গৌরী দাশগুপ্ত

বোবা কান্নার আওয়াজ ঢেকেছে কথা/বুকের ভিতর তীব্র জলোচ্ছ্বাস/কলম থেমেছে, তবুও আগুন/উঁকি দিয়ে যায় ফাল্গুন বারোমাস…

– ‘প্রস্থান সময় উপস্থিত’ আমার বাবা কবি অরবিন্দ গুহ-র সাম্প্রতিকতম কবিতার বই। বাবা আর কলম ধরবেন না বলেছেন, আমি চাই বাবার লেখায় আবার মুগ্ধ হোন অগণিত পাঠক…

Loading videos...

আমার ‘আবোলতাবোল’ শৈশবে কিংবা ‘আরণ্যক’ কৈশোরে, যখন ‘চাঁদের পাহাড়’ বেয়ে নেমে আসত টুকটুক জ্যোৎস্না, তখন বাবার সঙ্গ ছিল সবচেয়ে দামি। ছোটোবেলা থেকেই জানতাম আমার বাবা নামী সাহিত্যিক, সঙ্গে সরকারি চাকুরে। চাকরি করেন সংসারের তাগিদে আর লেখা – সে তো মনের তাগিদ। বাবার গল্প, কবিতা পড়ার ইচ্ছে হত খুব, কিন্তু সুযোগ ছিল না, কেননা বাবার ঘরে স্তূপাকার বইয়ের ভিতরে বাবার লেখা বই খুঁজে পেতাম না কখনো। সাহস করে বাবার কাছে চাইনি কোনো দিন, জানতাম বাবা কখনোই চাইবেন না তাঁর লেখা পড়ে স্বজনেরা, বিশেষত তাঁর মেয়ে বাহবা দিক – এ হেন চরিত্রের আমার বাবার জন্য মনে ক্ষোভও ছিল খানিকটা, আবার গর্বেও ভরে উঠত মনটা। তবে হ্যাঁ, পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা, আনন্দবাজার, দেশ পত্রিকায় বাবার লেখা ‘মিস’ করিনি কখনো; বাবার অন্য সব লেখা না পড়তে পারার দুঃখ এ ভাবেই কাটিয়ে ফেলতাম পুজোর সময়।

বাবার সঙ্গে সব চেয়ে ভালো সময় কাটত গল্প করে আর অঙ্ক কষে। অনেকেই হয়তো জানেন না আমার বাবা সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্কচর্চায়-ও বিশেষ অনুরাগী। শুধু আমি নয়, বাবার ভাগনে-ভাগনি, ভাইপো-ভাইঝিরাও বাবার কাছে অঙ্ক করেই ক্লাসের গণ্ডি পেরোত হাসিমুখে। আর আমি? – আমার বেশ মনে পড়ে, গরমের দুপুরে ছুটির দিনে দরদর করে ঘামছেন আমার বাবা, সামনে সাদা ফুলস্কেপ কাগজে একের পর এক অঙ্ক কষছেন, যতক্ষণ না সহজ হচ্ছে আমার কাছে অঙ্কের নিয়মাবলি, ততক্ষণ কোনো  বিরক্তি নেই, নেই কোনো রাগ। কী অপরিসীম ধৈর্য! এমনকি আমার অঙ্ক কষায় ভুল হলেও কোনো বকুনি নেই, আবার প্রথম থেকে শুরু। এমনি ভাবেই অঙ্ককে ভালোবাসোতে শিখিয়েছিলেন আমার বাবা – আর তাই অঙ্কতে বরাবর ভালো নম্বর পাওয়া ছাত্রী ছিলাম আমি।

গল্প বলিয়ে হিসেবে আমার বাবার জুড়ি মেলা ভার। বাবা অফিস থেকে ন্যাশনাল লাইব্রেরি হয়ে বাড়ি ফেরার পর একসঙ্গে পিঁড়ি পেতে বসে আমরা ভাত খেতাম, তখন থেকেই গল্পের শুরু; ভাত খেয়ে উঠে পান মুখে নিয়ে বাবা লম্বা সোফায় বালিশ মাথায় শুয়ে একের পর এক গল্প বলতেন আর উলটো দিকের সোফায় বসে অবাক হয়ে শুনতাম সে সব অজানা গল্প। বাবার ছোটোবেলার দেশের গল্প, কলকাতায় আসার পরের কাহিনি, চাকরি জীবনের গল্প আর তার সঙ্গে লেখক ইন্দ্রমিত্রের অনেক অভিজ্ঞতার কথা – রূপে, রসে, বর্ণে, গল্পে সে সব গল্প ছিল অতুলনীয়। কত জ্ঞানী-গুণীজনের জীবনের কথা – হাঁ করে শুনতাম বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে। আর ভাবতাম এমন বাবার সান্নিধ্য পাওয়া – ক’টা মেয়ের ভাগ্যে জোটে। আজও বাবার সামনে গেলেই কিছুক্ষণ এ-কথা ও-কথার পর বাবা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে গল্পের ঝুড়ি খুলে ফেলেন। আর আমিও ফিরে যাই কৈশোরের সেই গল্প শোনা দিনগুলিতে, আবারও মুগ্ধ হই।

বাবার সঙ্গে ডেকার্স লেনে ফিশরোল খেতে যাওয়া, রয়্যাল হোটেলে বিরিয়ানি-চাঁপ, কিংবা নিছকই মোড়ের মিষ্টির দোকানে দেদার মিষ্টি খাওয়া – ভুলিনি কিছুই। এ সব সময় আমার জীবনে সোনায় মোড়া। একলা মনখারাপের কোনো বিকেলে এ সব মুহূর্তের ছবি – এক নিমেষে মন রোদ্দুর হয়ে ওঠে।

এখন বাবার বয়স ৮৬ বছর। বৃদ্ধ বয়সের নানা সমস্যায় বাবা বিপর্যস্ত। তবুও বাবার কাছে গেলে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে ওঠে মন। রবি ঠাকুর যিনি আমার প্রাণের ঠাকুর তাঁর লেখা গানের দু’ কলি বারবার ফিরে আসে আমার মনে বাবাকে দেখলেই – ‘অমল কমল সহজে জলের কোলে/আনন্দে রহে ফুটিয়া/ফিরে না সে কভু আলয় কোথায় বলে/ধূলায় ধূলায় লুটিয়া’।

– এমনই অমলিন থাকুক অসাধারণ জীবন-দর্শনে ঘেরা আমার সাধারণ বাবার জীবন – এই প্রার্থনায় সব সময় আমি…

(কবি-লেখক-গবেষক অরবিন্দ গুহ তথা ইন্দ্রমিত্র প্রয়াত হয়েছেন গত ৩ জুন। তাঁর কন্যা গৌরী দাশগুপ্তের এই লেখা প্রকাশিত হয় কারুকথা এইসময়, মার্চ-অক্টোবর ২০১৪ সংখ্যায়। লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল।)

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.