maqbara saadat ali khan
সাদত আলী খান। ছবি: লেখক
avijit chatterjee
অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়

মৃত্যু জাগতিক জীবনের পরিসমাপ্তি টানলেও ইসলামিক সমাজে মৃত্যুকে পারলৌকিক জীবনের শুরু বলে মনে করা হয়। সমাধিসৌধ্যের বাস্তব অস্তিত্ব ইসলামিক ধর্মালম্বীদের সদাসর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পরকালের মহাযাত্রার প্রস্তুতির জন্য সর্বদা একটা তাগিদ সৃষ্টি করে। এ ছাড়াও সমাধিসৌধ ব্যক্তিবিশেষের জাগতিক জীবনের কৃতিত্বের গৌরবময় স্মারক হিসাবেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কবরের উপরে সৌধনির্মাণ সম্পর্কে পবিত্র হাদিসে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কবরের উপরে সমাধিসৌধকে নিরুৎসাহিত করা হলেও বাস্তবক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা মানা হয়নি।

মধ্য ভারতের প্রাক-সুলতানি মুসলিম শাসকরাও সমাধিসৌধ্য নির্মাণের নিষেধাজ্ঞায় গুরুত্ব না দিয়ে এই শ্রেণির ইমারত নির্মাণে উৎসাহিত হয়েছিলেন। ফলে মুসলিম শাসনকালে ভারতবর্ষে স্থাপত্যের ইতিহাসে, সমাধিসৌধ বা মকবরা নির্মাণে এক নব্য যুগের সূচনা হয়েছিল, যার সফল ও গৌরবময় পরিণতি হল আগ্রার তাজমহল, যা বিশ্বের ত্রুটিহীন, নির্ভুল সমাধিসৌধ বলেই চিহ্নিত হয়েছে।

বর্তমান তুরস্কের বদরুম জেলায় অবস্থিত হ্যালিকারনাসুসের (Halicarnasus) সমাধি সৌধটিকেই বিশ্বের প্রাচীনতম সমাধিস্তম্ভ হিসাবে গণ্য করা হয়। ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ গ্রিক রানি আর্টেমিসিয়া (Artemisia) তাঁর প্রয়াত স্বামী রাজা মউসলুসের (Mausolus) স্মরণে হ্যালিকারনাসুসের সমাধিসৌধটি নির্মাণ করেছিলেন এবং সৌধটির নকশা করেছিলেন পাইথিয়াস (Pythius)। প্রথম যুগে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে মকবরার ভূমি-নকশাগুলো পারস্যরীতি মেনেই নির্মিত হয়েছিল।

mausoleum at Halicarnasus
হ্যালিকারনাসুসে সমাধিসৌধের বর্তমান অবস্থা।

পারস্যরীতির মকবরাগুলো ছিল বৃত্তকেন্দ্রিক (নয়টি বৃত্তের কাল্পনিক কৌণিক কোণের মিলিত যোগফলের জ্যামিতিক বিদ্যার উপর নির্ভরশীল)। পরবর্তী সময়ে মকবরায় গম্বুজ নির্মাণ ছিল ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য। হিন্দু শৈলীর রেখদেউলের প্রভাবও দেখা গিয়েছিল মকবরার স্থাপত্যশৈলীতে।

ইসলামিক স্থাপত্যে শীর্ষদণ্ড হিসাবে আমলকের ব্যবহার যেমন হয়েছে, তেমনই মৃত ব্যক্তির তৃষ্ণার্ত আত্মার জলপানের জন্য মকবরাতে কলসের ব্যবহারও দেখা যায়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে নাবাতীয় আরবদের মকবরাতে জলপাত্র বা কলসের নকশা খোদিত হত বলে জানা যায়। শীর্ষদণ্ড হিসাবে কলসের ব্যবহার ভারতীয় মন্দিরের চূড়াতেও দেখা যায়। দেবতাদের পানীয়রসের পাত্রের প্রতীক হিসাবে ভারতীয় মন্দিরগুলোতে অনুরূপ কীর্তির সংযোজন হয়েছিল বলেই মনে করা হয়।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অস্ত্রময়/ প্রথম পর্ব

তবে সৌন্দর্য্যের খাতিরে ইসলামিক স্থাপত্যে কলস প্রতীক সংবলিত শীর্ষদণ্ডের ব্যবহার ভারতীয় মন্দির থেকে অনুকৃত হলেও হিন্দুধর্মের প্রতীকী ব্যঞ্জনার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি ইসলামিক মকবরা নির্মাণশৈলীতে। মুঘল যুগের সম্রাটরা মৃত্যুকে দেখেছিলেন জীবনের একটি পর্যায় হিসাবেই। তাঁরা সংগীতের আনন্দই হোক, কামলালসার জীবনসুধাই হোক অথবা প্রেমের পরিস্ফুরণ হোক, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে স্থাপত্যের আঙ্গিকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। চিত্রকলা, কাব্য, সাহিত্যজীবনের প্রতিটি রসের প্রতিলিপি মূর্ত করেছিলেন স্থাপত্যের ভাষায়। তা হলে জীবনের যে অনিবার্য পরিণতি, সেই মৃত্যুই বা বাদ থাকে কেন! জীবনের এই আবশ্যিক ঘটনাকে তাঁরা রূপ দিয়েছিলেন মকবরার আঙ্গিকে।

মানুষের মৌল অন্তর্দৃষ্টির সূত্রপাত হয় তখনই যখন মনের বিভিন্ন কক্ষে সঞ্চিত ভাবনার টুকরোগুলো সজ্ঞান চেতনায় যুথবদ্ধ হয়, পরস্পরের সঙ্গে যোগের ও বিয়োগের মাধ্যমে নব নব রূপ লাভ করে। অওধের নবাবেরাও বাদ যাননি ওই একই দর্শন থেকে। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে অওধের নবাবেরা এবং মুঘল যুগের সম্রাটেরা একই বন্ধনীযুক্ত ছিলেন। শিয়া ধর্মীয় নবাবদের মধ্যে কয়েক জন ব্যতিক্রমী (সাদত আলী খান) থাকলেও, নবাবেরা ইমামবাড়া বা কারবালায় নির্মাণ করেছিলেন তাঁদের সমাধিস্থান। রীতিটা এক হলেও স্থাপত্যের ভাষায় ফর্মটা ছিল আলাদা। ছন্দে ও সুরে, স্থাপত্যের লেখায় ও রেখায় ও তার বর্ণবিন্যাসে শাশ্বত করতে চেয়েছেন মৃত্যুর পর তাঁদের পলাতক জীবনের।

bibi ka maqbara
বিবি কা মকবরা। আওরঙ্গাবাদ।

ভারতের মকবরাগুলোতে মৃতদেহকে কিবলার সমান্তরাল এবং মক্কার অভিমুখে সমকৌণিক ভাবে রাখা হয়। মৃতদেহের মুখমণ্ডল মক্কামুখী রাখার নিয়ম। মকবরা সাধারণত উচ্চ ভিত্তিবেদির উপর নির্মিত হয় এবং শীর্ষে গম্বুজ থাকে। কখনও কখনও মকবরাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো কক্ষও দেখা যায়। গবেষক ফ্রেডরিক ডাবলু বুন্সে তাঁর ‘দ্য মস্কস অব দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট: দেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড আইকোনোগ্রাফি’ গ্রন্থে নকশার উপর ভিত্তি করে ভারতের ইসলামিক স্থাপত্যের ছয় রকম মকবরার কথা উল্লেখ করেছিলেন –

১) ছত্রীযুক্ত মুক্ত মকবরা – এগুলোতে ৪-৮টি স্তম্ভ থাকে কিন্তু কোনো দেওয়ালগাত্র থাকে না।

২) ছত্রীযুক্ত আধা মুক্ত মকবরা – এগুলোতে ৪-৮টি স্তম্ভ থাকে এবং কিবলা চিহ্নযুক্ত একটি দেওয়াল থাকে।

৩) একটিমাত্র প্রবেশতোরণ যুক্ত চতুষ্কোণাকার অথবা অষ্টকোণাকৃতি ভিত্তিভূমির উপর নির্মিত চতুর্দিক ঘেরা মকবরা।

৪) উন্মুক্ত প্রাঙ্গণযুক্ত মকবরা।

৫) একই ছাদযুক্ত এবং একই প্রাঙ্গণে দু’টি পরস্পর-যুক্ত মকবরা।

৬) চতুষ্কোণাকার ভিত্তিভূমির উপর নির্মিত সমাধিস্তম্ভকে কেন্দ্র করে চতুর্দিক অলিন্দযুক্ত মকবরা।

ইসলামিক স্থাপত্যে মকবরার নির্মাণশৈলী দু’টি মৌলিক রীতি বা রূপরেখার উপর নির্ভর করে –

১) স্তম্ভযুক্ত এবং শীর্ষে গম্বুজ-সহ মকবরাগুলোর চতুর্দিক পাথরের অলংকার জালি দ্বারা ঘেরা থাকবে।

২) মকবরার প্রধান কক্ষটি চতুর্দিক নিরেট দেওয়াল ঘেরা এবং প্রবেশপথটি দক্ষিণমুখী হবে।

মকবরায় মৃতদেহের মাথা থাকে উত্তরমুখী এবং তার পা থাকে দক্ষিণমুখী। দর্শনার্থীকে মৃতের পায়ের দিক থেকেই প্রবেশ করতে হবে বলে মকবরার প্রবেশপথ দক্ষিণমুখী হয়। ইসলামিক স্থাপত্যে মৌলবী বা সুফিসন্ত বা দরবেশদের মকবরাগুলোকে দরগাহ বলা হয়। দরগাহের মূলকক্ষের প্রবেশপথটি অবশ্যই দক্ষিণমুখী হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অস্ত্রময়/ শেষ পর্ব

কখনও কখনও সমাধিস্তম্ভে মৃতদেহকে মকবরার ভূগর্ভে স্থাপন করা হয় তখন ওই কবরের উপর সোন্দউখ (Cenotaph) নির্মাণ করা হয়। মকবরার নির্মাণরীতি অনুসারে সোন্দউখটি (যা থেকে বাংলায় সিন্দুক শব্দটির উৎপত্তি) গম্বুজের খিলান ছাদের ঠিক কেন্দ্রস্থলে থাকে। লখনউ নবাবি স্থাপত্যে মকবরা বা সমাধিসৌধগুলো ইউরোপীয় শৈলীর প্রভাবমুক্ত, ধর্মীয় সৌধ বলেই হয়তো নবাবেরা সমাধিসৌধগুলোকে ইউরোপীয় শৈলীর প্রভাব থেকে সচেতন ভাবেই মুক্ত রেখেছিলেন। নবাবদের সমাধিসৌধগুলোতে পদ্মফুলের মোটিফ অলংকরণের প্রাচুর্য্য দেখা যায় – রসাত্মক পদ্মের পাতা, পদ্মফুল, কুঁড়ি ইত্যাদি অলংকরণ দেখা যায়। হারমান গোয়েটজ এইগুলোকে ডেকান স্টাইল বলেই উল্লেখ করেছিলেন, যদিও তাঁর মূল্যায়ন সঠিক কিনা তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে যথেষ্ট মতভেদ আছে। (চলবে)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here