Connect with us

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: হাতিরালয়ে মানুষের হানা

 

তপন মল্লিক চৌধুরী

বিগত কয়েক বছরে লোকালয়ে হাতি বা আন্যান্য জন্তুজানোয়ার ঢুকে পড়া বা হানার ঘটনা ঘটেছে বহুবার। সব ক্ষেত্রেই যে প্রাণহানি ঘটেছে তেমনটা নয়, কিন্তু তাণ্ডব বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘরবাড়ি ভাঙা, খেতখামার নষ্ট হওয়ার মতো মারাত্নক আকার ধারণ করে। প্রবল চাপে পড়ে প্রশাসন বা বন দফতর হাতি-সহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর হানা রুখতে একাধিক প্রকল্পের কথা ঘোষণাও করে। তবে সেই সব উদ্যোগ বা প্রকল্প যে  কেবলমাত্র মুখের কথা বই অন্য কিছু নয় তা জঙ্গল লাগোয়া বা বনবস্তির মানুষ মাত্রই এখন জানে। কারণ হাতি কিংবা বন্য জন্তু হানার ঘটনায় যখনই বন দফতর তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়, তখনই অবস্থা সামাল দিতে তারা সাদা মিথ্যার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। কিন্তু মিথ্যা প্রতিশ্রুতির থেকেও বড়ো প্রশ্ন হল জঙ্গল কিম্বা সংলগ্ন এলাকায়  হাতি বা বন্যজন্তুর হানা রোখা অথবা রুখতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা কি স্বয়ং বন দফতর বলতে পারে? পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে না কি মানুষই হানা দিয়েছে হাতির এলাকায়

ঘটনা হল যে দিন থেকে নগর সম্প্রসারণের জন্য জঙ্গল সাফাই আভিযান শুরু হয়েছে, বলা যায় সে দিন থেকেই লোকালয়ে হাতি এবং বন্যজন্তু ঢুকে পড়ার ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে। তার পর যত দিন এগিয়েছে, সভ্য নাগরিকদের ঘরবাড়ি, জমিজিরেতের সীমানা বাড়তে বাড়তে জঙ্গল এলাকায় ঢুকে পড়ে। জঙ্গল দখল করে ওই বসতি নির্মাণ করার ব্যাপারটিকে আধুনিক সমাজসভ্যতা নামকরণ করেছে বনবস্তি।

elephant safariশুধু যে বনবস্তি তা তো নয়, বসতির পাশাপাশি সভ্য নাগরিকদের প্রমোদভ্রমণেরও ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তার জন্য বন্যপ্রাণীদের কোর এলাকা দখল করে পাকা নির্মাণ উঠেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে রিসোর্ট। সভ্য নাগরিক জঙ্গল আর বন্য জন্তুজানয়ার দেখতে খুবই পছন্দ করে। শহর থেকে কাতারে কাতারে মানুষ প্রায়শই ছোটে সেই অভিমুখে, নাগরিকদের জঙ্গলপ্রীতি আর বন্যপশু দেখার ইচ্ছে মেটাতে রাশি রাশি গাড়ি মানুষ বোঝাই করে ছোটে নিবিড় অরণ্যের গভীরে, যার নামকরণ হয়েছে সাফারি। ফলত অরণ্যে সভ্য নাগরিকদের ভিড় যেমন বেড়েই চলেছে তেমনই ধোঁয়া ধুলো উড়িয়ে রাশি রাশি সাফারি ছুটছে প্রচণ্ড শব্দে আর বন্যজন্তুরা প্রাণ বাঁচাতে ক্রমশই পিছু হটছে। কিন্তু আমরা ক্লান্তহীন ভাবে বলেই চলেছি, লোকালয়ে হাতি ঢুকে পড়েছে, মানুষের বসতিতে হাতির হানা। কেবল আমরা নই বন দফতর বা প্রশাসনও জানাচ্ছে, হাতির হানা রুখতে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এমনকি তারা এক থেকে একাধিক প্রকল্পের কথাও ঘোষণা করে দেয়। ওই সব প্রকল্প বাস্তবায়িত হোক না হোক সে প্রশ্ন ভিন্ন। কিন্তু এখানে জরুরি প্রশ্ন হল খোদ বন দফতর কোন যুক্তিবুদ্ধিতে হাতিদের কোণঠাসা করে দেওয়ার কথা এ ভাবে দিনের পর দিন ঘোষণা করতে পারে ?

অরণ্য ধ্বংস করে বসতি গড়ে তোলার সময় থেকেই বিঘ্ন ঘটেছে এলিফ্যান্ট করিডোর বা হাতি চলার পথে। জঙ্গল বা সংলগ্ন এলাকার মধ্যে দিয়ে হাতি ওই পথ তৈরি করে মূলত খাদ্যানুসন্ধান বা জীবন নির্বাহের জন্য। কিন্তু নিজ বাসভূমেই আজ উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে জঙ্গলের আদি বাসিন্দা। জঙ্গলে হাতির খাদ্য নেই। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির পেট ভর্তি হতে প্রতি দিন দরকার পড়ে প্রায় দেড়শো কেজি পরিমাণ খাদ্য। তার খাদ্যতালিকায় রয়েছে বুনো বাঁশের মূল, কচি বেত, কলা গাছের ভিতরের সাদা অংশ, শাল গাছের গোঁড়ায় গজানো গুল্ম ইত্যাদি। হাতিও জানে, একটি জঙ্গল দিনের পর দিন ওই পরিমাণ খাদ্য জোগান দিতে পারে না। সেই কারণেই হাতি এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গল ফের সেখান থেকে আরেক জঙ্গলে যায় এবং এক দিন ফেলে যাওয়া জঙ্গলে ফিরে আসে ওই করিডোর বা পথ ধরে আর তত দিনে ছেড়ে যাওয়া জঙ্গল ফের খাদ্যসম্ভারে সেজে ওঠে। এই পরিক্রমণ যেমন নির্দিষ্ট পথ ধরে তেমন নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে। এই কারণেই হাতি দল বেঁধে বাস করে। দুনিয়ার সব জঙ্গলেই হাতির জীবননির্বাহ চলে এই নিয়মে।

elephant attackকিন্তু হাতি তার চেনাজানা পথ এখন প্রায়ই গুলিয়ে ফেলছে। কারণ তার নির্দিষ্ট চলার পথে কখনও গজিয়ে উঠছে বসতি, কখনও রিসোর্টহাতি ওই বাধা টপকে হঠাৎ করে আলাদা পথও তৈরি করে ফেলতে পারছে না। কারণ বনভূমির মধ্যে, নদীর চরে পিলপিল করে গজিয়ে উঠছে মানুষের বসতি এবং নানা ধরনের নির্মাণ। জনপদ থেকে শুরু করে ওইগুলি সবই সম্পূর্ণ ভাবে বেআইনি এবং নিষিদ্ধ। অথচ আমরা বলেই চলেছি লোকালয়ে হাতি হানা দিচ্ছে আর বন দফতরও সেই একই সুর বাজিয়ে চলেছে বহু কাল ধরে। কারণ প্রাথমিক অবস্থা থেকেই প্রশাসন ওই সব বেআইনি ও নিষিদ্ধ বসতি এবং নির্মাণ জেনেবুঝে এড়িয়ে চলেছিল। অথচ হাতি তার অভ্যস্ত পথ ধরে চলাফেরা করলেই আমরা এবং প্রশাসন বলছি অনুপ্রবেশ, হাতির হানাসেই আক্রমণ রুখতে তৎপর প্রশাসন এমনকি সরকারও। তা হলে কি বুঝতে হবে যে নিজের বাসভুমেই আজ আদি বাসিন্দারা উদ্বাস্তু, জঙ্গলে তাদের দিন ফুরিয়ে এল বলে?

 

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: ভারতীয় ক্রিকেট-বিপ্লবের দুই কারিগর

শ্রয়ণ সেন

১০ নভেম্বর, ২০০০। ঢাকায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্ট খেলছে নামছে ভারত। প্রথম বার সাদা জার্সিতে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিতে চলেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ভারতীয় ড্রেসিং রুমে থেকে দেখা যাচ্ছে এক বিদেশি মুখকে। জন রাইট (John Wright)।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ওই টেস্টটা সৌরভের যেমন অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্ট তেমনই ভারতের প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে জন রাইটেরও।

পরবর্তী সাড়ে চার বছর ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সুবর্ণ অধ্যায় ছিল। সেই অধ্যায়ে অর্জুন যদি হন সৌরভ, তা হলে নিঃসন্দেহে তাঁর দ্রোণাচার্য হলেন জন রাইট।

কী অদ্ভুত সমাপতন না! আজই গুরু পূর্ণিমা। আবার ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম বিদেশি কোচের জন্মদিন। তিন দিনের মাথায় অর্জুনেরও জন্মদিন।

২০০০ সালটা ভারতীয় ক্রিকেটের কাছে মহাপরিবর্তনের যুগ ছিল। মার্চেই ভারতীয় দলের ব্যাটনটা সচিনের হাত থেকে সৌরভের হাতে চলে আসে।

কিন্তু তার পরের কয়েক মাস, সৌরভদের কাছে অত্যন্ত কঠিন একটা সময় ছিল। গড়াপেটার কলঙ্ক লেগে গিয়েছে ভারতীয় দলে। সাসপেন্ড হয়েছেন একাধিক সিনিয়র ক্রিকেটার।

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি থেকে ভারতীয় দলকে টেনে বের করে আনার দায়িত্ব নেন সৌরভ, সচিন, দ্রাবিড়রা। সেই সঙ্গে জুটে যান যুবরাজ, জাহির খানদের মতো জুনিয়র। ২০০০-এর অক্টোবরেই বাজিমাত। সবাইকে চমকে দিয়ে আইসিসি মিনি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের রানার্স আপ। অল্পের জন্য ট্রফি হাতছাড়া। গ্রুপ স্টেজে অস্ট্রেলিয়া আর সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা বধ করে আসা। ভারতীয় ক্রিকেটের চরিত্রটা কিন্তু বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে।

এই চারিত্রিক বদলের ব্যাপারটি পূর্ণ মর্যাদা পেল জন রাইটের আগমনে। বিদেশি কোচের সুবিধা হল, তাঁর মধ্যে প্রাদেশিকতার কোনো ব্যাপার থাকে না, যেটা দেশি কোচদের নিয়ে সব থেকে বড়ো সমস্যার।

জন রাইটকে ভারতীয় দলের কোচ করে আনার পেছনে রাহুল দ্রাবিড়ের (Rahul Dravid) একটা ছোট্ট কিন্তু মহৎ ভূমিকা রয়েছে।

রাইটের কথা প্রথমে সৌরভকে বলেন দ্রাবিড়ই। ২০০০-এর গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডে কেন্টের হয়ে কাউন্টি খেলেন দ্রাবিড়। সেই দলেরই কোচ ছিলেন রাইট। তখন সৌরভ আবার খেলছেন ল্যাঙ্কাশায়ারে। সেখান থেকে সৌরভের সঙ্গেও রাইটের পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

এর পরেই বিশ্ব দেখল সৌরভ আর রাইটের সেই বিখ্যাত জুটি। সৌরভ-রাইট জুটির প্রথম পরীক্ষা ছিল ২০০১-এর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তিন টেস্টের সিরিজটা।

স্টিভ ওয়ের অস্ট্রেলিয়া তখন অশ্বমেধের ঘোড়া। টানা ১৫টা টেস্ট জিতে ভারতে পা রেখেছে। বিপক্ষে ভারত তখন একঝাঁক তরুণ, অভিজ্ঞতাও সে ভাবে কম। তা এ হেন অস্ট্রেলিয়া যখন প্রথম টেস্টেই ভারতের ওপরে বুলডোজার চালিয়ে দিয়ে গেল, কেউ হয়তো কল্পনাই করতে পারেননি যে পরের দু’টো টেস্ট জিতে ভারত ইতিহাস গড়বে।

কিন্তু সেটাই করে দেখাল বদলে যাওয়া ভারত। সিরিজ শুরু হওয়ার আগে পঞ্জাবের তরুণ অফ স্পিনার হরভজন সিংহের হয়ে প্রবল জোরে গলা ফাটিয়েছিলেন সৌরভ। অবশ্যই রাইটের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল এই ব্যাপারে।

এই হরভজনই ভারত আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে তফাতটা গড়ে দিয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে উঠে এলেন ভিভিএস লক্ষ্মণও। ইডেনে দ্বিতীয় টেস্টে ফলোঅন করে ভারত কার্যত পরাজিত হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। রাহুল দ্রাবিড়কে সঙ্গে নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন লক্ষ্মণ। পঞ্চম দিনের শেষ লগ্নে এসে ঐতিহাসিক জয় পেল ভারত। এর পর চেন্নাইয়ের শেষ টেস্টও জিতে নিয়ে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফি দখল করে নিল ভারত।

স্টিভ ওয়ের ‘ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’ দখল করার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।

ভারতের মাটিতে ট্রফি জয় এক জিনিস আর সেই ট্রফিটাই যখন বিদেশের মাটি থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়, তার মাহাত্ম্য আরও অনেকটাই বেশি।

আড়াই বছর পর, ২০০৩-০৪-এর শীতটা ভারতীয় ক্রিকেটে আরও এক সোনালি মুহূর্ত নিয়ে এল। এ বার সিডনি থেকে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফিটি ভারতে নিয়ে চলে এলেন সৌরভ। স্টিভ ওয়, রিকি পন্টিংরা হাঁ করে দেখতে থাকলেন।

না, ওই সিরিজটা ভারতের জেতা হয়নি। চার টেস্টের সিরিজ অমীমাংসিত ভাবে শেষ হয়েছিল ১-১। কিন্তু শেষ টেস্টের শেষ বিকেলে স্টিভ ওয় ও রকম প্রতিরোধ না গড়ে তুললে ২-১ ব্যবধানে সিরিজটা যে ভারতই জিতত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তার বছর দুয়েক তিনেক আগে থেকেই বিদেশে টেস্ট ম্যাচ জেতা রপ্ত করতে শিখেছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। ২০০১-এ জিম্বাবোয়ে আর শ্রীলঙ্কায় টেস্ট ম্যাচ জিতলেও ২০০২-টা ছিল মোড়ঘোরানো বছর।

ওই বছর এপ্রিল-মে’তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে পোর্ট অব স্পেনে ঐতিহাসিক টেস্ট জিতল ভারত। দুর্ভাগ্যবশত, পরের দু’টি টেস্ট হেরে যাওয়ার ফলে সিরিজটা জেতা হয়নি, কিন্তু তার মাস তিনেকের মধ্যেই ইংল্যান্ডে আরও বড়ো সাফল্য এলে ভারতীয় দলের জন্য।

হেডিংলি টেস্টে জয় আজও বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দলের সেরা টেস্ট জয়ের মধ্যে একটি হিসেবে গণ্য হয়। ওই টেস্টে ইনিংসে জয়ের হাত ধরে, ইংল্যান্ডে মাটিতে টেস্ট সিরিজ অমীমাংসিত রাখার বিরাট কৃতিত্ব অর্জন করল ভারত।

তখন থেকেই ভারতীয় ক্রিকেটের ভাবমূর্তি বদলাতে শুরু করেছে। ভারত আর ‘বিদেশের মাঠে শক্ত পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র’ নয়। সৌরভের ‘চোখে চোখ রেখে কথা বলা’ মনোভাবের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় দল তখন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

হরভজনের পাশাপাশি আরও কয়েক জন তরুণের আগমন ঘটল ভারতীয় দলে, যারা নিজেরাই এক একজন ম্যাচ উইনার। একদিনের ব্যাটিং তো বটেই, ভারতীয় ফিল্ডিং নতুন রূপ পেল যুবরাজ সিংহ আর মহম্মদ কাইফের আগমনে। অন্য দিকে বীরেন্দ্র সহবাগকে মিডিল অর্ডার থেকে ওপেনার হিসেবে তুলে আনা একটি বিশাল বড়ো মাস্টারস্ট্রোক ছিল, তা তো পরের কয়েকটি বছরেই জানা যায়।

আর প্রতিপক্ষ শিবিরে থরহরিকম্প ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতীয় দলে আগমন ঘটল জাহির খান আর আশিস নেহরার।

সৌরভ-রাইট জুটি আরও একটি মাস্টারস্ট্রোকীয় চাল চাললেন। রাহুল দ্রাবিড়কে এক দিনের দলে উইকেটকিপার করে আনা। দ্রাবিড়ের এক দিনের ব্যাটিং ফর্ম কিছুটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে এক দিনের দল থেকে বাদ পড়েছিলেন।

কিন্তু সৌরভ-রাইট বুঝতে পারে, দ্রাবিড়ের মতো ব্যাটসম্যানকে এক দিনের দলের বাইরে রাখা উচিত নয়। এর ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মরল। ভারতীয় দলে বাড়তি ব্যাটসম্যানও এল, আর উইকেটে পেছনে মোটামুটি নির্ভরযোগ্য একজনকে পাওয়াও গেল।

উইকেটকিপার হিসেবে দ্রাবিড় কতটা দক্ষ ছিলেন, সেটা তো ২০০৩ বিশ্বকাপেই দেখেছি আমরা। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সময়েও ব্যাট হাতেও বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

এই বিশ্বকাপটি সৌরভ-রাইট জুটির আরও একটা সাফল্যগাথা বলা যায়। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের চমকে দিয়ে টানা ৮টা ম্যাচ জিতে ভারত চলে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে। পরাজিত হল এমন একটা অস্ট্রেলিয়ার দলের কাছে, যারা ওই সময়ে অন্য গ্রহের কোনো দলের মতো খেলছিল। এই হারে কোনো লজ্জা ছিল না, বরং রানার্স হওয়ার জন্য দেশবাসীর চূড়ান্ত বাহবা কুড়িয়েছিল সৌরভের ভারত।

সাফল্য তো আরও বাকি। ১৫ বছর পর পাকিস্তান সফর করে টেস্ট আর এক দিনের সিরিজ দু’টোই বাগিয়ে আনা।

কিন্তু সৌরভ-রাইট জুটির এই সাফল্যগাথাটা আচমকাই ফিকে হতে শুরু করে। ২০০৪-এ অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার ভারত আগমন দিয়ে শুরু। দেশের মাঠে সিরিজ হেরে যায় ভারত, যা এক সময়ে অকল্পনীয় ছিল কার্যত। এর কয়েক মাস পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও দেশের মাঠে টেস্ট সিরিজ জিততে ব্যর্থ হয় ভারত।

সৌরভ আর রাইটের জুটিও ভেঙে যায়। ২০০৫-এর এপ্রিলের ভারতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে যান তিনি। এর পর আগমন হয় গ্রেগ চ্যাপেলের। তার পরের দু’ বছর ভারতীয় দল কী রকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তা তো আমরা জানিই।

কী কাকতালীয়, রাইটের চলে যাওয়া আর ক্রিকেট-রাজনীতির শিকার হয়ে সৌরভের অধিনায়কত্ব আর দলে জায়গা হারানো প্রায় একই সময়ে ঘটেছে।

রাইট আর সৌরভের মধ্যে ছোটোখাটো কিছু মিলও রয়েছে। প্রথমত, দু’জনেই বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান। রাইট দু’ ধরনের ক্রিকেটেই ওপেনার ছিলেন, সৌরভ একদিনের ক্রিকেটে ওপেনিংয়ে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন। আবার দু’ জনেই টেস্টে দু’বার করে ৯৯-এ আউট হয়েছেন।

খেলার দুনিয়ায় কিছু কিছু কোচ-অধিনায়ক জুটি হয়, যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। এমনই একটি জুটিই ছিলে সৌরভ আর রাইটের মধ্যে। ঠিক যেমন ২০১১ বিশ্বকাপের সময়ে গ্যারি কার্স্টেন আর মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মধ্যে জুটি ছিল।

গত বছর বিশ্বকাপের সময়ে একটি টিভি সাক্ষাৎকারে একসঙ্গে দেখা সৌরভ আর রাইটের। রাইটকে উদ্দেশ করে সৌরভ সরাসরিই বলে দেন, “আমার প্রিয় কোচ।”

রাইট বলেন, “ভারতকে কোচিং করানোর ব্যাপারটা আমার কাছে খুব সম্মানের ছিল। শুরুটা দু’ জনের কাছেই খুব শক্ত ছিল। কিন্তু আমাদের দু’ জনের কাছেই প্রমাণ করার তাগিদ ছিল কোচ আর অধিনায়ক হিসেবে আমরা দু’ জনই ভারতীয় ক্রিকেটে সাফল্য এনে দিতে পারি।”

দু’ দশক হয়ে গেল একটা দলের স্বার্থে এই দু’ জন লোক হাত মিলিয়েছিল। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভারতীয় ক্রিকেটের যুগান্তকারী পরিবর্তনের কান্ডারি এই দু’ জন।

শুভ জন্মদিন জন রাইট। জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

চিরঞ্জীব পাল

সে দিনটা ছিল সূর্যগ্রহণের ঠিক আগের দিন। সকালবেলা বাড়ির পরিচারিকা ঘর মুছতে মুছতে বলল, ‘‘বৌদি কাল সূর্যগ্রহণ। সাড়ে ন’টা থেকে শুরু হবে। তাড়াতাড়ি রান্না–খাওয়া করে নিও। ও বাড়ির বৌদি বলছিল।’’

‘ও বাড়ির বৌদি’ মানে আমার বাড়িতে কাজে আসার আগে যে বাড়িতে ও কাজ করে এসেছে সে-ই বাড়ির মালকিন। ভদ্রমহিলা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। 

মেয়েটির কথা শুনে খুব একটা অবাক হইনি, কিন্তু যখন ও বৌদির প্রসঙ্গ তুলল তখন একটু ধাক্কা খেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার জানা জগৎটা এখনও অনেকটা অজানা। এক পা আগে দু’ পা পিছে করতে গিয়ে আমরা কখন যেন শুধু পেছনেই হাঁটতে শুরু করেছি। পিছনে হাঁটাতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা হয়েও উপদেশ দেন সূর্যগ্রহণের সময় না-খাওয়ার। অথচ সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার। আমরা সবাই জানি কেন সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ হয়। টিভিতে লাইভ সূর্যগ্রহণ দেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ টেলিকাস্ট হয়। তবুও গ্রহণের সময় না-খাওয়ার কুসংস্কারটা আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে। ঠিক যেন বাপ-ঠাকুর্দার দেওয়া ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো। যুক্তিবোধ সেখানে ঠুনকো।

অন্তহীন এক গ্রহণ

সূর্যগ্রহণের ঠিক দু’দিন পর মারা গেলেন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। খবরটা পেয়ে মনে হল আমার জানা একটা সূর্য ঢাকা পড়ে গেল মৃত্যুর ছায়ায়। সেই সূর্য আর গ্রহণ ছেড়ে বেরোবে না। তবে কি পৃথিবীটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে?

একটা ফোন কিছু মুহূর্ত

সাল: ২০০২।

হ্যালো স্যার? আমাদের পাড়ায় একটা স্লাইড শো করব?

কবে করবে বাবা! আগামী সপ্তাহ আমি পারব না। তার পরে একটা দিন ঠিক করো।

দিন ঠিক করলাম। ফোনে জানালাম স্যারকে। স্যার মানে অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’ দিন ধরে চলল মাইক-প্রচার। অনুষ্ঠানের দিন যথা সময়ে তিনি হাজির হলেন। স্লাইড রেডি করে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু লোক নেই। মাইকে ঘোষণা চলছে। কেউ কেউ উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে সরে পড়ছেন। উদ্যোক্তা হিসাবে আমাদের অবস্থা তো কাহিল। গা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। এই বুঝি স্যার বলেন, লোক জোগাড় করতে পারবে না যখন আমাকে ডাকলে কেন। জল মাপার জন্য গুটি গুটি পায়ে ওঁর কাছে গেলাম। বললাম, স্যার দশ মিনিট বাদে শুরু করুন লোকজন চলে আসবে। 

স্যার বললেন, ঠিক আছে বাবা, একটু দেখে নিই, যে ক’জন আছে তাদের নিয়েই শুরু করব। 

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

মনে মনে গুণে দেখলাম জনা ছয়েক দর্শক আছেন। এঁদের মধ্যে একজন একটি স্কুলের দিদিমণি, তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বেগতিক দেখে ক্লাবের বাইরে বসে থাকা কয়েক জন বিহারী মিস্ত্রিকে বললাম, মাঠে যাও চাঁদ-তারা দেখাবে। তাঁরা প্রতি দিন এই সময় কাজ থেকে ফিরে গল্প করেন। আমাদের কথা শুনে তাঁরা মাঠে গিয়ে বসলেন। শুরু হল স্লাইড শো। মিনিট তিনেক চলার পর পরিস্থিতি বদলে গেল। ছোটো মাঠ ভরে গেল দর্শকে। মহাবিশ্বের নানা রহস্য একের পর এক উজাড় করে দিচ্ছেন স্যার। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে। জলে যে ভাবে মাছ থাকে কখন যে তিনি সে ভাবে দর্শকের মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন কেউ বুঝতে পারেনি। মনের মধ্যে সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি আরও গভীরে পৌঁছোতে চাইছেন। শো চলাকালীন কেউ বেরোলেন না। এমনকি ওই মিস্ত্রিরাও না।

শো-এর শেষ পর্বে উনি মহাকাশকে ঘিরে কুসংস্কার প্রসঙ্গে বললেন। এল গ্রহণের সময় না খাওয়ার প্রসঙ্গও। আক্ষরিক অর্থে জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন যে, গ্রহণের সময় খেলে কোনো ক্ষতি হয় না।

এ রকমই মন্ত্রমুগ্ধতা দেখেছিলাম নৈহাটি পুরসভার হলে একটি অনুষ্ঠানে। হল ‘হাউসফুল’। অনেকে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যেন নামী কোনো নায়কের ছবির প্রথম শো। আলো নেভার কিছুক্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্রমুগ্ধতা।

মাটির কাছাকাছি এক তারা

পৃথিবী থেকে কোটি কোটি যোজন দূরে থাকা তারা, গ্রহ, উপগ্রহ নিয়ে কাজ করেও তিনি যেন মাটির মানুষ। বোঝানোর সময় যথাসম্ভব বাংলা পরিভাষার ব্যবহার, দর্শকদের প্রশ্নগুলো ভালো করে শোনা, তাদের বোধগম্য করে উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি ছিল শিক্ষণীয়। অনেক ‘বড়ো মাপের’ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির একটা ‘তেজরশ্মি’ বেরোয়। সেই রশ্মির কাছে কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে না ‘সাধারণ মানুষ’। অমলেন্দুবাবু নামী জ্যোর্তিবিজ্ঞানী। মাঠেঘাটে গিয়ে স্লাইড দেখানোর সময় তাঁর সেই রশ্মির খোঁজ করেছি। দেখতে পাইনি। তাই তাঁকে ছুঁয়েছি। প্রশ্ন করেছি। 

আমরা জেনেছিলাম, তিনি নারকোল-মুড়ি খেতে ভালোবাসেন। একবার এক ঘরোয়া স্লাইড শোর শেষে তাঁকে মুড়ি-নারকোল খেতে দিয়েছিলাম। কী তৃপ্তি করে যে খেয়েছিলেন!

মৃত্যুকালে অমলেন্দুবাবুর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। আড়াই বছর আগে মেয়েকে নিয়ে সোদপুরে তাঁর একটি স্লাইড শো দেখতে গিয়েছিলাম। শরীরের কারণে গতি শ্লথ হলেও বোঝানার সময় আগের মতোই তারুণ্য উপচে পড়ছিল। সেই স্লাইড শো দেখে মেয়ের প্রশ্ন আর থামে না। 

ভুল ভুল আমি ভুল

না! না! সূর্য কখনও অনন্ত গ্রহণে থাকতে পারে না। আপনজনের মৃত্যুর খবরে ও আমার মনের বিকার। বিড়লা তারামণ্ডলের ডিরেক্টর পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি শুধু বিজ্ঞান গবেষণা করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে স্লাইড নিয়ে ছুটে গেছেন মাঠে ঘাটে। কারণ, তিনি মনে করতেন ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’। এই সত্যিটা না বুঝলে মানতে হবে প্লাস্টিক সাজার্রি করে গণেশের মাথা বসানো হয়েছে কিংবা গোমূত্র সর্বরোগহর।

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বঙ্কিম দত্ত

সম্প্রতি প্রয়াত হলেন (২২-০৬-২০২০) ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। 

নব্বই বছর বয়স পার করেও এই বিশিষ্ট জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং সক্রিয়। এর রহস্য কী জানতে চাইলে, উত্তরে বলতেন, আনন্দের সঙ্গে কাজ, স্বল্পাহার, সরল ও নিয়মানুগ জীবনযাপন। দু’ দশকের বেশি ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গলোভী বর্তমান লেখক বুঝেছেন এগুলো কেবল কথার কথা না। তাঁর জীবনই ছিল তাঁর বাণী।

জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করবেন বলেই বর্ধমানের মুগকল্যাণ গ্রামের স্কুল থেকে সোজা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও গবেষণার কাজ। জ্যোর্তিবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহের বীজ অন্তরে লালিত হয়েছিল বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার পরোক্ষ প্রভাবে। এমএসসি ক্লাসে তাঁর শিক্ষক গণিতবিদ ভি ভি নারলিকার (প্রখ্যাত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকারের বাবা) এ বিষয়ে তাঁকে গবেষণায় আগ্রহী করে তোলেন। প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ৫০-এর বেশি। 

বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা চাইতেন সমাজে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হোক এবং সেই প্রয়োজনে সহজ ভাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বই লিখে তিনি প্রচার করতেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সায়েন্স অ্যান্ড কালচার’ পত্রিকা যাতে সামাজিক অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞানকে প্রয়োগের নানা আলোচনা থাকত। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ও মহাকাশ নিয়ে মানুষের মনে আগ্রহ ও এই বিষয়ে ভুল ধারণা দূর করার জন্য সর্বসাধারণের উপযোগী বই লিখেছেন, রেডিও-দূরদর্শনে বক্তৃতা করেছেন, জ্যোর্তিবিজ্ঞান নিয়ে সহজ ভাষায় প্রচুর প্রবন্ধ (আড়াই হাজারের বেশি) লিখেছেন এবং স্থিরচিত্রের সাহায্যে হাজার হাজার বার (প্রায় ন’ হাজার) আলোচনা করতে ছুটে বেড়িয়েছেন দূরদূরান্তের গ্রাম-শহরে। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাধ সাধতে পারত না বেশির ভাগ সময়েই। জিজ্ঞেস করলে আয়োজকদের অসহায়তার কথা বলতেন। প্রচণ্ড গরমে ঘামছেন, প্রেক্ষাগৃহ দর্শকের ভিড়ে উপচে পড়ছে। তিনি অবিচল, কারণ উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন হলের শীতাতপ ব্যবস্থাটি মহার্ঘ। অনুষ্ঠান শেষে সঙ্গের অ্যাট্যাচি খুলে ভিজে গেঞ্জি পালটে নিলেন যখন, তখনও সমান নির্বিকার। জিজ্ঞেস করলেন, অনুষ্ঠান সবার কেমন লাগল! 

আসলে এই কাজ তিনি ভালোবাসতেন আর একে তিনি সামাজিক দায় হিসাবেই দেখতেন। এমন তো হয়েছেই, যখন দেখেছি অনুষ্ঠানে পৌঁছে দেখা গেল মাত্র কয়েক জন বসে আছেন দর্শক আসনে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অনেকেই ফিরে গেছেন ঘরে। অনুষ্ঠানে স্লাইড নিয়ে মহাকাশের বিষয়ে চিত্তাকর্ষক বক্তব্য রাখলেন অন্য দিনগুলোর মতোই, সমান উৎসাহের সঙ্গে।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

একবার বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন করার জন্য আয়োজকরা স্যারকে (এ ভাবেই আমরা সম্বোধন করতাম) নিয়ে গেছেন। উদ্বোধনের পর স্লাইড চিত্র-সহযোগে বলবেন ‘জ্যোতিষ কেন বিজ্ঞান নয়’ এই প্রসঙ্গে। উদ্বোধনের কাজ শুরু হতে অনেক দেরি হচ্ছে। বিশেষ অতিথি এসে পৌঁছোতে দেরি করছেন। আমরা কয়েক জন রয়েছি সঙ্গে এবং বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলছি। স্যার কিন্তু আমাদের নিরস্ত করছেন। কত কষ্ট করে অর্থ আর শ্রম দিয়ে এ সব মেলা আয়োজন করতে হয়, তাই একদিন আমাদের কষ্ট হলই বা! এই সব কথা তিনি আমাদের বোঝাতেন আন্তরিক ভাবেই। 

জ্যোতিষ-বিরোধিতা প্রসঙ্গে স্যারের ছিল ক্ষুরধার যুক্তি। জ্যোতিষশাস্ত্রের অসারতা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে স্লাইড প্রদর্শনগুলোতে তিনি কোনো বাগাড়ম্বর নয়, ব্যবহার করতেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যকে। আর এ বিষয়ে তাঁর প্রজ্ঞা ছিল অপরিসীম। দীর্ঘদিন (১৯৬৮-১৯৮৮) প্রথমে নটিক্যাল অ্যালামনাক ও পরে এই সংস্থার নাম পরিবর্তন হয়ে তৈরি পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার-এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, বিভিন্ন তিথিগণনা, চন্দ্র-সূর্যের উদয়-অস্তের সময় মাপা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ তারিখ, সময় ধরে পূর্বাভাস দেওয়ার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটা বৈজ্ঞানিক ভাবে ভারতে এই একমাত্র প্রতিষ্ঠানেই হয়।

পজিশনাল অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান যা বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার ফল। যদিও এটি প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর আগেই মেঘনাদ সাহা মারা যান (১৯৫৬)৷ যাদের ধারাবাহিক পরিশ্রমে চিন ও জাপান ছাড়া এশিয়া মহাদেশের তৃতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি রূপ পায় ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অগ্রণী ও অন্যতম প্রধান। জ্যোতিষশাস্ত্রের কারবারিরা এই সংস্থার তথ্যগুলো ব্যবহার করেন কিন্তু দুর্বোধ্য আঁকিবুকি কেটে গ্রহের সঙ্গে মানুষের ভাগ্যের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন যা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। স্যার এ সবের সরব প্রতিবাদ করতেন সব সময়।

তাঁর লেখা ‘জ্যোতিষশাস্ত্র কি বিজ্ঞান?’ বইটি বহূল প্রচারিত৷ বইটির ইংরাজি অনুবাদও যথেষ্ট জনপ্রিয়। বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে জ্যোতিষীদের ভ্রান্ত ধারণা প্রচার ও মানুষকে প্রতারণা তিনি মেনে নেননি কখনোই। প্রাসঙ্গিক ভাবে বলা যায় যে এর ফলে প্রমাদ গুনলেন একদল জ্যোতিষী। অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা প্রাণনাশের হুমকি দিলেন – অবিলম্বে এ সব প্রচার বন্ধ করতে হবে। অবশ্য সে যাত্রায় ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন রক্ষা পায় পুলিশ প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ অফিসারের সক্রিয় ভূমিকায়। উল্লেখযোগ্য যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জ্যোতিষ-বিরোধিতায় তিনি ছিলেন অবিচল যা মেঘনাদ সাহার  ভূমিকার উজ্জ্বল অনুসরণকেই মনে করিয়ে দেয় আমাদের।

Continue Reading
Advertisement
দেশ7 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ২৪৮৭৯, সুস্থ ১৯৫৪৭

currency
শিল্প-বাণিজ্য3 days ago

পিপিএফের ৯টি নিয়ম, যা জেনে রাখা ভালো

কলকাতা22 hours ago

কলকাতায় লকডাউনের আওতায় পড়া এলাকাগুলির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত

রাজ্য2 days ago

পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু জায়গায় ফের কড়া লকডাউনের জল্পনা

দেশ2 days ago

দ্রুত গতিতে বাড়ছে সুস্থতা, ভারতে এক সপ্তাহেই করোনামুক্ত লক্ষাধিক

ক্রিকেট3 days ago

ওপেনার সচিন তেন্ডুলকরের গোপন রহস্য ফাঁস করলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

দেশ3 days ago

গালোয়ান উপত্যকা থেকে চিন সেনার পিছু হঠার পেছনেও অজিত ডোভালের ভূমিকা

বিদেশ2 days ago

অনলাইনে ক্লাস করা ভিনদেশি পড়ুয়াদের আমেরিকা ছাড়তে হবে, নির্দেশ ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 days ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

কেনাকাটা3 days ago

রান্নাঘরের টুকিটাকি প্রয়োজনে এই ১০টি সামগ্রী খুবই কাজের

খবরঅনলাইন ডেস্ক : লকডাউনের মধ্যে আনলক হলেও খুব দরকার ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভালো। আর বাইরে বেরোলেও নিউ নর্মালের সব...

কেনাকাটা4 days ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

DIY DIY
কেনাকাটা1 week ago

সময় কাটছে না? ঘরে বসে এই সমস্ত সামগ্রী দিয়ে করুন ডিআইওয়াই আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক :  এক ঘেয়ে সময় কাটছে না? ঘরে বসে করতে পারেন ডিআইওয়াই অর্থাৎ ডু ইট ইওরসেলফ। বাড়িতে পড়ে...

নজরে