Connect with us

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: মকবরা… সাদত আলী খান এবং মুশিরজাদী মকবরা / প্রথম পর্ব

maqbara saadat ali khan
avijit chatterjee

অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়

মৃত্যু জাগতিক জীবনের পরিসমাপ্তি টানলেও ইসলামিক সমাজে মৃত্যুকে পারলৌকিক জীবনের শুরু বলে মনে করা হয়। সমাধিসৌধ্যের বাস্তব অস্তিত্ব ইসলামিক ধর্মালম্বীদের সদাসর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পরকালের মহাযাত্রার প্রস্তুতির জন্য সর্বদা একটা তাগিদ সৃষ্টি করে। এ ছাড়াও সমাধিসৌধ ব্যক্তিবিশেষের জাগতিক জীবনের কৃতিত্বের গৌরবময় স্মারক হিসাবেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কবরের উপরে সৌধনির্মাণ সম্পর্কে পবিত্র হাদিসে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কবরের উপরে সমাধিসৌধকে নিরুৎসাহিত করা হলেও বাস্তবক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা মানা হয়নি।

মধ্য ভারতের প্রাক-সুলতানি মুসলিম শাসকরাও সমাধিসৌধ্য নির্মাণের নিষেধাজ্ঞায় গুরুত্ব না দিয়ে এই শ্রেণির ইমারত নির্মাণে উৎসাহিত হয়েছিলেন। ফলে মুসলিম শাসনকালে ভারতবর্ষে স্থাপত্যের ইতিহাসে, সমাধিসৌধ বা মকবরা নির্মাণে এক নব্য যুগের সূচনা হয়েছিল, যার সফল ও গৌরবময় পরিণতি হল আগ্রার তাজমহল, যা বিশ্বের ত্রুটিহীন, নির্ভুল সমাধিসৌধ বলেই চিহ্নিত হয়েছে।

বর্তমান তুরস্কের বদরুম জেলায় অবস্থিত হ্যালিকারনাসুসের (Halicarnasus) সমাধি সৌধটিকেই বিশ্বের প্রাচীনতম সমাধিস্তম্ভ হিসাবে গণ্য করা হয়। ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ গ্রিক রানি আর্টেমিসিয়া (Artemisia) তাঁর প্রয়াত স্বামী রাজা মউসলুসের (Mausolus) স্মরণে হ্যালিকারনাসুসের সমাধিসৌধটি নির্মাণ করেছিলেন এবং সৌধটির নকশা করেছিলেন পাইথিয়াস (Pythius)। প্রথম যুগে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে মকবরার ভূমি-নকশাগুলো পারস্যরীতি মেনেই নির্মিত হয়েছিল।

mausoleum at Halicarnasus

হ্যালিকারনাসুসে সমাধিসৌধের বর্তমান অবস্থা।

পারস্যরীতির মকবরাগুলো ছিল বৃত্তকেন্দ্রিক (নয়টি বৃত্তের কাল্পনিক কৌণিক কোণের মিলিত যোগফলের জ্যামিতিক বিদ্যার উপর নির্ভরশীল)। পরবর্তী সময়ে মকবরায় গম্বুজ নির্মাণ ছিল ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য। হিন্দু শৈলীর রেখদেউলের প্রভাবও দেখা গিয়েছিল মকবরার স্থাপত্যশৈলীতে।

ইসলামিক স্থাপত্যে শীর্ষদণ্ড হিসাবে আমলকের ব্যবহার যেমন হয়েছে, তেমনই মৃত ব্যক্তির তৃষ্ণার্ত আত্মার জলপানের জন্য মকবরাতে কলসের ব্যবহারও দেখা যায়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে নাবাতীয় আরবদের মকবরাতে জলপাত্র বা কলসের নকশা খোদিত হত বলে জানা যায়। শীর্ষদণ্ড হিসাবে কলসের ব্যবহার ভারতীয় মন্দিরের চূড়াতেও দেখা যায়। দেবতাদের পানীয়রসের পাত্রের প্রতীক হিসাবে ভারতীয় মন্দিরগুলোতে অনুরূপ কীর্তির সংযোজন হয়েছিল বলেই মনে করা হয়।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অস্ত্রময়/ প্রথম পর্ব

তবে সৌন্দর্য্যের খাতিরে ইসলামিক স্থাপত্যে কলস প্রতীক সংবলিত শীর্ষদণ্ডের ব্যবহার ভারতীয় মন্দির থেকে অনুকৃত হলেও হিন্দুধর্মের প্রতীকী ব্যঞ্জনার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি ইসলামিক মকবরা নির্মাণশৈলীতে। মুঘল যুগের সম্রাটরা মৃত্যুকে দেখেছিলেন জীবনের একটি পর্যায় হিসাবেই। তাঁরা সংগীতের আনন্দই হোক, কামলালসার জীবনসুধাই হোক অথবা প্রেমের পরিস্ফুরণ হোক, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে স্থাপত্যের আঙ্গিকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। চিত্রকলা, কাব্য, সাহিত্যজীবনের প্রতিটি রসের প্রতিলিপি মূর্ত করেছিলেন স্থাপত্যের ভাষায়। তা হলে জীবনের যে অনিবার্য পরিণতি, সেই মৃত্যুই বা বাদ থাকে কেন! জীবনের এই আবশ্যিক ঘটনাকে তাঁরা রূপ দিয়েছিলেন মকবরার আঙ্গিকে।

মানুষের মৌল অন্তর্দৃষ্টির সূত্রপাত হয় তখনই যখন মনের বিভিন্ন কক্ষে সঞ্চিত ভাবনার টুকরোগুলো সজ্ঞান চেতনায় যুথবদ্ধ হয়, পরস্পরের সঙ্গে যোগের ও বিয়োগের মাধ্যমে নব নব রূপ লাভ করে। অওধের নবাবেরাও বাদ যাননি ওই একই দর্শন থেকে। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে অওধের নবাবেরা এবং মুঘল যুগের সম্রাটেরা একই বন্ধনীযুক্ত ছিলেন। শিয়া ধর্মীয় নবাবদের মধ্যে কয়েক জন ব্যতিক্রমী (সাদত আলী খান) থাকলেও, নবাবেরা ইমামবাড়া বা কারবালায় নির্মাণ করেছিলেন তাঁদের সমাধিস্থান। রীতিটা এক হলেও স্থাপত্যের ভাষায় ফর্মটা ছিল আলাদা। ছন্দে ও সুরে, স্থাপত্যের লেখায় ও রেখায় ও তার বর্ণবিন্যাসে শাশ্বত করতে চেয়েছেন মৃত্যুর পর তাঁদের পলাতক জীবনের।

bibi ka maqbara

বিবি কা মকবরা। আওরঙ্গাবাদ।

ভারতের মকবরাগুলোতে মৃতদেহকে কিবলার সমান্তরাল এবং মক্কার অভিমুখে সমকৌণিক ভাবে রাখা হয়। মৃতদেহের মুখমণ্ডল মক্কামুখী রাখার নিয়ম। মকবরা সাধারণত উচ্চ ভিত্তিবেদির উপর নির্মিত হয় এবং শীর্ষে গম্বুজ থাকে। কখনও কখনও মকবরাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো কক্ষও দেখা যায়। গবেষক ফ্রেডরিক ডাবলু বুন্সে তাঁর ‘দ্য মস্কস অব দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট: দেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড আইকোনোগ্রাফি’ গ্রন্থে নকশার উপর ভিত্তি করে ভারতের ইসলামিক স্থাপত্যের ছয় রকম মকবরার কথা উল্লেখ করেছিলেন –

১) ছত্রীযুক্ত মুক্ত মকবরা – এগুলোতে ৪-৮টি স্তম্ভ থাকে কিন্তু কোনো দেওয়ালগাত্র থাকে না।

২) ছত্রীযুক্ত আধা মুক্ত মকবরা – এগুলোতে ৪-৮টি স্তম্ভ থাকে এবং কিবলা চিহ্নযুক্ত একটি দেওয়াল থাকে।

৩) একটিমাত্র প্রবেশতোরণ যুক্ত চতুষ্কোণাকার অথবা অষ্টকোণাকৃতি ভিত্তিভূমির উপর নির্মিত চতুর্দিক ঘেরা মকবরা।

৪) উন্মুক্ত প্রাঙ্গণযুক্ত মকবরা।

৫) একই ছাদযুক্ত এবং একই প্রাঙ্গণে দু’টি পরস্পর-যুক্ত মকবরা।

৬) চতুষ্কোণাকার ভিত্তিভূমির উপর নির্মিত সমাধিস্তম্ভকে কেন্দ্র করে চতুর্দিক অলিন্দযুক্ত মকবরা।

ইসলামিক স্থাপত্যে মকবরার নির্মাণশৈলী দু’টি মৌলিক রীতি বা রূপরেখার উপর নির্ভর করে –

১) স্তম্ভযুক্ত এবং শীর্ষে গম্বুজ-সহ মকবরাগুলোর চতুর্দিক পাথরের অলংকার জালি দ্বারা ঘেরা থাকবে।

২) মকবরার প্রধান কক্ষটি চতুর্দিক নিরেট দেওয়াল ঘেরা এবং প্রবেশপথটি দক্ষিণমুখী হবে।

মকবরায় মৃতদেহের মাথা থাকে উত্তরমুখী এবং তার পা থাকে দক্ষিণমুখী। দর্শনার্থীকে মৃতের পায়ের দিক থেকেই প্রবেশ করতে হবে বলে মকবরার প্রবেশপথ দক্ষিণমুখী হয়। ইসলামিক স্থাপত্যে মৌলবী বা সুফিসন্ত বা দরবেশদের মকবরাগুলোকে দরগাহ বলা হয়। দরগাহের মূলকক্ষের প্রবেশপথটি অবশ্যই দক্ষিণমুখী হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অস্ত্রময়/ শেষ পর্ব

কখনও কখনও সমাধিস্তম্ভে মৃতদেহকে মকবরার ভূগর্ভে স্থাপন করা হয় তখন ওই কবরের উপর সোন্দউখ (Cenotaph) নির্মাণ করা হয়। মকবরার নির্মাণরীতি অনুসারে সোন্দউখটি (যা থেকে বাংলায় সিন্দুক শব্দটির উৎপত্তি) গম্বুজের খিলান ছাদের ঠিক কেন্দ্রস্থলে থাকে। লখনউ নবাবি স্থাপত্যে মকবরা বা সমাধিসৌধগুলো ইউরোপীয় শৈলীর প্রভাবমুক্ত, ধর্মীয় সৌধ বলেই হয়তো নবাবেরা সমাধিসৌধগুলোকে ইউরোপীয় শৈলীর প্রভাব থেকে সচেতন ভাবেই মুক্ত রেখেছিলেন। নবাবদের সমাধিসৌধগুলোতে পদ্মফুলের মোটিফ অলংকরণের প্রাচুর্য্য দেখা যায় – রসাত্মক পদ্মের পাতা, পদ্মফুল, কুঁড়ি ইত্যাদি অলংকরণ দেখা যায়। হারমান গোয়েটজ এইগুলোকে ডেকান স্টাইল বলেই উল্লেখ করেছিলেন, যদিও তাঁর মূল্যায়ন সঠিক কিনা তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে যথেষ্ট মতভেদ আছে। (চলবে)

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

চিরঞ্জীব পাল

সে দিনটা ছিল সূর্যগ্রহণের ঠিক আগের দিন। সকালবেলা বাড়ির পরিচারিকা ঘর মুছতে মুছতে বলল, ‘‘বৌদি কাল সূর্যগ্রহণ। সাড়ে ন’টা থেকে শুরু হবে। তাড়াতাড়ি রান্না–খাওয়া করে নিও। ও বাড়ির বৌদি বলছিল।’’

‘ও বাড়ির বৌদি’ মানে আমার বাড়িতে কাজে আসার আগে যে বাড়িতে ও কাজ করে এসেছে সে-ই বাড়ির মালকিন। ভদ্রমহিলা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। 

মেয়েটির কথা শুনে খুব একটা অবাক হইনি, কিন্তু যখন ও বৌদির প্রসঙ্গ তুলল তখন একটু ধাক্কা খেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার জানা জগৎটা এখনও অনেকটা অজানা। এক পা আগে দু’ পা পিছে করতে গিয়ে আমরা কখন যেন শুধু পেছনেই হাঁটতে শুরু করেছি। পিছনে হাঁটাতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা হয়েও উপদেশ দেন সূর্যগ্রহণের সময় না-খাওয়ার। অথচ সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার। আমরা সবাই জানি কেন সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ হয়। টিভিতে লাইভ সূর্যগ্রহণ দেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ টেলিকাস্ট হয়। তবুও গ্রহণের সময় না-খাওয়ার কুসংস্কারটা আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে। ঠিক যেন বাপ-ঠাকুর্দার দেওয়া ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো। যুক্তিবোধ সেখানে ঠুনকো।

অন্তহীন এক গ্রহণ

সূর্যগ্রহণের ঠিক দু’দিন পর মারা গেলেন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। খবরটা পেয়ে মনে হল আমার জানা একটা সূর্য ঢাকা পড়ে গেল মৃত্যুর ছায়ায়। সেই সূর্য আর গ্রহণ ছেড়ে বেরোবে না। তবে কি পৃথিবীটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে?

একটা ফোন কিছু মুহূর্ত

সাল: ২০০২।

হ্যালো স্যার? আমাদের পাড়ায় একটা স্লাইড শো করব?

কবে করবে বাবা! আগামী সপ্তাহ আমি পারব না। তার পরে একটা দিন ঠিক করো।

দিন ঠিক করলাম। ফোনে জানালাম স্যারকে। স্যার মানে অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’ দিন ধরে চলল মাইক-প্রচার। অনুষ্ঠানের দিন যথা সময়ে তিনি হাজির হলেন। স্লাইড রেডি করে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু লোক নেই। মাইকে ঘোষণা চলছে। কেউ কেউ উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে সরে পড়ছেন। উদ্যোক্তা হিসাবে আমাদের অবস্থা তো কাহিল। গা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। এই বুঝি স্যার বলেন, লোক জোগাড় করতে পারবে না যখন আমাকে ডাকলে কেন। জল মাপার জন্য গুটি গুটি পায়ে ওঁর কাছে গেলাম। বললাম, স্যার দশ মিনিট বাদে শুরু করুন লোকজন চলে আসবে। 

স্যার বললেন, ঠিক আছে বাবা, একটু দেখে নিই, যে ক’জন আছে তাদের নিয়েই শুরু করব। 

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

মনে মনে গুণে দেখলাম জনা ছয়েক দর্শক আছেন। এঁদের মধ্যে একজন একটি স্কুলের দিদিমণি, তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বেগতিক দেখে ক্লাবের বাইরে বসে থাকা কয়েক জন বিহারী মিস্ত্রিকে বললাম, মাঠে যাও চাঁদ-তারা দেখাবে। তাঁরা প্রতি দিন এই সময় কাজ থেকে ফিরে গল্প করেন। আমাদের কথা শুনে তাঁরা মাঠে গিয়ে বসলেন। শুরু হল স্লাইড শো। মিনিট তিনেক চলার পর পরিস্থিতি বদলে গেল। ছোটো মাঠ ভরে গেল দর্শকে। মহাবিশ্বের নানা রহস্য একের পর এক উজাড় করে দিচ্ছেন স্যার। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে। জলে যে ভাবে মাছ থাকে কখন যে তিনি সে ভাবে দর্শকের মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন কেউ বুঝতে পারেনি। মনের মধ্যে সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি আরও গভীরে পৌঁছোতে চাইছেন। শো চলাকালীন কেউ বেরোলেন না। এমনকি ওই মিস্ত্রিরাও না।

শো-এর শেষ পর্বে উনি মহাকাশকে ঘিরে কুসংস্কার প্রসঙ্গে বললেন। এল গ্রহণের সময় না খাওয়ার প্রসঙ্গও। আক্ষরিক অর্থে জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন যে, গ্রহণের সময় খেলে কোনো ক্ষতি হয় না।

এ রকমই মন্ত্রমুগ্ধতা দেখেছিলাম নৈহাটি পুরসভার হলে একটি অনুষ্ঠানে। হল ‘হাউসফুল’। অনেকে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যেন নামী কোনো নায়কের ছবির প্রথম শো। আলো নেভার কিছুক্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্রমুগ্ধতা।

মাটির কাছাকাছি এক তারা

পৃথিবী থেকে কোটি কোটি যোজন দূরে থাকা তারা, গ্রহ, উপগ্রহ নিয়ে কাজ করেও তিনি যেন মাটির মানুষ। বোঝানোর সময় যথাসম্ভব বাংলা পরিভাষার ব্যবহার, দর্শকদের প্রশ্নগুলো ভালো করে শোনা, তাদের বোধগম্য করে উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি ছিল শিক্ষণীয়। অনেক ‘বড়ো মাপের’ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির একটা ‘তেজরশ্মি’ বেরোয়। সেই রশ্মির কাছে কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে না ‘সাধারণ মানুষ’। অমলেন্দুবাবু নামী জ্যোর্তিবিজ্ঞানী। মাঠেঘাটে গিয়ে স্লাইড দেখানোর সময় তাঁর সেই রশ্মির খোঁজ করেছি। দেখতে পাইনি। তাই তাঁকে ছুঁয়েছি। প্রশ্ন করেছি। 

আমরা জেনেছিলাম, তিনি নারকোল-মুড়ি খেতে ভালোবাসেন। একবার এক ঘরোয়া স্লাইড শোর শেষে তাঁকে মুড়ি-নারকোল খেতে দিয়েছিলাম। কী তৃপ্তি করে যে খেয়েছিলেন!

মৃত্যুকালে অমলেন্দুবাবুর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। আড়াই বছর আগে মেয়েকে নিয়ে সোদপুরে তাঁর একটি স্লাইড শো দেখতে গিয়েছিলাম। শরীরের কারণে গতি শ্লথ হলেও বোঝানার সময় আগের মতোই তারুণ্য উপচে পড়ছিল। সেই স্লাইড শো দেখে মেয়ের প্রশ্ন আর থামে না। 

ভুল ভুল আমি ভুল

না! না! সূর্য কখনও অনন্ত গ্রহণে থাকতে পারে না। আপনজনের মৃত্যুর খবরে ও আমার মনের বিকার। বিড়লা তারামণ্ডলের ডিরেক্টর পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি শুধু বিজ্ঞান গবেষণা করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে স্লাইড নিয়ে ছুটে গেছেন মাঠে ঘাটে। কারণ, তিনি মনে করতেন ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’। এই সত্যিটা না বুঝলে মানতে হবে প্লাস্টিক সাজার্রি করে গণেশের মাথা বসানো হয়েছে কিংবা গোমূত্র সর্বরোগহর।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বঙ্কিম দত্ত

সম্প্রতি প্রয়াত হলেন (২২-০৬-২০২০) ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। 

নব্বই বছর বয়স পার করেও এই বিশিষ্ট জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং সক্রিয়। এর রহস্য কী জানতে চাইলে, উত্তরে বলতেন, আনন্দের সঙ্গে কাজ, স্বল্পাহার, সরল ও নিয়মানুগ জীবনযাপন। দু’ দশকের বেশি ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গলোভী বর্তমান লেখক বুঝেছেন এগুলো কেবল কথার কথা না। তাঁর জীবনই ছিল তাঁর বাণী।

জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করবেন বলেই বর্ধমানের মুগকল্যাণ গ্রামের স্কুল থেকে সোজা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও গবেষণার কাজ। জ্যোর্তিবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহের বীজ অন্তরে লালিত হয়েছিল বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার পরোক্ষ প্রভাবে। এমএসসি ক্লাসে তাঁর শিক্ষক গণিতবিদ ভি ভি নারলিকার (প্রখ্যাত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকারের বাবা) এ বিষয়ে তাঁকে গবেষণায় আগ্রহী করে তোলেন। প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ৫০-এর বেশি। 

বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা চাইতেন সমাজে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হোক এবং সেই প্রয়োজনে সহজ ভাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বই লিখে তিনি প্রচার করতেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সায়েন্স অ্যান্ড কালচার’ পত্রিকা যাতে সামাজিক অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞানকে প্রয়োগের নানা আলোচনা থাকত। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ও মহাকাশ নিয়ে মানুষের মনে আগ্রহ ও এই বিষয়ে ভুল ধারণা দূর করার জন্য সর্বসাধারণের উপযোগী বই লিখেছেন, রেডিও-দূরদর্শনে বক্তৃতা করেছেন, জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে সহজ ভাষায় প্রচুর প্রবন্ধ (আড়াই হাজারের বেশি) লিখেছেন এবং স্থিরচিত্রের সাহায্যে হাজার হাজার বার (প্রায় ন’ হাজার) আলোচনা করতে ছুটে বেড়িয়েছেন দূরদূরান্তের গ্রাম-শহরে। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাধ সাধতে পারত না বেশির ভাগ সময়েই। জিজ্ঞেস করলে আয়োজকদের অসহায়তার কথা বলতেন। প্রচণ্ড গরমে ঘামছেন, প্রেক্ষাগৃহ দর্শকের ভিড়ে উপচে পড়ছে। তিনি অবিচল, কারণ উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন হলের শীতাতপ ব্যবস্থাটি মহার্ঘ। অনুষ্ঠান শেষে সঙ্গের অ্যাট্যাচি খুলে ভিজে গেঞ্জি পালটে নিলেন যখন, তখনও সমান নির্বিকার। জিজ্ঞেস করলেন, অনুষ্ঠান সবার কেমন লাগল! 

আসলে এই কাজ তিনি ভালোবাসতেন আর একে তিনি সামাজিক দায় হিসাবেই দেখতেন। এমন তো হয়েছেই, যখন দেখেছি অনুষ্ঠানে পৌঁছে দেখা গেল মাত্র কয়েক জন বসে আছেন দর্শক আসনে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অনেকেই ফিরে গেছেন ঘরে। অনুষ্ঠানে স্লাইড নিয়ে মহাকাশের বিষয়ে চিত্তাকর্ষক বক্তব্য রাখলেন অন্য দিনগুলোর মতোই, সমান উৎসাহের সঙ্গে।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

একবার বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন করার জন্য আয়োজকরা স্যারকে (এ ভাবেই আমরা সম্বোধন করতাম) নিয়ে গেছেন। উদ্বোধনের পর স্লাইড চিত্র-সহযোগে বলবেন ‘জ্যোতিষ কেন বিজ্ঞান নয়’ এই প্রসঙ্গে। উদ্বোধনের কাজ শুরু হতে অনেক দেরি হচ্ছে। বিশেষ অতিথি এসে পৌঁছোতে দেরি করছেন। আমরা কয়েক জন রয়েছি সঙ্গে এবং বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলছি। স্যার কিন্তু আমাদের নিরস্ত করছেন। কত কষ্ট করে অর্থ আর শ্রম দিয়ে এ সব মেলা আয়োজন করতে হয়, তাই একদিন আমাদের কষ্ট হলই বা! এই সব কথা তিনি আমাদের বোঝাতেন আন্তরিক ভাবেই। 

জ্যোতিষ-বিরোধিতা প্রসঙ্গে স্যারের ছিল ক্ষুরধার যুক্তি। জ্যোতিষশাস্ত্রের অসারতা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে স্লাইড প্রদর্শনগুলোতে তিনি কোনো বাগাড়ম্বর নয়, ব্যবহার করতেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যকে। আর এ বিষয়ে তাঁর প্রজ্ঞা ছিল অপরিসীম। দীর্ঘদিন (১৯৬৮-১৯৮৮) প্রথমে নটিক্যাল অ্যালামনাক ও পরে এই সংস্থার নাম পরিবর্তন হয়ে তৈরি পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার-এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, বিভিন্ন তিথিগণনা, চন্দ্র-সূর্যের উদয়-অস্তের সময় মাপা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ তারিখ, সময় ধরে পূর্বাভাস দেওয়ার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটা বৈজ্ঞানিক ভাবে ভারতে এই একমাত্র প্রতিষ্ঠানেই হয়।

পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান যা বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার ফল। যদিও এটি প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর আগেই মেঘনাদ সাহা মারা যান (১৯৫৬)৷ যাদের ধারাবাহিক পরিশ্রমে চিন ও জাপান ছাড়া এশিয়া মহাদেশের তৃতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি রূপ পায় ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অগ্রণী ও অন্যতম প্রধান। জ্যোতিষশাস্ত্রের কারবারিরা এই সংস্থার তথ্যগুলো ব্যবহার করেন কিন্তু দুর্বোধ্য আঁকিবুকি কেটে গ্রহের সঙ্গে মানুষের ভাগ্যের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন যা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। স্যার এ সবের সরব প্রতিবাদ করতেন সব সময়।

তাঁর লেখা ‘জ্যোতিষশাস্ত্র কি বিজ্ঞান?’ বইটি বহূল প্রচারিত৷ বইটির ইংরাজি অনুবাদও যথেষ্ট জনপ্রিয়। বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে জ্যোতিষীদের ভ্রান্ত ধারণা প্রচার ও মানুষকে প্রতারণা তিনি মেনে নেননি কখনোই। প্রাসঙ্গিক ভাবে বলা যায় যে এর ফলে প্রমাদ গুনলেন একদল জ্যোতিষী। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা প্রাণনাশের হুমকি দিলেন – অবিলম্বে এ সব প্রচার বন্ধ করতে হবে। অবশ্য সে যাত্রায় ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন রক্ষা পায় পুলিশ প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ অফিসারের সক্রিয় ভূমিকায়। উল্লেখযোগ্য যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জ্যোতিষ-বিরোধিতায় তিনি ছিলেন অবিচল যা মেঘনাদ সাহার  ভূমিকার উজ্জ্বল অনুসরণকেই মনে করিয়ে দেয় আমাদের।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: বাংলাভাষার শিল্প-সাহিত্যে হাংরি আন্দোলন

শুভদীপ রায় চৌধুরী

বাংলা শিল্প-সাহিত্যে স্থিতাবস্থা ভাঙার যে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল তার নামই হাংরি আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রথম বুলেটিন ইংরাজিতে প্রকাশিত হয়, কারণ পাটনায় সেই সময় বাংলা প্রেস পাওয়া যায়নি। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মলয় রায় চৌধুরী এবং সমীর রায় চৌধুরী – এঁরা দু’জনেই সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের সুসন্তান। আন্দোলনের পর্যালোচনা করার আগে তাঁদের সম্পর্কে বা রায় চৌধুরী পরিবারের সম্পর্কে কিছু বলা যাক।

সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের নাম কলকাতা-সহ বঙ্গের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাহাঙ্গীরের আমলে এই পরিবারের সুসন্তান রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরী পেয়েছিলেন বিশাল অঞ্চলের জমিদারি আর তখন থেকেই শুরু রায় চৌধুরী পরিবারের যাত্রাপথ। সমীর রায় চৌধুরী এবং মলয় রায় চৌধুরী সাবর্ণদের উত্তরপাড়া শাখার সদস্য। সেই অঞ্চলের ‘সাবর্ণ ভিলা’র অস্তিত্ব বর্তমানে নেই ঠিকই, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এই ভিলার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত।

সমীর রায় চৌধুরী।

উত্তরপাড়া অঞ্চলে রায় চৌধুরী পরিবারের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন মা মুক্তকেশী কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ (নির্মাণ করেছিলেন রত্নেশ্বর রায় চৌধুরী)। এই উত্তরপাড়া শাখায় সমীর রায় চৌধুরী এবং মলয় রায় চৌধুরী ছাড়াও ছিলেন আরও একজন কুলতিলক যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী, পরবর্তীকালে স্বামী যোগানন্দ, যিনি ছিলেন মা সারদার প্রথম মন্ত্রশিষ্য এবং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের পার্ষদদের অন্যতম।

আমাদের হাংরি আন্দোলনের হোতা মলয় রায় চৌধুরীর জন্ম ২৯ অক্টোবর ১৯৩৯ সালে এবং তাঁরই দাদা সমীর রায় চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৩ সালের ১ নভেম্বর। দু’ জনেই বাংলা সাহিত্য জগতের বিতর্কিত কবি, ছোটোগল্পকার, ঔপন্যাসিক। আবার এই দু’ জনই ১৯৬০-এর দশকে হাংরি আন্দোলনের জনক, অর্থাৎ তথাকথিত বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক ছিলেন। ১৯৬১ সালে আন্দোলনের প্রথম ইস্তাহার বা বুলেটিন প্রকাশিত হয় পাটনা থেকে। গোড়ার দিকে  আন্দোলনে ছিলেন চার সদস্য – সমীর রায় চৌধুরী, মলয় রায় চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়। আন্দোলন চলেছিল ১৯৬৫ সাল অবধি। তার পর থেকে এই আন্দোলনের প্রভাব ফুরিয়ে যেতে থাকে।

দেবী রায়।

কিন্তু আন্দোলনের নাম হাংরি কেন? কোথা থেকে পাওয়া এই নাম? বলা বাহুল্য সমীর রায় ও মলয় রায়ের ঠাকুমা ছিলেন অপূর্বময়ী দেবী এবং তাঁর ভাই ছিলেন সাহিত্যিক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। ছোটো থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি দুই ভাইয়ের  নজর ছিল প্রবল। সেই কারণে মলয় রায় চৌধুরীর বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়রা নিয়মিত আসতেন উত্তরপাড়ায় সাবর্ণদের ভিলাতে।

এই ভিলাতেই সপরিবার ভাড়ায় থাকতেন ‘ছোটো ফণি’ – ফণী গাঙ্গুলি। আবার এই সাবর্ণ ভিলাতেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ‘নীরা’ চরিত্রকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম বই ‘এক এবং কয়েকজন’ প্রকাশ করেছিলেন সমীর রায় চৌধুরী। মলয় রায় চৌধুরীর কৈশোর আর যৌবন কেটেছে পাটনা ও চাইবাসায়। তাঁদের বাবা রঞ্জিত রায় চৌধুরী (১৯০৯-১৯৯১) ছিলেন বিখ্যাত ভারতীয় চিত্রশিল্পী আর তাঁদের পিতামহ লক্ষ্মীনারায়ণ রায় চৌধুরী ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম ভ্রাম্যমাণ আলোকচিত্রশিল্পী। প্রসঙ্গত এই ‘হাংরি’ কথাটি মলয়বাবু খুঁজে পেয়েছিলেন জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ কাব্যছত্রটি থেকে। সেখান থেকেই তিনি এই ‘হাংরি’ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন, অর্থাৎ তাঁর ইচ্ছা ছিল বাংলা শিল্প-সাহিত্যকে বাঁচানোর জন্য কিছু একটা করার।

১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল অবধি যে আন্দোলন চলেছিল তা বাংলা-সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে সাড়া ফেলেছিল। তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যিকরা দলে দলে যুক্ত হয়েছিলেন এই হাংরি আন্দোলনে। তাঁদের মধ্যে বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ফাল্গুনী রায়, রবীন্দ্র গুহ, অরুপরতন বসু, সতীন্দ্র ভৌমিক, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, মনোহর দাশ, যোগেশ পাণ্ডা, অজিতকুমার ভৌমিক প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এই চার বছর ধরে হাংরি আন্দোলন নিয়ে শতাধিক বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছিল এবং তা সাড়া ফেলেছিল গোটা ভারতবর্ষে।

এই হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন কেমন ছিল? কী কী লেখা থাকত? কী ভাবে প্রকাশিত হত? কে কে দায়িত্বে ছিলেন? বহু প্রশ্নই মনের মধ্যে আসছে। আগেই উল্লেখ করেছি ১৯৬১-এর নভেম্বরে প্রথম যে বুলেটিনটি প্রকাশিত হয়েছিল তা ছিল ইংরাজি ভাষায়। বুলেটিন প্রকাশনার খরচ দেবেন মলয় রায় চৌধুরী, সমস্ত কিছু সংগঠিত করার দায়িত্ব সমীরবাবুর, সম্পাদনা ও বিতরণের  ভার দেবী রায়ের ওপর আর সব কিছুর নেতৃত্বে থাকবেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় – এই ছিল চার সারথির কাজ। বুলেটিনগুলি ছিল ছাপানো বা সাইক্লোস্টাইল করা, অধিকাংশই হ্যান্ডবিলের মতো ফালিকাগজে, কয়েকটা দেওয়াল-পোস্টারে, তিনটি এক ফর্মার মাপে এবং একটি কুষ্ঠিঠিকুজির মতো দীর্ঘ কাগজে। এই বুলেটিনে কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, জীবন, ছোটোগল্প, নাটক, অনুগল্প, স্কেচ ইত্যাদি নানান ধরনের সৃজনশীল কাজকর্ম প্রকশিত হত। ১৯৬৩-৬৫ সালে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন যেমন, সুবিমল বসাক সম্পাদিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, মলয় রায় চৌধুরী সম্পাদিত ‘জেব্রা’, দেবী রায় সম্পাদিত ‘চিহ্ন’, আলো মিত্র সম্পাদিত ‘ইংরেজি দ্য ওয়েস্ট পেপার’ ইত্যাদি।

হাংরি আন্দোলনের বুলেটিনগুলো হ্যান্ডবিলের আকারে প্রকাশিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক ক্ষতি হয়েছে প্রচুর, কারণ অধিকাংশ বুলেটিনই সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। কিছু সংরক্ষিত আছে ঢাকা বাংলা একাডেমি ও কলকাতার লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে। পরবর্তী কালে যখন এই আন্দোলনের সারথিরা গ্রেফতার হয়েছিলেন তখন সকল বইপত্র, ডায়েরি, ফাইল, পাণ্ডুলিপি, টাইপরাইটার ইত্যাদি পুলিশের কাছে দিতে হয়েছিল যা তাঁরা আর ফেরত পাননি। সেই সময়ের কয়েকটি হাংরিয়ালিস্ট কবিতা হল – উৎপলকুমার রচিত ‘পোপের সমাধি’, শৈলেশ্বর ঘোষ রচিত ‘ঘোড়ার সঙ্গে ভৌতিক কথাবার্তা’, মলয় রায়ের ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’, সমীর রায়ের ‘হনির জন্মদিন’, শম্ভু রক্ষিতের ‘আমি স্বেচ্ছাচারী’, বিকাশ সরকারের ভর্ত ‘ভর্ৎসনার পাণ্ডুলিপি’ ইত্যাদি। মোট ১০৮টি বুলেটিন প্রকাশ করা হয়েছিল যার মধ্যে কয়েকটিই রয়েছে সংরক্ষিত।

এই আন্দোলন চার বছরের পর আর এগোতে পারল না কেন? কেন গ্রেফতার হতে হল হাংরিয়ালিস্টদের? মলয়বাবুদের এই আন্দোলন যে খুব সহজেই অগ্রসর হয়েছিল তা কিন্তু নয়। তাঁদের বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে সুবিমল বসাককে পর পর দু’ বার কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউসে হেনস্থা হতে হয়। হাংরি আন্দোলনের ১৫নং রাজনৈতিক ও ৬৫নং ধর্মীয় বুলেটিন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের এস্টাবলিশমেন্টকে চটিয়ে দিয়েছিল। তাই তাঁদের রাজরোষে পড়তে হয়েছিল।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

১৯৬৪ সালে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার জন্য মলয় রায় চৌধুরীকে অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেফতার হতে হয়। তাঁকে কোমরে দড়ি বেঁধে, হাতে কড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। নিম্ন আদালতে সাজা ঘোষণা হলেও উচ্চ আদালতে অভিযোগমুক্ত হন তিনি। মলয়ের পক্ষে সাক্ষী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত প্রমুখ। ১৯৬৪ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা অনুযায়ী ১১ জন হাংরিয়ালিস্টকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মলয় রায় চৌধুরী, সমীর রায় চৌধুরী, দেবী রায়, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রমুখ।

ইতিমধ্যে মলয় রায় চৌধুরী আমেরিকার ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে সংবাদ হয়ে গেছেন। আমেরিকার বহু জনপ্রিয় লিটিল ম্যাগাজিনেও খবর প্রকাশিত হল। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার পত্রপত্রিকা তাঁদের সংবাদ ও রচনা প্রকাশ করার জন্য কলকাতায় প্রতিনিধি পাঠায়। ভারতবর্ষে তাঁরা সমর্থন পেয়ে যান প্রতিষ্ঠিত লেখকদের। আপাতদৃষ্টিতে হাংরি আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই তাঁরা ভারতবর্ষ তথা বিদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। মলয় রায় চৌধুরী ২০০৪ সালে ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার পান, কিন্তু সেই পুরস্কার তিনি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মানসিকতায় সহজই ত্যাগ করেছিলেন।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: বাসু চট্টোপাধ্যায়ের ছবিতে ঘরোয়া জীবনের খুঁটিনাটি, সঙ্গে বিনোদনের দু’শো মজা

বর্তমানে প্রায় চল্লিশ বছর পরে হাংরি জেনরেশনের আন্দোলনকে নিয়ে ব্যবসা হচ্ছে। ‘হাংরি জেনরেশন রচনা সংকলন’ নামে বই প্রকাশিত হচ্ছে কিন্তু সেখানে আন্দোলনের হোতা সেই মলয় রায় চৌধুরীর নাম বা তাঁকে নিয়ে লেখা কিছুই নেই। নেই শক্তি, উৎপল, সমীর রায় চৌধুরীর লেখাও। এ যেন এক ইতিহাসের বিকৃত রূপ। কিন্তু এই ভাবে সাহিত্যিক মলয় রায় চৌধুরীরকে ইতিহাসের পাতা থেকে মোছা সম্ভব নয়। তিনি তাঁর নিজ প্রতিভায় বাংলা সাহিত্যে ঠাঁই নিয়েছেন। আর হাংরি আন্দোলনের অন্যতম স্রষ্টা তিনিই।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

১. হাওয়া ৪৯, তেত্রিশতম সংকলন, বইমেলা ২০০৬ (সম্পাদক সমীর রায় চৌধুরী)

২. প্রতি সন্দর্ভের স্মৃতি – মলয় রায় চৌধুরী, দিগঙ্গন উৎসব সংখ্যা, ২০০৪

৩. বঙ্গীয় সাবর্ণ কথা কালীক্ষেত্র কলিকাতা – ভবানী রায় চৌধুরী, সেপ্টেম্বর ২০০৬

৪. হাংরি কিংবদন্তি – মলয় রায় চৌধুরী

৫. হাংরি শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন – ডঃ উত্তম দাশ

৬. হাংরি আন্দোলন ও দ্রোহপুরুষ-কথা – ডঃ বিষ্ণুচন্দ্র দে

৭. হাংরি আন্দোলন- উইকিপিডিয়া

Continue Reading
Advertisement
ভ্রমণের খবর10 mins ago

খুলে গেল পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন আর বনোন্নয়ন নিগমের আরও কয়েকটি লজ

দেশ2 hours ago

ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ লক্ষের গণ্ডি ছাড়াল, কিছুটা কমল রোগীবৃদ্ধির হার

দেশ2 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ১৯,১৪৮, সুস্থ ১১,৯১২

বিদেশ2 hours ago

আমেরিকায় আরও ভয়াবহ ভাবে জাল বিস্তার করছে করোনা, এক দিনেই আক্রান্ত ৫২ হাজার

ক্রিকেট3 hours ago

চলে গেলেন ‘থ্রি ডব্লু’-এর শেষ জন স্যার এভার্টন উইকস, শেষ হল একটা অধ্যায়

ক্রিকেট3 hours ago

২০১১ বিশ্বকাপ কাণ্ড: জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হল কুমার সঙ্গকারা, মাহেলা জয়বর্ধনকে

দেশ3 hours ago

জয়রাজ-বেনিক্স হত্যার ঘটনায় ধৃত চার পুলিশ অফিসার, মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে খুনের মামলা

বিদেশ4 hours ago

চিনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করার ভারতীয় সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল আমেরিকা

দেশ2 days ago

কোভিড ১৯ আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ১৮,৫২২, সুস্থ ১৩,০৯৯

ক্রিকেট2 days ago

বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে আসন্ন টেস্ট সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সিতে থাকছে ‘ব্ল্যাক লাইভ্‌স ম্যাটার’

kiran rao, aamir khan and azaad khan
বিনোদন2 days ago

আমির খানের বেশ কয়েকজন সহযোগী করোনা পজিটিভ

DIY
ঘরদোর2 days ago

সময় কাটছে না? ঘরে বসে এই সমস্ত সামগ্রী দিয়ে করুন ডিআইওয়াই আইটেম

ক্রিকেট2 days ago

২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনাল: গড়াপেটার অভিযোগে ফৌজদারি তদন্তের নির্দেশ

বিদেশ2 days ago

ভারত ৫৯টি অ্যাপ নিষিদ্ধ করতেই চিনের জোরালো প্রতিক্রিয়া

LPG
শিল্প-বাণিজ্য1 day ago

পর পর দু’মাস বাড়ল রান্নার গ্যাসের দাম

দেশ1 day ago

ভারতে রোগীবৃদ্ধির হার কমল অনেকটাই, সুস্থতার হার ৬০ শতাংশের কাছাকাছি

নজরে