Connect with us

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অস্ত্রময়/ প্রথম পর্ব

সূত্রপাত ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেড্রিক সডি, যিনি যুগ্ম ভাবে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে লিখলেন, “(তেজস্ক্রিয়তা থেকে উৎপন্ন শক্তি) এই পৃথিবীকে সদা হাস্যময় গার্ডেন অফ ইডেনে পরিণত করবে”। সডির এই উক্তির পর একশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে মানুষের গড় আয়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রাণঘাতী মারাত্মক অনেক রোগের চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়েছে। […]

Published

on

representational image

শংকর ঘটক

সূত্রপাত

১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেড্রিক সডি, যিনি যুগ্ম ভাবে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে লিখলেন, “(তেজস্ক্রিয়তা থেকে উৎপন্ন শক্তি) এই পৃথিবীকে সদা হাস্যময় গার্ডেন অফ ইডেনে পরিণত করবে”। সডির এই উক্তির পর একশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে মানুষের গড় আয়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রাণঘাতী মারাত্মক অনেক রোগের চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়েছে। অনেক রোগব্যাধি চিরতরে নির্মূল হয়েছে। বাসস্থান, যানবাহন, বিনোদন ইত্যাদি সব কিছুরই আমূল বিবর্তন ঘটেছে। সডির স্বপ্ন সফল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, এ রকমটাই এক সময় মনে হচ্ছিল। হবে নাই-বা কেন! একটা পরমাণুর কেন্দ্রে যে এত শক্তি থাকতে পারে সেটা জানা গেল, জানা গেল কিছু কিছু ভারী মৌল নিজে নিজেই ভেঙে যায়, সৃষ্টি করে একাধিক হালকা মৌল, আর তার সঙ্গে সৃষ্টি করে শক্তি। প্রাকৃতিক নিয়মেই এ রকম হয়। প্রায় অফুরন্ত শক্তি এই পৃথিবীকে সরবরাহ করবে অগ্রগতির জ্বালানি।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: লখনউ ও আত্মাভিমানী মীর তকী মীর ও মির্জা গালিব / শেষ পর্ব

এই শক্তি ব্যবহার করতে পারলেই বিশ্বের অন্যতম সমস্যা, শক্তি সমস্যার সমাধান। বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করলেন বিষয়টি নিয়ে। প্রাথমিক উন্মাদনা কাটিয়ে সবে উঠে পড়ে লেগেছেন তাঁরা, বিশ্বে নেমে এল পর পর দু’টি যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-এর ২৮ জুলাই থেকে ১৯১৮-এর ১১ নভেম্বর পর্যন্ত) আর তার বছর কুড়ি পরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-এর ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৪৫-এর ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)। বিজ্ঞানীদের সমস্ত হিসেব গোলমাল হয়ে গেল। সব থেকে বড় বিপদ এল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। গবেষণায় নৈরাজ্য দেখা দিল। হিটলার-নিয়ন্ত্রিত জার্মানি থেকে বিজ্ঞানীদের একটা বিরাট অংশ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন। তাঁদের বড়ো অংশটাই চলে গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: লখনউ ও আত্মাভিমানী মীর তকী মীর ও মির্জা গালিব / প্রথম পর্ব

হিটলারের কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে জার্মান থেকে অ্যামেরিকায় আসা এক দল বিজ্ঞানী বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। জার্মানিতে রয়ে গিয়েছেন বেশ কিছু প্রতিভাবান পরমাণু বিজ্ঞানী। রয়ে গিয়েছেন হাইজেনবার্গ স্বয়ং। বলা যায় না, হিটলারের হাতে যদি কোনো ভাবে পরমাণু অস্ত্র চলে আসে তা হলে মানবসভ্যতার সেখানেই ইতি। হিটলারের নির্যাতনের কাছে হাইজেনবার্গের আত্মসমর্পণ অনিবার্য। সবাই মিলে ভাবনাচিন্তা করে আইনস্টাইনের ওপর ভার দিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের কাছে তথ্যটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ১৯৩৯-এর অক্টোবর মাসে মার্কিন রাষ্ট্রপতি একটি চিঠি পেলেন। লিও জিলার্ডের পরামর্শে চিঠিটি লিখেছিলেন আইনস্টাইন। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল এটাই যে হিটলারের জার্মানিতে এমন অনেক বিজ্ঞানী আছেন যাঁরা অ্যাটম বম বানানোর চেষ্টা করতে সক্ষম। অনেকের বিশ্বাস, এই চিঠি পাওয়ার পরই হিটলার-আতঙ্কে ভোগা রুজভেল্ট ব্রিটেনের সঙ্গে মিলিত ভাবে অ্যাটম বম বানানোর গোপন প্রকল্পটি শুরু করেন। জন্ম নিল পরমাণু অস্ত্র।

একটি সংক্রামক ব্যাধি

১৯৪৫ সালে জার্মানি আত্মসমর্পণ করার পরে উৎপাদিত অ্যাটম বমের ধ্বংসক্ষমতা পরীক্ষা করা হল জাপানে। তখন ধরা যেতে পারে যুদ্ধ শেষই, জাপানের ঠ্যাঁটামোটা বাদ দিলে। ইউরেনিয়াম বম ‘লিটিল্ বয়’ ফেলা হল হিরোসিমায়, প্লুটোনিয়াম বম ‘ফ্যাট ম্যান’ পড়ল নাগাসাকির মাথায়। সমগ্র বিশ্ব প্রত্যক্ষ করল নতুন আবিষ্কৃত মারণাস্ত্রের নৃশংসতম ধ্বংসলীলা। পরীক্ষামূলক মানবসংহার।

Nagasaki after bombing

বোমা পড়ার পরে নাফাসাকি।

এর পর থেকে আজ পর্যন্ত আর অ্যাটম বমের ব্যবহার হয়নি। কিন্তু হুমকি আর পালটা হুমকিতে বিশ্ববাসী ত্রস্ত। অ্যাটম বমের খবরাখবর, যথা পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাবনা, যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ভয়াবহ অবস্থা, সম্পূর্ণ ধ্বংসের পর পৃথিবীতে ফের কবে বাসযোগ্য পরিবেশ ফিরে আসবে, এই সব প্রশ্ন নিয়েই আলোচনা। যুদ্ধ শেষ হলেও উত্তরোত্তর আরও বেশি বেশি উন্নত মানের পরমাণু বোমা বানানোর গবেষণা চলতেই থাকল। সোভিয়েত রাশিয়া পরমাণু শক্তিধর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান হাইড্রোজেন বোমা বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। রাশিয়া তার আগেই এই  সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ১৯৫৪ সালের মধ্যে দু’টো দেশই সাফল্যের সঙ্গে  হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটাল। তার পর এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যেও দ্রুত সংক্রামিত হয়ে গেল। পরমাণু শক্তিধর হওয়াটা জাতীয় রণকৌশলের স্তরে উন্নীত হয়ে গেল। এর অন্তর্নিহিত কারণ, ভীতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর মেকি কৌলীন্যের অভিলাষ। নাৎসি জার্মানির হুংকার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের ইন্ধন (অথবা প্রেরণা)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রধর হওয়াটা হয়ে গেল সোভিয়েতের পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের কারণ। ব্রিটেন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রের ভীতি চিনকে উৎসাহিত করল অস্ত্রনির্মাণে। চিনের ভয়ে ভারতবর্ষ একই পথে হাঁটল। ভারতবর্ষের ভয়েই নাকি পাকিস্তানের অস্ত্র-ভাবনা। ও দিকে মধ্য এশিয়াকে চাপে রাখতে ইজরায়েলের পরমাণু অস্ত্র সংগ্রহ। ইজরায়েল আর মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে ইরান যোগ দিল এই দলে। দক্ষিণ কোরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পশ্চিমের দেশগুলির ভয়ে পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ করল  উত্তর কোরিয়া, এমনই দাবি। এ যেন এক স্বয়ংক্রিয় রাসায়নিক বিক্রিয়া। একবার শুরু হলে আর থামে না। তেজস্ক্রিয় বিক্রিয়ার ধাঁচে।

After Pokhran test

পোখরানে ভারতের পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার পরে।

এই কৌশলের একটা আন্তর্জাতিক নামকরণও হল – মিউচুয়ালি অ্যাসিওরড ডেসট্রাকশন সংক্ষেপে ম্যাড। বিশ্বের সামগ্রিক নিরাপত্তার নামে নিরাপত্তারই ঘোর বিপদ নেমে এল। যারা পরমাণু অস্ত্র নির্মানের জন্য প্রথম কাজ শুরু করেছিল তাদের অনেক বেশি সংখ্যায় পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা করতে হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (মোট পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা – ১০৩০) এবং রাশিয়া (মোট পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা – ৭১৫) উল্লেখযোগ্যে। পরবর্তী সময়ে বাকি যারা পরমাণু অস্ত্র উৎপাদনের কাজে হাত লাগিয়েছিল তাদের কাছে যে আগে থেকেই অনেক তথ্য ছিল তা বোঝা যায় তাদের অস্ত্র পরীক্ষার সংখ্যা দেখলে। সেই সব দেশের মোট পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার (ফ্রান্স – ৩০০; চিন – ৪৫; ব্রিটেন – ৪৫; পাকিস্তান – ২; ভারতবর্ষ – ৩; উত্তর কোরিয়া ৬) সংখ্যা বন্ধু রাষ্ট্রের সাহায্যের ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমানে মোট ৯টি রাষ্ট্রের হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে।

আধুনিক বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র

২০১৮-এর মার্চে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে আধুনিক বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রসম্ভারের একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যে হেতু বিষয়টি সমস্ত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই স্পর্শকাতর আর গোপনীয়, সঠিক পরিসংখ্যান এ ক্ষেত্রে সুলভ নয়। কিন্তু বিভিন্ন অপ্রত্যক্ষ তথ্যভিত্তিক এই জাতীয় পরিসংখ্যানকেই নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়ে থাকে। আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন এবং ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েনটিস্টস-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমান বিশ্বে আনুমানিক সাড়ে ১৪ হাজার পরমাণু মজুত আছে। রাষ্ট্র অনুসারে ভাগাভাগিটা এ রকম : রাশিয়া – ৬৮০০, আমেরিকা – ৬৫৫০, ফ্রান্স – ৩০০, চিন – ২৭০, ব্রিটেন – ২১৫, পাকিস্তান – ১৩০-১৪০,  ইজরায়েল – ৪০, ভারত – ১২০-১৩০, উত্তর কোরিয়া – ১০-২০। এ বারে ভাবা যাক খরচের বিষয়ে।

‘ইউনিয়ন অব কনসার্ন্‌ড সায়েনটিস্ট’ বোমার খরচের হিসেব কষেছিল। খুব কৃপণের মতো হিসেব করলেও ৩০০০টি অস্ত্রের জন্য খরচটা দাঁড়িয়েছিল ২৫০ বিলিয়ন তথা ২৫ হাজার কোটি ডলার।

অতি গোপনীয় প্রতিরক্ষার অন্তর্গত বলে খরচের তথ্য সংগ্রহ সহজসাধ্য নয়। কিছু গবেষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বেশ কিছু তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। এ ছাড়াও আরও অনেক সমীক্ষা আছে, যেখান থেকে জানা যায় যে ১৯৪০ থেকে ১৯৯৬-এর মধ্যে পরমাণু অস্ত্র খাতে মার্কিন সরকারের ন্যূনতম খরচ সাড়ে ৫.৫ ট্রিলিয়ন তথা ৫৫০০০০ কোটি ডলার। এর সঙ্গে যোগ হবে ভবিষ্যতের খরচ আরও ৩২০ বিলিয়ন তথা ৩২০০০ কোটি ডলার। এখানেই শেষ নয়, বিগত পাঁচ দশকের জমে থাকা নিউক্লিয়ার আবর্জনা সাফ করা, পড়ে থাকা অকেজো অস্ত্রগুলোর নির্বীর্যকরণ ইত্যাদি হাজারো কাজের জন্য প্রয়োজন আরও ২০ বিলিয়ন তথা ২০০০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে খরচের অঙ্ক ৫.৮ ট্রিলিয়ন তথা ৫৮০০০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এটা ছিল একটি মাত্র দেশের হিসেব। বিশ্বের অন্য সব অস্ত্রধারী দেশ ধরলে খরচটা কোথায় গিয়ে পৌঁছোবে ভাবতেও ভয় হয়।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যৎ বিশ্ব

খরচের কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বোমা বানালেই কাজ শেষ হয় না। সেটা বহন করে নিয়ে গিয়ে অন্য দেশে ফেলতে হবে। তার খরচও গগনচুম্বী। আছে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, আর আছে নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার বিশাল অঙ্কের খরচ। এক বার এক প্রশ্নের উত্তরে ‘ইউনিয়ন অব কনসার্ন্‌ড সায়েনটিস্ট’ নামে একটি সংগঠন বোমার খরচের হিসেব কষেছিল। খুবই আকর্ষণীয় ছিল সেই হিসেব। খুব কৃপণের মতো হিসেব করলেও ৩০০০টি অস্ত্রের জন্য খরচটা দাঁড়িয়েছিল ২৫০ বিলিয়ন তথা ২৫ হাজার কোটি ডলার। (চলবে)

ক্রিকেট

রবিবারের পড়া ২ / রানআউটে শুরু, রানআউটেই শেষ…

ধোনি কিন্তু নিজের মর্জিমাফিক চলেন বোঝা যায়। টেস্ট থেকে যেমন আচমকা অবসর ঘোষণা করেছিলেন, তেমনই সীমিত ওভারের ক্রিকেট থেকে যখন অবসর ঘোষণা করলেন তখন তাঁর জন্য একটি বিদায় ম্যাচের আয়োজন করারও উপায় নেই।

Published

on

শ্রয়ণ সেন

১০ জুলাই ২০১৯। নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপ্টিলের দুরন্ত একটা থ্রো শেষ করে দিল ১৩০ কোটির স্বপ্ন। একটুর জন্য ক্রিজের ভেতরে ঢুকতে পারেনি তাঁর ব্যাট, আর তাতেই সব স্বপ্নের জলাঞ্জলি।

বরাবরের আবেগহীন মহেন্দ্র সিংহ ধোনি সে দিন কিন্তু নিজের আবেগকে চেপে রাখতে পারেননি। প্যাভিলিয়নে ফেরার সময়ে তাঁর চোখে জল দেখা গিয়েছিল স্পষ্ট। ভারতকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে ধোনির ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার ঘটনা ভারতীয় ক্রিকেটে খুব একটা ঘটেনি, কিন্তু সে দিন হয়েছিল।

গত দু’ বছর ধরেই ধোনির ফর্ম পড়ে গিয়েছিল। শেষের দিকে নেমে রান পেলেও আগের মতো সেই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ধোনি কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন। তবুও একটা স্বপ্ন ছিল, ধোনির হাত ধরেই ভারত আরও একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে।

কিন্তু সেই সব স্বপ্ন শেষ করে দিল সেই দুঃস্বপ্নের রানআউট। রানআউট হওয়ার আগে ওই ম্যাচটায় খারাপ খেলেননি ধোনি। অর্ধশতরান করেছিলেন। কিন্তু ভারতের ব্যর্থতায় সেই সব কিছুই চাপা পড়ে গেল।

ধোনি কিন্তু ভারতের হয়ে আর কোনো ম্যাচ খেলেননি। তাঁর অবসরের ঘোষণা ছিল শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। তবুও আশায় ছিলেন ক্রিকেটভক্তরা। যদি কোনো ভাবে নিজের মত বদল করেন তিনি।

সেই সেমিফাইনালে রানআউটের মধ্যে দিয়ে শেষ হওয়া কেরিয়ারের সুচনাও হয়েছিল রানআউট দিয়েই।

সেটা ২০০৪-এর ডিসেম্বর। ঘরোয়া ক্রিকেটে তখন ফুলিঝুরি ঝরাচ্ছেন বছর ২৩-এর ধোনি। রাহুল দ্রাবিড়ের ওপর থেকে ভার কিছুটা হালকা করার জন্য একদিনের ক্রিকেটে ভারতের দরকার ভালো নির্ভরযোগ্য উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জোরাজুরির কারণে বাংলাদেশ সফররত ভারতের একদিনের দলে ধোনিকে জায়গা দিতে বাধ্য হলেন নির্বাচকরা।

[চট্টগ্রামের অভিষেক ম্যাচে রানআউট ধোনি]

কিন্তু শুরুটা যে ভালো হল না ধোনির। চট্টগ্রামে প্রথম ম্যাচে ব্যাট করতে নেমেই রানআউট। খাতা খোলার সুযোগই এল না তাঁর কাছে। ঘরোয়া ক্রিকেটে মোটামুটি নাম করে ফেলা ধোনির এ হেন অভিশপ্ত অভিষেক কেউ কল্পনাই করতে পারেননি।

তবে ধোনিকে নিজের জাত চেনাতে লাগল মাত্র পাঁচটা ম্যাচ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একদিনের ম্যাচ ছিল সেটা। ফাটকা খেলে তিন নম্বরে ধোনিকে নামিয়েছিলেন সৌরভ। আর তাতেই বাজিমাত। ১২৩ বলে ১৪৮ রানের দুর্ধর্ষ একটি ইনিংস। ব্যাস, তার পর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি।

[বিশাখাপত্তনমে শতরানের পর]

কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও ধোনি-তাণ্ডব। এ বার জয়পুরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। তাঁর ব্যাট থেকে বেরোল অপরাজিত ১৮৩ রানের দুর্ধর্ষ একটা ইনিংস।

এর পর টেস্ট ক্রিকেটেও নিয়ে আসা হল ধোনিকে। আর সেখানেও কয়েক মাস পরেই বাজিমাত। ২০০৬-এর পাকিস্তান সফরে ফৈজলাবাদ টেস্টে শোয়েব আখতারদের ঠেঙিয়ে ১৪৮ রানের তুখোড় একটি ইনিংস। ঝাঁকড়া চুলের ধোনি তত দিনে গোটা বিশ্বে পরিচিত হয়ে গিয়েছেন। তাঁর চুলের জন্য ফ্যান হয়ে গিয়েছেন স্বয়ং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পরভেজ মুশারফ। ধোনিকে চুল না কাটারও আবদার করেছিলেন মুশারফ। যদিও পরের বছরই সেই চুল ছেঁটে ফেলেন মাহি।

[ফৈজলাবাদ টেস্টে শতরান করে ধোনি]

আসলে দায়িত্ব বাড়তেই এই বাড়তি বোঝা নিজের শরীরের ওপর থেকে ঝেড়ে ফেলেন ধোনি। ধোনি তত দিনে ভারতের অধিনায়ক হয়ে গিয়েছেন। অধিনায়কের কেরিয়ারের শুরুতেই বাজিমাত।

২০০৭-এ ৫০ ওভারের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতের গ্রুপ লিগেই বিদায়ের পর কেউ ভাবতেই পারেনি যে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে টি২০ বিশ্বকাপে ভারত আদৌ ভালো ফল করতে পারবে বলে।

সম্ভবত নির্বাচকদেরও বেশি আশা ছিল না। আর তাই সৌরভ-সচিন-দ্রাবিড়দের বাদ দিয়ে পুরোপুরি যুবদল ভারত পাঠায় দক্ষিণ আফ্রিকায় টি২০ বিশ্বকাপের জন্য। অধিনায়ক করা হয় ধোনিকে। ওই দলে বেশি অভিজ্ঞতার যুবরাজ থাকলেও নির্বাচকরা ভরসা করেন ধোনির ওপরেই। আর এটাই হয়ে যায় এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

[২০০৭-এ টি২০ বিশ্বকাপে জয়ের পর]

ধোনির নেতৃত্বে টি২০ বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ভারত। টুর্নামেন্টের ফাইনালে পাকিস্তান, সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়া, তার আগে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে হারিয়ে নজির তৈরি করে ভারত। এই বিশ্বজয়ের পরেই ভারতের একদিনের আর টেস্ট দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেন রাহুল দ্রাবিড়। একদিনের অধিনায়কের কুর্সিতেও বসে পড়েন ধোনি।

তার পরেই ভারতীয় ক্রিকেটের এক স্বর্ণযুগের শুরু। কার্যত ‘ম্যান উইথ দ্য মিডাস টাচ’ হয়ে যান ধোনি। ২০০৮-এ অনিল কুম্বলের অবসরের পরে টেস্ট দলের দায়িত্বও তাঁর হাতে চলে আসে।

একদিনের দলকে নিজের মতো করে তৈরি করতে গিয়ে বেশ কিছু অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাঁকে। সৌরভ আর দ্রাবিড়ের মতো সিনিয়রদের একদিনের দল থেকে বাদ দিয়েছিলেন। প্রবল সমালোচিত হয়েছিলেন বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু তাঁর হাতে তৈরি ভারতীয় দল ফল দিয়েছিল।

ধোনি যে ভাবে একদিনের দল তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সেটাই করেছিলেন। আর তার ফলস্বরূপ ২০১১-তে বিশ্বজয়।

[২০১১-এ বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে ধোনি]

নিঃসন্দেহে ধোনির কেরিয়ারে সব থেকে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ভারতের এই বিশ্বজয়। এর ঠিক দু’ বছরের মাথায় আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও দখল নিল ভারত। ধোনিই প্রথম অধিনায়ক যিনি আইসিসির তিনটে টুর্নামেন্টেই নিজের দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেন।

পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে ভারতের সব থেকে সফল অধিনায়ক হয়ে যান ধোনি। সৌরভের রেকর্ড ভেঙে টেস্টে সর্বাধিক জয়ের রেকর্ডেরও মালিক হন অধিনায়ক ধোনি, পরবর্তীকালে যে রেকর্ডের দখল নিয়েছেন বিরাট কোহলি।

কিন্তু এর মধ্যে একটি বিতর্কও থেকে যায়। পরিসংখ্যানের দিক থেকে সব থেকে সফল অধিনায়ক হলেই কি তাঁকে সফল বলা চলে?

বিদেশে টেস্ট জয়ের নিরিখে ধোনি কিন্তু সৌরভ আর বিরাট কোহলির থেকে পিছিয়েই শেষ করলেন। বিদেশের মাঠে ২৫টা টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে মাত্র ৬টায় ভারতকে জিতিয়েছেন ধোনি। ভারত হেরেছে ১১টি টেস্টে।

তবে ধোনির টেস্ট ক্রিকেট খুব একটা প্রিয় ছিল না, সেটা তিনি বুঝিয়ে দেন ২০১৪-এর ডিসেম্বরে। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে সবাইকে চমকে দিয়ে টেস্ট থেকে নিজের অবসরের কথা ঘোষণা করেন মাহি। এর পর শুধুই সীমিত ওভারের ক্রিকেটে মনোনিবেশ করেন তিনি।

২০১৫-এর বিশ্বকাপে ধোনির নেতৃত্বে ভারত সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। গোটা টুর্নামেন্টে ভারত একটা মাত্র ম্যাচেই হেরেছিল। অস্ট্রেলিয়ার কাছে সেমিফাইনালে।

এর পরের বছরের এক্কেবারে শেষলগ্নে একদিনের ম্যাচের অধিনায়কত্বও ছেড়ে দেন মাহি। বিরাট কোহলির কাঁধে দায়িত্ব চলে আসে। তবে বকলমে ভারতের অধিনায়ক ধোনিই ছিলেন, সেটা পরতে পরতে বোঝা গিয়েছে। উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে ধোনিকে অনেক বার ফিল্ড সেট করতে দেখা গিয়েছে।

বিরাট কোহলিও ধোনিকে অসম্ভব ভরসা করতেন। আর সেই কারণেই শেষ দু’ বছর তাঁর ব্যাটিং ফর্ম পড়ে গেলেও ধোনি সম্পর্কে কোনো বিরূপ ধারণা তৈরি হয়নি কোহলির। অধিনায়কের ব্যাকিং সব সময়ে পেয়ে গিয়েছিলেন ধোনি। এমনকি ক্রিকেটবিশ্ব যখন ধোনির সমালোচনায় মুখর, তখন তার জবাব কোহলিই দিয়েছেন।

কিন্তু যতই অধিনায়কের সমর্থন থাকুক, ধোনির নিজের ফর্ম যে পড়তির দিকে সেটা তিনিও সম্ভবত বুঝতে পারছিলেন। তবুও তাঁর আশা ছিল ভারতকে আরও একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেই ক্রিকেট মাঠকে বিদায় জানাবেন তিনি।

কিন্তু মার্টিন গাপ্টিলের একটা রানআউট তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দিল না। রানআউটে শুরু হওয়া একটি কেরিয়ার শেষ হল রানআউটের মধ্যে দিয়েই।

[যে রানআউটে শেষ হয়ে গেল ১৩০ কোটির স্বপ্ন]

ধোনি কিন্তু নিজের মর্জিমাফিক চলেন বোঝা যায়। টেস্ট থেকে যেমন আচমকা অবসর ঘোষণা করেছিলেন, তেমনই সীমিত ওভারের ক্রিকেট থেকে যখন অবসর ঘোষণা করলেন তখন তাঁর জন্য একটি বিদায় ম্যাচের আয়োজন করারও উপায় নেই।

তবুও আমরা চাই, আপামর ক্রিকেটভক্ত চায়, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনও চান, অন্তত একটা ফেয়ারওয়েল ম্যাচ খেলুন ধোনি। করোনার দাপট কমে গেলে সামনের বছর দর্শকভরতি কোনো স্টেডিয়ামেই হোক এই ম্যাচ।

আপাতত চেন্নাই সুপারকিংসের হলুদ জার্সিতে দেখা যাবে ধোনিকে। কিন্তু নীল জার্সির মাহাত্ম্য যে সব সময় আলাদা।

২০১১-এর বিশ্বকাপের ফাইনালে ছয় মেরে ভারতকে জেতানোর সময়ে রবি শাস্ত্রীর বিখ্যাত ধারাবিবরণীটা এখনও মনে পড়ে, “ধোনি ফিনিসেজ অফ ইন স্টাইল!”

সেটাই কিন্তু এ বারও হল। একবারে নিজস্ব ঢঙে, নিজস্ব কায়দায় কেরিয়ার শেষ করলেন মাহি।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ১ / ঠিক ৪০ বছর আগের ১৬ আগস্ট

ঘরে ঘরে প্রিয়জনদের উদগ্রীব অপেক্ষা – ছেলেটা ঘরে ফিরল? পাড়ায় পাড়ায় জিজ্ঞাসা – ছেলেটা ফিরেছে?

Published

on

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

মায়ের সঙ্গে একবার গঙ্গাস্নান করতে বাবুঘাটে এসে ছেলেটি অবাক হয়ে দেখেছিল, একটু দূরে সেনাব্যারাকের পাশের মাঠে একদল গোরা একটা পেটমোটা গোল জিনিস নিয়ে খেলছে, ছুটছে, পায়ে পায়ে কেড়ে নিচ্ছে…। হঠাৎ ফেনসিং-এর ধারে সেই গোল জিনিসটা চলে এল। একজন গোরা ছুটে এসে সেটা চাইল। ছেলেটি তৎক্ষণাৎ সেই গোল জিনিসটা তুলে নিয়ে গোরার দিকে ছুড়ে দিল। তার পর তার ফিরে আসা মায়ের সঙ্গে। কিন্তু মনের মধ্যে সেই মুহূর্তগুলো জ্বলজ্বল করতে লাগল। ভাবনায় বার বার ঘুরে ঘুরে আসতে লাগল।

ছেলেটি কলকাতার হেয়ার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তার অভিজ্ঞতার কথা বন্ধুদের কাছে বলল। জানল, ওই পেটমোটা গোল বস্তুটা হল ‘বল’, আর খেলাটার নাম ‘ফুটবল’। ছেলেটির নাম নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। তারই উদ্যমে কেনা হল একটি বল। সেই জোগাড় করল তার স্কুলের সহপাঠীদের। নামল সবাই মিলে মাঠে, শুরু হল খেলা। কিন্তু সে খেলা ছিল এলোপাথাড়ি – যে যে দিকে পারে ছুটছে, এলোপাথাড়ি লাথি মারছে, বল পায়ে পেলে যে দিকে খুশি মেরে দিচ্ছে – সে এক হট্টগোলের হল্লাগুল্লা খেলা।

১৮৭৯-এর সেই গোড়ার কথা

পাশেই হিন্দু কলেজ। সেখানকার কয়েক জন ছাত্রও জুটে গেল তাদের সঙ্গে। কয়েক দিন পরে হিন্দু কলেজের (পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ, অধুনা বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক বি ভি স্ট্যাকের নজরে পড়ল ঘটনাটা। শেষে তিনিই উদ্যোগী হয়ে নিয়ে এলেন নতুন বল। শেখালেন খেলার নিয়মকানুন। ছাত্রদের দু’ দলে ভাগ করে দিয়ে তিনিই রেফারি হিসাবে মুখে বাঁশি নিয়ে মাঠে নামলেন। শুরু হল বাংলার মাটিতে ফুটবলের ইতিহাস। সময়টা ১৮৭৯।

নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী।

তখন থেকেই শুরু বাংলা ও বাঙালির ফুটবল-ইতিহাসের অগ্রগতি। একে একে জন্ম নিল ওয়েলিংটন ক্লাব (পরে টাউন ক্লাব), শোভাবাজার ক্লাব, মোহনবাগান ক্লাব, ইস্টবেঙ্গল ক্লাব, মহমেডান স্পোর্টিং, ঢাকার ওয়েলিংটন ক্লাব (পরে উয়াড়ি ক্লাব), ঢাকা স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি। বাঙালির আবেগে, রক্তে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হল ফুটবলের আকর্ষণ, উত্তেজনা। স্বামী বিবেকানন্দও তাঁর কৈশোরকালে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন। অনুভব করেছিলেন ফুটবল খেলার মাধ্যমে শরীরচর্চার তাৎপর্য, তাই ডাক দিতে পেরেছিলেন ফুটবল খেলতে।

ফুটবল খেলার মধ্য দিয়ে একটা জাতিয়তাবাদী সত্তা ও আবেগ জন্ম নিয়েছিল পরাধীন ভারতবর্ষে। তাই তো বোধহয় ১৯১১-তে ১১ জন বাঙালির যুবকের খালি পায়ে লড়াই বাঙালিকে ইংরেজের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল।

গত শতকের প্রতিটি দশকে বাঙালি ও ফুটবল একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। আর সেই খেলার ২২ জন খেলোয়াড় ছাড়া বাকি যে বিরাট অংশ – সেই বঙ্গসন্তানেরা কখনও মাঠের ধারে, কখনও বা গ্যালারিতে বা রেডিও ধারাবিবরণীতে মশগুল হয়ে থাকত। প্রিয় দলের জেতা-হারায় ছিল আনন্দ-দুঃখের অভিব্যক্তি। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, মফস্‌সলে কৈশোর, যৌবন ফুটবল খেলার প্রতি ছিল নিবেদিত প্রাণ। সেই আবেগ এমনই ছিল বা বলা যায় আজও আছে, যে বিশ্ব ফুটবলের প্রতিযোগিতায় বাঙালি দলে দলে বিভক্ত হয়ে যায় – ব্রাজিল, আর্জেন্তিনা, জার্মানি, ইংল্যান্ড ইত্যাদির পক্ষে। ঠিক যেমন, দেশের মাটিতে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহমেডান…।

সেই দিনটিতে ফুটবল কাঁদিয়েছিল

সেই ফুটবল খেলা, যা বাঙালিকে আনন্দ দেয়, উত্তেজনায় ভরপুর করে তোলে, শপথে-প্রতিজ্ঞায় সুদৃঢ় করে তোলে, সেই ফুটবল বাঙালিকে কাঁদিয়েও তোলে, যখন বাঙালির মনে পড়ে আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগের একটি দিনের ইতিহাস, যে দিন ফুটবলের চোখে নেমেছিল কান্না, হাহাকার।

দিনটা ছিল ১৯৮০ সালের ১৬ আগস্ট। খেলার নন্দনকানন ইডেন গার্ডেনস। কলকাতা লিগের ডার্বি ম্যাচ – প্রতিপক্ষ দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল। গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। দর্শকসংখ্যা ৭০ হাজারের কিছু বেশি। রেডিওতে কান পেতেছে লক্ষ লক্ষ ফুটবলপ্রেমী। দূরদর্শনে চোখ রেখেছে আরও অনেকে। মোহনবাগানের ক্যাপ্টেন কম্পটন দত্ত আর ইস্টবেঙ্গলের সত্যজিৎ মিত্র। রেফারি সুধীন চ্যাটার্জি।

টানটান উত্তেজনায় শুরু হল খেলা। দু’ পক্ষই অঙ্গীকারবদ্ধ – জিততেই হবে। গ্যালারিতে সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে দর্শকদের অন্তরে অন্তরে – শরীরী ভাষায় আর তাদের শিরায় শিরায় বইছে উত্তেজিত রক্তস্রোত। খেলা এগোচ্ছে, দু’ দলই মরিয়া তাদের সম্মান-ঐতিহ্য অটুট রাখতে। মাঠের মধ্যে ৯০ মিনিটের প্রতি সেকেন্ডে খেলোয়াড়দের যেমন চোয়াল শক্ত করে চলছে লড়াই, ঠিক তেমনই গ্যালারির বুকে হাজার হাজার সমর্থকের হৃদপিণ্ডে চড়ছে উত্তেজনার পারদ। এক সময় খেলা শেষ হল, ফল ০-০। কিন্তু ততক্ষণে মাঠের গ্যালারিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্যালারিতে শুরু হয়ে গিয়েছিল বিশৃঙ্খলা, ভেঙে পড়েছিল প্রশাসনিক দৃঢ়তা। দর্শকরা যে যার মতো করে প্রাণ হাতে করে ছুটতে শুরু করল। দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হাজার হাজার মানুষ। কে রইল পেছনে, কে রইল পায়ের নীচে – সে সব চিন্তা তখন কারও নেই। সবার অবস্থা তখন ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’।            

সে দিনের বিশৃঙ্খলা।

ঘটে গেল কলকাতার ফুটবলের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ঘটনা। পদপিষ্ট হয়ে মারা গেলেন ১৬ জন ফুটবলপ্রেমী – ১৯৮০-র ১৬ আগস্ট। সারা মাঠ, সারা শহর, বাংলার গ্রাম-গঞ্জ-মফস্‌সল সে দিন হতবাক, শোকে বিহ্বল। হাহাকারে, আর্তনাদে ভরে গিয়েছিল বাঙালির মন-প্রাণ।

খেলা দেখতে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরল না ১৬টি তরতাজা প্রাণ – হিমাংশুশেখর দাস, উত্তম ছাউলে, কার্তিক মাইতি, সমীর দাস, অলোক দাস, সনৎ বসু, বিশ্বজিৎ কর, নবীন নস্কর, কার্তিক মাজী, ধনঞ্জয় দাস, প্রশান্তকুমার দত্ত, শ্যামল বিশ্বাস, রবীন আদক, মদনমোহন বাগলি, অসীম চ্যাটার্জি এবং কল্যাণ সামন্ত। সে দিন আহত হয়েছিল কয়েকশো ফুটবলপ্রেমী দর্শক।

১৬ আগস্টের সন্ধ্যা-রাত্রি ভীষণ ভারী হয়ে উঠেছিল বাংলার বুকে, বড়ো দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল, কিছুতেই সকাল হতে চাইছিল না সেই রাত। ঘরে ঘরে প্রিয়জনদের উদগ্রীব অপেক্ষা – ছেলেটা ঘরে ফিরল? পাড়ায় পাড়ায় জিজ্ঞাসা – ছেলেটা ফিরেছে? সারা বাংলা সে দিন গুমরে গুমরে কাটিয়েছিল নিদ্রাহীন রাত।

পরের দিন প্রভাতী সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রকাশিত খবরের অক্ষরগুলো যেন কেঁদে উঠেছিল। আকাশবাণীতে ঝরে পড়েছিল কষ্টের উচ্চারণ ‘সংবাদ বিচিত্রা’য়। উপেন তরফদারের উপস্থাপনায় প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল উত্তম ছাউলে, মদনমোহন বাগলিদের (তখনও পর্যন্ত সকলের নাম জানা যায়নি) প্রতি। সে দিন বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ শুনেছিলেন সেই অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে শোনা গিয়েছিল এক সন্তানহারা পিতার আর্তনাদ – খো…কা, খো…কা।  

‘খেলার মাঠে কারও খোকা আর না হারায় দেখো’

বাংলার মানুষ শুনেছিলেন বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম নক্ষত্র সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা সেই ঐতিহাসিক গান – ‘খেলা ফুটবল খেলা, খোকা দেখতে গেল সেই সকালবেলা’। সেই সন্তানহারা পিতার কান্নাই বোধহয় তাঁকে দিয়ে এই গান লিখিয়ে নিয়েছিল। গানটিতে সুর দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সুরকার নচিকেতা ঘোষের পুত্র সুপর্ণকান্তি ঘোষ। গেয়েছিলেন মান্না দে।

গানটি ১৯৮১ সালের সরস্বতী পুজোর আগে এইচএমভি থেকে প্রকাশ করা হয়। ফুটবল-শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ক্যালকাটা স্পোর্টস জার্নালিস্টস ক্লাব এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেই অনুষ্ঠানেই ওই গানটি প্রকাশ করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন স্বয়ং মান্না দে, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপর্ণকান্তি ঘোষ, সেই সময়কার অ্যাডভোকেট জেনারেল স্নেহাংশুকান্ত আচার্য, পি কে ব্যানার্জি, চুণী গোস্বামী, সুঁটে ব্যানার্জি, পঙ্কজ রায়, বিদেশ বসু, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, কম্পটন দত্ত, সত্যজিৎ মিত্র-সহ বাংলার ক্রীড়া ও সংস্কৃতি জগতের নক্ষত্ররা।

গানটি ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ মিনিটের। শেষে সন্তানহারা পিতার সেই মর্মস্পর্শী আবেদন প্রোথিত হয়ে যায় বাঙালির মর্মস্থলে – ‘তোমরা আমার একটা কথাই রেখো / খেলার মাঠে কারও খোকা আর না হারায় দেখো’।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ২: অমলাশঙ্কর বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃজনশীলতার মধ্যে

ঘুমের মধ‍্যে রানির মতো চলে গেলেন পরম আত্মীয়ের কাছে।

Published

on

papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

ভোরের আলো ফোটার আগেই একটা যুগের অবসান। ঘুমের মধ‍্যে রানির মতো চলে গেলেন পরম আত্মীয়ের কাছে। শতায়ু নৃত্যশিল্পী বার্ধক‍্যজনিত কারণেই ইহলোক ত‍্যাগ করলেন শুক্রবার ভোররাতে।

ব্যবসার কাজে বিদেশে যাওয়ার জন্য বাবা অক্ষয়কুমার নন্দী যদি তাঁকে সঙ্গে না নিতেন, তা হলে তাঁর জীবন কোন দিকে বয়ে যেত বলা মুশকিল। বারো বছরের মেয়েকে নিয়ে প্যারিস যাওয়ার যে পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি, তা এক সময়ে মহার্ঘ পিতৃ-আশীর্বাদ বলেই ভেবেছিলেন তিনি। তিনি নৃত্যশিল্পী অমলাশঙ্কর চৌধুরী, আমাদের সকলের অত্যন্ত শ্রদ্ধার অমলাশঙ্কর (Amala Shankar)।

সময়টা ১৯৩১। প্যারিসের ‘ইন্টারন্যাশনাল কলোনিয়াল এক্সপোজিশন’ থেকে আমন্ত্রণ এল বাবার কাছে। তাঁর অলংকারের কারখানা ‘ইকোনমিক জুয়েলারি ওয়ার্ক্স’-এর স্টল হবে সেখানে। সেই সূত্রে ফ্রান্সে যাওয়া। ছোট্ট অমলা আত্মহারা। যখন শুনল শহরের বোয়া দে ভান সাঁ বা ভানসার বন নামে একটি বনের ভেতরে প্রদর্শনীটি হবে এবং সেখানে নাচগানও হবে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই আরও উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল কিশোরী অমলা। সেই প্রদর্শনীতে ভারতীয় নৃত্য পরিবেশনের দায়িত্বে ছিলেন মাদাম নিয়তা নিয়কা। অমলা তখন নাচের কিছুই জানত না। বাবার উৎসাহে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া এবং নিয়তাই তৈরি করে নিলেন অমলাকে।

১৯৩১ স্মরণীয় হয়ে রইল আরও এক কারণে। সেই প্রদর্শনীতে নৃত্য পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রিত ছিলেন আরও এক ভারতীয়, উদয়শঙ্কর। লোকমুখে জানা হয়ে গিয়েছিল, তিনিও একই জেলার লোক, বাবার বিশেষ পরিচিত ও বিশ্ববিখ্যাত নর্তকী আনা পাভলোভার সঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকায় নৃত্য পরিবেশন করে যশস্বী হয়েছেন। ভারতবর্ষকে গৌরবান্বিত করেছেন।

উদয়শঙ্কর ও অমলাশঙ্কর।

উদয়শঙ্কর – নাম শুনে মনে হল প্রবীণ এক দিকপাল প্যারিসে অবসর যাপন করতে এসেছেন। কিন্তু প্রদর্শনীতে তাঁদের প্যাভেলিয়নের সামনের সারিতে ষোলো আনা সাহেবি পোশাক পরিহিত সেই বাঙালিকে দেখে ধারণা পালটাল। সেই সঙ্গে সে দিনের কিশোরীর মনে একটা সুরও গেঁথে গেল। এত দিন তো পুরুষচিত্র বলতে মনের মধ্যে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল কৃষ্ণ, অর্জুন আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।  

শঙ্কর পরিবারের অনেকেই থাকতেন প্যারিসে। অক্ষয়বাবুর সঙ্গে কথা বলে অমলা ও তাঁকে তাঁদের বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ করে গেলেন উদয়শঙ্কর। প্যারিসের বাড়িতে অমলাকে পেয়ে উদয়ের মা হেমাঙ্গিনী দেবীর মহা আনন্দ। সে দিন হেমাঙ্গিনীর রান্না করা চচ্চড়ি, মাংস আর পোলাও খেয়েছিলেন অমলা। আর খেলার সঙ্গী হিসাবে পেয়েছিলেন রবিকে, মানে রবিশঙ্করকে।

শঙ্করদের প্যারিসের বাড়িতে প্রায়ই যেতেন অমলা। একদিন রবির সঙ্গে খেলছেন, এমন সময় উদয়শঙ্করের ডাক। অমলাকে একটা মুদ্রা দেখিয়ে নাচতে বললেন। অমলাও তৎক্ষণাৎ দেখিয়ে দিলেন। উদয় দেখে বুঝেছিলেন, নাচ অমলার রক্তে আছে। এ ভাবেই নৃত্যে হাতেখড়ি অমলার, ‘বড়দা’ উদয়শঙ্করের কাছে। খেলার ছলে নাচ তোলা হতে লাগল অনায়াসে।

ঠিক হল ইউরোপের নানা জায়গায় নাচের অনুষ্ঠান করা হবে। আর অমলার বাবাও ঠিক করেছিলেন ইউরোপের সব শিল্পকেন্দ্রগুলি মেয়েকে ঘুরিয়ে দেখাবেন। ১৯৩১-এর ২৯ ডিসেম্বর – শুরু হল ইউরোপ-যাত্রা, শুরু হল অমলার নৃত্যজীবনের যাত্রাও। ১৬ জনের দলে ছিলেন আরও দুই ভাই, তিন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী – সুরশিল্পী তিমিরবরণ, অন্নদাচরণ এবং পশ্চিম ভারতীয় যুবক বিষ্ণুদাস শিরালি। মহিলা অধ্যক্ষ ছিলেন শিল্পকলাবিদ সুইৎজারল্যান্ডের মিস আলিস বোনর। দলে এসে অমলার নতুন নাম হল অপরাজিতা। ইউরোপ ঘুরে এসে সেই কিশোরী লিখে ফেলেন ‘সাত সাগরের পারে’ নামে এক ভ্রমণের বই। অস্ট্রিয়া থেকে বাল্টিকের লিথুয়ানিয়া, জার্মানির সুলৎজবার্গ, ফ্রান্সের টুলোঁ, সুইডেনের মালমো, নরওয়ের অসলো, ফিনল্যান্ডের হেলজিৎ ফোর্স, বেলজিয়ামের লিজ্‌ – কোথায় না ঘুরে ফেলল ছোট্ট অমলা।

নৃত্যের তালে তালে

ইতিমধ্যে নৃত্যশিক্ষা চলতে লাগল উদয়শঙ্করের হাত ধরে। ‘কালীয়দমন’ দিয়ে মঞ্চে প্রবেশ। অমলা কালীয়, উদয়শঙ্কর কৃষ্ণ। বিদেশিরা অভিভূত নাচ দেখে। আট মাসের সেই সফরে ভারতবর্ষের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব বিদেশিদের কাছে তুলে ধরলেন তাঁরা। এ দিকে মনের পুরুষচিত্র ধীরে ধীরে বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। কষ্ট করে জীবনের পথ খুঁজতে হল না। নৃত্যশৈলী দেখিয়ে দিল কোনটা অমলার পথ। উদয়শঙ্করের হাত ধরেই পথ এসে মিশে গেল অমলার পথে। এ যেন হর-পার্বতীর মিলন।

বছর ষোলো বয়স। ম্যাডান থিয়েটার তথা এলিট সিনেমাহলে ‘কার্তিকেয়’ দেখতে গিয়ে মনের মানুষের খোঁজ যেন আরও ভালো করে পেলেন অমলা, কার্তিকেয়রূপী উদয়শঙ্করকে দেখে। বিদেশ সফরে উদয়শঙ্কর একটি ফোর্ড গাড়ি উপহার পেয়েছিলেন। সেই গাড়িতে অমলা-সহ কয়েক জনকে নিয়ে কলকাতা থেকে দেহরাদুন হয়ে আলমোড়া যাওয়া উদয়শঙ্করের। অমলার কাছে এ যাত্রার স্বাদ ছিল আলাদা। বিচিত্র অনুভূতি – রোমান্সের সঙ্গে মিশে আছে লজ্জা, ভয়, দ্বিধা। বিত্তশালী, অসামান্য মেয়েরা উদয়ের জন্য পাগল। আর সেখানে অমলা তো একরত্তি মেয়ে। তবে জোর ছিল এক জায়গায়। যে দু’-একটি বই কিনে অমলাকে  দিয়েছিলেন, তাতে লেখা ছিল – উইথ লাভ, উদয়শঙ্কর। কত বার বই খুলে সেই নাম দেখা – উদয়শঙ্কর। একদিন মেঘ না চাইতেই জল এসে পড়ল কপালে। উদয়শঙ্কর জানালেন, ম্যাটিনি শো-তে মেট্রো হলে ছবি দেখতে যাওয়ার কথা। অমলার পথ যেন আরও মসৃণ হল।             

বাবা অক্ষয়কুমার নন্দীর সঙ্গে সেই আমলের বহু গুণীজনের ভালো আলাপ ছিল। তাঁদের মধ‍্যে ছিলেন সংগীতবিশারদ বিখ্যাত দিলীপকুমার রায়। অমলার নাচ দেখে প্রশংসা করে জানালেন, এ মেয়ে নাচ করে হৃদয় দিয়ে। ওঁরই উৎসাহে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের বাড়িতে একদিন নাচের আয়োজন করা হল। দেখতে এলেন সুভাষচন্দ্র বসুও। খদ্দরের শাড়ি পরা অমলার নাচ দেখে খুব খুশি সুভাষ। অক্ষয়বাবুকে প্রস্তাব দিলেন আলমোড়ায় উদয়শঙ্করের সেন্টারে অমলাকে পাঠিয়ে দিতে। উদয়শঙ্করের গুণমুগ্ধ ছিলেন সুভাষ, অথচ কেউ কাউকে কোনওদিন দেখেননি। উদয়শঙ্কর সম্পর্কে সুভাষ বলতেন, আই অ্যাম অ্যান আরডেন্ট অ্যাডমায়ারার অফ দিস ম‍্যান। সুভাষ যখন অসুস্থ হয়ে ভিয়েনায় ছিলেন তখন সেখানে উদয়শঙ্করের শো চলছিল। সেই সময় সেখানকার পত্রপত্রিকায় উদয়শঙ্করের কথা তিনি পড়েছিলেন।

সুভাষচন্দ্রের প্রস্তাবে অমলার মন নেচে উঠল। কিন্তু বাধ সাধলেন অক্ষয়বাবু। বিশেষ আমল দিলেন না সেই প্রস্তাবে। লেখালেখিতেই মন দেওয়ার কথা বললেন অমলাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুভাষচন্দ্রের হস্তক্ষেপেই আলমোড়ায় ‘শঙ্কর ইন্ডিয়া কালচার সেন্টার’-এ  অমলার যাওয়া। সময়টা ১৯৩৯। আলমোড়ার শিক্ষাকেন্দ্রে ১৪টি বাংলো ছিল। তখন সেখানে ছিলেন সিমকি, জোহরা মমতাজ, উজরা বেগম। আলমোড়ার অনাবিল প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য আর শিল্পচর্চার আদর্শ ক্ষেত্র অমলাকে নিবিড় করে প্রশিক্ষিত করে তুলল। এক বছর টানা প্রশিক্ষণ চলল নৃত‍্যের সঙ্গে ধৈর্যের, সহ‍্যের, শারীরিক ক্ষমতার, খাঁটি ভারতীয় মেয়ের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা কতটুকু ইত‍্যাদির। সেই সময় একদিন বলেছিলেন, তিনি সাত ঘাটের জল খেয়েছেন, গঙ্গাজলের স্বাদ কী তা তিনি জানেন। মনের মধ‍্যে শ্রদ্ধা আর অনুরাগ নিয়ে প্রশিক্ষণ চলতে লাগল।

সপরিবার – পুত্র আনন্দ, কন্যা মমতা আর স্বামী উদয়শঙ্করের সঙ্গে।

ইতিমধ্যে মনে মনে ভালোলাগা আর ভালোবাসার পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে নিজেদের অজান্তেই। প্রেম তো বলে কয়ে আসে না। উদয় চিঠি লিখলেন অক্ষয়কুমারকে। তিনি রাজি ছিলেন না। কিন্তু আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের মধ‍্যস্থতায় বিয়ে পরিপূর্ণ রূপ পেল ১৯৪২-এ।

১৯৪৮-এ উদয়শঙ্কর পরিচালিত ‘কল্পনা’ ছবিতে উমা চরিত্রে অভিনয় করলেন অমলাশঙ্কর। এর পরে এগিয়ে যাওয়া। কী সাংসারিক ক্ষেত্রে কী কর্মক্ষেত্রে। পুত্র আনন্দ ও কন‍্যা মমতার মা হয়ে গেলেন। পাশাপাশি এক দক্ষ প্রশিক্ষক হয়ে উঠলেন নৃত‍্যশিল্পে। স্বামী উদয়শঙ্করের সৃষ্টি করা কাজকে ফিরিয়ে এনেছিলেন মঞ্চে। সামান্য ক্ষতি, ছায়ানৃত‍্য মহামানব, মেশিনড‍্যান্স, স্নানাম, গ্রামীণ নৃত‍্য, অস্ত্রপূজা, কার্তিকেয়, রামলীলা সহ নানা কৃষ্টি। অমলাশঙ্কর নিজে মঞ্চায়ন করেছিলেন পুত্র আনন্দশঙ্করের সুরপ্রয়োগে সীতা স্বয়ম্ভরা, যুগচন্দ্র। এ ছাড়াও বাসবদত্তা, চিদাম্বরা, চিত্রাঙ্গদা, কালমৃগয়া – সবেতেই শঙ্কর ঘরানার নৃত‍্যকৌশলের উপস্থিতি যা দর্শকদের  মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল। আজও আমরা তার প্রতিচ্ছবি পাই যোগ্য উত্তরসূরিদের নৃত্য পরিবেশনের মধ্যে।

অমলাশঙ্কর নিজে শুধু শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন এক পূর্ণ মা। শিল্পী হয়েও যিনি বহু ছাত্রছাত্রী ও নিজের শাখাপ্রশাখার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন শঙ্কর ঘরানাকে। মঞ্চ ও পোশাকের উৎকর্ষ নিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতেন।১৯৯১-এ পদ্মভূষণে ভূষিত হন অমলাশঙ্কর। ২০১২-তে কান্ ফেস্টিভ‍্যালে আবার  উপস্থিত ছিলেন তিনি। ছেলেবেলাতেও সব চেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে ওই উৎসবে তাঁর উপস্থিতি সেই সময়ে অনেকের নজর কেড়েছিল।

১৯১৯-এর ১৭ জুন যশোরে জন্ম হয়েছিল অমলা নন্দীর। গত মাসেই উদযাপন করেছিলেন নিজের জন্মের ১০১ বছর। তার মাস খানেক পরেই চলে গেলেন চির ঘুমের দেশে। শিল্পীর মৃত্যু নেই। অমলাশঙ্কর বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃজনশীলতার মধ্যে, বেঁচে থাকবেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের মধ‍্যে।

উদয়শঙ্কর ও অমলাশঙ্কর অভিনীত ছবি কল্পনা

Continue Reading
Advertisement
Narendra Modi
দেশ4 hours ago

২০১৫ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিদেশ সফরে খরচ হয়েছে প্রায় ৫১৮ কোটি টাকা

দেশ5 hours ago

অর্থনীতিতে নতুন হাতছানি বাংলাদেশ-ভারত পণ্যবাহী রেল চলাচল

IPL rajasthan Royals
ক্রিকেট5 hours ago

রানের বন্যা শেষে চেন্নাই-জয় রাজস্থান রয়্যালসের

Sherpa Ang Rita
অ্যাডভেঞ্চার7 hours ago

অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই ১০ বার মাউন্ট এভারেস্ট বিজয়ী আং রিটা প্রয়াত

রাজ্য8 hours ago

পর পর তিন দিন দৈনিক মৃতের সংখ্যা ৬০-এর উপরে, তবে ঊর্ধ্বমুখী সুস্থতার হার

Currency
শিল্প-বাণিজ্য9 hours ago

জল জীবন মিশনের আওতায় ৫০ লক্ষ টাকা জেতার সুযোগ দিচ্ছে কেন্দ্র, তবে উৎরাতে হবে আইসিটি গ্র্যান্ড চ্যালেঞ্জে

কেনাকাটা10 hours ago

মহিলাদের পোশাকের পুজোর ১০টি কালেকশন, দাম ৮০০ টাকার মধ্যে

দেশ12 hours ago

এ বার আলু, পেঁয়াজ, চাল, ডাল, ভোজ্য তেল অত্যাবশ্যক পণ্য নয়, বিল পাশ রাজ্যসভায়

দেশ19 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৭৫০৮৩, সুস্থ ১০১৪৬৮

দেশ2 days ago

সোমবার থেকে স্কুল খোলা বাধ্যতামূলক নয়, দেখে নিন কোন রাজ্য কী সিদ্ধান্ত নিল

দেশ3 days ago

ব্যথার কারণ খুঁজতে হল এক্স-রে, বন্দির মলদ্বারে হদিশ মিলল চারটি মোবাইলের

coronavirus west bengal
দেশ18 hours ago

এই প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ কোভিডরোগীর সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়াল

রাজ্য3 days ago

জাতীয় গড়ের তুলনায় রাজ্যে সুস্থতার হার অনেকটাই বেশি, কেন্দ্রের প্রশংসা

mamata banerjee
রাজ্য3 days ago

সোমবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরবঙ্গ সফর স্থগিত

corona
দেশ2 days ago

৫টি রাজ্যেই মোট সক্রিয় কোভিডরোগীর ৬০ শতাংশ!

coronavirus west bengal
রাজ্য2 days ago

রাজ্যের চার জেলার কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ ভাবে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য দফতর

কেনাকাটা

কেনাকাটা10 hours ago

মহিলাদের পোশাকের পুজোর ১০টি কালেকশন, দাম ৮০০ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : পুজো তো এসে গেল। অন্যান্য বছরের মতো না হলেও পুজো তো পুজোই। তাই কিছু হলেও তো নতুন...

কেনাকাটা4 days ago

সংসারের খুঁটিনাটি সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে এই জিনিসগুলির তুলনা নেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিজের ও ঘরের প্রয়োজনে এমন অনেক কিছুই থাকে যেগুলি না থাকলে প্রতি দিনের জীবনে বেশ কিছু সমস্যার...

কেনাকাটা6 days ago

ঘরের জায়গা বাঁচাতে চান? এই জিনিসগুলি খুবই কাজে লাগবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : ঘরের মধ্যে অল্প জায়গায় সব জিনিস অগোছালো হয়ে থাকে। এই নিয়ে বারে বারেই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লেগে...

কেনাকাটা2 weeks ago

রান্নাঘরের জনপ্রিয় কয়েকটি জরুরি সামগ্রী, আপনার কাছেও আছে তো?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরের এমন কিছু সামগ্রী আছে যেগুলি থাকলে কাজ করাও যেমন সহজ হয়ে যায়, তেমন সময়ও অনেক কম খরচ...

কেনাকাটা2 weeks ago

ওজন কমাতে ও রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়াতে গ্রিন টি

খবরঅনলাইন ডেস্ক : ওজন কমাতে, ত্বকের জেল্লা বাড়াতে ও করোনা আবহে যেটি সব থেকে বেশি দরকার সেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা...

কেনাকাটা2 weeks ago

ইউটিউব চ্যানেল করবেন? এই ৮টি সামগ্রী খুবই কাজের

বহু মানুষকে স্বাবলম্বী করতে ইউটিউব খুব বড়ো একটি প্ল্যাটফর্ম।

কেনাকাটা4 weeks ago

ঘর সাজানোর ও ব্যবহারের জন্য সেরামিকের ১৯টি দারুণ আইটেম, দাম সাধ্যের মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘর সাজাতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু তার জন্য বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এ দোকান সে দোকান ঘুরে উপযুক্ত...

কেনাকাটা1 month ago

শোওয়ার ঘরকে আরও আরামদায়ক করবে এই ৮টি সামগ্রী

খবর অনলাইন ডেস্ক : সারা দিনের কাজের পরে ঘুমের জায়গাটা পরিপাটি হলে সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। সুন্দর মনোরম পরিবেশে...

kitchen kitchen
কেনাকাটা1 month ago

রান্নাঘরের এই ৮টি জিনিস কাজ অনেক সহজ করে দেবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজকাল রান্নাঘরের প্রত্যেকটি কাজ সহজ করার জন্য অনেক উন্নত ব্যবস্থা এসে গিয়েছে। তা হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কষ্ট...

care care
কেনাকাটা1 month ago

চুল ও ত্বকের বিশেষ যত্নের জন্য ১০০০ টাকার মধ্যে এই জিনিসগুলি ঘরে রাখা খুবই ভালো

খবরঅনলাইন ডেস্ক : পার্লার গিয়ে ত্বকের যত্ন নেওয়ার সময় অনেকেরই নেই। সেই ক্ষেত্রে বাড়িতে ঘরোয়া পদ্ধতি অনেকেই অবলম্বন করেন। বাড়িতে...

নজরে