representational image
পরমাণু অস্ত্র। প্রতীকী ছবি সৌজন্যে ইউটিউব।
শংকর ঘটক

সূত্রপাত

১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রেড্রিক সডি, যিনি যুগ্ম ভাবে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে লিখলেন, “(তেজস্ক্রিয়তা থেকে উৎপন্ন শক্তি) এই পৃথিবীকে সদা হাস্যময় গার্ডেন অফ ইডেনে পরিণত করবে”। সডির এই উক্তির পর একশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে মানুষের গড় আয়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রাণঘাতী মারাত্মক অনেক রোগের চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়েছে। অনেক রোগব্যাধি চিরতরে নির্মূল হয়েছে। বাসস্থান, যানবাহন, বিনোদন ইত্যাদি সব কিছুরই আমূল বিবর্তন ঘটেছে। সডির স্বপ্ন সফল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, এ রকমটাই এক সময় মনে হচ্ছিল। হবে নাই-বা কেন! একটা পরমাণুর কেন্দ্রে যে এত শক্তি থাকতে পারে সেটা জানা গেল, জানা গেল কিছু কিছু ভারী মৌল নিজে নিজেই ভেঙে যায়, সৃষ্টি করে একাধিক হালকা মৌল, আর তার সঙ্গে সৃষ্টি করে শক্তি। প্রাকৃতিক নিয়মেই এ রকম হয়। প্রায় অফুরন্ত শক্তি এই পৃথিবীকে সরবরাহ করবে অগ্রগতির জ্বালানি।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: লখনউ ও আত্মাভিমানী মীর তকী মীর ও মির্জা গালিব / শেষ পর্ব

এই শক্তি ব্যবহার করতে পারলেই বিশ্বের অন্যতম সমস্যা, শক্তি সমস্যার সমাধান। বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করলেন বিষয়টি নিয়ে। প্রাথমিক উন্মাদনা কাটিয়ে সবে উঠে পড়ে লেগেছেন তাঁরা, বিশ্বে নেমে এল পর পর দু’টি যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-এর ২৮ জুলাই থেকে ১৯১৮-এর ১১ নভেম্বর পর্যন্ত) আর তার বছর কুড়ি পরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-এর ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৪৫-এর ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)। বিজ্ঞানীদের সমস্ত হিসেব গোলমাল হয়ে গেল। সব থেকে বড় বিপদ এল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। গবেষণায় নৈরাজ্য দেখা দিল। হিটলার-নিয়ন্ত্রিত জার্মানি থেকে বিজ্ঞানীদের একটা বিরাট অংশ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন। তাঁদের বড়ো অংশটাই চলে গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: লখনউ ও আত্মাভিমানী মীর তকী মীর ও মির্জা গালিব / প্রথম পর্ব

হিটলারের কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে জার্মান থেকে অ্যামেরিকায় আসা এক দল বিজ্ঞানী বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। জার্মানিতে রয়ে গিয়েছেন বেশ কিছু প্রতিভাবান পরমাণু বিজ্ঞানী। রয়ে গিয়েছেন হাইজেনবার্গ স্বয়ং। বলা যায় না, হিটলারের হাতে যদি কোনো ভাবে পরমাণু অস্ত্র চলে আসে তা হলে মানবসভ্যতার সেখানেই ইতি। হিটলারের নির্যাতনের কাছে হাইজেনবার্গের আত্মসমর্পণ অনিবার্য। সবাই মিলে ভাবনাচিন্তা করে আইনস্টাইনের ওপর ভার দিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের কাছে তথ্যটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ১৯৩৯-এর অক্টোবর মাসে মার্কিন রাষ্ট্রপতি একটি চিঠি পেলেন। লিও জিলার্ডের পরামর্শে চিঠিটি লিখেছিলেন আইনস্টাইন। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল এটাই যে হিটলারের জার্মানিতে এমন অনেক বিজ্ঞানী আছেন যাঁরা অ্যাটম বম বানানোর চেষ্টা করতে সক্ষম। অনেকের বিশ্বাস, এই চিঠি পাওয়ার পরই হিটলার-আতঙ্কে ভোগা রুজভেল্ট ব্রিটেনের সঙ্গে মিলিত ভাবে অ্যাটম বম বানানোর গোপন প্রকল্পটি শুরু করেন। জন্ম নিল পরমাণু অস্ত্র।

একটি সংক্রামক ব্যাধি

১৯৪৫ সালে জার্মানি আত্মসমর্পণ করার পরে উৎপাদিত অ্যাটম বমের ধ্বংসক্ষমতা পরীক্ষা করা হল জাপানে। তখন ধরা যেতে পারে যুদ্ধ শেষই, জাপানের ঠ্যাঁটামোটা বাদ দিলে। ইউরেনিয়াম বম ‘লিটিল্ বয়’ ফেলা হল হিরোসিমায়, প্লুটোনিয়াম বম ‘ফ্যাট ম্যান’ পড়ল নাগাসাকির মাথায়। সমগ্র বিশ্ব প্রত্যক্ষ করল নতুন আবিষ্কৃত মারণাস্ত্রের নৃশংসতম ধ্বংসলীলা। পরীক্ষামূলক মানবসংহার।

Nagasaki after bombing
বোমা পড়ার পরে নাফাসাকি।

এর পর থেকে আজ পর্যন্ত আর অ্যাটম বমের ব্যবহার হয়নি। কিন্তু হুমকি আর পালটা হুমকিতে বিশ্ববাসী ত্রস্ত। অ্যাটম বমের খবরাখবর, যথা পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাবনা, যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ভয়াবহ অবস্থা, সম্পূর্ণ ধ্বংসের পর পৃথিবীতে ফের কবে বাসযোগ্য পরিবেশ ফিরে আসবে, এই সব প্রশ্ন নিয়েই আলোচনা। যুদ্ধ শেষ হলেও উত্তরোত্তর আরও বেশি বেশি উন্নত মানের পরমাণু বোমা বানানোর গবেষণা চলতেই থাকল। সোভিয়েত রাশিয়া পরমাণু শক্তিধর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান হাইড্রোজেন বোমা বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। রাশিয়া তার আগেই এই  সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ১৯৫৪ সালের মধ্যে দু’টো দেশই সাফল্যের সঙ্গে  হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটাল। তার পর এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যেও দ্রুত সংক্রামিত হয়ে গেল। পরমাণু শক্তিধর হওয়াটা জাতীয় রণকৌশলের স্তরে উন্নীত হয়ে গেল। এর অন্তর্নিহিত কারণ, ভীতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর মেকি কৌলীন্যের অভিলাষ। নাৎসি জার্মানির হুংকার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের ইন্ধন (অথবা প্রেরণা)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রধর হওয়াটা হয়ে গেল সোভিয়েতের পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের কারণ। ব্রিটেন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রের ভীতি চিনকে উৎসাহিত করল অস্ত্রনির্মাণে। চিনের ভয়ে ভারতবর্ষ একই পথে হাঁটল। ভারতবর্ষের ভয়েই নাকি পাকিস্তানের অস্ত্র-ভাবনা। ও দিকে মধ্য এশিয়াকে চাপে রাখতে ইজরায়েলের পরমাণু অস্ত্র সংগ্রহ। ইজরায়েল আর মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে ইরান যোগ দিল এই দলে। দক্ষিণ কোরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পশ্চিমের দেশগুলির ভয়ে পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ করল  উত্তর কোরিয়া, এমনই দাবি। এ যেন এক স্বয়ংক্রিয় রাসায়নিক বিক্রিয়া। একবার শুরু হলে আর থামে না। তেজস্ক্রিয় বিক্রিয়ার ধাঁচে।

After Pokhran test
পোখরানে ভারতের পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার পরে।

এই কৌশলের একটা আন্তর্জাতিক নামকরণও হল – মিউচুয়ালি অ্যাসিওরড ডেসট্রাকশন সংক্ষেপে ম্যাড। বিশ্বের সামগ্রিক নিরাপত্তার নামে নিরাপত্তারই ঘোর বিপদ নেমে এল। যারা পরমাণু অস্ত্র নির্মানের জন্য প্রথম কাজ শুরু করেছিল তাদের অনেক বেশি সংখ্যায় পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা করতে হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (মোট পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা – ১০৩০) এবং রাশিয়া (মোট পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা – ৭১৫) উল্লেখযোগ্যে। পরবর্তী সময়ে বাকি যারা পরমাণু অস্ত্র উৎপাদনের কাজে হাত লাগিয়েছিল তাদের কাছে যে আগে থেকেই অনেক তথ্য ছিল তা বোঝা যায় তাদের অস্ত্র পরীক্ষার সংখ্যা দেখলে। সেই সব দেশের মোট পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার (ফ্রান্স – ৩০০; চিন – ৪৫; ব্রিটেন – ৪৫; পাকিস্তান – ২; ভারতবর্ষ – ৩; উত্তর কোরিয়া ৬) সংখ্যা বন্ধু রাষ্ট্রের সাহায্যের ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমানে মোট ৯টি রাষ্ট্রের হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে।

আধুনিক বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র

২০১৮-এর মার্চে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে আধুনিক বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রসম্ভারের একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যে হেতু বিষয়টি সমস্ত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই স্পর্শকাতর আর গোপনীয়, সঠিক পরিসংখ্যান এ ক্ষেত্রে সুলভ নয়। কিন্তু বিভিন্ন অপ্রত্যক্ষ তথ্যভিত্তিক এই জাতীয় পরিসংখ্যানকেই নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়ে থাকে। আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন এবং ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েনটিস্টস-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমান বিশ্বে আনুমানিক সাড়ে ১৪ হাজার পরমাণু মজুত আছে। রাষ্ট্র অনুসারে ভাগাভাগিটা এ রকম : রাশিয়া – ৬৮০০, আমেরিকা – ৬৫৫০, ফ্রান্স – ৩০০, চিন – ২৭০, ব্রিটেন – ২১৫, পাকিস্তান – ১৩০-১৪০,  ইজরায়েল – ৪০, ভারত – ১২০-১৩০, উত্তর কোরিয়া – ১০-২০। এ বারে ভাবা যাক খরচের বিষয়ে।

‘ইউনিয়ন অব কনসার্ন্‌ড সায়েনটিস্ট’ বোমার খরচের হিসেব কষেছিল। খুব কৃপণের মতো হিসেব করলেও ৩০০০টি অস্ত্রের জন্য খরচটা দাঁড়িয়েছিল ২৫০ বিলিয়ন তথা ২৫ হাজার কোটি ডলার।

অতি গোপনীয় প্রতিরক্ষার অন্তর্গত বলে খরচের তথ্য সংগ্রহ সহজসাধ্য নয়। কিছু গবেষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বেশ কিছু তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। এ ছাড়াও আরও অনেক সমীক্ষা আছে, যেখান থেকে জানা যায় যে ১৯৪০ থেকে ১৯৯৬-এর মধ্যে পরমাণু অস্ত্র খাতে মার্কিন সরকারের ন্যূনতম খরচ সাড়ে ৫.৫ ট্রিলিয়ন তথা ৫৫০০০০ কোটি ডলার। এর সঙ্গে যোগ হবে ভবিষ্যতের খরচ আরও ৩২০ বিলিয়ন তথা ৩২০০০ কোটি ডলার। এখানেই শেষ নয়, বিগত পাঁচ দশকের জমে থাকা নিউক্লিয়ার আবর্জনা সাফ করা, পড়ে থাকা অকেজো অস্ত্রগুলোর নির্বীর্যকরণ ইত্যাদি হাজারো কাজের জন্য প্রয়োজন আরও ২০ বিলিয়ন তথা ২০০০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে খরচের অঙ্ক ৫.৮ ট্রিলিয়ন তথা ৫৮০০০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এটা ছিল একটি মাত্র দেশের হিসেব। বিশ্বের অন্য সব অস্ত্রধারী দেশ ধরলে খরচটা কোথায় গিয়ে পৌঁছোবে ভাবতেও ভয় হয়।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যৎ বিশ্ব

খরচের কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বোমা বানালেই কাজ শেষ হয় না। সেটা বহন করে নিয়ে গিয়ে অন্য দেশে ফেলতে হবে। তার খরচও গগনচুম্বী। আছে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, আর আছে নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার বিশাল অঙ্কের খরচ। এক বার এক প্রশ্নের উত্তরে ‘ইউনিয়ন অব কনসার্ন্‌ড সায়েনটিস্ট’ নামে একটি সংগঠন বোমার খরচের হিসেব কষেছিল। খুবই আকর্ষণীয় ছিল সেই হিসেব। খুব কৃপণের মতো হিসেব করলেও ৩০০০টি অস্ত্রের জন্য খরচটা দাঁড়িয়েছিল ২৫০ বিলিয়ন তথা ২৫ হাজার কোটি ডলার। (চলবে)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here