রবিবারের পড়া: সবার উপরে মানুষ সত্য

স্মরণ করুন বড়ু চণ্ডীদাস ও তাঁর সর্ববিদিত এবং চিরন্তনী মানবিক বাণী, ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’।

0
sakhina got sheltar
সন্তানদের নিয়ে সখিনা আশ্রয় পেল রায়চৌধুরী পরিবারে।

জাহির রায়হান

‘ও সকিনা আর কেঁদো না, ফেলো না তুমি চোখের পানি’ – বাংলা এই গজলখানি প্রায়শই শোনা যায় পথেপ্রান্তরে, গাঁয়েগঞ্জে, বিশেষত জেলা মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে যখন ইসলামিক জলসা বা ধর্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়, শোনা যায়। পথচলিত আমিও শুনেছি বহুবার, বহুলগ্নে। বন্ধু সাংবাদিকের সখিনা-কে নিয়ে পরিবেশিত প্রতিবেদনটি পড়ার সময় মনে উঁকি দিল গজলটি, সাতসকালে। জলঙ্গির এক সাধারণ গৃহবধূ সখিনা। এক পুত্র ও এক কন্যাসন্তানের মা। সন্তানসহ প্রায় এক কাপড়ে তাকে বাড়িছাড়া করেছে তার স্বামী। ক্ষুধার্ত দুই শিশুকে নিয়ে খোলা আকাশের নীচে ঠাঁই হয়েছে সখিনার। প্রগতিবাদী যুক্তিবাদী অথবা ধর্মের ধ্বজ্জাধারী ভগবানের সাক্ষাৎ বরপুত্র, কারও চোখে পড়েনি পথে পথে ঘোরা অসহায় গৃহবধূর নিদারুণ দুর্দশা। তবে পয়গম্বর হিসেবে ‘সখিনা’র চোখের জল মোছাতে আবির্ভূত হয়ে তাকে সন্তানসহ ঘরে তুলেছেন হরিহরপাড়ার মানবধর্মী সুভাষ রায়চৌধুরী ও তাঁর কন্যা কাকলি। ‘সখিনা’ ঘর পেয়েছে, বিদ্যালয় পেয়েছে তার অবোধ শিশুসন্তান দু’টি। মানবতার এই উজ্জ্বল আধারটি অবয়ব পেয়েছে আজ থেকে প্রায় সাত মাস পূর্বে। আর ওই একই সময় ধরে সমাজপতিদের অমানবিক আচরণের শিকার হয়ে চলেছে রায়চৌধুরী পরিবার। সামান্য যজমানি করে সংসার নির্বাহ করতেন সুভাষবাবু। তাঁর সেই রুজিরুটির কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে মাতব্বরদের ফতোয়ায়, ধোপা-নাপিত বন্ধ, প্রায় একঘরে এখন রায়চৌধুরী পরিবার, আশ্রয়হীন ভিন্নধর্মী ‘সখিনা’ ও তার কোলের শিশুদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান / পর্ব ১

রায়চৌধুরী পরিবার মাথা নত করেনি, তাঁদের সেলাম জানাই। সুভাষবাবুর স্ত্রী ইলা দেবী মুক্ত কন্ঠে সরবে প্রশ্ন তুলেছেন, “আমরা তো এর মধ্যে কোনো অন্যায় দেখিনি। দু’টো বাচ্চা ছেলেমেয়েকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় বেড়ানো অসহায় একটি মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছি, ধর্ম কি তার চেয়েও বড়?” না মা, আপনার বিশ্বাস এবং কর্তব্যজ্ঞানের কাছে ধর্ম নিতান্তই শিশু। আপনার পরিবারের যে উচিত কাজের দরুন গ্রামবাসীদের গর্বিত হওয়ার সুযোগ ছিল, কতিপয় লোকের মূর্খামির জন্য এই অতীব লজ্জার প্রতিবেদনটি পড়ে করতে হচ্ছে হাহাকার। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে ঈশ্বর যদি কেউ থেকে থাকেন তা হলে তাঁর সৃষ্ট একমাত্র ধর্ম হল মানবতা এবং সেটাই পৃথিবীর আদি ও অনন্ত ধর্মবিশ্বাস। মানবতা ছাড়া যে ধর্মবিশ্বাস এবং তার অপব্যাখ্যা নিয়ে এত দাঙ্গাহাঙ্গামা তা আদতে মনুষ্যসৃষ্ট যা মানুষের সুকুমারবোধকে গুলিয়ে জান্তব প্রবৃত্তিকে ইন্ধন দিচ্ছে প্রতিনিয়ত, সৃষ্টি করছে ভেদাভেদ মানুষে-মানুষে।

আমার ছোটোমাসি মম মূলত হিন্দু ব্রাহ্মণবাড়িতে মানুষ। মামাবাড়ির উলটো দিকেই বাস সম্ভ্রান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের। বাড়ির কর্তা উমাপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় কান্দী কোর্টের উকিল, অবসরে আবার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন যৎসামান্য দক্ষিণার বিনিময়ে। ছোটোমাসিকে তাঁরা খুবই স্নেহ করতেন, দিনে প্রায় বার দশেক হাঁক দিতেন বাড়ির গিন্নিমা ‘মম’, ‘মম’ করে। ছোটোমাসিকে চোখে হারাতেন তাঁরা, তাঁদের বাড়িতে ছোটোমাসির ছিল অবারিত দ্বার, সেই সুযোগে আমরাও ঢুকে পড়তাম ওই বাড়িতে, নানান গাছগাছালি ঘেরা বড়ো বাড়িটিতে আমটা, জামটা খাওয়ার লোভ তো ছিলই। শুধু তাই-ই নয়, মামাবাড়ির সামনে রাস্তার পাশেই রয়েছে মসজিদ। ছোটো থেকেই দেখে আসছি, রাস্তাচলতি সিনেমা বা অন্য কোনো মাইকিং বা তাসাপার্টি মসজিদ আসার অনেক আগেই বন্ধ করে দেয় মাইক বা বাজনা, মসজিদ পার করে আবার শুরু করে তাদের কাজ। কালীবাড়ি থেকে বিয়ে করে আসা নবদম্পতিকে সেলাম ঠুকতেও দেখেছি মসজিদের দরজায়। তাদের দিয়ে যাওয়া কয়েনের বিনিময়েই তো কিনতাম ঘুড়ি-লাটাই বা লজেন্স-আচার।

আমি নিজেও বহু হিন্দু পরিবারের সাথে মেলামেশা করেছি, এখনও করি, কই কেউ তো আমায় দুর ছাই করেনি। আবার এই মেলামেশায় দুই তরফের জাত চলে যাচ্ছে, এমন কোনো প্রমাণ বা খবর তো এখনও পর্যন্ত পাইনি। হরিহরপাড়ার চোঁয়া গ্রামের রায়চৌধুরী পরিবার যেটা করছেন সেটাই তো প্রকৃত ধর্ম, এই ধর্মের কথা শুনলে আপনা হতেই তো চোখে জল আসে। নবাবি জেলা মুর্শিদাবাদে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মিল মহব্বত ও সম্প্রীতির অনেক উদাহরণই লিপিবদ্ধ রয়েছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন, একসঙ্গে রোজা রাখা ও ইফতার করা, এ তো এই রাজ্যেরই গৌরবগাথা। অসহিষ্ণু ভারতের নিরিখে মুর্শিদাবাদ তথা পশ্চিমবঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলি আদতে তো সভ্য সমাজের জলছবি। মানুষ আছে বলেই না ধর্ম আছে। আজ যদি মানুষই ধর্মীয় রোষের শিকার হয়, তা হলে ধর্মের জায়গাও তো হবে না কোথাও।

সারা ভারত জুড়ে যখন ছড়িয়ে পড়ছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প, তখন আলোর পথ দেখাল তো এই পশ্চিমবঙ্গেরই মানুষ, মাত্র দিন কয়েক আগে। এক হিন্দু প্রতিবেশীর মরদেহ সৎকার করতে মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে এগিয়ে এল এলাকার মুসলিমরা। মুর্শিদাবাদ জেলার সুতির মোমিনপাড়া নামক গ্রামে মাত্র দু’ঘর হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাস করেন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বছর পঁয়তাল্লিশের গণেশ রবিদাস। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে মৃতদেহ সৎকারের আয়োজন করা অসম্ভব। এগিয়ে এলেন গাঁয়ের মসজিদের ইমাম নুরুল ইসলাম সাহেব। তাঁর নির্দেশে জাকির-মজিদরা কাঁধে তুলে নিলেন মরদেহ, সঙ্গী হলেন হিন্দু প্রতিবেশীর অন্তিমযাত্রায়। কেউ বাঁশের জোগান দিলেন, খই ছিটালেন কেউ, কেউ আবার এক ছুটে ঘাটকাজের জন্য কিনে আনলেন নতুন কাপড়। ‘বলো হরি, হরি বোল’ ধ্বনির পাশাপাশি শোভাযাত্রায় উচ্চারিত হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। কই খোদা বা ভগবান এ ঘটনায় মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে আজাব বর্ষণ করেছেন, এমন কোনো খবর তো পাওয়া যাচ্ছে না এখনও। বরং সে দিনই ওই গ্রামে হয়তো-বা পাশাপাশি বসে দুই সৃষ্টিকর্তা লক্ষ করে গিয়েছেন মানবতার উজ্বল দৃষ্টান্ত। সাধুবাদ প্রাপ্য গ্রামবাসীদের। তাঁরা প্রমাণ করেছেন সহিষ্ণুতাই পরম ধর্ম, শুধু কথায় নয়, কাজেও।

তবে এ ঘটনা রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম নয়, এর আগেও এমন ঘটনার সাক্ষী থেকেছি আমরা। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা পুরসভার ১২ নং ওয়ার্ডের ভেরবাজার এলাকার কিশোর রাজু দলুই বেপরোয়া ট্রাক্টরের ধাক্কায় প্রাণ হারায়। পেশায় রাজমিস্ত্রি রূপা দলুই ও পরিচারিকা অর্চনা দলুই-এর একমাত্র সন্তান ছিল সে। ঘটনার খবর পেতেই চন্দ্রকোনা গ্রামীণ হাসপাতালে ঝাঁপিয়ে পড়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল গ্রামবাসী। আকস্মিক এই দুর্ঘনায় গোটা গ্রাম জুড়ে নেমে আসে শোকের আবহ। গ্রামে হিন্দু বলতে শুধুমাত্র দলুই পরিবার। আর্থিক অনটনের কথা মাথায় রেখে নানা ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল মুসলিম প্রতিবেশীরা। কাঠ কাটা থেকে শুরু করে দুপুরের আহারের বন্দোবস্ত, মৃতের পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া ও মৃতদেহ কাঁধে করে শ্মশান নিয়ে গিয়ে প্রথামাফিক দাহ করার ক্ষেত্রে সমস্ত রকম আয়োজন করেছিল মুসলিম প্রতিবেশীরা। জাতপাত দূরে ঠেলে গ্রামের মানুষ প্রমাণ করেছিল এটাই এ রাজ্যের আসল সংস্কৃতি। মানবতা রক্ষাকারী পরিবারকে বয়কট বা সমাজচ্যুত করার প্রচেষ্টা আমাদের ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সংগীতজ্ঞান / শেষ পর্ব

দেশের প্রায় সর্বত্রই যখন ধর্ম নিয়ে লড়াই চলছে, তখন একটা মোমিনপাড়া বা চন্দ্রকোণা অথবা হরিহরপাড়ার চোঁয়া গ্রাম হয়ে উঠেছে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির সর্বশেষ উজ্জ্বলতর নজির। একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের। প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে আমাদের ঘরও যে সুরক্ষিত নয় সে বোধ আমাদের চিন্তাভাবনায় আসা উচিত। সখিনার প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বহু সাধারণ মানুষ সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সখিনা ও রায়চৌধুরী পরিবারের প্রতি। এগিয়ে এসেছে প্রশাসনও। শঙ্কা কেটেছে, স্বস্তি ফিরেছে পরিবারের সদস্যদের মনে। তবে তা বুঝি যথেষ্ট নয়, এখনও হয়তো বহু স্থানেই আমাদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হয়ে চলেছে মানবতা। তাকে রক্ষা করার কাজে পথে নামুন, স্মরণ করুন বড়ু চণ্ডীদাস ও তাঁর সর্ববিদিত এবং চিরন্তনী মানবিক বাণী, ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here