Connect with us

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া ২: অমলেন্দু স্যারকে যেমন দেখেছি

Published

on

চিরঞ্জীব পাল

সে দিনটা ছিল সূর্যগ্রহণের ঠিক আগের দিন। সকালবেলা বাড়ির পরিচারিকা ঘর মুছতে মুছতে বলল, ‘‘বৌদি কাল সূর্যগ্রহণ। সাড়ে ন’টা থেকে শুরু হবে। তাড়াতাড়ি রান্না–খাওয়া করে নিও। ও বাড়ির বৌদি বলছিল।’’

Loading videos...

‘ও বাড়ির বৌদি’ মানে আমার বাড়িতে কাজে আসার আগে যে বাড়িতে ও কাজ করে এসেছে সে-ই বাড়ির মালকিন। ভদ্রমহিলা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। 

মেয়েটির কথা শুনে খুব একটা অবাক হইনি, কিন্তু যখন ও বৌদির প্রসঙ্গ তুলল তখন একটু ধাক্কা খেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার জানা জগৎটা এখনও অনেকটা অজানা। এক পা আগে দু’ পা পিছে করতে গিয়ে আমরা কখন যেন শুধু পেছনেই হাঁটতে শুরু করেছি। পিছনে হাঁটাতে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা হয়েও উপদেশ দেন সূর্যগ্রহণের সময় না-খাওয়ার। অথচ সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার। আমরা সবাই জানি কেন সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ হয়। টিভিতে লাইভ সূর্যগ্রহণ দেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ টেলিকাস্ট হয়। তবুও গ্রহণের সময় না-খাওয়ার কুসংস্কারটা আঁকড়ে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে। ঠিক যেন বাপ-ঠাকুর্দার দেওয়া ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো। যুক্তিবোধ সেখানে ঠুনকো।

অন্তহীন এক গ্রহণ

সূর্যগ্রহণের ঠিক দু’দিন পর মারা গেলেন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। খবরটা পেয়ে মনে হল আমার জানা একটা সূর্য ঢাকা পড়ে গেল মৃত্যুর ছায়ায়। সেই সূর্য আর গ্রহণ ছেড়ে বেরোবে না। তবে কি পৃথিবীটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে?

একটা ফোন কিছু মুহূর্ত

সাল: ২০০২।

হ্যালো স্যার? আমাদের পাড়ায় একটা স্লাইড শো করব?

কবে করবে বাবা! আগামী সপ্তাহ আমি পারব না। তার পরে একটা দিন ঠিক করো।

দিন ঠিক করলাম। ফোনে জানালাম স্যারকে। স্যার মানে অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’ দিন ধরে চলল মাইক-প্রচার। অনুষ্ঠানের দিন যথা সময়ে তিনি হাজির হলেন। স্লাইড রেডি করে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু লোক নেই। মাইকে ঘোষণা চলছে। কেউ কেউ উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে সরে পড়ছেন। উদ্যোক্তা হিসাবে আমাদের অবস্থা তো কাহিল। গা দিয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। এই বুঝি স্যার বলেন, লোক জোগাড় করতে পারবে না যখন আমাকে ডাকলে কেন। জল মাপার জন্য গুটি গুটি পায়ে ওঁর কাছে গেলাম। বললাম, স্যার দশ মিনিট বাদে শুরু করুন লোকজন চলে আসবে। 

স্যার বললেন, ঠিক আছে বাবা, একটু দেখে নিই, যে ক’জন আছে তাদের নিয়েই শুরু করব। 

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ১: এক অমল বিজ্ঞানী ড. অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

মনে মনে গুণে দেখলাম জনা ছয়েক দর্শক আছেন। এঁদের মধ্যে একজন একটি স্কুলের দিদিমণি, তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বেগতিক দেখে ক্লাবের বাইরে বসে থাকা কয়েক জন বিহারী মিস্ত্রিকে বললাম, মাঠে যাও চাঁদ-তারা দেখাবে। তাঁরা প্রতি দিন এই সময় কাজ থেকে ফিরে গল্প করেন। আমাদের কথা শুনে তাঁরা মাঠে গিয়ে বসলেন। শুরু হল স্লাইড শো। মিনিট তিনেক চলার পর পরিস্থিতি বদলে গেল। ছোটো মাঠ ভরে গেল দর্শকে। মহাবিশ্বের নানা রহস্য একের পর এক উজাড় করে দিচ্ছেন স্যার। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে। জলে যে ভাবে মাছ থাকে কখন যে তিনি সে ভাবে দর্শকের মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন কেউ বুঝতে পারেনি। মনের মধ্যে সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি আরও গভীরে পৌঁছোতে চাইছেন। শো চলাকালীন কেউ বেরোলেন না। এমনকি ওই মিস্ত্রিরাও না।

শো-এর শেষ পর্বে উনি মহাকাশকে ঘিরে কুসংস্কার প্রসঙ্গে বললেন। এল গ্রহণের সময় না খাওয়ার প্রসঙ্গও। আক্ষরিক অর্থে জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন যে, গ্রহণের সময় খেলে কোনো ক্ষতি হয় না।

এ রকমই মন্ত্রমুগ্ধতা দেখেছিলাম নৈহাটি পুরসভার হলে একটি অনুষ্ঠানে। হল ‘হাউসফুল’। অনেকে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যেন নামী কোনো নায়কের ছবির প্রথম শো। আলো নেভার কিছুক্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্রমুগ্ধতা।

মাটির কাছাকাছি এক তারা

পৃথিবী থেকে কোটি কোটি যোজন দূরে থাকা তারা, গ্রহ, উপগ্রহ নিয়ে কাজ করেও তিনি যেন মাটির মানুষ। বোঝানোর সময় যথাসম্ভব বাংলা পরিভাষার ব্যবহার, দর্শকদের প্রশ্নগুলো ভালো করে শোনা, তাদের বোধগম্য করে উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি ছিল শিক্ষণীয়। অনেক ‘বড়ো মাপের’ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির একটা ‘তেজরশ্মি’ বেরোয়। সেই রশ্মির কাছে কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে না ‘সাধারণ মানুষ’। অমলেন্দুবাবু নামী জ্যোর্তিবিজ্ঞানী। মাঠেঘাটে গিয়ে স্লাইড দেখানোর সময় তাঁর সেই রশ্মির খোঁজ করেছি। দেখতে পাইনি। তাই তাঁকে ছুঁয়েছি। প্রশ্ন করেছি। 

আমরা জেনেছিলাম, তিনি নারকোল-মুড়ি খেতে ভালোবাসেন। একবার এক ঘরোয়া স্লাইড শোর শেষে তাঁকে মুড়ি-নারকোল খেতে দিয়েছিলাম। কী তৃপ্তি করে যে খেয়েছিলেন!

মৃত্যুকালে অমলেন্দুবাবুর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। আড়াই বছর আগে মেয়েকে নিয়ে সোদপুরে তাঁর একটি স্লাইড শো দেখতে গিয়েছিলাম। শরীরের কারণে গতি শ্লথ হলেও বোঝানার সময় আগের মতোই তারুণ্য উপচে পড়ছিল। সেই স্লাইড শো দেখে মেয়ের প্রশ্ন আর থামে না। 

ভুল ভুল আমি ভুল

না! না! সূর্য কখনও অনন্ত গ্রহণে থাকতে পারে না। আপনজনের মৃত্যুর খবরে ও আমার মনের বিকার। বিড়লা তারামণ্ডলের ডিরেক্টর পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি শুধু বিজ্ঞান গবেষণা করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে স্লাইড নিয়ে ছুটে গেছেন মাঠে ঘাটে। কারণ, তিনি মনে করতেন ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে’। এই সত্যিটা না বুঝলে মানতে হবে প্লাস্টিক সাজার্রি করে গণেশের মাথা বসানো হয়েছে কিংবা গোমূত্র সর্বরোগহর।

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: বঙ্গদেশের প্রথম সমাজসংস্কারক লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরীর ৪৫০ বছর

সপ্তদশ শতাব্দীতেই সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন তিনি। তাই সে কারণেই সাবর্ণ কুলসূর্য রায় লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় মজুমদার চৌধুরী বঙ্গদেশের প্রথম সমাজসংস্কারক।

Published

on

সাবর্ণদের আটচালা, বড়িশা।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

ঋষি সাবর্ণির নামানুসারেই পরিচয় সাবর্ণ গোত্র বা গোষ্ঠীর। এই গোষ্ঠীর আদি বাসস্থান ছিল কাহ্নকুব্জ, যা এখন কনৌজ নামে পরিচিত। 

Loading videos...

গৌড়ের রাজা আদিশূর যে ব্রাহ্মণ পঞ্চককে কাহ্নকুব্জ থেকে এনেছিলেন তাঁরা রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শ্রী বেদগর্ভ। বাকি চার জন হলেন শ্রী দক্ষ, শ্রী ভট্টনারায়ণ, শ্রী হর্ষ এবং শ্রী ছন্দ (ছান্দড়)। তখন বঙ্গদেশে সপ্তশতী ব্রাহ্মণদের মধ্যে যজ্ঞকার্যে পারদর্শী কেউ না থাকায় বিশেষ যজ্ঞকার্য সম্পাদনের জন্য উপযুক্ত ব্রাহ্মণ পাঠাতে রাজা আদিশূর কাহ্নকুব্জের রাজা চন্দ্রকেতুর কাছে দরবার করেন। আদিশূরের প্রার্থনা শুনে গৌড়বঙ্গে পাঁচ জন বেদজ্ঞ সাগ্নিক ব্রাহ্মণকে পাঠান চন্দ্রকেতু।

ওই পাঁচ ব্রাহ্মণের মধ্যে বেদগর্ভ ছিলেন ঋষি সাবর্ণির পৌত্র। তাঁর পিতা ছিলেন ঋষি সৌভরি। গৌড়বঙ্গে এসে বেদগর্ভ পেয়েছিলেন গৌরমণ্ডলের বটগ্রাম নামক একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম (বর্তমানে যা মালদহ জেলায় গঙ্গাতীরে বটরি বা বটোরিয়া গ্রাম)।

এই পণ্ডিত বেদগর্ভেরই অধস্তন পুরুষ লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরী হলেন সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের প্রথম জমিদার এবং পরিবারের কুলতিলক। ৯৭৭ বঙ্গাব্দের (১৫৭০ খ্রিস্টাব্দ) আশ্বিন মাসে কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার দিন জন্ম লক্ষ্মীকান্তের। লক্ষ্মীপূজার দিন ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন বলে নাম লক্ষ্মীনারায়ণ বা লক্ষ্মীকান্ত। সন্তান জন্ম দিয়েই মা পদ্মাবতীর মৃত্যু হয়। শিশুপুত্রকে কালীঘাটের প্রধান পুরোহিত আত্মারাম ঠাকুরের কাছে অর্পণ করে বাবা জীয়া গঙ্গোপাধ্যায় চলে গেলেন মণিকর্ণিকায়, হয়ে উঠলেন ভারতবিখ্যাত সাধক কামদেব ব্রক্ষ্মচারী।

কালীক্ষেত্রে জন্মগ্রহণের পর লক্ষ্মীকান্ত কালীঘাটের সেবায়েতগণের ব্যবস্থাপনায় বড়ো হতে লাগলেন এবং পাঁচ বছর বয়সে হাতেখড়ি ও তেরো বছর বয়সে তাঁর উপনয়ন সম্পন্ন হয়। মাত্র পনেরো বছরেই তিনি হয়ে উঠলেন সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত এবং আরও বহু ভাষা তিনি আয়ত্তে আনলেন। লক্ষ্মীকান্তের পিতা ছিলেন আত্মারামের শিষ্য। পুত্র লক্ষ্মীকান্তও তাঁর থেকে দীক্ষা নিলেন এবং শক্তিপূজার নিয়ম শিখলেন।

সাবর্ণ গোত্রীয় সুসন্তান লক্ষ্মীকান্ত বঙ্গের অন্যতম জমিদার বিক্রমাদিত্যের অধীনে সপ্তগ্রাম সরকারে রাজস্ব আদায়ের কর্মচারী হন। বিক্রমাদিত্যের পুত্র প্রতাপাদিত্য (যিনি পরবর্তী কালে মহারাজা প্রতাপাদিত্য নামে পরিচিত হন এবং বাংলার বারো ভুঁইয়ার মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠেন) ছিলেন লক্ষ্মীকান্তের সমবয়সি। প্রতাপাদিত্যকে বহু কাজে সাহায্য করতে লাগলেন লক্ষ্মীকান্ত। তাঁর বুদ্ধি, ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনায় প্রতাপ মুগ্ধ হতে লাগলেন।

বিক্রমাদিত্য মারা যাওয়ার পর প্রতাপাদিত্য সিংহাসনে বসলেন। তিনি লক্ষ্মীকান্তকে দেওয়ান পদে নিযুক্ত করলেন। প্রতাপের সমস্ত কাজেই সায় থাকত লক্ষ্মীকান্তের। কিন্তু নিজের খুল্লতাত বসন্ত রায়কে প্রতাপ হত্যা করায় সেই কাজ মেনে নিতে পারেননি লক্ষ্মীকান্ত। তাঁর ঔদ্ধত্যে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে কালীঘাটে ফিরে আসেন।

মহারাজা প্রতাপাদিত্যকে দমন করার পর বঙ্গের সুবেদার রাজা মান সিংহ গুরুদক্ষিণাস্বরূপ লক্ষ্মীকান্তকে দিলেন ৮টি পরগনার নিষ্কর জমিদারি (উত্তরে হালিশহর থেকে দক্ষিণে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত)। এর বার্ষিক রাজস্ব তখন ছিল ২৪৬৯৫০ তৎকালীন মুদ্রা। অর্থাৎ ১৬০৮ সালে দিল্লির বাদশাহ জাহাঙ্গিরের স্বাক্ষর ও সিলমোহরযুক্ত সনদের বলে লক্ষ্মীকান্ত দক্ষিণবঙ্গের বিশাল ভূখণ্ডের জায়গির পেলেন। সঙ্গে উপাধি পেলেন ‘রায়’ ও ‘চৌধুরী’। সে দিন থেকে লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় পরিচিত হলেন রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরী হিসাবে।

জমিদারি লাভ করার পর ১৬১০ সালে লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী ভগবতীদেবী শুরু করলেন কলকাতার প্রথম দুর্গাপূজা। লক্ষ্মীকান্তের জমিদারি ভাগীরথীর দুই তীরেই ছিল। তাঁর জমিদারিভুক্ত ছিল পূর্ব তীরে আলিপুরের অধীন গার্ডেনরিচ, খিদিরপুর, চেতলা, বেহালা-বড়িশা, কালীঘাট; ব্যারাকপুর, নিমতা, দমদম, বরানগর, আগরপাড়া, খড়দহ, বেলঘরিয়া, বারাসাত; ডায়মন্ডহারবারের অধীন মথুরাপুর, রসা, রামনগর, বাঁশতলা, লক্ষ্মীকান্তপুর এবং হালিশহরের অধীন বেশ কিছু জায়গা। আর ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে সালকিয়া, শ্রীরামপুর প্রভৃতি, মেদিনীপুর জেলার কাঁথিও ছিল তাঁর জমিদারির অন্তর্গত।

সাবর্ণদের প্রতিষ্ঠিত কালীঘাট।

কালীঘাটের কালীমন্দিরের সংস্কার করে সেখানে দেবীর পূজার্চনার নতুন ব্যবস্থাও গ্রহণ করলেন লক্ষ্মীকান্ত। কালীঘাটের মায়ের সেবার জন্য লক্ষ্মীকান্ত ৫৯৫ বিঘা ৪ কাঠা ২ ছটাক জমি দান করেছিলেন। শুধুমাত্র কালীঘাটই নয় তিনি কলিকাতা, আমাটি, গোঘাটেও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং জমিজমা দান করেছিলেন। বলা বাহুল্য রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরী ছিলেন সমগ্র বাংলায় ব্রাহ্মণ জমিদারগণের মধ্যে সব চেয়ে ধনশালী এবং বিচক্ষণ জমিদার। জমিদারি রক্ষা করার জন্য তিনি দক্ষ যোদ্ধাবাহিনী তৈরি করেছিলেন। এই বাহিনী প্রয়োজনে মুঘল বাহিনীকেও সাহায্য করত। তিনিই কলকাতার প্রথম সমাজসংস্কারক।  

রাজা বল্লাল সেনের সময়ে হিন্দুদের সর্বোচ্চ দু’টি সম্প্রদায়ের (ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ) ব্যক্তিদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তিসংক্রান্ত ন’টা গুণ থাকলে তাদের  কুলীন বলে গণ্য করা হত। এই ন’টা গুণ হল আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, শান্তি, তপ ও দান। সুতরাং কুলীনপ্রথা প্রবর্তনের সূচনাকালে দেখা যায় উচ্চমানের সংস্কৃতি, পরিচ্ছন্ন ও ধর্মভাবাপন্ন জীবনযাপন, সামাজিক আচারব্যবহারে নম্রতা, সরলতা ও ঋজুতা – এই লক্ষণগুলি কুলীনের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির মধ্যে এই সব গুণ আছে কি না সে ব্যাপারে খোঁজখবর করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য হিন্দু রাজসরকার কুলাচার্য নিযুক্ত করতেন।

বল্লাল সেন যে কুলীনপ্রথা প্রবর্তন করেছিলেন, তাকে ঘিরে পরবর্তী কালে সমাজে দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কুলাচার্য তথা ঘটকরা কুলীনবিচারের প্রক্রিয়াটি ক্রমশ নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এলেন। লক্ষ্মীকান্তের সময়ে ষোড়শ শতকের শেষার্ধে দেবীবর নামে মহাবিক্রমশালী এক কুলাচার্য উৎকোচলোভী স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠলেন। তিনি ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থদের বিভিন্ন ‘মেল’ বা সম্প্রদায়ে ভাগ করে দিলেন। এগুলির মধ্যে ‘ফুলিয়া মেল’, ‘বল্লভী মেল’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অর্থলোভী দেবীবর বিধান দিলেন, যে পরিবার একবার কুলীন হয়েছে, সেই পরিবার কুলীন থাকবে। তিনি বললেন, তাঁরা চরিত্রহীন, মাতাল, এমনকি চোর হলেও তাঁদের কৌলীন্যচ্যুতি ঘটবে না। ফলে সমাজে বহুবিবাহ প্রথার সুত্রপাত হল। অর্থলোভে এবং কৌলীন্য বজায় রাখতে পুরুষ শতাধিক বিবাহ করতেও পিছপা হলেন না।

বংশের কৌলীন্য বজায় রাখার জন্য কন্যাদায়গ্রস্ত পিতামাতা সর্বস্ব খুইয়ে অর্থ সংগ্রহ করে কুলীন পাত্রের সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিতে বাধ্য হতেন। আশি বছরের বৃদ্ধের সঙ্গে আট বছরের বালিকার বিবাহের উদাহরণ সমাজে ভুরি ভুরি মিলতে লাগল। ফলে নারীরা সমাজে ক্রমশই লাঞ্ছিত, অত্যাচারিত ও বিড়ম্বিত হতে লাগল।

লক্ষ্মীকান্ত শুদ্ধ কুলীনের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু কৌলীন্যের নামে বদমায়েশির বিপক্ষে ছিলেন। তা ছাড়া তাঁর পিতা কামদেব ব্রহ্মচারীর মতো নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণকে কৌলীন্যচ্যুত করায় লক্ষ্মীকান্ত ইতিমধ্যেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। সমাজের দুর্নীতি এবং নারীজীবনের এই দুর্দশা তাঁকে ব্যাকুল করে তুলেছিল। ব্রাহ্মণসমাজের ধর্মীয় ও নৈতিক অধঃপতন, বিধবা রমণীদের চোখের জল, অর্থলোভী ঘটক তথা কুলাচার্যদের অত্যাচার দেখে ন্যায়পরায়ণ, রুচিশীল লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় সমাজের এই কুসংস্কার দূর করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে উঠলেন।

হালিশহরে সাবর্ণদের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির।

হালিশহরের কাছে কাঞ্চনপল্লি ছিল লক্ষ্মীকান্তের হাভেলি সরকারের অধীন। দেবীবরের দুর্নীতির খবর পেয়ে এই কাঞ্চনপল্লিতে তাঁর শোভাযাত্রা বন্ধ করে দিলেন লক্ষ্মীকান্ত। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বেদগর্ভের আরও এক উত্তরপুরুষ ঢাকা বিক্রমপুরের গাঙ্গুলি বংশের সন্তান রাঘবকে তাঁর বিবাহের সময় ‘শ্রেষ্ঠ কুলীন’ মর্যাদা দিলেন দেবীবর এবং ঘোষণা করলেন কোনো কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবার লক্ষ্মীকান্তের চার কন্যাকে বিবাহ করবে না।

লক্ষ্মীকান্তের কাছে এই অভিশাপে বর হল। লক্ষ্মীকান্ত মূলত চেয়েছিলেন সমাজে এই কুসংস্কার বন্ধ করতে। কুলীন হওয়ার মোহ তাঁর ছিল না। লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরী তাঁর কন্যাদের বিবাহ দেওয়ার জন্য প্রচুর ভূসম্পত্তি আর নগদ অর্থ দেওয়ার কথা ঘোষণা করতেই তৎকালীন ‘ফুলিয়া মেল’, ‘খড়দহ মেল’, ‘বল্লভী মেল’ এবং ‘সর্বানন্দী মেল’ থেকে চলে এল উপযুক্ত পাত্র। এই উৎকৃষ্ট চার ‘মেল’-এর ঘরে চার কন্যার বিবাহ দিলেন লক্ষ্মীকান্ত।

তখন ঘটকদের সঙ্গে সমাজ সংস্কারক লক্ষ্মীকান্তের যুদ্ধ বেঁধে গেল। দরিদ্র কন্যাদায়গ্রস্ত পিতামাতা দু’হাত তুলে লক্ষ্মীকান্তকে আশীর্বাদ করলেন। লক্ষ্মীকান্ত তাঁর সাত পুত্রের বিবাহও সম্ভ্রান্ত উচ্চ কুলীন পরিবারেই দিলেন। লালমোহন বিদ্যানিধি বলেছেন লিখেছেন –

“লক্ষ্মীর অতুলবিত্ত রায় চৌধুরী খ্যাতি।/ কন্যাদানে কুলনাশে কুলের দুর্গতি।।/ ভাগিনেয় উপানৎ-বহ এই স্পর্দ্ধায়।/ শ্রেষ্ঠ কুলচূর্ণ করে অবহেলায়।।/ কুলীনের মাতামহ হয়ে কুলপতি।/ কুলভঙ্গেও তবু গোষ্ঠীপতির খ্যাতি।।/ যতকালে কালীঘাটে কালিকার স্থিতি।/ লক্ষ্মীনাথে কুলভঙ্গে সাবর্ণের মতি।।”

দেবীবর ও অন্যান্য অর্থলোভী ঘটকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লক্ষ্মীকান্ত সর্বশক্তি দিয়ে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। অবশেষে পরাজিত দেবীবর একটা সমঝোতায় এলেন। তিনি ‘ভগ্নকুলীন’ নামক একটি সংজ্ঞা নির্ণয় করলেন। লক্ষ্মীকান্তের জামাতা বংশগুলি ‘ভগ্নকুলীন’ বলে গণ্য হলেন। এ ছাড়া রায় লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় মজুমদার চৌধুরীকে সমাজের শিরোমণি এবং গোষ্ঠীপতি বলে ঘোষণা করা হল। সপ্তদশ শতাব্দীতেই সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন তিনি। তাই সে কারণেই সাবর্ণ কুলসূর্য রায় লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় মজুমদার চৌধুরী বঙ্গদেশের প্রথম সমাজসংস্কারক।

ঋণ স্বীকার:

১. বঙ্গীয় সাবর্ণ কথা-কালীক্ষেত্র কলিকাতা – ভবানী রায় চৌধুরী

২. Laksmikanta: A Chapter in the social History of Bengal – A.K.Roy

৩. কলিকাতা বিচিত্রা – রাধারমণ রায়

৪. সম্বন্ধ নির্ণয় – লালমোহন বিদ্যানিধি

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: রাজার বিশ্বাস

রাজা কোনো দিন আমাকে বলেনি, নিজেকে বদলে ফেলো, আমার মতো। কিন্তু স্বল্প সময় হলেও, সঙ্গে থেকে বুঝতে পেরেছি, নিজেকে বদলে ফেলতে হবে।

Published

on

Raja Biswas

চিরঞ্জীব পাল

উপরের ছবিটা রাজা বিশ্বাসের। আপনি ওকে হয়তো নাও চিনতে পারেন। রাজা বিশ্বাস আমার বন্ধু। ৪৫ বছর বয়সে সদ্য প্রয়াত হয়েছে। কোভিড নয়, সেলিব্রাল অ্যাটাকে।

Loading videos...

রাজা বামপন্থী। তবে জীবনের এক একটি ধাপে এক এক রকম ভাবে সক্রিয় থেকেছে সে। ছাত্রজীবনে নকশাল রাজনীতি, পরবর্তী কালে রোজগারের প্রয়োজনে সাংবাদিকতা এবং মিডিয়াকর্মী, মিডিয়াকেন্দ্রিক ব্যবসা, একেবারে শেষের দিকে সংস্কৃতিকর্মী।

সংস্কৃতিকর্মী হিসাবে নাটকটাকে আঁকড়ে ধরেছিল। নাট্যকার হিসাবে নিজেকে ক্রমশ বিকশিত করছিল। কিন্তু ছড়িয়ে পড়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।

রাজার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় একটি নিউজ চ্যানেলে। আমি রাজার সমবয়সি হলেও কর্মক্ষেত্রে রাজা ছিল আমার সিনিয়ার। ওই চ্যানেলের একটি জনপ্রিয় প্রোগামের দায়িত্বে সে। আমাকে চ্যানেলের আউটপুট এডিটর বললেন, রাজাকে ওই প্রোগ্রামটায় অ্যাসিস্ট করতে।

পেশায় আমি নতুন, রাজা সিনিয়র, তাই দুরুদুরু বক্ষ এবং কুণ্ঠা নিয়ে হাজির হলাম। তার পর মাত্র পাঁচ মিনিটি, কোথায় গেল সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক! কয়েক মিনিটের মধ্যেই ও বুঝিয়ে দিল আসলে এ সবের কোনো অর্থ হয় না। মোদ্দা কথা হল কাজটাকে চ্যাম্পিয়ন করা।

তার পর সম্পর্ক গড়িয়েছে বন্ধুত্বে। সব সময় এক সঙ্গে কাজ না করলেও সম্পর্ক আরও দৃঢ হয়েছে।

সম্মান ও শ্রদ্ধার মধ্যে একটি বড়ো পার্থক্য রয়েছে। শ্রদ্ধার মধ্যে কোথাও একটি নিজেকে নত করার ব্যাপার থাকে। তা সে মত বা মাথা, উভয়ই। কিন্তু সম্মান জানানোর মধ্যে তা নেই। পারস্পরিক মতের আদানপ্রদানের রাস্তা খোলা থাকে।

রাজার সঙ্গে প্রথম কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারি যে, সে সম্মান জানানোকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এ ক্ষেত্রে ছোটো-বড়োর কোনো পার্থক্য ছিল না। সবার মতকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা, মতের মধ্যে যুক্তি থাকলে তা কাজে লাগানো, অযুক্তির মনে হলে পালটা যুক্তি দিয়ে বলা। কিন্তু কোথাও নিজের মতটাকে ঠিক এবং একমাত্র সত্য বলে চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপার ছিল না।

রাজার সঙ্গে যত মিশেছি, বুঝেছি এটা সে খুব সচেতন ভাবেই চর্চা করে।

যাঁরা ফ্যাসিবাদকে বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসাবে মনে করেন, তাঁদের দেখেছি ‘অচেতন’ ভাবে প্রতি মুহূর্তে ফ্যাসিস্ট-ভাবনার চর্চা করতে। নিজের মতকে একমাত্র সত্য বলে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, অন্য মত না শোনা। আমি তোমার থেকে বেশি সমাজ সচেতন, তাই তুমি কিছু বোঝো না —  নিজের মনে এই বিশ্বাসকে গেঁড়ে বসিয়ে রেখে অন্যের মতকে অসম্মান করা। তাই অন্যকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই নিজের কথা অনগর্ল গড়গড় করে বলে চলা – এ সব চলে প্রতিনিয়ত।

আসলে খুব ছোটো থেকে আমাদের মধ্যে এই অভ্যেসগুলোকে গেঁথে বসিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ি, স্কুল কলেজ – সর্বত্র চলে এই চর্চা। ছোটো শিশুটি তার অভ্যাসবশত কিছু প্রশ্ন করলেই বলা হয় ‘চুপ করো, অত প্রশ্ন কেন।’ শিশুর মনের মধ্যে গেঁথে বসে যায়, বেশি প্রশ্ন করতে নেই বা কেউ প্রশ্ন করলে তাকে এই ভাবে চুপ করিয়ে দিতে হয়। সেখান থেকেই শুরু হয়ে যায় ফ্যাসিবাদের চর্চা।

শিশু নানা বিষয়ে নিজের মত প্রকাশের চেষ্টা করে। কিন্তু বড়োরা তাকে থামিয়ে দেয়। শিশুরা বোঝে এটাই পদ্ধতি।

তাই হিটলার (মানে ফ্যাসিবাদী বলতে তো প্রথমেই আমাদের হিটলারের কথা মনে আসে) মরে ভূত হয়ে গেলেও তার ভাবনার অবাধ চলাচল আমাদের চিন্তায়, কাজে। সমাজ-রাজনীতিতে আবার তাই খুব সহজেই নতুন মোড়কে জায়গা করে নেয় ফ্যাসিবাদ।

আমরা শঙ্কিত হই, প্রধান শত্রু চিহ্নিত করি, বদল চাই, কিন্তু নিজেদের বদলাই না।

রাজা বদলে ফেলেছিল। নিজেকে। সচেতন ভাবে।

রাজা কোনো দিন আমাকে বলেনি, নিজেকে বদলে ফেলো, আমার মতো। কিন্তু স্বল্প সময় হলেও, সঙ্গে থেকে বুঝতে পেরেছি, নিজেকে বদলে ফেলতে হবে। না হলে মেনে নিতে হবে ‘ফ্যাসিবাদ সত্য কারণ ইহা সনাতন’।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: চলে গেলেন অলোকরঞ্জন, খুলে গেল বাংলা কবিতার বাহুডোর

Continue Reading

রবিবারের পড়া

রবিবারের পড়া: চলে গেলেন অলোকরঞ্জন, খুলে গেল বাংলা কবিতার বাহুডোর

রবীন্দ্রসাহিত্যের মধ‍্যে তিনি পেয়েছিলেন বস্তুবাদী জীবনের আড়ালে গভীর এক প্রশান্তি। যেখানে যখন খুশি ডুব দিয়ে অতলের আহ্বানে সাড়া দিতেন।

Published

on

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। ছবি সংগৃহীত।

পাপিয়া মিত্র

পরনে খদ্দরের পাঞ্জাবি আর তার ওপরে জহর কোট, কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ। আপাতনিরিখে বাঙালিয়ানায় কাটিয়ে দিলেন জীবনের এক দীর্ঘ সফর, জার্মানিতে। এবং যাঁর মননে-চিন্তায়-জাগরণে শুধু বাংলা ভাষা, বাংলা কবিতা। তিনি সাহিত্য কাব্যজগতের কিংবদন্তি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত।

Loading videos...

কেমন তাঁর কবিতা?

জানো এটা কার বাড়ি? শহুরে বাবুরা ছিলো কাল, /  ভীষণ শ্যাওলা এসে আজ তার জানালা দেয়াল / ঢেকে গেছে, যেন ওর ভয়ানক বেড়ে গেছে দেনা, / তাই কোনো পাখিও বসে না! / এর চেয়ে আমাদের কুঁড়েঘর ঢের ভালো, ঢের  / দলে-দলে নীল পাখি নিকোনো নরম উঠোনের  / ধান খায়, ধান খেয়ে যাবে – / বুধুয়া অবাক হয়ে ভাবে। ( বুধুয়ার পাখি)।

আবার কখনও তিনি বলেছেন, “কবিতা তো আমার কাছে মহাতরণী, যে তরণী অনেক সময় মনে হয়েছে ঢেউ দিয়ে গড়া।” এই ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছিলেন বাংলা কবিতার কৌলীন্য। কবিতাজগতে যে ঢেউ তিনি তুলেছিলেন সেই কবিতাগোলার তিনি ছিলেন এক আদর্শ কারিগর। ১৯৫৯-এ প্রথম বইটি ‘যৌবনবাউল’ প্রকাশিত হয়। এর এক যুগ পরে প্রকাশিত হয় তাঁর গবেষণা গ্রন্থ ‘দ্য লিরিক ইন ইন্ডিয়ান পোয়েট্রি’।  চার দশকেরও বেশি সময় ধরে জার্মানির এই বাসিন্দা তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার উৎসর্গে লেখেন ‘ভগবানের গুপ্তচর মৃত্যু এসে বাঁধুক ঘর / ছন্দে, আমি কবিতা ছাড়ব না’ – যা একদিন উসকে দিয়েছিল বাঙালির কবিতা লেখার আবগকে।

মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। বার্ধক‍্যজনিত রোগেই তাঁর চিরশান্তি লাভ। নিঃস্ব হল বাংলার সংস্কৃতিজগত। খুলে গেল বাংলা কবিতার বাহুডোর।

১৯৩৩-এর ৬ অক্টোবর কলকাতায় জন্ম অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা শেষ করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে সাহিত্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ভারতীয় কবিতার শব্দমালা নিয়ে পিএইচডি করেছিলেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ থেকে শুরু কর্মজীবন। পরে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ‍্যালয়ে অধ্যাপনা করতে গিয়েছিলেন অলোকরঞ্জন। সেখান থেকে শুরু করেন নিজের দেশের সঙ্গে কর্মরত দেশের সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা এবং এখানেই তাঁর কৃষ্টির সফলতা।

অধ‍্যাপনার পাশাপাশি তিনি বহু জার্মান কবিতা ফরাসি ও বাংলায় অনুবাদ করেছেন। পাশাপাশি বাংলা ও সাঁওতালি কবিতা জার্মান ও ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতির ভাঁড়ারকে আরও সমৃদ্ধ করে এক কালের হিটলারের দেশে উৎসাহভরে পৌঁছে দিয়েছিলেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। বাংলা-জার্মান সাহিত্যের মেলবন্ধনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। এই কর্মকাণ্ডের জন্য জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে ‘গ্যেটে’ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন তিনি। পাকাপাকি ভাবে জীবনের অর্ধেক সময় জার্মানির বাসিন্দা হলেও বাংলার সঙ্গে নাড়ির টান তাঁর ছিন্ন হয়নি কখনও।

উল্লেখযোগ্য কাব‍্যগ্রন্থ ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’, ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’, ‘দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে’, ‘পাহাড়তলীর বাস্তুহারা’, ‘এখন নভোনীল আমার তহবিল’, ‘মরমী করাত’ ইত্যাদি। রবীন্দ্র-অনুসারী কাব্যরুচি থেকে বাংলা কবিতাকে এক পৃথক খাতে বইয়ে দেওয়ার শুরু পঞ্চাশের দশকে। এই সময় নিজস্ব ধারায় যাঁরা লিখতে এসেছিলেন অলোকরঞ্জন ছিলেন তাঁদের অগ্রপথিক, যিনি কবি শঙ্খ ঘোষের পরম বন্ধু।

১৯৯২ ‘মরমী করাত’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। এই কাব্যগ্রন্থ পরে তাঁকে প্রবাসী ভারতীয়ের সম্মান এনে দেয়। এ ছাড়া ঝুলিতে আছে রবীন্দ্র পুরস্কার ,আনন্দ পুরস্কার ও অসংখ্য কাব্যপ্রেমিকের ভালোবাসা। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে ছিল তাঁর প্রাণবন্ধুতা।

শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করা কিশোর অলোকরঞ্জনের কেমন কেটেছিল শৈশব? এক জায়গায় উনি বলেছেন, সব সময় মনে হত রবীন্দ্রনাথ নেই ঠিকই, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি অনুভবে এসে ধাক্কা দিয়ে যেত। আর সেই সময় থেকে অবচেতনে অবগত করে নিয়েছিল শৈশবকাল। রবীন্দ্রনাথের মৃত্য ১৯৪১। আট বছরের অলোকের কাছে তখন কবির রচনাপর্বের প্রান্তসময়।

৫০-এর দশকের কবি অলোকরঞ্জনের কৈশোর-যৌবনকাল স্বাভাবিক ভাবেই রবীন্দ্রোত্তর যুগে সমাদৃত। তাঁর পূর্বভাষ ও উত্তরভাষের আহার রবীন্দ্রনাথ। তিনি মনে করেন, কবি ছাড়া জন্ম-মৃত‍্যু নেই। বিশ্বের নানা দেশে বিখ্যাত কবিরা আছেন, কিন্তু তাঁরা সেই দেশেই সীমাবদ্ধ, কেননা আসল অন্তরায় ভাষা। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য কবিতা লিখেছেন, লিখে চলেছেন, মরে যেতে যেতেও কবিতা লিখে যাবেন। অমরতার কবিতা লিখতে গেলে একমাত্র নশ্বরই লিখবে। এটা ছিল অলোকরঞ্জনের বিশ্বাস।

৪০-এর দশকে ছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ‍্যায়, নরেশ গুহরা। তার অনুজ স্তরে এসে পড়েছে্ন অলোকরঞ্জন,  শঙ্খ ঘোষ, অরবিন্দ গুহরা। ২০-৩০ দশক থেকে রবীন্দ্ররচনা গ্রহণ-বর্জনের একটা প্রবাহ সমান্তরাল ভাবে প্রবাহিত ছিল। কিন্তু দেখা যায় রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করা হয়েছে আধুনিক কবি হিসেবেই এবং সেই দিকে পাল্লা ভারী হয়ে পড়ছে। মনে হল রাঙামাটির দেশ থেকে একটা চ‍্যালেঞ্জ উড়ে এল – ‘পারবি না কি যোগ দিতে এই ছন্দে রে / খসে যাবার, ভেসে যাবার, ভাঙবারই  আনন্দে রে’।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী একটা শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বীজতলা’। এখান থেকেই অঙ্কুরিত হওয়া রবীন্দ্র-পরবর্তী কবিদের। অর্থাৎ যাঁরা ওই শব্দটিকে গ্রহণ করেছেন। কারণ সেই জীবনানন্দ দাশের বহুশ্রুত উক্তি, ‘একটা দুটো কবিতা লিখে কবি হওয়া যায় না। সবাই কবিতা লেখে, তবে কেউ কেউ কবি নয়’। রবীন্দ্রনাথ যে ভাষা তুলে দিয়েছেন, আজীবন সেই খেলাই তুলে নিয়েছেন কবি অলোকরঞ্জন। সে লেখালেখি স্বাধীন। তবে সেই সময়ও একটা প্রতিযোগিতা ছিল, তবে সেটা ছিল স্বাস্থ্যময়। অন্তরে ছিল সত্তার অনন্ত প্রান্তর। যেখানে কখনোই বাণিজ্যিক মাধ‍্যমের অনুশাসন ও প্রণোদনা ছিল না। যদিও সেই যুগটা মিডিয়ার যুগ ছিল না। যদিও মিডিয়াকে দোষ দেওয়া যায় না। পরবর্তী যুগের কবিদের এদের সঙ্গে মোকাবিলা করে চলতে হয়েছে বা হচ্ছে।

সেই সময় অপীড়িত অক্ষরব্রহ্মের কাছে আত্মনিবেদন করে লেখা চালিয়ে যেতে হত। রবীন্দ্রসাহিত্যের মধ‍্যে তিনি পেয়েছিলেন বস্তুবাদী জীবনের আড়ালে গভীর এক প্রশান্তি। যেখানে যখন খুশি ডুব দিয়ে অতলের আহ্বানে সাড়া দিতেন। আর জন্ম নিত ‘ফেরা’, ‘পাখিদের খাবার দাবার’, ‘তোমার নাগকেশর’, ‘ছেলেটি’, ‘এক বেশ‍্যা অনায়াসে মন্দিরের ভিতর ঢুকে যায়’, ‘চৌরঙ্গীর ফুটপাত’ সহ নানা মুক্তো।

জার্মানির হাইডেলবার্গের রুপ্রেশ্ট-কার্লস বিশ্ববিদ‍্যালয়ে আলেকজান্ডার ফন হুমবোল্ট ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৭১-এ। তখন তিনি তরুণ তুর্কি। অলোকরঞ্জনের প্রয়াণে ইউরোপে বাংলা সাহিত্যের বাতিঘর অন্ধকার হয়ে গেলেও কবির অস্তিত্বনক্ষত্র জ্বলে তার সৃষ্টির মধ‍্যে।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

রবিবারের পড়া: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
ফুটবল3 hours ago

শেষ মুহূর্তের গোল নর্থইস্টের, এগিয়ে থেকেও প্রথম সেমিফাইনাল ড্র এটিকে মোহনবাগানের

দেশ3 hours ago

স্বামী থাকতেও প্রেমিক খুঁজছেন ভারতের বিবাহিত মহিলারা! এটা কি খারাপ খবর?

রাজ্য4 hours ago

অস্বস্তি বাড়াচ্ছে রাজ্যের করোনা সংক্রমণ, কলকাতাতেও বাড়ল আক্রান্তের সংখ্যা

রাজ্য6 hours ago

লড়াই মুখোমুখি! নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী

দেশ6 hours ago

ফের বাড়ছে উদ্বেগ! ৮টি রাজ্যেকে বিশেষ করোনা-পরামর্শ কেন্দ্রের

রাজ্য7 hours ago

আজই প্রার্থী তালিকা বিজেপির! নন্দীগ্রামে শুভেন্দু, খড়গপুরে দিলীপ, জোর জল্পনা

ক্রিকেট8 hours ago

ইংল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে সিরিজ জিতল ভারত

দেশ8 hours ago

নিজস্ব শিক্ষা পর্ষদ গঠন করছে দিল্লি, বড়ো ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের

রাজ্য1 day ago

পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করল তৃণমূল

গাড়ি ও বাইক2 days ago

আরটিও অফিসে আর যেতে হবে না! চালু হল আধার ভিত্তিক যোগাযোগহীন পরিষেবা

ভ্রমণের খবর3 days ago

ব্যাপক ক্ষতির মুখে পর্যটন, রাঢ়বঙ্গে ভোট পেছোনোর আর্জি নিয়ে কমিশনের দ্বারস্থ পর্যটন ব্যবসায়ীদের সংগঠন

রাজ্য1 day ago

বিধান পরিষদ গঠন করে প্রবীণদের স্থান দেওয়া হবে, প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে বললেন মমতা

কলকাতা2 days ago

মোদীর ব্রিগেডের দিন কলকাতাকে ‘মমতাময়’ করতে ওয়ার্ড-প্রশাসকদের বিশেষ নির্দেশ তৃণমূলের

দেশ2 days ago

দেশের পরিস্থিতি একটু ভালো হলেও পঞ্জাবে মারাত্মক ভাবে বাড়ল দৈনিক সংক্রমণ

ক্রিকেট3 days ago

টসে জিতে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং, সিরাজকে ফেরাল ভারত

বেশন কার্ড
দেশ3 days ago

রেশন কার্ড সম্পর্কিত সমস্যায় অভিযোগ জানান এই নম্বরগুলিতে, দেখে নিন সম্পূর্ণ তালিকা

কেনাকাটা

কেনাকাটা4 weeks ago

সরস্বতী পুজোর পোশাক, ছোটোদের জন্য কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সরস্বতী পুজোয় প্রায় সব ছোটো ছেলেমেয়েই হলুদ লাল ও অন্যান্য রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠে। তাই ছোটোদের জন্য...

কেনাকাটা4 weeks ago

সরস্বতী পুজো স্পেশাল হলুদ শাড়ির নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই সরস্বতী পুজো। এই দিন বয়স নির্বিশেষে সবাই হলুদ রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই হলুদ রঙের...

কেনাকাটা1 month ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা1 month ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা1 month ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা1 month ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা1 month ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা2 months ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা2 months ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

কেনাকাটা2 months ago

৯৯ টাকার মধ্যে ব্র্যান্ডেড মেকআপের সামগ্রী

খবর অনলাইন ডেস্ক : ব্র্যান্ডেড সামগ্রী যদি নাগালের মধ্যে এসে যায় তা হলে তো কোনো কথাই নেই। তেমনই বেশ কিছু...

নজরে