রবিবারের পড়া: ‘বাপুরে বাপুর দোহাই’, মার্কেটিংয়ে মোদী, রাগাচ্ছেন রাগা

0
Narendra Modi And Rahul Gandhi
নরেন্দ্র মোদী এবং রাহুল গান্ধী।
দেবারুণ রায়

‘ভক্ত’ বললেই ইদানীং বেশ বোঝা যাচ্ছে। কে ভক্ত কার ভক্ত, কিংবা কী ভক্তি কার ভক্তি, এ সব আর বলে দিতে হচ্ছে না। দিব‍্যি চিনে নেওয়া যাচ্ছে ভক্তদের ভগবানকে। ভূ-ভারতে সবাই জানে, মোদীজির সমর্থক বা ভক্তকুলকেই ভক্ত নামে চেনে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, হাইক – যার কাছে যা আছে তা-ই নিয়ে, ডুব দে রে মন মোদী বলে।

তা ছাড়া এ কালে যা আকাল! কাল কী হবে তারও ঠিক নেই। মাকালে ভরে গেছে মাঠময়দান। সকালের নেতা বদলে যাচ্ছে বিকালে। ইহকাল পরকালের মতো। মধ‍্যিখানে ফাঁকে পড়ে কাল কাটছে কত নেতার! সবাই তাকাচ্ছে কিন্তু দেখছে না। কান পাতছে কিন্তু শুনছে না। আর যারা মাথায় বসে বলছে, আরে ছাড়ুন তো মশাই ধর্মের জীবদের কথা, ওদের থিওরি দিয়ে ভোট ভেজে না, না হলে তিরিশ বছরে আর কেউ পুরো বহুমত পেয়েছে, তাদের কথা কেউ কেউ খাচ্ছে, কিন্তু গিলছে না।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: আয়ারামের প্রবেশ, গয়ারামের প্রস্থান, ব্যাটেবলে বিজেপির সঙ্গে

আসলে দেশটাই বিচিত্র। এক দিক থেকে ঝাড়ু দিয়ে আবর্জনা সাফ করতে না করতেই আরেক দিকে আবর্জনার পাহাড় হয়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছরে স্বচ্ছ ভারত হয় না। বাপুরে, তোদের বলছি বাপুর দোহাই, আর পাঁচটা বছর পাপ্পু পাপ্পু করিস না। তখনও যদিও পঁচাত্তরের হব না। কিন্তু থাক সে কথা। পঁচাত্তরে এখন পচা বলেই যে সবাই পচবে তার গ‍্যারান্টি আছে? পঁচাশিতেও পচেনি কেউ কেউ। আসলি বাত হল, পাওয়ার। সারা জীবন এত কিছু পাওয়ার পরও পাওয়ারের নেশা যায় না। এ হল নিরানব্বইয়ের চক্কর। এক বার শ’ পূর্ণ হলেই তো আবার তো কে করবে কামরাজ প্ল‍্যান। কংগ্রেসমুক্ত ভারত বললে তো আর নেহরুকে ভালো বলা যায় না! এটাই কেউ বুঝছে না। না হলে সব তো নেহরুই।

নামদার সব উঠে পড়ে লেগেছে। কাজ করতে দেবে না। শুধু কি কংগ্রেসি নামদার? বিজেপিরও নামদার কম নেই। কামদার আর ক’জন হয়? মন কি বাতে তো কোনো ‘দার’ নিয়েই কিছু বলা যায় না। তায় এখন আবার কোড অফ কন্ডাক্টের ফ‍্যাকড়া। আচরণ শিখতে হচ্ছে নতুন করে। না হলেই ফাঁস! ‘দার’বালা আরেকটা শব্দ, চৌকিদার! আমাদের কাছ থেকেই চুরি করে আমাদেরই চোর বানাচ্ছে! তো সবাই মিলে আমরা চৌকিদার বনে গেলাম। এ বার কাকে বলবি?

স্লোগানটাও বদলে নিলাম। দমদার বনাম দাগদার। দাগিদের বলে দাগদার। লোকে দেখুক বুঝুক, কারা দাগি আর মহাকাশে মিসাইল পাঠনোর দম রাখে কে বা কারা। দাগদাররা এ বার কী বলে দেখি। চার দিকে চিৎকার চলছে, ৪৫ বছরে নাকি এত বেকারি কোনো দিন হয়নি! ৪৫%। তো ঠিক হ‍্যায়। বেরোজগারি যখন আকাশেই পৌঁছোল, তখন তো মহাকাশেই পোস্ট করতে হয় মিসাইল। দেশদ্রোহী, মহা‘মিলাবট‘, স-রা-ব থেকে সিট থুড়ি দেশ বাঁচাতে মহাকাশে দেশপ্রেমী ‘শক্তি’র সার্জিক্যাল স্ট্রাইক।

সপা, রাষ্ট্রীয় লোক দল আর বসপার জোট মানেই তো স-রা-ব। তো সরাব মানে সর্বনাশ। স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। সুরা পান না করে দেবীমাতার পদতলের পদ্ম বেছে নিন। মাননীয় হিন্দুহৃদয় সম্রাটের এই আবেদন ছিল মেরঠ থেকে প্রচার সূচনায়। উড়ো খই এল প্রশ্নাকারে। হিন্দুত্বের হৃদকমলে নিবেদন, মহিষাসুর বধের মুহূর্তে দেবী অসুররাজকে বলছেন, গর্জ‍্য গর্জ‍্য ক্ষণং মূঢ়। যতক্ষণ আমার সুরাপাত্র পূর্ণ। পানশেষে প্রাণ নেব তোর। সুতরাং রণরঙ্গে, অসুরসংহারে সুরা বা স-রা-ব শক্তির প্রতীকী।

প্রচারের আবার পূব-পশ্চিম। সারা ভারত চষে বেড়িয়ে, এই অসম তো ওই তেলঙ্গানা জেতার অঙ্ক যেন গুলিয়ে না যায়। কারণ মান‍্যবর মোদী এখন মার্কেটিং মুদ্রায়। আডবাণীজিকে বাতিল করে দিলেও তাঁর দেওয়া গুরুমন্ত্রই জপছেন। ঠিক যে কোনো হেরে-যাওয়া ভোটের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও আডবাণী বলতে পারতেন, হমারি বিজয় নিশ্চিত হ‍্যায়। যে ফিডব‍্যাক আসছে সারা দেশ থেকে তাতে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে যে আমরাই সরকার গড়ছি – দিল্লির বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে এক বার এ কথা বলেছিলেন হার আসন্ন জেনেও। তা ছাড়া ২০০৪-এর ‘ভারত উদয়’ ও ‘ফিল গুডফ‍্যাক্টর‘ ছিল আডবাণীর মস্তিষ্কপ্রসূত। এই স্টাইল চালু করেছেন মোদী বালাকোটের পরেই। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসছি ইত্যাদি। কিন্তু সমস্যা হল সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ধৈর্যচ‍্যুতির সংলাপ। বলছেন, স‍্যাট-ও বোঝে না। একে কী বলব? আসলে মহাকাশে ভোটের বাদ‍্যি বাজানোর পর পরই রাহুল মোদীকে বললেন, আপনাকে বিশ্ব‍ নাট‍্য দিবসের শুভেচ্ছা। এর উত্তরটা ছিল বেশ ঝাঁঝালো। বলছি স‍্যাট আর ভাবছে নাটকের সেট! কী বুদ্ধি! রাহুলের অডিয়েন্স মজা নিচ্ছে সমানে। রাগার চলনেবলনে রাগ ফুটে উঠছে নমো-র। কিন্তু ভোটের পূর্বরাগ তো! পশ্চিম থেকে যত পূবে যাবেন নমো, তাঁর দত্তক দেশে, ততই রাগরাগিনীর বিস্তার চলতে থাকবে অহরহ। সবে রাগিয়ে দিয়েছেন রাগা, আপনি তো ১৫ লাখ টাকা দিলেন না, এ বার আমরা সরকারে এসে গরিবদের মাসে ছ’হাজার টাকা দেব। ও দিকে দশাশ্বমেধ ঘাটে নৌকো থেকে নামতে নামতেই পি কপট রাগের ভঙ্গিমায় ময়ূরীর মতো করে বলছেন, পেলেন ১৫ লাখ? যান, আরও ভোট দিন মোদীকে।

আসলে ভোট কে বলে তোমার আমার,/ভোট কি কারও কেনা?/ভোটের আমি ভোটের তুমি/ভোট দিয়ে যায় চেনা।

এর মধ্যে কে যে মাথার দিব‍্যি দিয়েছিল ওঁকে ও সব কথা বলতে। কোনো মাতব্বর হয়ত বলেছেন, আপনি মনের সুখে মাতৃভাষা বলুন। প্রিয়ঙ্কা বুঝবে যে যাদের ভোট টানতে এত চেষ্টা সেই মুসলমানরাও ওদের চান না। কিন্তু উনি তো শিয়া। ওঁরা তো বিজেপিরই সঙ্গে বরাবর। ওঁদের ভোটে এসপার ওসপার হয় না। উনি বলে দিলেন, “প্রিয়ঙ্কাসুন্দরী। তো সিনেমায় নামুন। ভোটে আপনি বেমানান।” গ্রামে গ্রামে এই বার্তা রটি গেল ক্রমে, প্রিয়ঙ্কা বিটিয়াকে অপমান করেছে ভাজপার দোস্ত শিয়া নেতা। শুনে কোন্‌ রাগ হতে পারে মোদীজির? ব্রহ্মাণ্ডে শক্তি প্রদর্শনের পর কাশীতে এ কী কাণ্ড!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here