রবিবারের পড়া ১ / ঠিক ৪০ বছর আগের ১৬ আগস্ট

0

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

মায়ের সঙ্গে একবার গঙ্গাস্নান করতে বাবুঘাটে এসে ছেলেটি অবাক হয়ে দেখেছিল, একটু দূরে সেনাব্যারাকের পাশের মাঠে একদল গোরা একটা পেটমোটা গোল জিনিস নিয়ে খেলছে, ছুটছে, পায়ে পায়ে কেড়ে নিচ্ছে…। হঠাৎ ফেনসিং-এর ধারে সেই গোল জিনিসটা চলে এল। একজন গোরা ছুটে এসে সেটা চাইল। ছেলেটি তৎক্ষণাৎ সেই গোল জিনিসটা তুলে নিয়ে গোরার দিকে ছুড়ে দিল। তার পর তার ফিরে আসা মায়ের সঙ্গে। কিন্তু মনের মধ্যে সেই মুহূর্তগুলো জ্বলজ্বল করতে লাগল। ভাবনায় বার বার ঘুরে ঘুরে আসতে লাগল।

Loading videos...

ছেলেটি কলকাতার হেয়ার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তার অভিজ্ঞতার কথা বন্ধুদের কাছে বলল। জানল, ওই পেটমোটা গোল বস্তুটা হল ‘বল’, আর খেলাটার নাম ‘ফুটবল’। ছেলেটির নাম নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। তারই উদ্যমে কেনা হল একটি বল। সেই জোগাড় করল তার স্কুলের সহপাঠীদের। নামল সবাই মিলে মাঠে, শুরু হল খেলা। কিন্তু সে খেলা ছিল এলোপাথাড়ি – যে যে দিকে পারে ছুটছে, এলোপাথাড়ি লাথি মারছে, বল পায়ে পেলে যে দিকে খুশি মেরে দিচ্ছে – সে এক হট্টগোলের হল্লাগুল্লা খেলা।

১৮৭৯-এর সেই গোড়ার কথা

পাশেই হিন্দু কলেজ। সেখানকার কয়েক জন ছাত্রও জুটে গেল তাদের সঙ্গে। কয়েক দিন পরে হিন্দু কলেজের (পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ, অধুনা বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক বি ভি স্ট্যাকের নজরে পড়ল ঘটনাটা। শেষে তিনিই উদ্যোগী হয়ে নিয়ে এলেন নতুন বল। শেখালেন খেলার নিয়মকানুন। ছাত্রদের দু’ দলে ভাগ করে দিয়ে তিনিই রেফারি হিসাবে মুখে বাঁশি নিয়ে মাঠে নামলেন। শুরু হল বাংলার মাটিতে ফুটবলের ইতিহাস। সময়টা ১৮৭৯।

নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী।

তখন থেকেই শুরু বাংলা ও বাঙালির ফুটবল-ইতিহাসের অগ্রগতি। একে একে জন্ম নিল ওয়েলিংটন ক্লাব (পরে টাউন ক্লাব), শোভাবাজার ক্লাব, মোহনবাগান ক্লাব, ইস্টবেঙ্গল ক্লাব, মহমেডান স্পোর্টিং, ঢাকার ওয়েলিংটন ক্লাব (পরে উয়াড়ি ক্লাব), ঢাকা স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি। বাঙালির আবেগে, রক্তে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হল ফুটবলের আকর্ষণ, উত্তেজনা। স্বামী বিবেকানন্দও তাঁর কৈশোরকালে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন। অনুভব করেছিলেন ফুটবল খেলার মাধ্যমে শরীরচর্চার তাৎপর্য, তাই ডাক দিতে পেরেছিলেন ফুটবল খেলতে।

ফুটবল খেলার মধ্য দিয়ে একটা জাতিয়তাবাদী সত্তা ও আবেগ জন্ম নিয়েছিল পরাধীন ভারতবর্ষে। তাই তো বোধহয় ১৯১১-তে ১১ জন বাঙালির যুবকের খালি পায়ে লড়াই বাঙালিকে ইংরেজের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল।

গত শতকের প্রতিটি দশকে বাঙালি ও ফুটবল একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। আর সেই খেলার ২২ জন খেলোয়াড় ছাড়া বাকি যে বিরাট অংশ – সেই বঙ্গসন্তানেরা কখনও মাঠের ধারে, কখনও বা গ্যালারিতে বা রেডিও ধারাবিবরণীতে মশগুল হয়ে থাকত। প্রিয় দলের জেতা-হারায় ছিল আনন্দ-দুঃখের অভিব্যক্তি। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, মফস্‌সলে কৈশোর, যৌবন ফুটবল খেলার প্রতি ছিল নিবেদিত প্রাণ। সেই আবেগ এমনই ছিল বা বলা যায় আজও আছে, যে বিশ্ব ফুটবলের প্রতিযোগিতায় বাঙালি দলে দলে বিভক্ত হয়ে যায় – ব্রাজিল, আর্জেন্তিনা, জার্মানি, ইংল্যান্ড ইত্যাদির পক্ষে। ঠিক যেমন, দেশের মাটিতে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহমেডান…।

সেই দিনটিতে ফুটবল কাঁদিয়েছিল

সেই ফুটবল খেলা, যা বাঙালিকে আনন্দ দেয়, উত্তেজনায় ভরপুর করে তোলে, শপথে-প্রতিজ্ঞায় সুদৃঢ় করে তোলে, সেই ফুটবল বাঙালিকে কাঁদিয়েও তোলে, যখন বাঙালির মনে পড়ে আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগের একটি দিনের ইতিহাস, যে দিন ফুটবলের চোখে নেমেছিল কান্না, হাহাকার।

দিনটা ছিল ১৯৮০ সালের ১৬ আগস্ট। খেলার নন্দনকানন ইডেন গার্ডেনস। কলকাতা লিগের ডার্বি ম্যাচ – প্রতিপক্ষ দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল। গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। দর্শকসংখ্যা ৭০ হাজারের কিছু বেশি। রেডিওতে কান পেতেছে লক্ষ লক্ষ ফুটবলপ্রেমী। দূরদর্শনে চোখ রেখেছে আরও অনেকে। মোহনবাগানের ক্যাপ্টেন কম্পটন দত্ত আর ইস্টবেঙ্গলের সত্যজিৎ মিত্র। রেফারি সুধীন চ্যাটার্জি।

টানটান উত্তেজনায় শুরু হল খেলা। দু’ পক্ষই অঙ্গীকারবদ্ধ – জিততেই হবে। গ্যালারিতে সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে দর্শকদের অন্তরে অন্তরে – শরীরী ভাষায় আর তাদের শিরায় শিরায় বইছে উত্তেজিত রক্তস্রোত। খেলা এগোচ্ছে, দু’ দলই মরিয়া তাদের সম্মান-ঐতিহ্য অটুট রাখতে। মাঠের মধ্যে ৯০ মিনিটের প্রতি সেকেন্ডে খেলোয়াড়দের যেমন চোয়াল শক্ত করে চলছে লড়াই, ঠিক তেমনই গ্যালারির বুকে হাজার হাজার সমর্থকের হৃদপিণ্ডে চড়ছে উত্তেজনার পারদ। এক সময় খেলা শেষ হল, ফল ০-০। কিন্তু ততক্ষণে মাঠের গ্যালারিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্যালারিতে শুরু হয়ে গিয়েছিল বিশৃঙ্খলা, ভেঙে পড়েছিল প্রশাসনিক দৃঢ়তা। দর্শকরা যে যার মতো করে প্রাণ হাতে করে ছুটতে শুরু করল। দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হাজার হাজার মানুষ। কে রইল পেছনে, কে রইল পায়ের নীচে – সে সব চিন্তা তখন কারও নেই। সবার অবস্থা তখন ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’।            

সে দিনের বিশৃঙ্খলা।

ঘটে গেল কলকাতার ফুটবলের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ঘটনা। পদপিষ্ট হয়ে মারা গেলেন ১৬ জন ফুটবলপ্রেমী – ১৯৮০-র ১৬ আগস্ট। সারা মাঠ, সারা শহর, বাংলার গ্রাম-গঞ্জ-মফস্‌সল সে দিন হতবাক, শোকে বিহ্বল। হাহাকারে, আর্তনাদে ভরে গিয়েছিল বাঙালির মন-প্রাণ।

খেলা দেখতে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরল না ১৬টি তরতাজা প্রাণ – হিমাংশুশেখর দাস, উত্তম ছাউলে, কার্তিক মাইতি, সমীর দাস, অলোক দাস, সনৎ বসু, বিশ্বজিৎ কর, নবীন নস্কর, কার্তিক মাজী, ধনঞ্জয় দাস, প্রশান্তকুমার দত্ত, শ্যামল বিশ্বাস, রবীন আদক, মদনমোহন বাগলি, অসীম চ্যাটার্জি এবং কল্যাণ সামন্ত। সে দিন আহত হয়েছিল কয়েকশো ফুটবলপ্রেমী দর্শক।

১৬ আগস্টের সন্ধ্যা-রাত্রি ভীষণ ভারী হয়ে উঠেছিল বাংলার বুকে, বড়ো দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল, কিছুতেই সকাল হতে চাইছিল না সেই রাত। ঘরে ঘরে প্রিয়জনদের উদগ্রীব অপেক্ষা – ছেলেটা ঘরে ফিরল? পাড়ায় পাড়ায় জিজ্ঞাসা – ছেলেটা ফিরেছে? সারা বাংলা সে দিন গুমরে গুমরে কাটিয়েছিল নিদ্রাহীন রাত।

পরের দিন প্রভাতী সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রকাশিত খবরের অক্ষরগুলো যেন কেঁদে উঠেছিল। আকাশবাণীতে ঝরে পড়েছিল কষ্টের উচ্চারণ ‘সংবাদ বিচিত্রা’য়। উপেন তরফদারের উপস্থাপনায় প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল উত্তম ছাউলে, মদনমোহন বাগলিদের (তখনও পর্যন্ত সকলের নাম জানা যায়নি) প্রতি। সে দিন বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ শুনেছিলেন সেই অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে শোনা গিয়েছিল এক সন্তানহারা পিতার আর্তনাদ – খো…কা, খো…কা।  

‘খেলার মাঠে কারও খোকা আর না হারায় দেখো’

বাংলার মানুষ শুনেছিলেন বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম নক্ষত্র সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা সেই ঐতিহাসিক গান – ‘খেলা ফুটবল খেলা, খোকা দেখতে গেল সেই সকালবেলা’। সেই সন্তানহারা পিতার কান্নাই বোধহয় তাঁকে দিয়ে এই গান লিখিয়ে নিয়েছিল। গানটিতে সুর দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সুরকার নচিকেতা ঘোষের পুত্র সুপর্ণকান্তি ঘোষ। গেয়েছিলেন মান্না দে।

গানটি ১৯৮১ সালের সরস্বতী পুজোর আগে এইচএমভি থেকে প্রকাশ করা হয়। ফুটবল-শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ক্যালকাটা স্পোর্টস জার্নালিস্টস ক্লাব এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেই অনুষ্ঠানেই ওই গানটি প্রকাশ করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন স্বয়ং মান্না দে, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপর্ণকান্তি ঘোষ, সেই সময়কার অ্যাডভোকেট জেনারেল স্নেহাংশুকান্ত আচার্য, পি কে ব্যানার্জি, চুণী গোস্বামী, সুঁটে ব্যানার্জি, পঙ্কজ রায়, বিদেশ বসু, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, কম্পটন দত্ত, সত্যজিৎ মিত্র-সহ বাংলার ক্রীড়া ও সংস্কৃতি জগতের নক্ষত্ররা।

গানটি ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ মিনিটের। শেষে সন্তানহারা পিতার সেই মর্মস্পর্শী আবেদন প্রোথিত হয়ে যায় বাঙালির মর্মস্থলে – ‘তোমরা আমার একটা কথাই রেখো / খেলার মাঠে কারও খোকা আর না হারায় দেখো’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.