চাল চাললেন। রাহুল দ্রাবিড়কে এক দিনের দলে উইকেটকিপার করে আনা। দ্রাবিড়ের এক দিনের ব্যাটিং ফর্ম কিছুটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে এক দিনের দল থেকে বাদ পড়েছিলেন।

কিন্তু সৌরভ-রাইট বুঝতে পারে, দ্রাবিড়ের মতো ব্যাটসম্যানকে এক দিনের দলের বাইরে রাখা উচিত নয়। এর ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মরল। ভারতীয় দলে বাড়তি ব্যাটসম্যানও এল, আর উইকেটে পেছনে মোটামুটি নির্ভরযোগ্য একজনকে পাওয়াও গেল।

উইকেটকিপার হিসেবে দ্রাবিড় কতটা দক্ষ ছিলেন, সেটা তো ২০০৩ বিশ্বকাপেই দেখেছি আমরা। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সময়েও ব্যাট হাতেও বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

এই বিশ্বকাপটি সৌরভ-রাইট জুটির আরও একটা সাফল্যগাথা বলা যায়। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের চমকে দিয়ে টানা ৮টা ম্যাচ জিতে ভারত চলে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে। পরাজিত হল এমন একটা অস্ট্রেলিয়ার দলের কাছে, যারা ওই সময়ে অন্য গ্রহের কোনো দলের মতো খেলছিল। এই হারে কোনো লজ্জা ছিল না, বরং রানার্স হওয়ার জন্য দেশবাসীর চূড়ান্ত বাহবা কুড়িয়েছিল সৌরভের ভারত।

সাফল্য তো আরও বাকি। ১৫ বছর পর পাকিস্তান সফর করে টেস্ট আর এক দিনের সিরিজ দু’টোই বাগিয়ে আনা।

কিন্তু সৌরভ-রাইট জুটির এই সাফল্যগাথাটা আচমকাই ফিকে হতে শুরু করে। ২০০৪-এ অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার ভারত আগমন দিয়ে শুরু। দেশের মাঠে সিরিজ হেরে যায় ভারত, যা এক সময়ে অকল্পনীয় ছিল কার্যত। এর কয়েক মাস পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও দেশের মাঠে টেস্ট সিরিজ জিততে ব্যর্থ হয় ভারত।

সৌরভ আর রাইটের জুটিও ভেঙে যায়। ২০০৫-এর এপ্রিলের ভারতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে যান তিনি। এর পর আগমন হয় গ্রেগ চ্যাপেলের। তার পরের দু’ বছর ভারতীয় দল কী রকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তা তো আমরা জানিই।

কী কাকতালীয়, রাইটের চলে যাওয়া আর ক্রিকেট-রাজনীতির শিকার হয়ে সৌরভের অধিনায়কত্ব আর দলে জায়গা হারানো প্রায় একই সময়ে ঘটেছে।

রাইট আর সৌরভের মধ্যে ছোটোখাটো কিছু মিলও রয়েছে। প্রথমত, দু’জনেই বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান। রাইট দু’ ধরনের ক্রিকেটেই ওপেনার ছিলেন, সৌরভ একদিনের ক্রিকেটে ওপেনিংয়ে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন। আবার দু’ জনেই টেস্টে দু’বার করে ৯৯-এ আউট হয়েছেন।

খেলার দুনিয়ায় কিছু কিছু কোচ-অধিনায়ক জুটি হয়, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। এমনই একটি জুটিই ছিলে সৌরভ আর রাইটের মধ্যে। ঠিক যেমন ২০১১ বিশ্বকাপের সময়ে গ্যারি কার্স্টেন আর মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মধ্যে জুটি ছিল।

গত বছর বিশ্বকাপের সময়ে একটি টিভি সাক্ষাৎকারে একসঙ্গে দেখা সৌরভ আর রাইটের। রাইটকে উদ্দেশ করে সৌরভ সরাসরিই বলে দেন, “আমার প্রিয় কোচ।”

রাইট বলেন, “ভারতকে কোচিং করানোর ব্যাপারটা আমার কাছে খুব সম্মানের ছিল। শুরুটা দু’ জনের কাছেই খুব শক্ত ছিল। কিন্তু আমাদের দু’ জনের কাছেই প্রমাণ করার তাগিদ ছিল কোচ আর অধিনায়ক হিসেবে আমরা দু’ জনই ভারতীয় ক্রিকেটে সাফল্য এনে দিতে পারি।”

দু’ দশক হয়ে গেল একটা দলের স্বার্থে এই দু’ জন লোক হাত মিলিয়েছিল। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভারতীয় ক্রিকেটের যুগান্তকারী পরিবর্তনের কান্ডারি এই দু’ জন।

শুভ জন্মদিন জন রাইট। জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

চিরঞ্জীব পাল

সে দিনটা ছিল সূর্যগ্রহণের ঠিক আগের দিন। সকালবেলা বাড়ির পরিচারিকা ঘর মুছতে মুছতে বলল, ‘‘বৌদি কাল সূর্যগ্রহণ। সাড়ে ন’টা থেকে শুরু হবে। তাড়াতাড়ি রান্না–খাওয়া করে নিও। ও বাড়ির বৌদি বলছিল।’’

‘ও বাড়ির বৌদি’ মানে আমার বাড়িতে কাজে আসার আগে যে বাড়িতে ও কাজ করে এসেছে সে-ই বাড়ির মালকিন। ভদ্রমহিলা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। 

মেয়েটির কথা শুনে খুব একটা অবাক হইনি, কিন্তু যখন ও বৌদির প্রসঙ্গ তুলল তখন একটু ধাক্কা খেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার জানা জগৎটা এখনও অনেকটা অজানা। এক পা আগে দু’ পা পিছে করতে গিয়ে আমরা কখন যেন শুধু পেছনেই হাঁটতে শুরু করেছি। পিছনে হাঁটাতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা হয়েও উপদেশ দেন সূর্যগ্রহণের সময় না-খাওয়ার। অথচ সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার। আমরা সবাই জানি কেন সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ হয়। টিভিতে লাইভ সূর্যগ্রহণ দেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ টেলিকাস্ট হয়। তবুও গ্রহণের সময় না-খাওয়ার কুসংস্কারটা আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে। ঠিক যেন বাপ-ঠাকুর্দার দেওয়া ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো। যুক্তিবোধ সেখানে ঠুনকো।

অন্তহীন এক গ্রহণ

সূর্যগ্রহণের ঠিক দু’দিন পর মারা গেলেন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। খবরটা পেয়ে মনে হল আমার জানা একটা সূর্য ঢাকা পড়ে গেল মৃত্যুর ছায়ায়। সেই সূর্য আর গ্রহণ ছেড়ে বেরোবে না। তবে কি পৃথিবীটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে?

একটা ফোন কিছু মুহূর্ত

সাল: ২০০২।

হ্যালো স্যার? আমাদের পাড়ায় একটা স্লাইড শো করব?

কবে করবে বাবা! আগামী সপ্তাহ আমি পারব না। তার পরে একটা দিন ঠিক করো।

দিন ঠিক করলাম। ফোনে জানালাম স্যারকে। স্যার মানে অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’ দিন ধরে চলল মাইক-প্রচার। অনুষ্ঠানের দিন যথা সময়ে তিনি হাজির হলেন। স্লাইড রেডি করে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু লোক নেই। মাইকে ঘোষণা চলছে। কেউ কেউ উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে সরে পড়ছেন। উদ্যোক্তা হিসাবে আমাদের অবস্থা তো কাহিল। গা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। এই বুঝি স্যার বলেন, লোক জোগাড় করতে পারবে না যখন আমাকে ডাকলে কেন। জল মাপার জন্য গুটি গুটি পায়ে ওঁর কাছে গেলাম। বললাম, স্যার দশ মিনিট বাদে শুরু করুন লোকজন চলে আসবে। 

স্যার বললেন, ঠিক আছে বাবা, একটু দেখে নিই, যে ক’জন আছে তাদের নিয়েই শুরু করব। 

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

মনে মনে গুণে দেখলাম জনা ছয়েক দর্শক আছেন। এঁদের মধ্যে একজন একটি স্কুলের দিদিমণি, তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বেগতিক দেখে ক্লাবের বাইরে বসে থাকা কয়েক জন বিহারী মিস্ত্রিকে বললাম, মাঠে যাও চাঁদ-তারা দেখাবে। তাঁরা প্রতি দিন এই সময় কাজ থেকে ফিরে গল্প করেন। আমাদের কথা শুনে তাঁরা মাঠে গিয়ে বসলেন। শুরু হল স্লাইড শো। মিনিট তিনেক চলার পর পরিস্থিতি বদলে গেল। ছোটো মাঠ ভরে গেল দর্শকে। মহাবিশ্বের নানা রহস্য একের পর এক উজাড় করে দিচ্ছেন স্যার। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে। জলে যে ভাবে মাছ থাকে কখন যে তিনি সে ভাবে দর্শকের মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন কেউ বুঝতে পারেনি। মনের মধ্যে সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি আরও গভীরে পৌঁছোতে চাইছেন। শো চলাকালীন কেউ বেরোলেন না। এমনকি ওই মিস্ত্রিরাও না।

শো-এর শেষ পর্বে উনি মহাকাশকে ঘিরে কুসংস্কার প্রসঙ্গে বললেন। এল গ্রহণের সময় না খাওয়ার প্রসঙ্গও। আক্ষরিক অর্থে জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন যে, গ্রহণের সময় খেলে কোনো ক্ষতি হয় না।

এ রকমই মন্ত্রমুগ্ধতা দেখেছিলাম নৈহাটি পুরসভার হলে একটি অনুষ্ঠানে। হল ‘হাউসফুল’। অনেকে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যেন নামী কোনো নায়কের ছবির প্রথম শো। আলো নেভার কিছুক্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্রমুগ্ধতা।

মাটির কাছাকাছি এক তারা

পৃথিবী থেকে কোটি কোটি যোজন দূরে থাকা তারা, গ্রহ, উপগ্রহ নিয়ে কাজ করেও তিনি যেন মাটির মানুষ। বোঝানোর সময় যথাসম্ভব বাংলা পরিভাষার ব্যবহার, দর্শকদের প্রশ্নগুলো ভালো করে শোনা, তাদের বোধগম্য করে উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি ছিল শিক্ষণীয়। অনেক ‘বড়ো মাপের’ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির একটা ‘তেজরশ্মি’ বেরোয়। সেই রশ্মির কাছে কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে না ‘সাধারণ মানুষ’। অমলেন্দুবাবু নামী জ্যোর্তিবিজ্ঞানী। মাঠেঘাটে গিয়ে স্লাইড দেখানোর সময় তাঁর সেই রশ্মির খোঁজ করেছি। দেখতে পাইনি। তাই তাঁকে ছুঁয়েছি। প্রশ্ন করেছি। 

আমরা জেনেছিলাম, তিনি নারকোল-মুড়ি খেতে ভালোবাসেন। একবার এক ঘরোয়া স্লাইড শোর শেষে তাঁকে মুড়ি-নারকোল খেতে দিয়েছিলাম। কী তৃপ্তি করে যে খেয়েছিলেন!

মৃত্যুকালে অমলেন্দুবাবুর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। আড়াই বছর আগে মেয়েকে নিয়ে সোদপুরে তাঁর একটি স্লাইড শো দেখতে গিয়েছিলাম। শরীরের কারণে গতি শ্লথ হলেও বোঝানার সময় আগের মতোই তারুণ্য উপচে পড়ছিল। সেই স্লাইড শো দেখে মেয়ের প্রশ্ন আর থামে না। 

ভুল ভুল আমি ভুল

না! না! সূর্য কখনও অনন্ত গ্রহণে থাকতে পারে না। আপনজনের মৃত্যুর খবরে ও আমার মনের বিকার। বিড়লা তারামণ্ডলের ডিরেক্টর পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি শুধু বিজ্ঞান গবেষণা করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে স্লাইড নিয়ে ছুটে গেছেন মাঠে ঘাটে। কারণ, তিনি মনে করতেন ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’। এই সত্যিটা না বুঝলে মানতে হবে প্লাস্টিক সাজার্রি করে গণেশের মাথা বসানো হয়েছে কিংবা গোমূত্র সর্বরোগহর।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বঙ্কিম দত্ত

সম্প্রতি প্রয়াত হলেন (২২-০৬-২০২০) ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। 

নব্বই বছর বয়স পার করেও এই বিশিষ্ট জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং সক্রিয়। এর রহস্য কী জানতে চাইলে, উত্তরে বলতেন, আনন্দের সঙ্গে কাজ, স্বল্পাহার, সরল ও নিয়মানুগ জীবনযাপন। দু’ দশকের বেশি ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গলোভী বর্তমান লেখক বুঝেছেন এগুলো কেবল কথার কথা না। তাঁর জীবনই ছিল তাঁর বাণী।

জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করবেন বলেই বর্ধমানের মুগকল্যাণ গ্রামের স্কুল থেকে সোজা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও গবেষণার কাজ। জ্যোর্তিবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহের বীজ অন্তরে লালিত হয়েছিল বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার পরোক্ষ প্রভাবে। এমএসসি ক্লাসে তাঁর শিক্ষক গণিতবিদ ভি ভি নারলিকার (প্রখ্যাত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকারের বাবা) এ বিষয়ে তাঁকে গবেষণায় আগ্রহী করে তোলেন। প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ৫০-এর বেশি। 

বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা চাইতেন সমাজে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হোক এবং সেই প্রয়োজনে সহজ ভাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বই লিখে তিনি প্রচার করতেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সায়েন্স অ্যান্ড কালচার’ পত্রিকা যাতে সামাজিক অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞানকে প্রয়োগের নানা আলোচনা থাকত। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ও মহাকাশ নিয়ে মানুষের মনে আগ্রহ ও এই বিষয়ে ভুল ধারণা দূর করার জন্য সর্বসাধারণের উপযোগী বই লিখেছেন, রেডিও-দূরদর্শনে বক্তৃতা করেছেন, জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে সহজ ভাষায় প্রচুর প্রবন্ধ (আড়াই হাজারের বেশি) লিখেছেন এবং স্থিরচিত্রের সাহায্যে হাজার হাজার বার (প্রায় ন’ হাজার) আলোচনা করতে ছুটে বেড়িয়েছেন দূরদূরান্তের গ্রাম-শহরে। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাধ সাধতে পারত না বেশির ভাগ সময়েই। জিজ্ঞেস করলে আয়োজকদের অসহায়তার কথা বলতেন। প্রচণ্ড গরমে ঘামছেন, প্রেক্ষাগৃহ দর্শকের ভিড়ে উপচে পড়ছে। তিনি অবিচল, কারণ উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন হলের শীতাতপ ব্যবস্থাটি মহার্ঘ। অনুষ্ঠান শেষে সঙ্গের অ্যাট্যাচি খুলে ভিজে গেঞ্জি পালটে নিলেন যখন, তখনও সমান নির্বিকার। জিজ্ঞেস করলেন, অনুষ্ঠান সবার কেমন লাগল! 

আসলে এই কাজ তিনি ভালোবাসতেন আর একে তিনি সামাজিক দায় হিসাবেই দেখতেন। এমন তো হয়েছেই, যখন দেখেছি অনুষ্ঠানে পৌঁছে দেখা গেল মাত্র কয়েক জন বসে আছেন দর্শক আসনে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অনেকেই ফিরে গেছেন ঘরে। অনুষ্ঠানে স্লাইড নিয়ে মহাকাশের বিষয়ে চিত্তাকর্ষক বক্তব্য রাখলেন অন্য দিনগুলোর মতোই, সমান উৎসাহের সঙ্গে।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

একবার বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন করার জন্য আয়োজকরা স্যারকে (এ ভাবেই আমরা সম্বোধন করতাম) নিয়ে গেছেন। উদ্বোধনের পর স্লাইড চিত্র-সহযোগে বলবেন ‘জ্যোতিষ কেন বিজ্ঞান নয়’ এই প্রসঙ্গে। উদ্বোধনের কাজ শুরু হতে অনেক দেরি হচ্ছে। বিশেষ অতিথি এসে পৌঁছোতে দেরি করছেন। আমরা কয়েক জন রয়েছি সঙ্গে এবং বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলছি। স্যার কিন্তু আমাদের নিরস্ত করছেন। কত কষ্ট করে অর্থ আর শ্রম দিয়ে এ সব মেলা আয়োজন করতে হয়, তাই একদিন আমাদের কষ্ট হলই বা! এই সব কথা তিনি আমাদের বোঝাতেন আন্তরিক ভাবেই। 

জ্যোতিষ-বিরোধিতা প্রসঙ্গে স্যারের ছিল ক্ষুরধার যুক্তি। জ্যোতিষশাস্ত্রের অসারতা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে স্লাইড প্রদর্শনগুলোতে তিনি কোনো বাগাড়ম্বর নয়, ব্যবহার করতেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যকে। আর এ বিষয়ে তাঁর প্রজ্ঞা ছিল অপরিসীম। দীর্ঘদিন (১৯৬৮-১৯৮৮) প্রথমে নটিক্যাল অ্যালামনাক ও পরে এই সংস্থার নাম পরিবর্তন হয়ে তৈরি পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার-এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, বিভিন্ন তিথিগণনা, চন্দ্র-সূর্যের উদয়-অস্তের সময় মাপা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ তারিখ, সময় ধরে পূর্বাভাস দেওয়ার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটা বৈজ্ঞানিক ভাবে ভারতে এই একমাত্র প্রতিষ্ঠানেই হয়।

পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান যা বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার ফল। যদিও এটি প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর আগেই মেঘনাদ সাহা মারা যান (১৯৫৬)৷ যাদের ধারাবাহিক পরিশ্রমে চিন ও জাপান ছাড়া এশিয়া মহাদেশের তৃতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি রূপ পায় ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অগ্রণী ও অন্যতম প্রধান। জ্যোতিষশাস্ত্রের কারবারিরা এই সংস্থার তথ্যগুলো ব্যবহার করেন কিন্তু দুর্বোধ্য আঁকিবুকি কেটে গ্রহের সঙ্গে মানুষের ভাগ্যের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন যা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। স্যার এ সবের সরব প্রতিবাদ করতেন সব সময়।

তাঁর লেখা ‘জ্যোতিষশাস্ত্র কি বিজ্ঞান?’ বইটি বহূল প্রচারিত৷ বইটির ইংরাজি অনুবাদও যথেষ্ট জনপ্রিয়। বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে জ্যোতিষীদের ভ্রান্ত ধারণা প্রচার ও মানুষকে প্রতারণা তিনি মেনে নেননি কখনোই। প্রাসঙ্গিক ভাবে বলা যায় যে এর ফলে প্রমাদ গুনলেন একদল জ্যোতিষী। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা প্রাণনাশের হুমকি দিলেন – অবিলম্বে এ সব প্রচার বন্ধ করতে হবে। অবশ্য সে যাত্রায় ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন রক্ষা পায় পুলিশ প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ অফিসারের সক্রিয় ভূমিকায়। উল্লেখযোগ্য যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জ্যোতিষ-বিরোধিতায় তিনি ছিলেন অবিচল যা মেঘনাদ সাহার  ভূমিকার উজ্জ্বল অনুসরণকেই মনে করিয়ে দেয় আমাদের।

Continue Reading
Advertisement
coronavirus
রাজ্য3 mins ago

নমুনা পজিটিভ হওয়ার হারে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান বাকি দেশের তুলনায় কোন জায়গায়?

দেশ38 mins ago

ছয় রাজ্যে ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নতুন করে সংক্রমিত ১৭,৬৪৭, বাকি দেশে ৬,৬০১

কলকাতা1 hour ago

কলকাতায় এখন ১৮টি কনটেনমেন্ট জোন, ১৮৭২টি আইসোলেশন ইউনিট, ফারাকটা কোথায়?

দেশ2 hours ago

আগামী এক বছর কেরলে মানতে হবে করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি, অন্যথায় বিপুল অঙ্কের জরিমানা

দেশ2 hours ago

‘করোনা ছড়াতে পারেন পর্যটকরা,’ সোমবার খুলছে না তাজমহল

দেশ9 hours ago

কোভিড থেকে সুস্থ হলেন এক শতায়ু দিল্লিবাসী, যিনি স্প্যানিশ ফ্লু-এর সাক্ষী

earthquake
দেশ14 hours ago

কেঁপেই চলেছে দেশের মাটি, এ বার ফের কচ্ছে, মিজোরামে

রাজ্য14 hours ago

রাজ্যে এক দিনে আক্রান্তের সংখ্যায় নতুন রেকর্ড! তবে সক্রিয় রোগীর চেয়ে অনেক এগিয়ে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা

দেশ1 day ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ২৪৮৫০, সুস্থ ৯৩৮১

কলকাতা2 days ago

কলকাতায় অতিসংক্রমিত ১৬টি অঞ্চলকে পুরোপুরি সিল করে দেওয়ার প্রস্তুতি

wfh
ঘরদোর3 days ago

ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছেন? কাজের গুণমান বাড়াতে এই পরামর্শ মেনে চলুন

fat
শরীরস্বাস্থ্য3 days ago

কোমরের পেছনের মেদ কমান এই ব্যায়ামগুলির সাহায্যে

thunderstorm
রাজ্য3 days ago

কলকাতা-সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গে সন্ধ্যার মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা

রাজ্য2 days ago

করোনা-আক্রান্তের সংখ্যায় কলকাতাকে পেছনে ফেলে দিল হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু

বিদেশ3 days ago

প্রধানমন্ত্রীর লাদাখ সফরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিনের প্রতিক্রিয়া

দেশ2 days ago

পাঁচ রাজ্যে নতুন করে করোনা-আক্রান্ত ১৬,৭৯৯ বাকি দেশে ৫,৯৭২

কেনাকাটা

কেনাকাটা19 hours ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

DIY DIY
কেনাকাটা6 days ago

সময় কাটছে না? ঘরে বসে এই সমস্ত সামগ্রী দিয়ে করুন ডিআইওয়াই আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক :  এক ঘেয়ে সময় কাটছে না? ঘরে বসে করতে পারেন ডিআইওয়াই অর্থাৎ ডু ইট ইওরসেলফ। বাড়িতে পড়ে...

smartphone smartphone
কেনাকাটা1 week ago

লকডাউনের মধ্যে ফোন খারাপ? রইল ৫ হাজারের মধ্যে স্মার্টফোনের হদিশ

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনা সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে ঘরে বসে যতটা কাজ সারা যায় ততটাই ভালো। তাই মোবাইল ফোন খারাপ...

কেনাকাটা1 week ago

১০টি ওয়াশেবল মাস্ক দেখে নিন

খবর অনলাইন ডেস্ক : বাইরে বেরোচ্ছেন। মাস্ক অবশ্যই ব্যবহার করুন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে তিন স্তর বিশিষ্ট মাস্ক...

নজরে