রবিবারের পড়া: জীবনের আয়নায় জর্জ – বিজেপি সম্পর্কে আগাগোড়াই ছিলেন নরম

0
george fernandes
জর্জ ফার্নান্ডেজ। ছবি সৌজন্যে এনডিটিভিডটকম।
দেবারুণ রায়

ভারতীয় রাজনীতির রঙ্গালয়ের ইতিহাস জর্জ ফার্নান্ডেজকে ছাড়া কোনো মতেই সম্পূর্ণ নয়। ওঁর বর্ণময় জীবন নানা উত্থান-পতন, আবাহন-বিসর্জনে ঘেরা। রাজনীতির নন্দনকাননে আগন্তুকের মতো এসেছিলেন। যখন যবনিকা পড়ল তখনও সেই স্ট্রেঞ্জার। নিজের কাছে নিজেই অচেনা। অ্যালঝাইমারের ছোবল তাঁকে অন্য জগতে নিয়ে যায় বেশ কয়েক বছর আগে। সেই সময় থেকেই সময় তাঁর কাছে ছুটি নিয়ে নেয় চিরতরে। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যান ফার্নান্ডেজ। হারিয়ে যান ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ মার্কা রাজনীতির খেরোর খাতা থেকে।

পাওয়ার পলিটিক্সের নির্মম অঙ্ক মানবজমিন ক’ ফসলা তার বিচার করে না। রেসের ঘোড়া হঠাৎ হোঁচট খেয়ে রেস থেকে ছিটকে গেলে যেমন বাতিল হয়ে যায় রাতারাতি, তেমনি হিসেবনিকেশ নৈতিকতা ক্ষমতার অলিন্দেও। ‘আগামীকাল’ যেমন কেউ দেখেনি, ঠিক সে ভাবেই ‘গতকালের’ কথাও মনে রাখে না চলতি হাওয়া আর বহতা নদীর স্রোত। হাওয়া আর স্রোত সব কিছুই উড়িয়ে আর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই দুই অমোঘ টান সত্ত্বেও ইতিহাস যতটুকু আঁচলে বেঁধে রাখে তা শুধুই মণিমুক্ত। সময়ের অতলান্ত গর্ভ থেকে ক’জন তা তুলে আনতে পারে? যে পারে সে পারে।

আরও পড়ুন ঐতিহাসিক ভুলে বাংলার পঞ্চপাণ্ডবের একজন ছিলেন নিরুপম

জর্জের জীবন বিচিত্র বর্ণময়। মুম্বইয়ের শ্রমিক আন্দোলনের মুকুটহীন নায়ক হিসেবে পাদপ্রদীপের আলো পড়ে তাঁর মুখে। গান্ধীবাদ আর সমাজবাদের মিশ্রণ, রামমনোহর লোহিয়ার ধারা তাঁকে টানে। কন্নড় প্রদেশের হয়েও মহারাষ্ট্রের পর বিহার হয়ে ওঠে তাঁর কর্মভূমি। কারণ ওই দুই রাজ‍্যেই সমাজবাদী আন্দোলনের ধারা ছিল তীব্রতর। সমাজবাদী আন্দোলনের লোহিয়াবাদী বিচারধারার সঙ্গেই ছিলেন জর্জ, অন্তত নয়ের দশকের গোড়া পর্যন্ত। তবে ‘৯২-এর আলোড়ন মতাদর্শ ও মেরুর রাজনীতিকে মূল মাপকাঠি করে তুলে যখন জাতীয় জীবনের অবস্থান ও অ্যাজেন্ডায় আমূল বদল আনে তখনও কংগ্রেস-বিরোধিতার লাইন আঁকড়ে থাকেন ফার্নান্ডেজ। জনতাদল ভেঙে সমতা পার্টি গড়েন নীতীশকুমারকে সঙ্গে নিয়ে। এবং সংঘের সংকেতে ও বিজেপির নকশা অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর ভগ্নাংশ সারা ভারতে যে ভাবে বিজেপির মিত্রশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছিল তার ভগীরথ ছিলেন জর্জ। নিজে ভিন্ন দল করে বিপরীত মেরুর বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিহারে লালুবিরোধী শিবিরের মাটি শক্ত করেন। সেই সঙ্গে রাজ‍্যে রাজ‍্যে একই ভাবে আঞ্চলিক দল গড়ে কংগ্রেসের বা সেকুলার শিবিরের বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তৈরিতে নামেন। বাংলায় বেশ কিছু দিন পরে কংগ্রেস ভেঙে জন্ম নেয় তৃণমূল। এবং তৃণমূলকে এনডিএর শরিক করার বিষয়ে জর্জের ভূমিকা ছিল অনন্য।

advani, vajpayee, fernandes, nt rama rao, farooq
আডবাণী, বাজপেয়ী, জর্জ, এনটি রাম রাও, ফারুক আবদুল্লা প্রমুখ। ছবি সৌজন্যে ফেসবক/জর্জ ফার্নান্ডেজ।

খোদ বাজপেয়ী, আডবাণী, সুষমা স্বরাজ বা প্রমোদ মহাজনদেরও ইচ্ছাপূরণ হত না জর্জ না থাকলে। ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের অনেকেই এনডিএতে এসেছিলেন জর্জের কারণে। যেমন দক্ষিণ ভারতের বিপুল সংখ্যক সাংসদের রাজ‍্য তামিলনাড়ু ও অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশ। তামিলনাড়ুর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল ডিএমকে ও এডিএমকের সম্পর্ক সাপে নেউলে হলেও মূলত জর্জের চেষ্টায় করুণানিধি এবং জয়ললিতা দু’জনই আসেন এনডিএতে। এটা যে কখনও ঘটতে পারে তা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। অন্ধ্রপ্রদেশের তেলুগু দেশম পার্টি আজন্ম ছিল সেকুলার শিবিরে। চন্দ্রবাবু নায়ডু ছিলেন যুক্তফ্রন্টের আহ্বায়ক। সেই চন্দ্রবাবুকে এনডিএর শরিক করতে না পারলেও সমর্থক করে সেই জোরেই সরকার গড়ার পথ প্রশস্ত করেন জর্জ।

এ ছাড়াও, বিহারে লালুকে আরও বেগ দিতে আরেক প্রস্ত ভাঙনের আয়োজন হয়। জনতাদল ভেঙে জন্ম হয় জেডিইউ ও আরজেডির। জেডিইউয়ের কর্তৃত্ব থাকে জর্জের মুঠোয়। স্বভাবতই তারা থাকে বিজেপির সঙ্গে। পরে কিছু দিনের জন্য গত বিধানসভা ভোটের আগে নীতীশ যখন লালুর হাত ধরেন, তত দিনে নখদন্তহীন জর্জ দলে কোণঠাসা, অসুস্থ ও অবসৃত। সুতরাং নীতীশকুমারকে রোখার জায়গায় ছিলেন না তিনি। যদি সুস্থ ও চেতনায় থাকতেন তা হলে নীতীশকে এনডিএ ছাড়তেই দিতেন না। নীতীশ কেন শরদ যাদবকে নেতৃত্বে নিয়ে এলেন সেটাই ছিল জর্জের মস্ত বড়ো ক্ষোভের কারণ। কিন্তু দলে ও সংগঠনে ক্রমশ অর্থহীন হতে হতে, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়া জর্জ টিকে ছিলেন শুধুমাত্র বিজেপির বলে, যা দলের কেউই সোজা চোখে দেখতে রাজি ছিলেন না।

আরও পড়ুন রাজনীতিকে চলচ্চিত্রের অধীন করে দিয়েছিলেন তিনি

নীতি নিয়ে নীতীশের সঙ্গেও সংঘাত হচ্ছিল লাগাতার। নীতীশও দলের ভেতর নেতৃত্ব-বিরোধী জেহাদ থেকে বাঁচতে বলির পাঁঠা করলেন জর্জকে। উল্লেখ্য, জনতাদলে মণ্ডল নিয়ে অন্তর্বিরোধ ছিলই। মণ্ডল দিয়ে বিজেপির কমণ্ডল ঠেকানোর অমোঘ কৌশল আগাগোড়াই নীতীশেরও অপছন্দ ছিল। কারণ মণ্ডলের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন লালু। শরদ ঘোর লালুবিরোধী হলেও মণ্ডল সম্পর্কে তাঁরও তীব্র আপত্তি ছিল। দলের ভেতরেও সংরক্ষণ চালু করা নিয়ে বেজায় চটেছিলেন। তার ওপর, দেশের রাজনৈতিক বাধ‍্যতা বদলে যাওয়ায় যে কংগ্রেস-বিরোধিতা আঁকড়ে থাকার দিন শেষ, তা মানতে তৈরি ছিলেন না। কার্যত এক দিকে কংগ্রেস-বিরোধিতাকে গৌণ আর অন্য দিকে মণ্ডলকে মুখ‍্য করার বিরুদ্ধে জেহাদ জানিয়েই জর্জ নতুন দল গড়েছিলেন। মণ্ডল ও কংগ্রেস প্রশ্নে ‘জর্জ সাব’-এর বিপরীত মেরুতে থাকলেও নীতীশ শুধু বিহারের মুখ‍্যমন্ত্রীর গদি আর অনগ্রসরদের নেতা হওয়ার বাসনার দিকে তাকিয়েই জর্জের সঙ্গে হাত মেলান। পরে জর্জবিহীন দলে লালুবিরোধিতাকে পাটলিপুত্রের গঙ্গায় ভাসিয়ে দিলেও মুখ‍্যমন্ত্রী হয়ে ফের ফিরে যান প্রাক-ভাসান পর্বে। যা অবশ্যই বিহার ও ভারতের রাজনীতিতে ফার্নান্ডেজ ফ‍্যাক্টর।

with nanaji deshmukh, morarji desai, madhu limaye and advani
নানাজি দেশমুখ, মোরারজি দেশাই, আডবাণী, মধু লিমায়ের সঙ্গে জর্জ। ছবি সৌজন্যে ফেসবুক/ জর্জ ফার্নান্ডেজ।

লোহিয়াযুগের অগ্রাধিকার বা ইন্দিরার স্বৈরশাসনের প্রেক্ষিতে লোকনায়কের রণনীতি নিশ্চয়ই ভারতের রাজনীতির বাবরি-ক্ষতের ওপর প্রলেপ হতে পারে না। একদা রামবিলাস পাসোয়ান যুক্তি দেখিয়েছেন, ‘৯২-এর আগের বিজেপিকে সাথ-সঙ্গতে নিলেও অযোধ্যা কাণ্ড-উত্তর বিজেপির সঙ্গে ঘর করা চলে না। সেই পাসোয়ানই অবশ্য এ কথা গিলে ফেলে বিজেপির ঘর করেছেন ও করছেন। অথচ দলে বা মোর্চায় রামবিলাস কিন্তু যথেষ্টই ফার্নান্ডেজের উলটো শিবিরে। একই ভাবে নীতীশও জনতাদলে থাকাকালীন কট্টর মণ্ডলপন্থী হিসেবে কদাচ জর্জ-শিবিরে ছিলেন না। জর্জরিত হন লালুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে।

এ দিকে, বিজেপি সম্পর্কে আগাগোড়া নরম জর্জ সাম্প্রদায়িক শক্তির সংহত হওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বই দিতে চাননি ‘৮০-র পর থেকে। ব‍্যক্তিজীবনে এটি তাঁর মস্ত বড়ো পরিবর্তন। কারণ এই মানুষটিই অনেকের মধ্যে প্রথম জনতা পার্টিতে পূর্বতন জনসংঘীদের দ্বৈত সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রশ্নটি ছিল, এক সঙ্গে দু’টি রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য থাকা কী করে সম্ভব? যুক্তিযুক্ত দাবি ছিল, একটি সংগঠনের সদস্যপদ ছাড়তে হবে। সমাজবাদীদের ওই প্রশ্ন ও দাবিকে সমর্থন জানান প্রাক্তন আদি কংগ্রেস, লোকদল, কংগ্রেস ফর ডেমোক্র‍্যাসি, স্বতন্ত্র পার্টি প্রমুখ সবাই। যারা এক হয়ে জনতা পার্টি গড়েছিল। এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিল বাইরে থেকে সমর্থন জানানো সিপিএম ও অন্য বামেরা। এরা প্রত‍্যেকেই বলল, জনসংঘের প্রাক্তনীদের সংঘ ছাড়তে হবে। কিন্তু প্রাক্তন জনসংঘীরা বললেন, আরএসএস রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন। সুতরাং সদস্যপদ ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। এর পর সংঘের নির্দেশ শিরোধার্য করে প্রাক্তন জনসংঘীরা সংঘের বদলে জনতা পার্টিই ছেড়ে দিলেন। ভাঙনের মুখে পড়ল মোরারজি সরকার। সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে সরকারের আস্থাভোটে একে একে সবাই সঙ্গ ছাড়ল প্রধানমন্ত্রীর। চরণ সিং হয়ে উঠলেন চূড়ান্ত ভাঙনের কেন্দ্রবিন্দু। সিপিএমও মোরারজির ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিল। (চলবে)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here