today's slogan
আজকের স্লোগান।
সন্তোষ সেন

উফ কী গরম পড়ছে গত দু-তিন বছর ধরে। বৃষ্টিও হচ্ছে অনিয়মিত, অপ্রতুল। আবার কখনও কোনো কোনো অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে মনুষ্যসৃষ্ট বন্যার কবলে পড়ে। কী দিনকাল পড়ল রে বাবা – এই সব যখন আমরা, আমআদমি, ভাবছি তখন কিন্তু এর পিছনের কারণগুলো অনেকেই খুঁজে দেখছি না। এ সবের ভিলেন হল – বায়ুদূষণ, ভূ-উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং, ব্যাপক হারে জঙ্গল ধ্বংস ইত্যাদি।

হিসেবমতো ভারতবর্ষে বনাঞ্চল থাকার কথা মোট ভূমির অন্তত ৩০ শতাংশ, তা কমতে কমতে আজ প্রায় ২২ শতাংশে পৌঁছেছে। কয়েকটি নমুনা দেখা যাক। গত পাঁচ বছরে আমাদের দেশে এক লক্ষ কুড়ি হাজার হেক্টর বনাঞ্চল স্রেফ হাওয়া করে দেওয়া হয়েছে, যা আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি। নিয়মগিরি, মালকানগিরি, বস্তার-সহ ছত্তীশগঢ়ের বিস্তৃত বনাঞ্চল নামজাদা শিল্পপতিদের মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদ তুলে আনার জন্য। এই সব কোম্পানির অপরিসীম লোভ, লালসা মেটাতে জানি না কাটা পড়বে আরও কত সহস্র হেক্টর বনাঞ্চল।

এরই মধ্যে আশার কথা – দান্তেওয়াড়ার মূল নিবাসী আদিবাসীদের সংগঠিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে পড়ে বায়লাডিলাতে আদানি গোষ্ঠীর সাধের লোহা-ইস্পাত শিল্প এখন বিশ বাঁও জলে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমরা – হয়তো-বা বেঁচে যাবে কয়েক হাজার বৃহৎ বৃক্ষ, ধ্বংসের হাত থেকে। রক্ষা পাবে হাজার হাজার জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী তথা সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র।

কিন্তু এই বনানী ধ্বংসের জন্য শুধু মুনাফাবাজ বহুজাতিক কোম্পানিকে দোষ দিয়ে লাভ কী, যখন দেশের সরকার, প্রশাসন একই পথের শরিক? সারা বছরই কার্যত নির্জলা থাকে মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চল। জলের জন্য হাহাকার। এই হাহাকারে বধির থেকে প্রশাসন এখানকার অমরাবতী ডিভিশনে প্রায় এক লক্ষ গাছ কাটার পরিকল্পনা করেছে। উপলক্ষ্য, ৭০১ কিমি দীর্ঘ মুম্বই-নাগপুর সুপার হাইওয়ে বানানো। উন্নয়নের যজ্ঞে আবার প্রাণ দিতে চলেছে তারা, যারা আমাদের সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়।

আমাদের রাজ্যও এই তালিকা থেকে বাদ নয়। এখানেও অপরিকল্পিত, অবৈজ্ঞানিক উন্নয়নের জন্য চলছে নির্বিচারে সবুজ ধ্বংস। জলাভূমি, পুকুর, নদী-নালা দখল করে ছুটে চলেছে উন্নয়নের রথ। জাপানের এক বহুজাতিক কোম্পানির সাধের মডেল – বামনির পর টুর্গা পাম্প স্টোরেজ প্রকল্প। শক্তির অপচয় করে লোয়ার ড্যাম থেকে পাম্প করে আপার ড্যামে জল তুলে শহরের বাবুদের জন্য পিক টাইমে বিদ্যুৎ দেওয়ার অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক টুর্গা প্রকল্পের জন্য পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় এলাকায় কম করে তিন লক্ষ গাছ কাটা পড়বে, অন্তত দশটি গ্রাম তলিয়ে যাবে জলের তলায়। এর আগে বামনি প্রকল্পে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কয়েক লক্ষ গাছের পরিবর্তে কোনো নতুন গাছ লাগানো হয়নি। আর নতুন কয়েকটা গাছ লাগালেই বাস্তবে লতা-গুল্ম-ফল-মূল-পাখ-পাখালি সমৃদ্ধ সত্যিকারের এক জঙ্গল কি তৈরি করা যায়? জঙ্গল তৈরি হয় প্রাকৃতিক উপায়ে।

এ বার একটু দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে তাকানো যাক। ১৯৭৮ থেকে আজ পর্যন্ত ব্রাজিল, পেরু, কোলোম্বিয়া, বোলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা প্রভৃতি দেশ থেকে পৃথিবীর ফুসফুস বলে খ্যাত বৃহত্তম বৃষ্টিঅরণ্য আমাজনের চার লক্ষ বর্গ কিলোমিটারব্যাপী বৃহৎ বৃক্ষরাজি জাস্ট ভ্যানিশ করে দেওয়া হয়েছে। ২০১১-য় দিলমা রৌসেফ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেখানে যে বন-সংহারের কাজ শুরু হয়েছিল, তা গুণিতক হারে বেড়ে গিয়েছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: আর মাত্র পনেরোটা বছর, তার পর হয়তো…

চাষবাস, বিশেষ করে গবাদি পশুর খাদ্যশস্য চাষ, মাটির বুক চিরে আকরিক তুলে আনা, আসবাব তৈরির জন্য বহুমূল্য মেহগনি, সেগুন রফতানি বা পাচার করা, নদীর বুকে জলাধার বা ওভারব্রিজ বানানো আর বহুজাতিক কোম্পানি-সহ কাঠমাফিয়াদের সহজে জঙ্গলে ঢোকার রাস্তা তৈরি করার ফলে আমাজন নামক এক বিশাল বৃষ্টিঅরণ্য হয়তো চিরকালের জন্য হারিয়ে যেতে চলেছে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। বন-সংহার, ধরণীর বুক চৌচির করে খনিজ সম্পদ লুঠ চলছে অবাধে, সরকার-প্রশাসনের মদতে।

সবুজের সমারোহ এক বৃহৎ বনানী এক দিকে বাতাস থেকে কয়েক লক্ষ টন দূষিত কার্বন ডাইঅক্সাইড শুষে নিয়ে আমাদের উপহার দেয় কয়েক কোটি টাকার বিশুদ্ধ বাতাস অক্সিজেন, যা প্রাণ ভরে বুকে টেনে নিয়ে বেঁচে থাকি আমরা। অন্য দিকে পথিককে দেয় শীতল ছায়া। শুধু মানুষই নয়, লক্ষ লক্ষ কীটপতঙ্গ, পশুপাখি, অণুজীবদের আশ্রয়স্থল এই বনরাজি। তাই গাছ কেটে জঙ্গল ধংস করলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যায় বেড়ে, দেখা দেয় গ্লোবাল ওয়ার্মিং। যার ফলে মেরু-বরফ দ্রুত হারে যাচ্ছে গলে, হলে চলেছে হিমালয়ের গ্লেসিয়ারসমূহ।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আর তিন ডিগ্রি বেড়ে গেলে সমুদ্রজলের উচ্চতা সাড়ে ছয় ফুট পর্যন্ত ফুলে ফেঁপে উঠবে, ফলে জলের তলায় তলিয়ে যাবে উপকূলবর্তী অঞ্চল ও সংলগ্ন সব শহর, মারা যাবেন বা বাস্তুচ্যুত হবেন লক্ষ কোটি মানুষ। বিপর্যস্ত পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের হাত ধরে মানবসভ্যতা অবলুপ্তিতে কিনারায় দাঁড়িয়ে। ‘Natural essence of man’ – এই আপ্তবাক্যটি ভুলে মেরে মানুষ আজ প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত। প্রকৃতির থেকে তৈরি মানুষকে হতে হবে প্রাকৃতিক। প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব বা দখলদারি নয়, থাকতে হবে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই। তবেই সম্ভব হবে মানবসভ্যতাকে চির অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো। আগামী প্রজন্মের জন্য শুদ্ধ বাতাস, বিশুদ্ধ পরিমিত জল ও একটা সুস্থ প্রাকৃতিক পরিবেশ রেখে যাওয়া সম্ভব হবে। এ অঙ্গীকার হোক আমার, আপনার সকলের। আর দেরি নয়, বিপর্যস্ত পরিবেশকে ঠিক করার কাজে হাত লাগাতে হবে এক্ষুনি, হ্যাঁ এক্ষুনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here