রবিবারের পড়া: মকবরা… সাদত আলী খান এবং মুশিরজাদী মকবরা / শেষ পর্ব

0
mushirzadi maqbara
মুশিরজাদী মকবরা।
অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়

কথিত আছে সম্রাট জাহাঙ্গীর একটি প্রাসাদের প্রতিষ্ঠাকালে তার গায়ে খোদাই করার উদ্দেশ্যে তাঁর দরবারের ইরানি কবি নজবীরী ন্যাসাপুরীকে (মৃত্যু ১৬১২) একটি কবিতা লিখতে আদেশ করেন। কবি লিখেছিলেন-   

অয় খাক-ই-দরৎ স্বন্দল-ই-সরগুশত সরান রা

বাদা মজহ জারুব-ই-রহৎ তাজবরান রা ।।

(হে খুদা বা বাদশাহ) তোমার দ্বারের ধুলি পার্থিব লোকদের নিকট চন্দনরূপে গৃহীত হোক। (আর) রাজা-বাদশাহদের চক্ষের পাতা তোমার পথের ঝাঁটা স্বরূপ হোক।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: মকবরা… সাদত আলী খান এবং মুশিরজাদী মকবরা / প্রথম পর্ব

লখনউয়ের নবাবেরা তাঁদের মকবরাগুলো ওই ইরানি কবির মানসিকতাতেই নির্মাণ করেছিলেন।  নবাবেরা চেয়েছিলেন তাঁরা বেঁচে থাকবেন কখনও প্রেমে, কখনও গানে, কখনও প্রাসাদের মোরামপথে, কখনও ক্যানভাসে-তুলিতে, কখনও কাগজ-রঙে, কখনও দিনের রোদে, কখনও রাতের জ্যোৎস্নায়, নিমগ্ন চেতনে, উলঙ্গ অবচেতনে মকবরার ছেনিতে-হাতুড়িতে।

ইনসান কি খোয়াইশ কি কোই ইন্তেহাঁ নহি

দো গজ জমিন চাহিয়ে, দো গজ কফন কে বাদ।

মানুষের আত্মার স্বাক্ষর পড়ে সার্থক শিল্পে। তুলির বর্ণবিন্যাসে, কালির আঁচড়ে বা সুরের সার্থক সৃষ্টিতে শিল্পী যে ইন্দ্রলোকের প্রতিষ্ঠা করেন তাই হয়ে ওঠে রিয়ালিটিমুখী। লখনউয়ের নবাবেরা তাঁদের বাইরের জীবনের আমোদপ্রমোদের প্রয়োজনে, বহিরঙ্গের তৃপ্তিসাধনে অথবা নিজেদের চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে আর্টকে ব্যবহার করেছিলেন যৌবনের রঙিন আলোর রংবাহারে কিন্তু মকবরায় তাঁরা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন বার্ধক্যের সায়াহ্নের ম্লান আলো। যে নবাবেরা যৌবনে চাঁদের আলোয় মুগ্ধ হয়েছিলেন সখীর সাহচর্যে, তাঁরাই আবার মকবরায় চাঁদের আলোর প্রবেশপথ করেছিলেন রুদ্ধ।

মুঘল পরবর্তী সময়কালে স্থাপত্যের পরিভাষায় সাদত আলী খান এবং খুরশীদ জাদী বা মুশিরজাদীর সমাধিসৌধ দু’টি লখনউয়ের অন্যতম ক্ল্যাসিকাল স্থাপত্যের উদাহরণ। বর্তমানে যেখানে এই সমাধিসৌধ দু’টি দাঁড়িয়ে আছে, অতীতে সেখানে একটি প্রাসাদের অবস্থান ছিল। নবাব সাদত আলী খানের পুত্র ও লখনউয়ের সপ্তম নবাব গাজীউদ্দিন হায়দর ওই প্রাসাদটি ধ্বংস করে সেই ধ্বংসস্তূপের উপরই এই সমাধিসৌধ দু’টি নির্মাণ করেছিলেন।

১৮১৪ সালে নবাব সাদত আলী খানের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র গাজীউদ্দিন হায়দর রাজগদিতে বসেন। কাইজারবাগের ভিতর ওই প্রাসাদে যুবরাজ গাজীউদ্দিন হায়দর বাস করতেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি নবাবের মহলে চলে গেলে ওই প্রাসাদটিকে ভেঙে কাইজারবাগের ভিতর সাদত আলী খান এবং তাঁর বেগম খুরশীদ জাদী অথবা মুশিরজাদী মকবরা নির্মাণ করা করেছিলেন নবাব গাজীউদ্দিন হায়দর। 

সাদত আলী খানের ত্রিতল সমাধিসৌধটিতে ভূগর্ভস্থ একটি তল নির্মাণ করা হয়েছিল। কক্ষযুক্ত ওই ভূগর্ভস্থ তলটির সাথে প্রথম তলের মধ্যে একটি সোপানশ্রেণি নির্মাণ করা হয়। সাদত আলী খানের সমাধিসৌধটিতে প্রথম তলটিকেই অট্টালিকার সর্বনিম্ন তল বা গ্রাউন্ড ফ্লোর হিসাবেই ধরা হয় এবং এই তলটির কেন্দ্রীয় অংশে একটি বৃহদায়তন অলংকৃত অষ্টকোণাকৃতি কক্ষের অবস্থান লক্ষ করা যায়। অট্টালিকার সর্বনিম্ন তলটির মেঝেতে সাদা কালো পাথর দিয়ে দাবা খেলার ছকের মতো ডিজাইন করা হয়েছিল।

নবাব সাদত আলী খানের কবরটি অট্টালিকার ভূগর্ভস্থ তলটিতে অবস্থান করছে। ভূগর্ভস্থ তলটিতে নবাব সাদত আলী খানের কবরটি ব্যতীত অপর একটি কবর দেখা যায়, সেটি নবাবের ভাইয়ের। ভূগর্ভস্থ তলটিতে নবাবের কবরের পিছনে একটি দালান দেখতে পাওয়া যায়,  সেখানে নবাবের তিন বেগমের কবরগুলো নির্মিত হয়েছে এবং দালানের পূর্ব দিকের কবরগুলো নবাবের তিন কন্যার।

খিলান ছাদবিশিষ্ট ভূগর্ভস্থ তলটিতে সূচ্যগ্র খিলানের প্রয়োগ দেখা যায়। সমাধিসৌধের প্রথম তলটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে – দুই পার্শ্বে অষ্টকোণাকৃতি চাঁদনি বারান্দা বা পোর্টিকোর প্রয়োগ। পোর্টিকোগুলোতে পত্রালংকার শোভিত ত্রিখিলানযুক্ত তোরণ ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রথম তলটির কেন্দ্রীয় কক্ষের কার্ডিনাল বিন্দুতে চারটি আয়তাকার কক্ষের অবস্থান লক্ষ করা যায় এবং কক্ষগুলোর অন্ত আচ্ছাদনটি কতগুলো খিলানের উপর নির্মিত।

প্রথম তলের কেন্দ্রীয় কক্ষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অলিন্দের চারটি কোণে চারটি সর্পিল বা স্পাইরাল সোপানশ্রেণি নির্মাণ করা হয়েছে উপরের তলে যাওয়ার জন্য। এই সোপানশ্রেণিগুলো দিয়ে উঠে যাওয়া যায় উপরের তলে, পৌঁছে যাওয়া যায় নি:সঙ্গ, একাকী খিলানাকৃতি একটি চলাচল-পথে। 

উপরের তলে নির্মিত চলাচল-পথটি,  কেন্দ্রীয় খিলানছাদকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে এবং অবশেষে অট্টালিকার একটি সমতল ছাদ বা চত্বরে গিয়ে উন্মুক্ত হয়েছে। সমাধিসৌধের এই সমতল ছাদ বা চত্বরের ছাদপ্রাচীর বা পার‍্যাপেটটিতে ঝালরের মতো নির্মাণ চোখে পড়ে।

প্রথম তলের চারটি কোণে ভার বহন করার জন্য চতুষ্কোণ আকারের এবং দ্বিতল উচ্চতার বুরুজ নির্মাণ করা হয়েছে। দুর্গপ্রাচীরের বহির্গত অংশের ন্যায় আকারের বুরুজগুলোর উপরে অষ্টকোণাকৃতি ছত্রী দেখা যায়। বুরুজের উপর নির্মিত ছত্রীগুলোর নির্মানশৈলীর মধ্যে মুঘল পরবর্তী স্থাপত্যশৈলী, বিশেষ করে রাজপুতশৈলীর প্রভাব দেখা যায়। 

সাদত আলী খান মকবরার কেন্দ্রীয় গম্বুজটির উচ্চতা নজরকাড়া এবং গম্বুজটিতে উলটানো পদ্মপাতার অলংকরণযুক্ত শীর্ষদণ্ড চোখে পড়ে। সৌধ্যের সম্মুখভাগটি স্টাকোর অলংকরণে সমৃদ্ধ। মকবরার অভ্যন্তরীণ অলংকরণগুলোর সাদা ভিত্তিভূমির উপর গাঢ় নীল এবং পিঙ্গল লোহিত (মেরুন) রঙের অলঙ্করণ চোখে পড়ে।

সাদত আলী খানের মকবরার পূর্ব দিকে একই চত্বরে খুরশীদ জাদী বা মুশিরজাদী মকবরাটি অবস্থিত। সাদত আলী খান মকবরার মতো প্রথম তলটিকেই অট্টালিকার সর্বনিম্ন তল বা গ্রাউন্ড ফ্লোর হিসাবেই ধরা হয়েছে এবং এর প্রবেশপথটি আয়তাকার।

মুশিরজাদী মকবরাটির ভূগর্ভস্থ কক্ষে দু’টি কবর দেখা যায়, একটি বেগম খুরশীদ জাদী বা মুশিরজাদীর এবং অপরটি তাঁর কন্যার।

ইমারতের কোণায় নির্মিত দ্বিতলাকৃতি বুরুজগুলোতে খিলানাকৃতির বাহিরপথ যুক্ত হয়েছে। বুরুজগুলোর ভিতরে নির্মিত সোপানশ্রেণি দিয়ে মকবরার দ্বিতলে পৌঁছোনো যায়।




সাদত আলী খান মকবরার পূর্ব দিকে একই চত্বরে মুশিরজাদী মকবরা

ইমারতের দ্বিতলটিতে অষ্টকোণাকৃতি কক্ষ দেখতে পাওয়া যায় এবং এখানেই কবরের সোন্দউখ বা সেনোটাফ নির্মিত হয়েছে। মকবরার ত্রিতলটিতে একটি প্রশস্ত সমতল ছাদ বা চত্বর যুক্ত হয়েছে। সমাধিসৌধটির কেন্দ্রীয় কক্ষটির খিলানাকৃতি ছাদের বাইরের আকারটিই সৌধ্যের গম্বুজের আকার নিয়েছে এবং গম্বুজটির গাত্র পলকাটা ও শীর্ষে পদ্ম পাতার অলংকরণসমৃদ্ধ শীর্ষদণ্ড যুক্ত করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় কক্ষের ত্রিখিলানযুক্ত খিলানগুলোর পার্শ্বে একটি সরু সোপানশ্রেণি নজরে পড়ে, উঠে যাওয়া যায় ইমারতের ত্রিতলে। সমাধিসৌধের ত্রিতলের বাইরের গাত্রে অনেকগুলো ক্ষুদ্র বুরুজ বা টারেট নির্মিত হয়েছে। ত্রিতলে নির্মিত দ্বিতল উচ্চতার বুরুজ গুলোতে খিলানাকৃতির প্রবেশপথ যুক্ত হয়েছে এবং ত্রিতলের কোণায় অষ্টকোণাকৃতি ছত্রী চোখে পড়ে।

নবাব সাদত আলী খানের মকবরার মধ্যে পুরুষালি সৌন্দর্য্যের যেমন পরিস্ফুরণ ঘটেছে, তেমনই খুরশীদ জাদী বা মুশিরজাদী মকবরার মধ্যে ফুটে উঠেছে নারীসুলভ কোমলতা।

ঔপন্যাসিক, কবি, চলচ্চিত্রকার, কলা সমালোচক পাসোলিনি বলেছিলেন, সভ্যতা ও সংস্কৃতি কখনও কখনও মানুষের চেতনার স্তরে, অনুভূতির জগতে এমন তীব্র আলোড়ন তোলে যেন মনে হয় প্রাকৃতিক ঘটনা। ঘটাচ্ছে প্রকৃতিই। তার পর ওই অনুভূতির আদলেই গড়ে ওঠে একজনের মানসপ্রকৃতি। সেটা একবার গড়ে উঠলে বদলানো শক্ত। সেখানে বিবর্তন ঘটতে পারে। কিন্তু মূল শিকড়টা রয়ে যায় অনেক গভীরে।

লখনউয়ের স্থাপত্য,  ভারতীয় স্থাপত্যকলার সেই অনুভূতি যার শিকড় ছিল অনেক মুলে,  শুধু বিবর্তনটাই ঘটেছিল। চিত্রকর ছবি আঁকা শেষ হলেই যেমন বুঝতে পারেন কেমন হল ছবিটা,  লেখক লেখা শেষ হলেই যেমন বুঝতে পারেন কেমন হল লেখাটা, অনেকটা সেই রকম। আসল হল হৃদয়ের কান্না, রক্তের ভিতর সৃষ্টির কোলাহল বা কান্না।

ডাকঘরের অমলের মতো লখনউয়ের ছোটো ঘরের চৌহদ্দিতে বন্দি,  নবাবেরা সামনের খোলা জানালার ধারে বসে পৃথিবীটাকে কাছে পাওয়ার চেষ্টাতেই ছুটে বেড়িয়েছেন প্রতি মুহূর্তে। তাঁরা হয়েছেন অধীর ও স্পন্দিত। পৃথিবীকে সে যেন বলতে চেয়েছে, জানো তোমাদের স্থাপত্যের পরীক্ষায় আমি কোনো দিন দ্বিতীয় হইনি… আবার তোমরা আমাকে কোনোদিন প্রথমও বলোনি। (শেষ)

ছবি: লেখক

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here